ঢাকা ০৩:০৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ সেকেন্ডে বাইক চুরি করে বিক্রি হতো ৫০ হাজার টাকায় সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র অনুমোদন দুদকের ‘আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসছে’: আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ইউরোপের দেশে দেশে বিক্ষোভ সূর্যবংশীতে ভারতের মোহ কি শেষ? ৫ টি–টুয়েন্টিতেই একাদশে বাইরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ১১ কর্মকর্তাকে বদলি ডেমরায় পিকআপ ভ্যানের চাপায় অজ্ঞাত নারী নিহত নারায়ণগঞ্জে সাত খুন, বুয়েটের আবরার ফাহাদ ও সিনহা হত্যা মামলায় আপিল শুনানির তারিখ নির্ধারণ তিন বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে, এবার কি দেশে ফিরছেন মৌসুমী রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব…

বাংলাদেশে উঠতি মধ্যবিত্তের বিকাশ এবং স্থানীয় শিল্পায়নের সম্ভাবনা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৩৮:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

অর্থনৈতিক মধ্যবিত্ত কারা, সেটা চিহ্নিত করা গেলে তাদের অর্থনৈতিক উপযোগিতা ও অবদানের সুযোগগুলোও খুঁজে পাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের ফল ও কারণ হিসেবে নতুন এক উঠতি মধ্যবিত্তকেও দেখা যাচ্ছে। উন্নয়ন গবেষক মহা মির্জা প্রশ্ন করছেন, শ্রমিকের আয় না বাড়লে উঠতি মধ্যবিত্তেরও বিকাশ থমকে যায় কিনা। রপ্তানিমুখী শিল্পের ওপর একচেটিয়াভাবে ভর না করে স্থানীয় বাজার ও স্থানীয় চাহিদানির্ভর শিল্পায়নের গুরুত্ব কতটা। স্থানীয় শিল্পায়নভিত্তিক কর্মসংস্থান ছাড়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ হবে কীভাবে? বাংলাদেশের উন্নয়নের নীতির গুরুতর একটা ফাঁক হলো এই নীতির মধ্যে শ্রমিক ও নিম্নমধ্যবিত্তের অস্তিত্বটা প্রায়ই ভুলে থাকা হয়। শেষ পর্যন্ত সেটা অর্থনীতির সার্বিক বিকাশকেই ভারসাম্যহীন করে ফেলে। অর্থনীতির তত্ত্বের সঙ্গে সমাজবিজ্ঞান ও সর্বজনের স্বার্থ মেলানো অর্থনৈতিক আলোচনা যেখানে বিরল, সেখানে মহা মির্জার প্রবন্ধটি বাস্তব সমস্যা ও সম্ভাবনাকে একসঙ্গেই আলোচনা করেছে।

অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে মধ্যবিত্ত

মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংজ্ঞা কী? ঠিক কাকে মধ্যবিত্ত বলে? খুব স্বাভাবিকভাবেই মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা স্থান, কাল বা একাডেমিক ডিসিপ্লিন অনুসারে ভিন্ন হতে পারে। যেমন সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যবিত্তের সংজ্ঞায়ন এবং অর্থনীতিবিদদের সংজ্ঞায়ন এক নয়। আবার ঔপনিবেশিক সময়ের মধ্যবিত্ত এবং এখনকার ‘শহুরে’ নাগরিক মধ্যবিত্ত এক নয়। যেমন ‘সামন্তীয়’ ইউরোপে মধ্যবিত্ত বলতে বোঝানো হতো পেজেন্ট্রি (কৃষক) ও নোবেলিটির (অভিজাত) মাঝখানে গড়ে ওঠা শ্রেণিটি। আবার পশ্চিমের এখনকার সমাজবিজ্ঞানীরা মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে উচ্চশিক্ষা এবং ‘হোয়াইট কলার’ চাকরির মানদণ্ডে চিহ্নিত করেছেন, যাঁরা মূলত টেবিলে বসে চাকরি করেন এবং দৈহিক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত নন। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ হোমি খারাস মধ্যবিত্তকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে : Being in the middle class implies having a comfortable standard of living, economic security, and self-reliance. The middle classes come from a range of occupations : government officials, college graduates, rich farmers, traders, business people, and professionals. They are in various management and clerical jobs. Many are self-employed in small businesses, crafts, and on commercialized family farms (খারাস ২০১১ : ৫৯) ।

বলা বাহুল্য, অর্থনীতিবিদেরা মধ্যবিত্তকে সংজ্ঞায়িত করেন আয় ও ব্যয়ের নিক্তিতে। যেমন ব্যানার্জি এবং ডাফলো (২০০৮) মধ্যবিত্ত চিহ্নিত করেছেন দৈনিক মাথাপিছু ব্যয় (এক্সপেন্ডিচার) ৬ থেকে ১০ ডলারের মধ্যে ধরে। বার্ডসল (২০০৭) মধ্যবিত্ত চিহ্নিত করেছেন দৈনিক মাথাপিছু আয় ১০ ডলারের ওপরে ধরে। রাভালিওন (২০০৯) পশ্চিমা দেশের মধ্যবিত্ত (ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড মিডল ক্লাস) এবং উন্নয়নশীল দেশের মধ্যবিত্তকে (ডেভেলপিং ওয়ার্ল্ড মিডল ক্লাস) আলাদা আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়ে চিহ্নিত করেছেন। আবার হোমি খারাস (২০১০) ‘গ্লোবাল মিডল ক্লাস’র হিসাব দেখিয়েছেন মাথাপিছু ব্যয় ১০ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে (এডিবি ২০১০ : ৫ ।) তাঁর মতে, এই পরিসীমার মধ্যবিত্তের মধ্যে নতুন ধরনের পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা তৈরি হয়। ভারতীয় অর্থনীতিবিদ (বিশ্বব্যাংকে কর্মরত) এজাজ ঘানি অর্থনীতিতে মধ্যবিত্তের ভূমিকা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে : A bigger middle class spends more, leading to higher business profits, savings and investment, higher growth and a larger middle class (খারাস ২০১১ : ৭৫)। তবে সব মধ্যবিত্তের মাপকাঠি এক নয়। মধ্যবিত্তের মধ্যে আছে উচ্চমধ্যবিত্ত আবার নিম্নমধ্যবিত্তও। বিভিন্ন সংস্থার জরিপে মধ্যবিত্তের এই ভাগগুলোর সংজ্ঞায়নও আবার এক নয়।

মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক সংজ্ঞার ক্ষেত্রে নানা রকমের হিসাব দেখা গেলেও এটি আসলেও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো অর্থনৈতিক চরিত্র হলো তার বাড়ন্ত ক্রয়ক্ষমতা। মধ্যবিত্ত কেবল খাদ্যবস্ত্র, বাসস্থানে খরচ করে না, বরং ‘এসেনশিয়াল’ বা আবশ্যক পণ্যগুলোর বাইরেও ‘নন-এসেনশিয়াল’ কিন্তু ডিজায়ারেবল (কাঙ্ক্ষিত) পণ্যগুলোতে খরচ করা শুরু করে। মধ্যবিত্ত রেস্টুরেন্টে খেতে যায়, মধ্যবিত্ত ঘর সাজানোর জিনিস কেনে, মধ্যবিত্ত প্লাস্টিকের সস্তা আসবাবের পরিবর্তে কাঠের মজবুত আসবাব কেনে। মধ্যবিত্ত কার্পেট কেনে, বালিশের কুশন কেনে, বছরে একবার কক্সবাজার বা সিলেটে বেড়াতে যায়। লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ মধ্যবিত্ত আইপিএস কেনে। তাই একটি দেশের মধ্যবিত্তের উত্থান মানেই হচ্ছে সামগ্রিকভাবে ওই দেশের বাজার ও অর্থনীতির চরিত্র ও ধরন বদলে যাওয়া, বাজারের ভোগ্যপণ্যের চাহিদা ও সরবরাহে পরিবর্তন ঘটা।

ভারতের মধ্যবিত্ত এবং ‘কনজ্যুমার গুড’র উত্থান

মূলত নব্বইয়ের দশক থেকে ভারত ও ভিয়েতনামে এবং তার কিছু পরে বাংলাদেশের মতো এককালীন দরিদ্র দেশগুলোতেও মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটে। মূলত গ্রামীণ কৃষক পরিবারের সন্তানদের শহরে পড়তে আসা, পড়ালেখা শেষে শহরেই চাকরির খোঁজ করা, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার পর শহরে থেকে যাওয়া, পরিবারের অন্য সদস্যদের শহরের দিকে টানা ইত্যাদি নানা অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটে, এমনটাই আমরা দেখি। ম্যাকেন্জি রিপোর্ট ২০০৭ সালেই দেখিয়েছিল, ২০২৫ সালের মধ্যে ভারতের মধ্যবিত্তের সংখ্যা ৫ কোটি থেকে ৫০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে (ম্যাকেন্জি গ্লোবাল ইন্সিটিউট ২০০৭)। ম্যাকেন্জি রিপোর্টের মতে, এই নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণিটির কনজাম্পশন বা ভোগের প্রবণতায় নাটকীয় পরিবর্তন আসবে, ‘These groups choose what they will consume, rather than be driven by the necessities of life. Such discretionary choices, reflecting the tastes of the new Indian middle class, will dominate consumption patterns.’ (ম্যাকেন্জি গ্লোবাল ইন্সিটিউট ২০০৭)। যেমন, নব্বইয়ের দশকে ভারতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানের সঙ্গে  সঙ্গে বেশ কিছু কনজ্যুমার গুড বা ভোগ্যপণ্যের চাহিদা হুহু করে বাড়তে থাকে। এই বাড়তি চাহিদার পণ্যের তালিকায় আছে গাড়ি, মোটরসাইকেল, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন এবং রেফ্রিজারেটর। ২০০৭ সালের ম্যাকেন্জি রিপোর্ট ভারতীয় মধ্যবিত্ত সম্পর্কে মন্তব্য করেছে এভাবে : They enjoy a lifestyle that most of the world would recognize as middle class and typically own a television, a refrigerator, a mobile phone and perhaps even a scooter or a car. Although their budgets are stretched, they scrimp and save for their children’s education and their own retirement (ম্যাকেন্জি গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ২০০৭)।

অন্যদিকে উপমহাদেশের উচ্চমধ্যবিত্তরা হলেন সাধারণত ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারিয়াল পদের কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ী। ২০০৭ সালের ম্যাকেন্জি রিপোর্ট ভারতীয় উচ্চমধ্যবিত্ত সম্পর্কে বলছে, Successful and upwardly mobile, they are highly brand-conscious, buying the latest foreign-made cars and electronic gadgets. They are likely to have air conditioning, and can indulge in an annual vacation, usually somewhere in India.

উচ্চমধ্যবিত্তের শৌখিন বিদেশি ব্র্যান্ডের প্রতি ঝোঁক তৈরি হয় বলেই ভারতের বাজারে ক্রিশ্চিয়ান ডিওর বা টমি হিলফিগারের মতো দামি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো ইতিমধ্যে ব্যবসাসফল হয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, উচ্চমধ্যবিত্তের উত্থানের সঙ্গে আমদানি করা পণ্য এবং হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্টের মতো পর্যটন-পণ্যেরও চাহিদা বেড়েছে। আবার আমদানি করা পণ্যের চাহিদা বাড়ার মধ্য দিয়ে বড় শহরগুলোতে ‘সুপারমল’-এর সংখ্যাও বেড়েছে।

এদিকে ভারতের ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্তের চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই পূরণ করেছে ভারতের স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাত। যেমন একসময় সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয়ের পক্ষে গাড়ি কেনার সামর্থ্য ছিল না। মধ্যবিত্তের বাড়ন্ত গাড়ির চাহিদাকে আমলে নিয়েই আশি-নব্বইয়ের দশকে ভারতে অটোমোবাইল খাতে বিপুল বিনিয়োগ ঘটে। সাম্প্রতিক কালে আবার নতুন মধ্যবিত্তের চাহিদা এবং ক্রয়ক্ষমতাকে মাথায় রেখেই টাটা মোটরস মাত্র এক লাখ টাকার গাড়ি এনেছে ভারতের বাজারে (‘ওয়ান লাখ রুপি কার’ নামে পরিচিত)। এ ছাড়া মধ্যবিত্তের উত্থান মানেই শহরে আধুনিক আবাসনের চাহিদা বৃদ্ধি ও রিয়েল এস্টেট বা নির্মাণ খাত বিকশিত হওয়া। উল্লেখ্য, নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে ভারতে মধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে গাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার জন্য ঋণ নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়। যেমন স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া এবং মারুতি-সুজুকির মতো গাড়ি কোম্পানি একসঙ্গে চুক্তি করে স্বল্প কিস্তিতে গাড়ি কেনার সুযোগ করে দিচ্ছে ভারতীয় মধ্যবিত্তকে। আবার ভারতীয় ইলেকট্রনিক উৎপাদন কোম্পানি ভিডিওকন স্বল্প আয়ের মধ্যবিত্তকে মাথায় রেখে খুব সস্তা দামের ওয়াশিং মেশিন বাজারে এনেছে।

বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা কত, এই হিসাব করতে গেলে সাধারণত তিনটি গবেষণা প্রতিবেদন সামনে আসে (জাইকা ২০১৬ : ৬২)। এর মধ্যে ড. বিনায়ক সেনের (২০১৫) হিসেবে দৈনিক ২ থেকে ৩ ডলারের মধ্যে আয় হলে তাকে মধ্যবিত্ত বলা হচ্ছে (স্বভাবতই আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থাগুলো ২ থেকে ৩ ডলারের এই ‘ইনকাম রেঞ্জ’ বা আয়ের পরিসীমাকে অনেক কম মনে করছে)। বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ-এর হিসাবে দৈনিক ১৩ থেকে ২১ ডলার আয় হলে তাকে মধ্যবিত্ত বলা যায়। তবে আমেরিকার পিউ রিসার্চ সেন্টার মধ্যবিত্তের আয় নির্ণয় করতে আরেকটু সতর্কতা অবলম্বন করেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টার দৈনিক ২ থেকে ১০ ডলার আয়কে চিহ্নিত করছে ‘লো ইনকাম’ বা নিম্ন আয় হিসেবে আর দৈনিক ১০ থেকে ২০ ডলার আয়কে চিহ্নিত করছে মধ্যবিত্তের আয় হিসেবে। এ ছাড়া দৈনিক ২০ থেকে ৫০ ডলার আয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে উচ্চমধ্যবিত্ত হিসেবে (মাসিক ৪০-৭৮ হাজার টাকা) (জাইকা ২০১৬ : ৬২) ।

এদিকে জাইকার ‘ইমার্জিং মিডল ইনকাম ক্লাস ইন বাংলাদেশ’ প্রতিবেদনটি পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপটিকেই বাস্তবসম্মত হিসেবে গ্রহণ করেছে, যদিও জাইকা আরও এক ধাপ এগিয়ে মধ্যবিত্তের ক্যাটাগরিটিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। যেমন দৈনিক ২ থেকে ৪ ডলারকে নিম্ন আয় হিসেবে দেখিয়েছে (৮-১৫ হাজার টাকা), আর ৪ থেকে ১০ ডলার আয়কে দেখিয়েছে নিম্নমধ্যবিত্ত হিসেবে (১৫-৪০ হাজার টাকা) (জাইকা ২০১৬ : ৬২) ।

জাইকার ২০১৬ সালের হিসাব অনুসারে, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২৫ শতাংশ, নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ, নিম্নমধ্যবিত্ত প্রায় ৩৪ শতাংশ আর উচ্চমধ্যবিত্ত মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ (জাইকা ২০১৬ : ৬৩) । এদিকে বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের ২০১৫ সালের জরিপ বলছে, পরবর্তী এক দশকে প্রতিবছর বাংলাদেশের ২০ লাখ মানুষের মাসিক আয় ৩৫ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছাবে। অর্থাৎ এই গ্রুপের ভোক্তা পরিবারগুলো এসি, আইপিএস বা বিদেশি শ্যাম্পু বা কসমেটিকসের মতো পণ্যগুলো কেনার মতো সক্ষমতা রাখবে।

বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা ও ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজার

সাধারণত মাসিক আয় ৩০ হাজার টাকা ছাড়ালে (অর্থাৎ নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তের পরিসীমায় প্রবেশ করলে) ভোক্তা পরিবারগুলোর প্রধান প্রবণতা হলো স্মার্টফোন, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর বা ইস্ত্রি কেনা। মাসিক আয় আরও বৃদ্ধি পেলে পরের ধাপে মোটরবাইক, এসি, আইপিএস বা রাইস কুকার কেনা। দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানে ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজারে নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়েছে। এদিকে শুধু পণ্যের বাজার তৈরি হলেই হবে না, পণ্য কোথায় তৈরি হচ্ছে (দেশে না বিদেশে), কোথায় সংযোজন হচ্ছে, আমদানি হচ্ছে নাকি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, অর্থনীতির বিকাশে এটি একটি অত্যন্ত জরুরি প্রশ্ন।

জাইকার (২০১৬) জরিপে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বা সংযোজিত পণ্যের বাজার সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। যেমন বর্তমানে ইলেকট্রনিক পণ্যের স্থানীয় সংযোজনকারী (অ্যাসেম্বলার) হিসেবে দেশীয় বাজারের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, বাটারফ্লাই, ইউনিটেক, খান ট্রেডিংস, হাওলাদার ইলেকট্রনিকস, রয়াল, ইলেক্ট্রোমার্ট এবং স্কয়ার। আর বাজারে প্রতিযোগিতা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর মধ্যে আছে এলজি, সনি, স্যামসাং, শার্প, হিটাচি, প্যানাসনিক, ফিলিপস, মিয়াকো, নোভা, ডিজিটাল, সিঙ্গার, হাইকো, জেনারেল ইত্যাদি। তবে কেবল এসি, রেফ্রিজারেটর ও ব্লেন্ডার ছাড়া বাকি ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজার প্রায় পুরোটাই জাপানিজ, চায়নিজ ও কোরীয় কোম্পানির দখলে। রেফ্রিজারেটর ও এসির ক্ষেত্রে বেশ ভালো করছে দেশীয় কোম্পানি ওয়ালটন। শার্প ও সিঙ্গারের মতো বিদেশি কোম্পানিগুলোকে টেক্কা দিয়ে ওয়ালটন-এর পণ্য সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। আবার আইপিএসের ক্ষেত্রে সিঙ্গার বা স্যামসাংয়ের চেয়ে রহিমআফরোজের বাজার বড়।

অন্যান্য বেশ কিছু পণ্যের ক্ষেত্রেও ওয়ালটনের সক্ষমতা খেয়াল করার মতো। যেমন মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে সুজুকি, হোন্ডা ও হিরোর পরেই ওয়ালটনের বাজার। সেলফোনের ক্ষেত্রে স্যামসাংয়ের পরেই ওয়ালটনের বাজার। এ ক্ষেত্রে সিম্ফনির থেকেও ভালো করছে ওয়ালটন। ব্লেন্ডার বিক্রির ক্ষেত্রেও ফিলিপস, নোভা, প্যানাসনিককে ছাড়িয়ে ওয়ালটন সবচেয়ে এগিয়ে (জাইকা ২০১৬ : ৭৪)। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, মধ্যবিত্তের উত্থানে নানা রকমের ইলেকট্রনিক পণ্যের যে নতুন বাজার তৈরি হয়েছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত না হলেও স্থানীয়ভাবে সংযোজিত। উৎপাদন, সংযোজন, সেলস, ডিস্ট্রিবিউশন ও মার্কেটিং মিলিয়ে দেশীয় এই দু-একটি কোম্পানি উল্লেখযোগ্য মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি করতে পারছে। কিন্তু মধ্যবিত্তের মধ্যে যেহেতু প্রকারভেদ আছে এবং উচ্চমধ্যবিত্তের মধ্যে যেহেতু নতুন ধরনের পণ্য কেনার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হচ্ছে, তাই এমন বলা যেতে পারে যে ‘রাইজিং’ মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়লেই স্থানীয় শিল্পের সংখ্যা বাড়বে বা স্থানীয় শিল্পের বিকাশ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং প্রবণতা বলে, মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আরেকটু বেশি খরচের আমদানিকৃত পণ্যের চাহিদা বাড়বে। যেমন জাইকার ২০১৫ সালের জরিপ বলছে, বাংলাদেশের উচ্চমধ্যবিত্তের মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য কিনতে আগ্রহী। যেখানে ৫৮ শতাংশই আমদানি করা পণ্য কিনতে আগ্রহী এবং ২৪ শতাংশ স্থানীয়ভাবে সংযোজিত (এসেম্বেল্ড) পণ্য কিনতে আগ্রহী (জাইকা ২০১৬ : ৪৯) । মূলত গাড়ি ও টিভির ক্ষেত্রেই বিদেশি পণ্যের প্রতি এই আগ্রহ বেশি দেখা গেছে।

আবার অন্যদিকে দরিদ্র থেকে নিম্নমধ্যবিত্তে উপনীত হওয়া শ্রেণিটির তুলনামূলক বেশি দামে আমদানিকৃত পণ্য কেনার সামর্থ্য নেই। তাঁরা দেশে তৈরি পণ্যেই ভরসা রাখেন। তাই এমন বলাই যায় যে নতুন মধ্যবিত্তের উত্থানের সঙ্গে স্থানীয় পণ্যের চাহিদা অবশ্যই বাড়ে এবং স্থানীয় শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু ধনী বা উচ্চমধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধি স্থানীয় শিল্পায়নের জন্য সুবিধাজনক না-ও হতে পারে। বরং উচ্চমধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে আমদানিকৃত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির সম্পর্কটি বেশ দৃশ্যমান। অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ের শিল্পায়নের জন্য মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে শ্রমিকের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি কিংবা প্রাথমিক ধাপে অন্তত শ্রমিকের নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উত্তরণ।

শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা ও মধ্যবিত্তে উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশের মতো দেশে শ্রমিক তাঁর মজুরির প্রায় পুরোটাই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কিনতে ব্যয় করেন। ‘নেসসিটি’ বা প্রয়োজনের বাইরে অন্যান্য কনজ্যুমার গুড কেনার সামর্থ্য তাঁর কম। বাংলাদেশের একজন পোশাকশ্রমিকের ‘কনজাম্পশন প্যাটার্ন’ বা খরচের তালিকাটি দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। বাসাভাড়া, পরিবহন খরচ, চাল, ডাল, সবজি, ডিম ইত্যাদি প্রাথমিক খাদ্যপণ্য কিনতেই তাঁর মজুরির প্রায় সম্পূর্ণটা খরচ হয়ে যায় (বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের অতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে মাসের প্রথম দেড় থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই পোশাক-শ্রমিকের মজুরির সম্পূর্ণ টাকাটাই শেষ হয়ে যাওয়া একটি স্বাভাবিক ঘটনা।) এদিকে বিপুলসংখ্যক নারী পোশাকশ্রমিকদের খাদ্যপণ্যের বাইরে সামান্য কিছু বাড়তি খরচের আকাঙ্ক্ষার ওপর নির্ভর করেই আশুলিয়া, গাজীপুর, সাভার ও টঙ্গীর মতো এলাকাগুলোতে সস্তা কাপড়, সস্তা জুতা, ইমিটেশনের গয়না ও কসমেটিকসের বাজার গড়ে উঠেছে। মূলত ১৫ হাজার টাকার কিছুটা ওপরে মজুরি পাওয়া নারী শ্রমিকরাই এসব সস্তা কাপড়ের দোকানের নিয়মিত ক্রেতা। পোশাকপল্লির চারদিকে গড়ে ওঠা এই বাজারগুলোর বহু পণ্য চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা হলেও রেডিমেড থ্রি-পিস, ম্যাক্সি, ওড়না, স্যান্ডেল ও সাবান-শ্যাম্পুর মতো পণ্যগুলোর একটি বড় অংশই দেশীয় ছোট-বড় বিভিন্ন কারখানায় তৈরি হয়। উল্লেখ্য, কেরানীগঞ্জ বা পুরান ঢাকায় গড়ে ওঠা প্রায় কয়েক শ দর্জির দোকান বা রেডিমেড কাপড় সেলাইয়ের কারখানার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই সরবরাহ করা হয় ঢাকার আশপাশের পোশাক-পল্লিগুলোতে। আবার শ্রমিকের জুতা বা স্যান্ডেলের চাহিদা মাথায় রেখেই পুরান ঢাকা ও কেরানীগঞ্জের নানান জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গড়ে উঠেছে অজস্র পাদুকা কারখানা।

এ ছাড়া পোশাকশিল্পের নারী কর্মীরা সস্তা দেশীয় কসমেটিকস ব্যবহার করে থাকেন। পোশাককর্মীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় দুটি দেশীয় কসমেটিকস ব্র্যান্ড হলো লতা হারবাল ও রেমি স্পট ক্রিম। দুটোই রং ফর্সাকারী ক্রিম হিসেবে পরিচিত। ১২ গ্রামের একটি লতা হারবাল কৌটার দাম মাত্র ৫০ টাকা। এ ছাড়া তিব্বতের লিপ জেল, ঘামাচি পাউডার, তিব্বত পমেড, কিউট গ্লিসারিন, দেশে তৈরি লাক্স ও সানসিল্কের শ্যাম্পু, কাপড় কাচার সাবান, কসকো ও দেশে তৈরি পন্ডস পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকদের নিয়মিত ব্যবহার্য সামগ্রী।

পোশাকের ক্ষেত্রে পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকদের রোজগারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের লোকাল পোশাকশিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। একদিকে বাজারে ভারতীয় ও পাকিস্তানি থ্রি-পিসের রমরমা চাহিদা থাকলেও নারী শ্রমিকেরা মূলত সস্তা দেশীয় থ্রি-পিস কেনেন বেশি (৬০০ টাকার মধ্যে ।) নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, সিরাজগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বহু ছোট-বড় বস্ত্রকল তৈরি হয়েছে, যেখানে পাওয়ার লুম বা অটোমেটিক মেশিনের মাধ্যমে কাপড় তৈরি হয়। ছাপা কাপড় বা স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ের জন্য আছে আলাদা কারখানা, আবার গজ কাপড় সেলাই করেও থ্রি-পিস বা টু-পিস বানানো হয় দর্জি কারখানাগুলোতে। পুরান ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জ, টঙ্গী ও মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকাতেও এসব কারখানার দেখা মেলে। একেকটি কারখানায় ৫ থেকে ১০ জন করে শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়। বলা বাহুল্য, এসব পণ্যের মূল ক্রেতা শ্রমজীবী মানুষ।

এ ছাড়া পোশাকপল্লিগুলোকে ঘিরে রান্নার কাজে ব্যবহৃত দেশীয় হাঁড়ি, পাতিল, বাসন, বাটি, গ্লাস, ছুরি, বঁটি, আর প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রীর এক বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে। দেশীয় কোম্পানির মধ্যে মূলত গাজী আর আরএফএলের প্লাস্টিকের চেয়ার, টেবিল আর অন্যান্য আসবাবের ব্যাপক চাহিদা দেখা যায়।

পোশাকশ্রমিকদের মধ্যে ইলেকট্রনিক পণ্যেরও চাহিদা আছে, তবে কম। ইলেকট্রনিক পণ্যের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারে সবার উৎসাহ থাকলেও সবাই কিনতে পারছেন না। কিছুটা বেতন বাড়লে বা কিছু টাকা জমাতে পারলে মূলত টিভি, ফ্রিজ আর স্মার্টফোন কেনাতেই আগ্রহ দেখা যায়। ফ্রিজের ক্ষেত্রে পোশাকশ্রমিকদের প্রথম পছন্দ মূলত ওয়ালটন, তুলনামূলক অনেক কম দাম ও ওয়ালটনের ভালো সার্ভিসের জন্য। পোশাককর্মীদের প্রায়ই বলতে শোনা যায়, শ্রমিকদের সার্ভিস দেওয়ার ক্ষেত্রে ওয়ালটনের কর্মীরা খুবই আন্তরিক। তাঁরা পোশাকশিল্পের নারী কর্মীদের খুবই সম্মান করেন এবং ‘বোন’ হিসেবে সম্বোধন করেন।

শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে নতুন পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়?

সাধারণত বেতন বাড়লে পোশাকশ্রমিকেরা কী ধরনের পণ্য কেনার আকাঙ্ক্ষা করেন? পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, প্রথমেই তাঁরা মূলত আরেকটু ভালো খাবার কিনতে চান। যেমন বেশির ভাগ পোশাকশ্রমিক এখন পর্যন্ত নিয়মিত মাছ, মাংস, দুধ বা ফলমূল কেনার সামর্থ্য রাখেন না। মূলত ডিম, ডাল ও শাকসবজিই তাঁদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা। এমনও দেখা গেছে, মাছ কেনার সামর্থ্য নেই বলে পোশাকশ্রমিকেরা সন্ধ্যার পর পোশাকপল্লির কাঁচাবাজারগুলোতে ভিড় করেন, মূলত পচতে থাকা মাছ সস্তায় পাবেন এই আশায়। বলা বাহুল্য পোশাকশ্রমিকদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বাড়লে বাজারে মাছ, মাংস বা মুরগির চাহিদা উত্তরোত্তর বাড়বে। অর্থাৎ গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক বা খামারভিত্তিক উৎপাদিত পণ্যের সরবরাহ বাড়বে।

অন্যদিকে কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে একটু ভালো মানের দেশীয় ক্রিম, শ্যাম্পু, স্যান্ডেল বা প্রসাধনসামগ্রীর চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ্য, পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকেরা বেশির ভাগই লোশন কিনতে পারেন না। দেশে ইউনিলিভারের তৈরি করা লোশন তাদের সামর্থ্যের বাইরে। বরং লোশনের পরিবর্তে ভ্যাসলিন, তেল বা পমেড ব্যবহার করেন। বলা বাহুল্য, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পেলে লোশনের মতো পণ্যগুলোর চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার পোশাকশ্রমিকের অনেকেই এক জোড়া স্যান্ডেলেই দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করেন। কামিজের ক্ষেত্রেও ২-৩ পিস কামিজ বারবার ধুয়ে ধুয়ে পরেন। মজুরি বৃদ্ধি পেলে বাড়তি এক জোড়া স্যান্ডেল, কামিজ বা ওড়নার ব্যবহার বাড়বেই। ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যাপারে আগেই বলা হয়েছে। উঁচু গ্রেডের শ্রমিকের ঘরে টিভি, রেফ্রিজারেটর, স্মার্টফোন, ইস্ত্রি বা রাইস কুকারের মতো পণ্যগুলোর দেখা পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ শ্রমিকের নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে দেশীয় ইলেকট্রনিক পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত।

সামগ্রিকভাবে দেখলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের বেতন বৃদ্ধি আসলে কারখানার মালিকের জন্য একটি বাড়তি ‘উৎপাদন খরচ’ হিসেবে গণ্য হলেও এই বর্ধিত বেতনের সম্পূর্ণটাই বাজারে বিভিন্ন সস্তা পণ্য কেনায় ব্যয় হয়, যা সস্তা পণ্যের দেশীয় ও স্থানীয় শিল্পায়নের পেছনের সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি হতে পারে।

ইউএনসিটিএডির প্রতিবেদন : লোকাল শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে স্থানীয় শিল্পায়নের সম্পর্ক

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বরাবরই উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঢালাও রপ্তানির পক্ষে। কিন্তু এই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি ব্যতিক্রম অবস্থান নিয়েছে ইউএনসিটিএডি (ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট)। ২০১৭ সালে এই সংস্থার একটি প্রতিবেদন রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের ঝুঁকি নিয়ে বিশদ আলোচনা করে। প্রতিবেদন বলছে, such a model is no longer viable in the current context of slow growth in developed economies. To address the prospect of a prolonged period of considerably slower export growth, policymakers need to give greater weight to domestic demand (ইউএনসিটিএডি ২০১৩)।

এই রিপোর্টের সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারকে দীর্ঘ কয়েক দশকের রপ্তানিমুখিতার ফর্মুলা থেকে সরে আসতে বলা হয়েছে এবং ডমেস্টিক ডিমান্ড বা স্থানীয় চাহিদার ওপর ভিত্তি করে উন্নয়ন পরিকল্পনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পশ্চিমা দেশের অনিশ্চিত চাহিদার ওপর নির্ভর করে নয়, বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর স্থানীয় চাহিদা বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে আঞ্চলিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মাত্রা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে রিপোর্টে। যেমন প্রতিবেদন বলছে : if many developing and transition economies simultaneously give domestic demand a greater role in their growth strategies, their economies could become markets for each other, fostering regional and ‘South-South trade,’ and thus further growth for all (ইউএনসিটিএডি ২০১৩)।

সাধারণত, স্থানীয় চাহিদা বা ডমেস্টিক ডিমান্ডের ওপর ভিত্তি করে যে শিল্পায়ন হয়, তাতে বৈশ্বিক এক্সটার্নালিটির ঝুঁকি কম। যুদ্ধ, বৈশ্বিক মন্দা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, পশ্চিমা ভোক্তাদের প্রেফারেন্স বা পছন্দ পরিবর্তন—এসব নিজেদের নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে থাকা ঘটনাবলি স্থানীয় অর্থনীতিতে অপেক্ষাকৃত কম প্রভাব ফেলতে পারে (যদিও এই শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আমদানি করা কাঁচামালের ‘কম্পোজিশনে’র ওপরও অনেক কিছুই নির্ভর করে)।

স্থানীয় মধ্যবিত্তের চাহিদার ওপর নির্ভর করে চাহিদা-জোগানের যে নিয়মিত চক্রটি তৈরি হয়, অর্থনীতির ভাষায় তাকে বলা হচ্ছে ‘ডমেস্টিক ডিমান্ড ড্রিভেন গ্রোথ’ বা স্থানীয় চাহিদানির্ভর প্রবৃদ্ধি। যদিও প্রচার করা হয় যে, পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ‘ইকোনমিক মিরাকল’ বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রায় পুরোটাই হয়েছে রপ্তানিভিত্তিক বাণিজ্যের কারণে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, সত্তর-আশির দশকে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি ছিল স্থানীয় চাহিদা এবং স্থানীয় শিল্পায়ন। বিশেষ করে বৈশ্বিক মন্দা-পরবর্তী সময়ে এশিয়ার রপ্তানি বাজারে ধস নামলেও স্থানীয় চাহিদা এবং স্থানীয় শিল্পের বিকাশের কারণেই মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর অর্থনীতি ক্রমাগতই সমৃদ্ধ হতে থাকে [হা জু চান (১৯৯৩, ২০১০) এবং লাই ওয়াহের (২০১০) কাজে স্থানীয় চাহিদা এবং স্থানীয় শিল্পায়নে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে।]

এদিকে আমেরিকার অর্থনীতিবিদ থমাস প্যালে ধনী দেশের ক্রেতাদের ‘আর্টিফিশিয়াল ডিমান্ড’ বা কৃত্রিম চাহিদাকে রপ্তানিমুখী অর্থনীতির একটি প্রধান সমস্যা হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, ইউরোপ-আমেরিকার কনজ্যুমার গুডের কৃত্রিম চাহিদা বা ‘খামোখা’ চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হচ্ছে একের পর এক দরিদ্র দেশের শিল্প খাত।

এদিকে শিক্ষণীয় হলো, ২০০৮ সালের মন্দায় আমেরিকার এই ঋণনির্ভর বাজারব্যবস্থাটাকেই আমরা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে দেখেছি। ওই সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোর পোশাকের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আমাদের পোশাকশিল্প মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছিল। একের পর এক অর্ডার যখন বাতিল হচ্ছিল, তখন ধারাবাহিকভাবে ভর্তুকি দিয়েই বাঁচানো হয়েছিল দেশের পোশাকশিল্পকে। প্রশ্ন হচ্ছে, পশ্চিমের এই ‘আর্টিফিশিয়াল’ বা ‘ইনফ্লেটেড’ চাহিদার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠল যে রপ্তানি-অর্থনীতির ভিত্তি, সেই অর্থনীতি আসলে দীর্ঘ মেয়াদে কতটুকু টেকসই? এটা সত্য যে পশ্চিমের পোশাকের চাহিদা ঠিক কখনোই ফুরিয়ে যাবে না, কিন্তু এ ক্ষেত্রে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, দেশের প্রধান শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে পশ্চিমা দেশগুলোর ঋণনির্ভর এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়া ব্র্যান্ড পণ্যের চাহিদার ওপর। অর্থাৎ দেশের এত বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নির্ভর করছে অত্যন্ত অস্থির ও অস্থিতিশীল একটি বাজারের টিকে থাকার ওপর।

এর মধ্যে আবার ব্যাপক অটোমেশনের বাস্তবতায় আগের মতো কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না পোশাক খাতে। বরং এক দশকে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ব্যাপক হারে কমে এসেছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটকে আমলে নিয়েই তাই ইউএনসিটিএডির প্রতিবেদনে ‘ডমেস্টিক ডিমান্ড’ বা লোকাল চাহিদার সঙ্গে স্থানীয় শিল্পায়নের সম্পর্কটিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রিপোর্টের ভাষ্যমতে, প্রতিটি রপ্তানিমুখী শিল্পকেই তীব্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সামনে পড়তে হয়। কর্মীদের বর্ধিত বেতন-ভাতাকে তাই বাড়তি উৎপাদন খরচ বা কষ্ট হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়। ম্যানেজমেন্টের মূল উদ্দেশ্যই থাকে যেকোনো উপায়ে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে যেকোনো মূল্যে দমন করা। কিন্তু ইউএনসিটিএডির রিপোর্ট বলছে, মজুরি বা ওয়েজকে শুধু উৎপাদনের খরচ (ভেরিয়েবল কষ্ট) হিসেবে না দেখে বরং ভোক্তা শ্রমিকের ইনকাম বা খরচ করার সক্ষমতা বা ক্রয়ক্ষমতার জায়গা থেকে দেখা দরকার। কারণ, ব্যবসায়ীর জন্য শ্রমিকের মজুরি একটি ‘কষ্ট’ বা উৎপাদন খরচ হতে পারে, কিন্তু সরকারকে ব্যবসায়ীদের মতো চিন্তা করলে চলে না। সরকার লাভ-ক্ষতির হিসাব করবে সামগ্রিক অর্থনীতির লাভ-ক্ষতির জায়গা থেকে। শ্রমিকের বর্ধিত মজুরি এখানে শ্রমিকের সস্তা দেশি পণ্য কেনার ‘ইনসেনটিভ’ বা প্রণোদনা এবং তা সামগ্রিকভাবে স্থানীয় অর্থনীতি বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইউএনসিটিএডির (২০১৩) প্রতিবেদন এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বলছে, ‘new perspective on the role of wages and the public sector’। প্রতিবেদনের ভাষায় : …export-oriented strategies emphasize the cost aspect of wages. By contrast, a strategy giving a greater role to domestic demand would emphasize the income aspect of wages, as it would be based on household spending as the largest component of domestic demand। অর্থাৎ এখানে শ্রমিকের বর্ধিত ক্রয়ক্ষমতাকে স্থানীয় চাহিদা সৃষ্টির মূল ভিত্তি হিসেবে দেখতে বলা হচ্ছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে খুলনাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার প্রায় ২৬টি পাটকল বেসরকারীকরণের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি আলোচনা করা প্রয়োজন। পাটকলগুলো কেন লাভ করতে পারছে না, এই প্রশ্নের উত্তরে প্রায়ই সরকারি মিলের শ্রমিকদের ‘অতিরিক্ত’ বেতনকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়।

উল্লেখ্য, সরকারি শ্রমিকেরা বিভিন্ন ধরনের ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে বেতন পান ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা। অন্যদিকে বেসরকারি আকিজ জুট মিল বা যশোরের নোয়াপাড়া জুট মিলের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে দেখা যাবে, তাঁদের দৈনিক মজুরি মাত্র ২৪০ টাকা! অর্থাৎ বেসরকারি পাটকলশ্রমিকের মাসিক আয় টেনেটুনে ৫ হাজার টাকা! এখানে জরুরি প্রশ্ন হলো মাত্র ৫ হাজার টাকায় একজন শ্রমিক চাল, ডাল, তেল, লবণের মতো জরুরি খাদ্যপণ্যগুলো ছাড়া আর কোনো কিছু কেনার সামর্থ্য রাখেন কি না? তাঁরা কি মাছ, মাংস কিনতে সক্ষম? একজন বেসরকারি মিলের শ্রমিকের পক্ষে শখের বশে একটি বাড়তি প্যান্ট, বাড়তি এক জোড়া স্যান্ডেল বা সস্তা প্রসাধনী কেনা কি সম্ভব? নোয়াপাড়া জুট মিলের শ্রমিকদের বাড়িঘর কেমন? তাঁরা কি দেশি প্লাস্টিকের আসবাব কিনতে পারেন? নিয়মিত তেল, সাবান, শ্যাম্পু বা কোল্ড ক্রিম কিনতে পারেন? বাচ্চাদের জন্য ১০ টাকার এক প্যাকেট এনার্জি প্লাস মাসে দু-চারবারের বেশি কিনতে পারেন? সপ্তাহে একদিন পাড়ার দোকান থেকে নন-ব্র্যান্ডের কেক, বানরুটি বা বিস্কুট কিনে খেতে পারেন? মাত্র ৫ হাজার টাকা মজুরিতে ওয়ালটনের টেলিভিশন বা রেফ্রিজারেটর কেনার সামর্থ্য কি তাঁদের কোনো দিন হবে?

সরকারি শ্রমিকের বাসাবাড়ি, ক্রয়ক্ষমতা ও কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা

২০২০ সালে মিল বন্ধ হওয়ার পর পিপলস জুট মিল কলোনির শ্রমিকদের বাসাবাড়িতে বসে আলাপচারিতা করার সুযোগ হয়েছিল। যে বাড়িতে আমরা প্রথম বসেছিলাম, সেই বাড়িটি লিটন মিয়ার। তিনি প্রায় ২৭ বছর ধরে কাজ করেছেন পিপলস মিলে। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে থাকেন। পাটকল বন্ধ হওয়ার ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন সময় কলোনি ছেড়ে তাঁদের চলে যেতে বলা হচ্ছিল। লিটু মিয়ার পরিবারও উচ্ছেদের ভয়ে ছিল।

কলোনির বহুতল দালানগুলো মিল কর্তৃপক্ষ করে দিয়েছে। তবে একই জমিতে শ্রমিকেরা নিজেরাও শত শত ইটের ঘর তুলেছেন। পোশাককর্মীদের মতো ঠাসাঠাসি করে ৭ থেকে ১০ জন মিলে থাকতে হয়নি তাঁদের। বসার ঘর আছে, শোবার ঘর আছে; আলাদা রান্নাঘর, বারান্দা আছে। সারবাঁধা ঘরগুলোর সামনে লাউয়ের মাচা, লেবুগাছ, ধনে-পুদিনার চাষ। জানালার গ্রিল ঘেঁষে হাসনাহেনার গাছ আছে। ঘরের ভেতরে নানান ধরনের আসবাবের দেখা মেলে। যেমন স্টিলের আলমারি, কাঠের সোফা, ড্রেসিং টেবিল, কাঠের চেয়ার-টেবিল ইত্যাদি। কারও ঘরে বেতের সোফা এবং রঙিন ফুলতোলা কুশনকভার দেখা গেল। জানালায় রঙিন পর্দাও আছে। প্রায় প্রত্যেকের ঘরেই কাঠের স্টাডি টেবিল ও টেবিল ক্লথের দেখা মেলে। বেশির ভাগ টেবিলেই দেখা যাবে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের বই, গাইড বই এবং বিসিএস পরীক্ষার গাইড। এ ছাড়া আরেকটা চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, প্রায় প্রত্যেকের ঘরেই দেখা যাবে সাজিয়ে রাখা বেশ কিছু গল্পের বই।

লিটু মিয়ার বড় ছেলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। বড় মেয়ে খুলনার সরকারি কলেজে দর্শন বিভাগে মাস্টার্স করছেন। তাঁদের মা খুব দুঃখ করে বলছিলেন, ছেলেমেয়েগুলোকে তো শিক্ষিত করেছি কিন্তু চাকরি কি পাবে? লিটু মিয়ার মেয়ের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো খুবই আত্মবিশ্বাসী ও শিক্ষিত মানসিকতার একজন তরুণী। তাঁর প্রথম ইচ্ছা বিসিএস দেবেন। সেটা না হলে শিক্ষকতা করবেন। জানালেন, কলেজের অধ্যাপকেরা তাঁকে খুবই পছন্দ করেন এবং কলেজের শিক্ষক হিসেবে চাকরি পাওয়ার একটা সম্ভাবনা তাঁর রয়েছে। বোঝা গেল, সেই আশাতেই আছে গোটা পরিবার।

বিষয়টি উল্লেখ করছি এই কারণে যে শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের মধ্যে পড়ালেখার চর্চা আসলে কতটুকু—সে বিষয়ে কোনো গবেষণা বা রিপোর্ট চোখে পড়ে না। পোশাকশ্রমিকের সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, বিসিএস দিচ্ছেন, এমনটা কি কল্পনা করা যায়? পোশাকশিল্পের ক্ষেত্রে আমরা বরং সম্পূর্ণ উল্টো চিত্রটি দেখি। পোশাকশ্রমিকদের সন্তানেরা বেশির ভাগই স্কুল থেকে ঝরে পড়ে এবং দ্রুত কাজে লেগে যায়। বেশির ভাগই দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগই পায় না। অথচ সরকারি মিলের শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের মধ্যে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার রেওয়াজ বহুদিনের। মিলশ্রমিকদের সন্তানেরা সবাই স্কুলে যাচ্ছে এবং স্কুলের পর কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। লিটু মিয়ার মেয়ের মতোই কলোনির অন্য বাড়িগুলোতেও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা আছেন। কেউবা পাস করে বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউবা ঢাকার কোনো কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছেন এমন উদাহরণও আছে। এবং এটা সরকারি পাটকলশ্রমিকদের জীবনমান বোঝার জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ সূচক তো অবশ্যই।

লিটু মিয়ার মেয়ের পড়ার টেবিলে ছিল হুমায়ূন আহমেদ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও ইমদাদুল হক মিলনের বই এবং একটি রান্নার বই। পরে আরও দুজন পাটকলশ্রমিকের ঘরেও গল্পের বই চোখে পড়ল। প্রশ্ন জাগল, আমাদের দেশে গল্পের বই কারা কেনে? শুধুই মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত? পোশাকশ্রমিক বা বেসরকারি মিলশ্রমিকের ঘরে গল্পের বইয়ের দেখা পাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। দেশি যেসব প্রকাশনী সস্তা কাগজে গল্পের বই ছাপে, তাদের বাজার কী রকম? মানসম্মত মজুরি পাওয়া শ্রমিকদের সন্তানেরা গল্পের বই কেনা শুরু করলে এসব দেশীয় প্রকাশনীর বাজার কি বিকশিত হতো?

পাবলিক মিলের বেতন বেশি, পাবলিক মিল লোকসানে চলে, পাবলিক মিলগুলোকে বছরে ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়, অথচ পাবলিক মিলের শ্রমিকের বর্ধিত ক্রয়ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে একটি শিক্ষিত পরবর্তী প্রজন্ম গড়ে উঠেছে। গড়ে উঠেছে একটি গোটা অঞ্চলের স্থানীয় অর্থনীতি। দক্ষিণের পাটকল বা উত্তরবঙ্গের চিনিকলশ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও সরকারি মজুরির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এলাকার ভাতের হোটেল, কাপড়ের বাজার, ছাপা লুঙ্গির ফ্যাক্টরি, বাচ্চাদের খেলনা, কাঠের ফার্নিচার থেকে শুরু করে দেশীয় কেক, বিস্কুট, চানাচুর, চিপস বা কোক-পেপসির ছোট-বড় অসংখ্য দোকানের ভবিষ্যৎ। অর্থাৎ মিলগুলো লাভে চলছে না লোকসানে চলছে—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই পাটকল-চিনিকলশ্রমিকদের বাড়তি খরচ করতে পারার সক্ষমতার ওপর অনেকগুলো অঞ্চলের স্থানীয় অর্থনীতি নির্ভরশীল। অথচ চাল, ডাল কিনতেই যাঁদের বেতন ফুরিয়ে যায়, সেই বেসরকারি মিলের শ্রমিকদের বাসস্থানের আশপাশে এত বিচিত্র বাহারি পণ্যের অর্থনীতি গড়ে ওঠার সুযোগ আছে কি?

কাজেই এটি পরিষ্কার যে শ্রমিকের ‘বেশি’ মজুরিকে শুধু ‘উৎপাদন খরচ’ বা ‘লোকসানের কারণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা একটি ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। শ্রমিকের বর্ধিত ক্রয়ক্ষমতাকে স্থানীয় অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে দেখতে না পারা এবং দরিদ্র শ্রমিককে নিম্নমধ্যবিত্তের কাতারে নিয়ে আসার প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচনা করতে না পারা মূলধারার অর্থনীতিবিদদের স্থানীয় অর্থনীতির বহুবিধ বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার প্রমাণই বহন করে।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, দরিদ্র শ্রমিক থেকে নিম্নমধ্যবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত হয়ে ওঠার এই প্রক্রিয়ায় যেহেতু স্থানীয় বাজার ও জাতীয় অর্থনীতিতে বহু রকমের পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়, এই চাহিদাকে ঘিরে দেশীয় শিল্পায়নের একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

ওপরের আলাপটি মূলত তিনটি বিষয় মাথায় রেখে করা হয়েছে।এক. নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে রূপান্তরিত হওয়ার অর্থনৈতিক পূর্বশর্ত

দুই. শ্রমিকের বাড়তে থাকা ক্রয়ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে মধ্যবিত্তের বিকাশ ও স্থানীয় পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি।

এবং তিন. রপ্তানিমুখী শিল্পের ওপর একচেটিয়া নির্ভরশীলতার বিপরীতে স্থানীয় বাজার ও স্থানীয় শিল্পায়নের গুরুত্বদান।

কিন্তু এই পরিপ্রেক্ষিতে সম্পূরক কিছু প্রশ্ন করা আবশ্যক; যেমন বাজারের হাতে ছেড়ে দিলেই কি আপনা-আপনি শিল্পায়ন ঘটে যায়?উত্তর : না।

স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পায়ন ঘটা মানেই কি শ্রমিক উপযুক্ত মজুরি পাবে বা শ্রমিকের জীবনমান বৃদ্ধি পাবে?উত্তর : না।

মারাত্মক খরচবহুল জীবনব্যয়ের বাস্তবতায় দরিদ্র বা নিম্নবিত্ত শ্রমিক একটু বেশি মজুরি পেলেই কি ‘মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা’ অর্জন করতে পারবে?উত্তর : না।

অথবা মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটলেই কি স্থানীয় শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রচুরসংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরি হবে?উত্তর : অটোমেশনের বাস্তবতায় শিল্পের ধরন ও অঞ্চলভেদে কর্মসংস্থান তৈরি হয়।

বলা বাহুল্য, প্রতিটি প্রশ্নই আলাদা করে বিশদ আলোচনার দাবি রাখে। তবে সংক্ষিপ্ত আকারে বলা যেতে পারে যে দিনে দিনে মারাত্মক ব্যয়বহুল হয়ে ওঠা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন, পরিবহন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি ছাড়াও শ্রমিকের আবাসনসংকট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ বিপর্যয়, বিশুদ্ধ পানির অপ্রতুলতা, পুলিশি নিপীড়ন, চাঁদাবাজি ও প্রায় অকার্যকর রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবতায় শুধু নিম্নবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লেই বা মধ্যবিত্তের বিকাশের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পায়ন ঘটলেই সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির চেহারা পাল্টে যাবে—এমন সরলীকরণ করার উপায় নেই। বরং রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে না পারলে, সুলভে ইউটিলিটি সেবা প্রদান করতে না পারলে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, পরিবহন বা আবাসনসংক্রান্ত পলিসিগুলোতে গণমুখী/অধিকারভিত্তিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটাতে না পারলে, শুধু আর্থিক ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়ানো ও মধ্যবিত্তের চাহিদামতো পণ্য সরবরাহ করে দীর্ঘ মেয়াদে একটি টেকসই ও বৈষম্যবিহীন অর্থনীতি তৈরি করা আদৌ সম্ভব নয়।

ইউএনসিটিএডি ২০১৩।। United Nations Conference on Trade and Development (UNCTAD), Trade and Development Report, 2013, New York and Geneva।

এডিবি ২০১০।। Asian Development Bank (ADB), The Rise of Asia’s Middle Class, https://www.adb.org/sites/default/files/publication/27726/ki2010-special-chapter.pdf, প্রবেশ: ১০ই জুন, ২০২২।

খারাস ২০১১।। Homi Kharas, ‘The Rise of the Middle Class’, in Ejaz Ghani (ed.), Reshaping Tomorrow: Is South Asia Ready for the Big Leap?, New Delhi: Oxford University Press।

জাইকা ২০১৬।। Japan International Cooperation Agency (JICA), Emerging Middle Income Class in Bangladesh, March 2016, https://www.jica.go.jp/bangladesh/bangland/pdf/about/Middle%20Income%20Survey.pdf, প্রবেশ: ১০ই জুন, ২০২২।

প্যালে ১৯৯৬।। Thomas Palley, ‘The Forces Making for an Economic Collapse’, The Atlantic, July 1996, https://www.theatlantic.com/magazine/archive/1996/07/the-forces-making-for-an-economic-collapse/376621/, প্রবেশ: ১০ই জুন, ২০২২।

বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ ২০১৫।। The Boston Consulting Group, The Surging Consumer Market Nobody Saw Coming, October 2015, https://www.bcg.com/publications/2015/bangladesh-the-surging-consumer-market-nobody-saw-coming, প্রবেশ: ১০ই জুন, ২০২২।

ম্যাকেন্জি গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ২০০৭।। McKinsey Global Institute, How India’s Rising and Unique Middle Class Will Reshape Global Consumer Markets, May 2007, https://www.mckinsey.com/mgi/overview/in-the-news/next-big-spenders-indian-middle-class, প্রবেশ: ১০ই জুন, ২০২২।

সেন ২০১৫।। Binayak Sen, Size and Growth of Middle Class in Bangladesh: Trends, Drivers and Policy Implications, Dhaka: Bangladesh Institute of Development Studies।

ড. মাহা মির্জা উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক। খণ্ডকালীন শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি জার্মানির বিলেফেল্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনৈতিক অর্থনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁর পিএচডির বিষয় ছিল: স্টেট বিজনেস নেক্সাস এন্ড ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ: দি কেস অফ এশিয়া এনার্জি, বিজিএমইএ, এন্ড কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ বিশ্লেষণমূলক সাময়িকী ‘সর্বজনকথা’র সম্পাদনা পর্ষদে যুক্ত আছেন। সর্বজনকথা এবং প্রথম আলোতে নিয়মিত উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ে লেখালেখি করেন।

নোট: আর্কাইভ থেকে প্রকাশিত। দেখুন, প্রতিচিন্তা, দ্বাদশ বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, ঢাকা, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২২

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

বাংলাদেশে উঠতি মধ্যবিত্তের বিকাশ এবং স্থানীয় শিল্পায়নের সম্ভাবনা

আপডেট সময় : ১২:৩৮:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

অর্থনৈতিক মধ্যবিত্ত কারা, সেটা চিহ্নিত করা গেলে তাদের অর্থনৈতিক উপযোগিতা ও অবদানের সুযোগগুলোও খুঁজে পাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের ফল ও কারণ হিসেবে নতুন এক উঠতি মধ্যবিত্তকেও দেখা যাচ্ছে। উন্নয়ন গবেষক মহা মির্জা প্রশ্ন করছেন, শ্রমিকের আয় না বাড়লে উঠতি মধ্যবিত্তেরও বিকাশ থমকে যায় কিনা। রপ্তানিমুখী শিল্পের ওপর একচেটিয়াভাবে ভর না করে স্থানীয় বাজার ও স্থানীয় চাহিদানির্ভর শিল্পায়নের গুরুত্ব কতটা। স্থানীয় শিল্পায়নভিত্তিক কর্মসংস্থান ছাড়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ হবে কীভাবে? বাংলাদেশের উন্নয়নের নীতির গুরুতর একটা ফাঁক হলো এই নীতির মধ্যে শ্রমিক ও নিম্নমধ্যবিত্তের অস্তিত্বটা প্রায়ই ভুলে থাকা হয়। শেষ পর্যন্ত সেটা অর্থনীতির সার্বিক বিকাশকেই ভারসাম্যহীন করে ফেলে। অর্থনীতির তত্ত্বের সঙ্গে সমাজবিজ্ঞান ও সর্বজনের স্বার্থ মেলানো অর্থনৈতিক আলোচনা যেখানে বিরল, সেখানে মহা মির্জার প্রবন্ধটি বাস্তব সমস্যা ও সম্ভাবনাকে একসঙ্গেই আলোচনা করেছে।

অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে মধ্যবিত্ত

মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংজ্ঞা কী? ঠিক কাকে মধ্যবিত্ত বলে? খুব স্বাভাবিকভাবেই মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা স্থান, কাল বা একাডেমিক ডিসিপ্লিন অনুসারে ভিন্ন হতে পারে। যেমন সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যবিত্তের সংজ্ঞায়ন এবং অর্থনীতিবিদদের সংজ্ঞায়ন এক নয়। আবার ঔপনিবেশিক সময়ের মধ্যবিত্ত এবং এখনকার ‘শহুরে’ নাগরিক মধ্যবিত্ত এক নয়। যেমন ‘সামন্তীয়’ ইউরোপে মধ্যবিত্ত বলতে বোঝানো হতো পেজেন্ট্রি (কৃষক) ও নোবেলিটির (অভিজাত) মাঝখানে গড়ে ওঠা শ্রেণিটি। আবার পশ্চিমের এখনকার সমাজবিজ্ঞানীরা মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে উচ্চশিক্ষা এবং ‘হোয়াইট কলার’ চাকরির মানদণ্ডে চিহ্নিত করেছেন, যাঁরা মূলত টেবিলে বসে চাকরি করেন এবং দৈহিক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত নন। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ হোমি খারাস মধ্যবিত্তকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে : Being in the middle class implies having a comfortable standard of living, economic security, and self-reliance. The middle classes come from a range of occupations : government officials, college graduates, rich farmers, traders, business people, and professionals. They are in various management and clerical jobs. Many are self-employed in small businesses, crafts, and on commercialized family farms (খারাস ২০১১ : ৫৯) ।

বলা বাহুল্য, অর্থনীতিবিদেরা মধ্যবিত্তকে সংজ্ঞায়িত করেন আয় ও ব্যয়ের নিক্তিতে। যেমন ব্যানার্জি এবং ডাফলো (২০০৮) মধ্যবিত্ত চিহ্নিত করেছেন দৈনিক মাথাপিছু ব্যয় (এক্সপেন্ডিচার) ৬ থেকে ১০ ডলারের মধ্যে ধরে। বার্ডসল (২০০৭) মধ্যবিত্ত চিহ্নিত করেছেন দৈনিক মাথাপিছু আয় ১০ ডলারের ওপরে ধরে। রাভালিওন (২০০৯) পশ্চিমা দেশের মধ্যবিত্ত (ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড মিডল ক্লাস) এবং উন্নয়নশীল দেশের মধ্যবিত্তকে (ডেভেলপিং ওয়ার্ল্ড মিডল ক্লাস) আলাদা আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়ে চিহ্নিত করেছেন। আবার হোমি খারাস (২০১০) ‘গ্লোবাল মিডল ক্লাস’র হিসাব দেখিয়েছেন মাথাপিছু ব্যয় ১০ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে (এডিবি ২০১০ : ৫ ।) তাঁর মতে, এই পরিসীমার মধ্যবিত্তের মধ্যে নতুন ধরনের পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা তৈরি হয়। ভারতীয় অর্থনীতিবিদ (বিশ্বব্যাংকে কর্মরত) এজাজ ঘানি অর্থনীতিতে মধ্যবিত্তের ভূমিকা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে : A bigger middle class spends more, leading to higher business profits, savings and investment, higher growth and a larger middle class (খারাস ২০১১ : ৭৫)। তবে সব মধ্যবিত্তের মাপকাঠি এক নয়। মধ্যবিত্তের মধ্যে আছে উচ্চমধ্যবিত্ত আবার নিম্নমধ্যবিত্তও। বিভিন্ন সংস্থার জরিপে মধ্যবিত্তের এই ভাগগুলোর সংজ্ঞায়নও আবার এক নয়।

মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক সংজ্ঞার ক্ষেত্রে নানা রকমের হিসাব দেখা গেলেও এটি আসলেও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো অর্থনৈতিক চরিত্র হলো তার বাড়ন্ত ক্রয়ক্ষমতা। মধ্যবিত্ত কেবল খাদ্যবস্ত্র, বাসস্থানে খরচ করে না, বরং ‘এসেনশিয়াল’ বা আবশ্যক পণ্যগুলোর বাইরেও ‘নন-এসেনশিয়াল’ কিন্তু ডিজায়ারেবল (কাঙ্ক্ষিত) পণ্যগুলোতে খরচ করা শুরু করে। মধ্যবিত্ত রেস্টুরেন্টে খেতে যায়, মধ্যবিত্ত ঘর সাজানোর জিনিস কেনে, মধ্যবিত্ত প্লাস্টিকের সস্তা আসবাবের পরিবর্তে কাঠের মজবুত আসবাব কেনে। মধ্যবিত্ত কার্পেট কেনে, বালিশের কুশন কেনে, বছরে একবার কক্সবাজার বা সিলেটে বেড়াতে যায়। লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ মধ্যবিত্ত আইপিএস কেনে। তাই একটি দেশের মধ্যবিত্তের উত্থান মানেই হচ্ছে সামগ্রিকভাবে ওই দেশের বাজার ও অর্থনীতির চরিত্র ও ধরন বদলে যাওয়া, বাজারের ভোগ্যপণ্যের চাহিদা ও সরবরাহে পরিবর্তন ঘটা।

ভারতের মধ্যবিত্ত এবং ‘কনজ্যুমার গুড’র উত্থান

মূলত নব্বইয়ের দশক থেকে ভারত ও ভিয়েতনামে এবং তার কিছু পরে বাংলাদেশের মতো এককালীন দরিদ্র দেশগুলোতেও মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটে। মূলত গ্রামীণ কৃষক পরিবারের সন্তানদের শহরে পড়তে আসা, পড়ালেখা শেষে শহরেই চাকরির খোঁজ করা, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার পর শহরে থেকে যাওয়া, পরিবারের অন্য সদস্যদের শহরের দিকে টানা ইত্যাদি নানা অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটে, এমনটাই আমরা দেখি। ম্যাকেন্জি রিপোর্ট ২০০৭ সালেই দেখিয়েছিল, ২০২৫ সালের মধ্যে ভারতের মধ্যবিত্তের সংখ্যা ৫ কোটি থেকে ৫০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে (ম্যাকেন্জি গ্লোবাল ইন্সিটিউট ২০০৭)। ম্যাকেন্জি রিপোর্টের মতে, এই নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণিটির কনজাম্পশন বা ভোগের প্রবণতায় নাটকীয় পরিবর্তন আসবে, ‘These groups choose what they will consume, rather than be driven by the necessities of life. Such discretionary choices, reflecting the tastes of the new Indian middle class, will dominate consumption patterns.’ (ম্যাকেন্জি গ্লোবাল ইন্সিটিউট ২০০৭)। যেমন, নব্বইয়ের দশকে ভারতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানের সঙ্গে  সঙ্গে বেশ কিছু কনজ্যুমার গুড বা ভোগ্যপণ্যের চাহিদা হুহু করে বাড়তে থাকে। এই বাড়তি চাহিদার পণ্যের তালিকায় আছে গাড়ি, মোটরসাইকেল, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন এবং রেফ্রিজারেটর। ২০০৭ সালের ম্যাকেন্জি রিপোর্ট ভারতীয় মধ্যবিত্ত সম্পর্কে মন্তব্য করেছে এভাবে : They enjoy a lifestyle that most of the world would recognize as middle class and typically own a television, a refrigerator, a mobile phone and perhaps even a scooter or a car. Although their budgets are stretched, they scrimp and save for their children’s education and their own retirement (ম্যাকেন্জি গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ২০০৭)।

অন্যদিকে উপমহাদেশের উচ্চমধ্যবিত্তরা হলেন সাধারণত ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারিয়াল পদের কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ী। ২০০৭ সালের ম্যাকেন্জি রিপোর্ট ভারতীয় উচ্চমধ্যবিত্ত সম্পর্কে বলছে, Successful and upwardly mobile, they are highly brand-conscious, buying the latest foreign-made cars and electronic gadgets. They are likely to have air conditioning, and can indulge in an annual vacation, usually somewhere in India.

উচ্চমধ্যবিত্তের শৌখিন বিদেশি ব্র্যান্ডের প্রতি ঝোঁক তৈরি হয় বলেই ভারতের বাজারে ক্রিশ্চিয়ান ডিওর বা টমি হিলফিগারের মতো দামি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো ইতিমধ্যে ব্যবসাসফল হয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, উচ্চমধ্যবিত্তের উত্থানের সঙ্গে আমদানি করা পণ্য এবং হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্টের মতো পর্যটন-পণ্যেরও চাহিদা বেড়েছে। আবার আমদানি করা পণ্যের চাহিদা বাড়ার মধ্য দিয়ে বড় শহরগুলোতে ‘সুপারমল’-এর সংখ্যাও বেড়েছে।

এদিকে ভারতের ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্তের চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই পূরণ করেছে ভারতের স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাত। যেমন একসময় সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয়ের পক্ষে গাড়ি কেনার সামর্থ্য ছিল না। মধ্যবিত্তের বাড়ন্ত গাড়ির চাহিদাকে আমলে নিয়েই আশি-নব্বইয়ের দশকে ভারতে অটোমোবাইল খাতে বিপুল বিনিয়োগ ঘটে। সাম্প্রতিক কালে আবার নতুন মধ্যবিত্তের চাহিদা এবং ক্রয়ক্ষমতাকে মাথায় রেখেই টাটা মোটরস মাত্র এক লাখ টাকার গাড়ি এনেছে ভারতের বাজারে (‘ওয়ান লাখ রুপি কার’ নামে পরিচিত)। এ ছাড়া মধ্যবিত্তের উত্থান মানেই শহরে আধুনিক আবাসনের চাহিদা বৃদ্ধি ও রিয়েল এস্টেট বা নির্মাণ খাত বিকশিত হওয়া। উল্লেখ্য, নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে ভারতে মধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে গাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার জন্য ঋণ নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়। যেমন স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া এবং মারুতি-সুজুকির মতো গাড়ি কোম্পানি একসঙ্গে চুক্তি করে স্বল্প কিস্তিতে গাড়ি কেনার সুযোগ করে দিচ্ছে ভারতীয় মধ্যবিত্তকে। আবার ভারতীয় ইলেকট্রনিক উৎপাদন কোম্পানি ভিডিওকন স্বল্প আয়ের মধ্যবিত্তকে মাথায় রেখে খুব সস্তা দামের ওয়াশিং মেশিন বাজারে এনেছে।

বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা কত, এই হিসাব করতে গেলে সাধারণত তিনটি গবেষণা প্রতিবেদন সামনে আসে (জাইকা ২০১৬ : ৬২)। এর মধ্যে ড. বিনায়ক সেনের (২০১৫) হিসেবে দৈনিক ২ থেকে ৩ ডলারের মধ্যে আয় হলে তাকে মধ্যবিত্ত বলা হচ্ছে (স্বভাবতই আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থাগুলো ২ থেকে ৩ ডলারের এই ‘ইনকাম রেঞ্জ’ বা আয়ের পরিসীমাকে অনেক কম মনে করছে)। বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ-এর হিসাবে দৈনিক ১৩ থেকে ২১ ডলার আয় হলে তাকে মধ্যবিত্ত বলা যায়। তবে আমেরিকার পিউ রিসার্চ সেন্টার মধ্যবিত্তের আয় নির্ণয় করতে আরেকটু সতর্কতা অবলম্বন করেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টার দৈনিক ২ থেকে ১০ ডলার আয়কে চিহ্নিত করছে ‘লো ইনকাম’ বা নিম্ন আয় হিসেবে আর দৈনিক ১০ থেকে ২০ ডলার আয়কে চিহ্নিত করছে মধ্যবিত্তের আয় হিসেবে। এ ছাড়া দৈনিক ২০ থেকে ৫০ ডলার আয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে উচ্চমধ্যবিত্ত হিসেবে (মাসিক ৪০-৭৮ হাজার টাকা) (জাইকা ২০১৬ : ৬২) ।

এদিকে জাইকার ‘ইমার্জিং মিডল ইনকাম ক্লাস ইন বাংলাদেশ’ প্রতিবেদনটি পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপটিকেই বাস্তবসম্মত হিসেবে গ্রহণ করেছে, যদিও জাইকা আরও এক ধাপ এগিয়ে মধ্যবিত্তের ক্যাটাগরিটিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। যেমন দৈনিক ২ থেকে ৪ ডলারকে নিম্ন আয় হিসেবে দেখিয়েছে (৮-১৫ হাজার টাকা), আর ৪ থেকে ১০ ডলার আয়কে দেখিয়েছে নিম্নমধ্যবিত্ত হিসেবে (১৫-৪০ হাজার টাকা) (জাইকা ২০১৬ : ৬২) ।

জাইকার ২০১৬ সালের হিসাব অনুসারে, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২৫ শতাংশ, নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ, নিম্নমধ্যবিত্ত প্রায় ৩৪ শতাংশ আর উচ্চমধ্যবিত্ত মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ (জাইকা ২০১৬ : ৬৩) । এদিকে বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের ২০১৫ সালের জরিপ বলছে, পরবর্তী এক দশকে প্রতিবছর বাংলাদেশের ২০ লাখ মানুষের মাসিক আয় ৩৫ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছাবে। অর্থাৎ এই গ্রুপের ভোক্তা পরিবারগুলো এসি, আইপিএস বা বিদেশি শ্যাম্পু বা কসমেটিকসের মতো পণ্যগুলো কেনার মতো সক্ষমতা রাখবে।

বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা ও ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজার

সাধারণত মাসিক আয় ৩০ হাজার টাকা ছাড়ালে (অর্থাৎ নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তের পরিসীমায় প্রবেশ করলে) ভোক্তা পরিবারগুলোর প্রধান প্রবণতা হলো স্মার্টফোন, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর বা ইস্ত্রি কেনা। মাসিক আয় আরও বৃদ্ধি পেলে পরের ধাপে মোটরবাইক, এসি, আইপিএস বা রাইস কুকার কেনা। দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানে ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজারে নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়েছে। এদিকে শুধু পণ্যের বাজার তৈরি হলেই হবে না, পণ্য কোথায় তৈরি হচ্ছে (দেশে না বিদেশে), কোথায় সংযোজন হচ্ছে, আমদানি হচ্ছে নাকি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, অর্থনীতির বিকাশে এটি একটি অত্যন্ত জরুরি প্রশ্ন।

জাইকার (২০১৬) জরিপে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বা সংযোজিত পণ্যের বাজার সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। যেমন বর্তমানে ইলেকট্রনিক পণ্যের স্থানীয় সংযোজনকারী (অ্যাসেম্বলার) হিসেবে দেশীয় বাজারের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, বাটারফ্লাই, ইউনিটেক, খান ট্রেডিংস, হাওলাদার ইলেকট্রনিকস, রয়াল, ইলেক্ট্রোমার্ট এবং স্কয়ার। আর বাজারে প্রতিযোগিতা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর মধ্যে আছে এলজি, সনি, স্যামসাং, শার্প, হিটাচি, প্যানাসনিক, ফিলিপস, মিয়াকো, নোভা, ডিজিটাল, সিঙ্গার, হাইকো, জেনারেল ইত্যাদি। তবে কেবল এসি, রেফ্রিজারেটর ও ব্লেন্ডার ছাড়া বাকি ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজার প্রায় পুরোটাই জাপানিজ, চায়নিজ ও কোরীয় কোম্পানির দখলে। রেফ্রিজারেটর ও এসির ক্ষেত্রে বেশ ভালো করছে দেশীয় কোম্পানি ওয়ালটন। শার্প ও সিঙ্গারের মতো বিদেশি কোম্পানিগুলোকে টেক্কা দিয়ে ওয়ালটন-এর পণ্য সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। আবার আইপিএসের ক্ষেত্রে সিঙ্গার বা স্যামসাংয়ের চেয়ে রহিমআফরোজের বাজার বড়।

অন্যান্য বেশ কিছু পণ্যের ক্ষেত্রেও ওয়ালটনের সক্ষমতা খেয়াল করার মতো। যেমন মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে সুজুকি, হোন্ডা ও হিরোর পরেই ওয়ালটনের বাজার। সেলফোনের ক্ষেত্রে স্যামসাংয়ের পরেই ওয়ালটনের বাজার। এ ক্ষেত্রে সিম্ফনির থেকেও ভালো করছে ওয়ালটন। ব্লেন্ডার বিক্রির ক্ষেত্রেও ফিলিপস, নোভা, প্যানাসনিককে ছাড়িয়ে ওয়ালটন সবচেয়ে এগিয়ে (জাইকা ২০১৬ : ৭৪)। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, মধ্যবিত্তের উত্থানে নানা রকমের ইলেকট্রনিক পণ্যের যে নতুন বাজার তৈরি হয়েছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত না হলেও স্থানীয়ভাবে সংযোজিত। উৎপাদন, সংযোজন, সেলস, ডিস্ট্রিবিউশন ও মার্কেটিং মিলিয়ে দেশীয় এই দু-একটি কোম্পানি উল্লেখযোগ্য মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি করতে পারছে। কিন্তু মধ্যবিত্তের মধ্যে যেহেতু প্রকারভেদ আছে এবং উচ্চমধ্যবিত্তের মধ্যে যেহেতু নতুন ধরনের পণ্য কেনার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হচ্ছে, তাই এমন বলা যেতে পারে যে ‘রাইজিং’ মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়লেই স্থানীয় শিল্পের সংখ্যা বাড়বে বা স্থানীয় শিল্পের বিকাশ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং প্রবণতা বলে, মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আরেকটু বেশি খরচের আমদানিকৃত পণ্যের চাহিদা বাড়বে। যেমন জাইকার ২০১৫ সালের জরিপ বলছে, বাংলাদেশের উচ্চমধ্যবিত্তের মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য কিনতে আগ্রহী। যেখানে ৫৮ শতাংশই আমদানি করা পণ্য কিনতে আগ্রহী এবং ২৪ শতাংশ স্থানীয়ভাবে সংযোজিত (এসেম্বেল্ড) পণ্য কিনতে আগ্রহী (জাইকা ২০১৬ : ৪৯) । মূলত গাড়ি ও টিভির ক্ষেত্রেই বিদেশি পণ্যের প্রতি এই আগ্রহ বেশি দেখা গেছে।

আবার অন্যদিকে দরিদ্র থেকে নিম্নমধ্যবিত্তে উপনীত হওয়া শ্রেণিটির তুলনামূলক বেশি দামে আমদানিকৃত পণ্য কেনার সামর্থ্য নেই। তাঁরা দেশে তৈরি পণ্যেই ভরসা রাখেন। তাই এমন বলাই যায় যে নতুন মধ্যবিত্তের উত্থানের সঙ্গে স্থানীয় পণ্যের চাহিদা অবশ্যই বাড়ে এবং স্থানীয় শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু ধনী বা উচ্চমধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধি স্থানীয় শিল্পায়নের জন্য সুবিধাজনক না-ও হতে পারে। বরং উচ্চমধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে আমদানিকৃত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির সম্পর্কটি বেশ দৃশ্যমান। অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ের শিল্পায়নের জন্য মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে শ্রমিকের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি কিংবা প্রাথমিক ধাপে অন্তত শ্রমিকের নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উত্তরণ।

শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা ও মধ্যবিত্তে উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশের মতো দেশে শ্রমিক তাঁর মজুরির প্রায় পুরোটাই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কিনতে ব্যয় করেন। ‘নেসসিটি’ বা প্রয়োজনের বাইরে অন্যান্য কনজ্যুমার গুড কেনার সামর্থ্য তাঁর কম। বাংলাদেশের একজন পোশাকশ্রমিকের ‘কনজাম্পশন প্যাটার্ন’ বা খরচের তালিকাটি দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। বাসাভাড়া, পরিবহন খরচ, চাল, ডাল, সবজি, ডিম ইত্যাদি প্রাথমিক খাদ্যপণ্য কিনতেই তাঁর মজুরির প্রায় সম্পূর্ণটা খরচ হয়ে যায় (বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের অতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে মাসের প্রথম দেড় থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই পোশাক-শ্রমিকের মজুরির সম্পূর্ণ টাকাটাই শেষ হয়ে যাওয়া একটি স্বাভাবিক ঘটনা।) এদিকে বিপুলসংখ্যক নারী পোশাকশ্রমিকদের খাদ্যপণ্যের বাইরে সামান্য কিছু বাড়তি খরচের আকাঙ্ক্ষার ওপর নির্ভর করেই আশুলিয়া, গাজীপুর, সাভার ও টঙ্গীর মতো এলাকাগুলোতে সস্তা কাপড়, সস্তা জুতা, ইমিটেশনের গয়না ও কসমেটিকসের বাজার গড়ে উঠেছে। মূলত ১৫ হাজার টাকার কিছুটা ওপরে মজুরি পাওয়া নারী শ্রমিকরাই এসব সস্তা কাপড়ের দোকানের নিয়মিত ক্রেতা। পোশাকপল্লির চারদিকে গড়ে ওঠা এই বাজারগুলোর বহু পণ্য চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা হলেও রেডিমেড থ্রি-পিস, ম্যাক্সি, ওড়না, স্যান্ডেল ও সাবান-শ্যাম্পুর মতো পণ্যগুলোর একটি বড় অংশই দেশীয় ছোট-বড় বিভিন্ন কারখানায় তৈরি হয়। উল্লেখ্য, কেরানীগঞ্জ বা পুরান ঢাকায় গড়ে ওঠা প্রায় কয়েক শ দর্জির দোকান বা রেডিমেড কাপড় সেলাইয়ের কারখানার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই সরবরাহ করা হয় ঢাকার আশপাশের পোশাক-পল্লিগুলোতে। আবার শ্রমিকের জুতা বা স্যান্ডেলের চাহিদা মাথায় রেখেই পুরান ঢাকা ও কেরানীগঞ্জের নানান জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গড়ে উঠেছে অজস্র পাদুকা কারখানা।

এ ছাড়া পোশাকশিল্পের নারী কর্মীরা সস্তা দেশীয় কসমেটিকস ব্যবহার করে থাকেন। পোশাককর্মীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় দুটি দেশীয় কসমেটিকস ব্র্যান্ড হলো লতা হারবাল ও রেমি স্পট ক্রিম। দুটোই রং ফর্সাকারী ক্রিম হিসেবে পরিচিত। ১২ গ্রামের একটি লতা হারবাল কৌটার দাম মাত্র ৫০ টাকা। এ ছাড়া তিব্বতের লিপ জেল, ঘামাচি পাউডার, তিব্বত পমেড, কিউট গ্লিসারিন, দেশে তৈরি লাক্স ও সানসিল্কের শ্যাম্পু, কাপড় কাচার সাবান, কসকো ও দেশে তৈরি পন্ডস পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকদের নিয়মিত ব্যবহার্য সামগ্রী।

পোশাকের ক্ষেত্রে পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকদের রোজগারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের লোকাল পোশাকশিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। একদিকে বাজারে ভারতীয় ও পাকিস্তানি থ্রি-পিসের রমরমা চাহিদা থাকলেও নারী শ্রমিকেরা মূলত সস্তা দেশীয় থ্রি-পিস কেনেন বেশি (৬০০ টাকার মধ্যে ।) নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, সিরাজগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বহু ছোট-বড় বস্ত্রকল তৈরি হয়েছে, যেখানে পাওয়ার লুম বা অটোমেটিক মেশিনের মাধ্যমে কাপড় তৈরি হয়। ছাপা কাপড় বা স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ের জন্য আছে আলাদা কারখানা, আবার গজ কাপড় সেলাই করেও থ্রি-পিস বা টু-পিস বানানো হয় দর্জি কারখানাগুলোতে। পুরান ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জ, টঙ্গী ও মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকাতেও এসব কারখানার দেখা মেলে। একেকটি কারখানায় ৫ থেকে ১০ জন করে শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়। বলা বাহুল্য, এসব পণ্যের মূল ক্রেতা শ্রমজীবী মানুষ।

এ ছাড়া পোশাকপল্লিগুলোকে ঘিরে রান্নার কাজে ব্যবহৃত দেশীয় হাঁড়ি, পাতিল, বাসন, বাটি, গ্লাস, ছুরি, বঁটি, আর প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রীর এক বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে। দেশীয় কোম্পানির মধ্যে মূলত গাজী আর আরএফএলের প্লাস্টিকের চেয়ার, টেবিল আর অন্যান্য আসবাবের ব্যাপক চাহিদা দেখা যায়।

পোশাকশ্রমিকদের মধ্যে ইলেকট্রনিক পণ্যেরও চাহিদা আছে, তবে কম। ইলেকট্রনিক পণ্যের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারে সবার উৎসাহ থাকলেও সবাই কিনতে পারছেন না। কিছুটা বেতন বাড়লে বা কিছু টাকা জমাতে পারলে মূলত টিভি, ফ্রিজ আর স্মার্টফোন কেনাতেই আগ্রহ দেখা যায়। ফ্রিজের ক্ষেত্রে পোশাকশ্রমিকদের প্রথম পছন্দ মূলত ওয়ালটন, তুলনামূলক অনেক কম দাম ও ওয়ালটনের ভালো সার্ভিসের জন্য। পোশাককর্মীদের প্রায়ই বলতে শোনা যায়, শ্রমিকদের সার্ভিস দেওয়ার ক্ষেত্রে ওয়ালটনের কর্মীরা খুবই আন্তরিক। তাঁরা পোশাকশিল্পের নারী কর্মীদের খুবই সম্মান করেন এবং ‘বোন’ হিসেবে সম্বোধন করেন।

শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে নতুন পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়?

সাধারণত বেতন বাড়লে পোশাকশ্রমিকেরা কী ধরনের পণ্য কেনার আকাঙ্ক্ষা করেন? পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, প্রথমেই তাঁরা মূলত আরেকটু ভালো খাবার কিনতে চান। যেমন বেশির ভাগ পোশাকশ্রমিক এখন পর্যন্ত নিয়মিত মাছ, মাংস, দুধ বা ফলমূল কেনার সামর্থ্য রাখেন না। মূলত ডিম, ডাল ও শাকসবজিই তাঁদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা। এমনও দেখা গেছে, মাছ কেনার সামর্থ্য নেই বলে পোশাকশ্রমিকেরা সন্ধ্যার পর পোশাকপল্লির কাঁচাবাজারগুলোতে ভিড় করেন, মূলত পচতে থাকা মাছ সস্তায় পাবেন এই আশায়। বলা বাহুল্য পোশাকশ্রমিকদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বাড়লে বাজারে মাছ, মাংস বা মুরগির চাহিদা উত্তরোত্তর বাড়বে। অর্থাৎ গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক বা খামারভিত্তিক উৎপাদিত পণ্যের সরবরাহ বাড়বে।

অন্যদিকে কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে একটু ভালো মানের দেশীয় ক্রিম, শ্যাম্পু, স্যান্ডেল বা প্রসাধনসামগ্রীর চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ্য, পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকেরা বেশির ভাগই লোশন কিনতে পারেন না। দেশে ইউনিলিভারের তৈরি করা লোশন তাদের সামর্থ্যের বাইরে। বরং লোশনের পরিবর্তে ভ্যাসলিন, তেল বা পমেড ব্যবহার করেন। বলা বাহুল্য, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পেলে লোশনের মতো পণ্যগুলোর চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার পোশাকশ্রমিকের অনেকেই এক জোড়া স্যান্ডেলেই দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করেন। কামিজের ক্ষেত্রেও ২-৩ পিস কামিজ বারবার ধুয়ে ধুয়ে পরেন। মজুরি বৃদ্ধি পেলে বাড়তি এক জোড়া স্যান্ডেল, কামিজ বা ওড়নার ব্যবহার বাড়বেই। ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যাপারে আগেই বলা হয়েছে। উঁচু গ্রেডের শ্রমিকের ঘরে টিভি, রেফ্রিজারেটর, স্মার্টফোন, ইস্ত্রি বা রাইস কুকারের মতো পণ্যগুলোর দেখা পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ শ্রমিকের নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে দেশীয় ইলেকট্রনিক পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত।

সামগ্রিকভাবে দেখলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের বেতন বৃদ্ধি আসলে কারখানার মালিকের জন্য একটি বাড়তি ‘উৎপাদন খরচ’ হিসেবে গণ্য হলেও এই বর্ধিত বেতনের সম্পূর্ণটাই বাজারে বিভিন্ন সস্তা পণ্য কেনায় ব্যয় হয়, যা সস্তা পণ্যের দেশীয় ও স্থানীয় শিল্পায়নের পেছনের সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি হতে পারে।

ইউএনসিটিএডির প্রতিবেদন : লোকাল শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে স্থানীয় শিল্পায়নের সম্পর্ক

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বরাবরই উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঢালাও রপ্তানির পক্ষে। কিন্তু এই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি ব্যতিক্রম অবস্থান নিয়েছে ইউএনসিটিএডি (ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট)। ২০১৭ সালে এই সংস্থার একটি প্রতিবেদন রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের ঝুঁকি নিয়ে বিশদ আলোচনা করে। প্রতিবেদন বলছে, such a model is no longer viable in the current context of slow growth in developed economies. To address the prospect of a prolonged period of considerably slower export growth, policymakers need to give greater weight to domestic demand (ইউএনসিটিএডি ২০১৩)।

এই রিপোর্টের সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারকে দীর্ঘ কয়েক দশকের রপ্তানিমুখিতার ফর্মুলা থেকে সরে আসতে বলা হয়েছে এবং ডমেস্টিক ডিমান্ড বা স্থানীয় চাহিদার ওপর ভিত্তি করে উন্নয়ন পরিকল্পনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পশ্চিমা দেশের অনিশ্চিত চাহিদার ওপর নির্ভর করে নয়, বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর স্থানীয় চাহিদা বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে আঞ্চলিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মাত্রা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে রিপোর্টে। যেমন প্রতিবেদন বলছে : if many developing and transition economies simultaneously give domestic demand a greater role in their growth strategies, their economies could become markets for each other, fostering regional and ‘South-South trade,’ and thus further growth for all (ইউএনসিটিএডি ২০১৩)।

সাধারণত, স্থানীয় চাহিদা বা ডমেস্টিক ডিমান্ডের ওপর ভিত্তি করে যে শিল্পায়ন হয়, তাতে বৈশ্বিক এক্সটার্নালিটির ঝুঁকি কম। যুদ্ধ, বৈশ্বিক মন্দা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, পশ্চিমা ভোক্তাদের প্রেফারেন্স বা পছন্দ পরিবর্তন—এসব নিজেদের নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে থাকা ঘটনাবলি স্থানীয় অর্থনীতিতে অপেক্ষাকৃত কম প্রভাব ফেলতে পারে (যদিও এই শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আমদানি করা কাঁচামালের ‘কম্পোজিশনে’র ওপরও অনেক কিছুই নির্ভর করে)।

স্থানীয় মধ্যবিত্তের চাহিদার ওপর নির্ভর করে চাহিদা-জোগানের যে নিয়মিত চক্রটি তৈরি হয়, অর্থনীতির ভাষায় তাকে বলা হচ্ছে ‘ডমেস্টিক ডিমান্ড ড্রিভেন গ্রোথ’ বা স্থানীয় চাহিদানির্ভর প্রবৃদ্ধি। যদিও প্রচার করা হয় যে, পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ‘ইকোনমিক মিরাকল’ বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রায় পুরোটাই হয়েছে রপ্তানিভিত্তিক বাণিজ্যের কারণে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, সত্তর-আশির দশকে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি ছিল স্থানীয় চাহিদা এবং স্থানীয় শিল্পায়ন। বিশেষ করে বৈশ্বিক মন্দা-পরবর্তী সময়ে এশিয়ার রপ্তানি বাজারে ধস নামলেও স্থানীয় চাহিদা এবং স্থানীয় শিল্পের বিকাশের কারণেই মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর অর্থনীতি ক্রমাগতই সমৃদ্ধ হতে থাকে [হা জু চান (১৯৯৩, ২০১০) এবং লাই ওয়াহের (২০১০) কাজে স্থানীয় চাহিদা এবং স্থানীয় শিল্পায়নে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে।]

এদিকে আমেরিকার অর্থনীতিবিদ থমাস প্যালে ধনী দেশের ক্রেতাদের ‘আর্টিফিশিয়াল ডিমান্ড’ বা কৃত্রিম চাহিদাকে রপ্তানিমুখী অর্থনীতির একটি প্রধান সমস্যা হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, ইউরোপ-আমেরিকার কনজ্যুমার গুডের কৃত্রিম চাহিদা বা ‘খামোখা’ চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হচ্ছে একের পর এক দরিদ্র দেশের শিল্প খাত।

এদিকে শিক্ষণীয় হলো, ২০০৮ সালের মন্দায় আমেরিকার এই ঋণনির্ভর বাজারব্যবস্থাটাকেই আমরা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে দেখেছি। ওই সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোর পোশাকের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আমাদের পোশাকশিল্প মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছিল। একের পর এক অর্ডার যখন বাতিল হচ্ছিল, তখন ধারাবাহিকভাবে ভর্তুকি দিয়েই বাঁচানো হয়েছিল দেশের পোশাকশিল্পকে। প্রশ্ন হচ্ছে, পশ্চিমের এই ‘আর্টিফিশিয়াল’ বা ‘ইনফ্লেটেড’ চাহিদার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠল যে রপ্তানি-অর্থনীতির ভিত্তি, সেই অর্থনীতি আসলে দীর্ঘ মেয়াদে কতটুকু টেকসই? এটা সত্য যে পশ্চিমের পোশাকের চাহিদা ঠিক কখনোই ফুরিয়ে যাবে না, কিন্তু এ ক্ষেত্রে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, দেশের প্রধান শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে পশ্চিমা দেশগুলোর ঋণনির্ভর এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়া ব্র্যান্ড পণ্যের চাহিদার ওপর। অর্থাৎ দেশের এত বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নির্ভর করছে অত্যন্ত অস্থির ও অস্থিতিশীল একটি বাজারের টিকে থাকার ওপর।

এর মধ্যে আবার ব্যাপক অটোমেশনের বাস্তবতায় আগের মতো কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না পোশাক খাতে। বরং এক দশকে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ব্যাপক হারে কমে এসেছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটকে আমলে নিয়েই তাই ইউএনসিটিএডির প্রতিবেদনে ‘ডমেস্টিক ডিমান্ড’ বা লোকাল চাহিদার সঙ্গে স্থানীয় শিল্পায়নের সম্পর্কটিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রিপোর্টের ভাষ্যমতে, প্রতিটি রপ্তানিমুখী শিল্পকেই তীব্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সামনে পড়তে হয়। কর্মীদের বর্ধিত বেতন-ভাতাকে তাই বাড়তি উৎপাদন খরচ বা কষ্ট হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়। ম্যানেজমেন্টের মূল উদ্দেশ্যই থাকে যেকোনো উপায়ে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে যেকোনো মূল্যে দমন করা। কিন্তু ইউএনসিটিএডির রিপোর্ট বলছে, মজুরি বা ওয়েজকে শুধু উৎপাদনের খরচ (ভেরিয়েবল কষ্ট) হিসেবে না দেখে বরং ভোক্তা শ্রমিকের ইনকাম বা খরচ করার সক্ষমতা বা ক্রয়ক্ষমতার জায়গা থেকে দেখা দরকার। কারণ, ব্যবসায়ীর জন্য শ্রমিকের মজুরি একটি ‘কষ্ট’ বা উৎপাদন খরচ হতে পারে, কিন্তু সরকারকে ব্যবসায়ীদের মতো চিন্তা করলে চলে না। সরকার লাভ-ক্ষতির হিসাব করবে সামগ্রিক অর্থনীতির লাভ-ক্ষতির জায়গা থেকে। শ্রমিকের বর্ধিত মজুরি এখানে শ্রমিকের সস্তা দেশি পণ্য কেনার ‘ইনসেনটিভ’ বা প্রণোদনা এবং তা সামগ্রিকভাবে স্থানীয় অর্থনীতি বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইউএনসিটিএডির (২০১৩) প্রতিবেদন এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বলছে, ‘new perspective on the role of wages and the public sector’। প্রতিবেদনের ভাষায় : …export-oriented strategies emphasize the cost aspect of wages. By contrast, a strategy giving a greater role to domestic demand would emphasize the income aspect of wages, as it would be based on household spending as the largest component of domestic demand। অর্থাৎ এখানে শ্রমিকের বর্ধিত ক্রয়ক্ষমতাকে স্থানীয় চাহিদা সৃষ্টির মূল ভিত্তি হিসেবে দেখতে বলা হচ্ছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে খুলনাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার প্রায় ২৬টি পাটকল বেসরকারীকরণের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি আলোচনা করা প্রয়োজন। পাটকলগুলো কেন লাভ করতে পারছে না, এই প্রশ্নের উত্তরে প্রায়ই সরকারি মিলের শ্রমিকদের ‘অতিরিক্ত’ বেতনকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়।

উল্লেখ্য, সরকারি শ্রমিকেরা বিভিন্ন ধরনের ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে বেতন পান ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা। অন্যদিকে বেসরকারি আকিজ জুট মিল বা যশোরের নোয়াপাড়া জুট মিলের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে দেখা যাবে, তাঁদের দৈনিক মজুরি মাত্র ২৪০ টাকা! অর্থাৎ বেসরকারি পাটকলশ্রমিকের মাসিক আয় টেনেটুনে ৫ হাজার টাকা! এখানে জরুরি প্রশ্ন হলো মাত্র ৫ হাজার টাকায় একজন শ্রমিক চাল, ডাল, তেল, লবণের মতো জরুরি খাদ্যপণ্যগুলো ছাড়া আর কোনো কিছু কেনার সামর্থ্য রাখেন কি না? তাঁরা কি মাছ, মাংস কিনতে সক্ষম? একজন বেসরকারি মিলের শ্রমিকের পক্ষে শখের বশে একটি বাড়তি প্যান্ট, বাড়তি এক জোড়া স্যান্ডেল বা সস্তা প্রসাধনী কেনা কি সম্ভব? নোয়াপাড়া জুট মিলের শ্রমিকদের বাড়িঘর কেমন? তাঁরা কি দেশি প্লাস্টিকের আসবাব কিনতে পারেন? নিয়মিত তেল, সাবান, শ্যাম্পু বা কোল্ড ক্রিম কিনতে পারেন? বাচ্চাদের জন্য ১০ টাকার এক প্যাকেট এনার্জি প্লাস মাসে দু-চারবারের বেশি কিনতে পারেন? সপ্তাহে একদিন পাড়ার দোকান থেকে নন-ব্র্যান্ডের কেক, বানরুটি বা বিস্কুট কিনে খেতে পারেন? মাত্র ৫ হাজার টাকা মজুরিতে ওয়ালটনের টেলিভিশন বা রেফ্রিজারেটর কেনার সামর্থ্য কি তাঁদের কোনো দিন হবে?

সরকারি শ্রমিকের বাসাবাড়ি, ক্রয়ক্ষমতা ও কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা

২০২০ সালে মিল বন্ধ হওয়ার পর পিপলস জুট মিল কলোনির শ্রমিকদের বাসাবাড়িতে বসে আলাপচারিতা করার সুযোগ হয়েছিল। যে বাড়িতে আমরা প্রথম বসেছিলাম, সেই বাড়িটি লিটন মিয়ার। তিনি প্রায় ২৭ বছর ধরে কাজ করেছেন পিপলস মিলে। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে থাকেন। পাটকল বন্ধ হওয়ার ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন সময় কলোনি ছেড়ে তাঁদের চলে যেতে বলা হচ্ছিল। লিটু মিয়ার পরিবারও উচ্ছেদের ভয়ে ছিল।

কলোনির বহুতল দালানগুলো মিল কর্তৃপক্ষ করে দিয়েছে। তবে একই জমিতে শ্রমিকেরা নিজেরাও শত শত ইটের ঘর তুলেছেন। পোশাককর্মীদের মতো ঠাসাঠাসি করে ৭ থেকে ১০ জন মিলে থাকতে হয়নি তাঁদের। বসার ঘর আছে, শোবার ঘর আছে; আলাদা রান্নাঘর, বারান্দা আছে। সারবাঁধা ঘরগুলোর সামনে লাউয়ের মাচা, লেবুগাছ, ধনে-পুদিনার চাষ। জানালার গ্রিল ঘেঁষে হাসনাহেনার গাছ আছে। ঘরের ভেতরে নানান ধরনের আসবাবের দেখা মেলে। যেমন স্টিলের আলমারি, কাঠের সোফা, ড্রেসিং টেবিল, কাঠের চেয়ার-টেবিল ইত্যাদি। কারও ঘরে বেতের সোফা এবং রঙিন ফুলতোলা কুশনকভার দেখা গেল। জানালায় রঙিন পর্দাও আছে। প্রায় প্রত্যেকের ঘরেই কাঠের স্টাডি টেবিল ও টেবিল ক্লথের দেখা মেলে। বেশির ভাগ টেবিলেই দেখা যাবে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের বই, গাইড বই এবং বিসিএস পরীক্ষার গাইড। এ ছাড়া আরেকটা চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, প্রায় প্রত্যেকের ঘরেই দেখা যাবে সাজিয়ে রাখা বেশ কিছু গল্পের বই।

লিটু মিয়ার বড় ছেলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। বড় মেয়ে খুলনার সরকারি কলেজে দর্শন বিভাগে মাস্টার্স করছেন। তাঁদের মা খুব দুঃখ করে বলছিলেন, ছেলেমেয়েগুলোকে তো শিক্ষিত করেছি কিন্তু চাকরি কি পাবে? লিটু মিয়ার মেয়ের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো খুবই আত্মবিশ্বাসী ও শিক্ষিত মানসিকতার একজন তরুণী। তাঁর প্রথম ইচ্ছা বিসিএস দেবেন। সেটা না হলে শিক্ষকতা করবেন। জানালেন, কলেজের অধ্যাপকেরা তাঁকে খুবই পছন্দ করেন এবং কলেজের শিক্ষক হিসেবে চাকরি পাওয়ার একটা সম্ভাবনা তাঁর রয়েছে। বোঝা গেল, সেই আশাতেই আছে গোটা পরিবার।

বিষয়টি উল্লেখ করছি এই কারণে যে শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের মধ্যে পড়ালেখার চর্চা আসলে কতটুকু—সে বিষয়ে কোনো গবেষণা বা রিপোর্ট চোখে পড়ে না। পোশাকশ্রমিকের সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, বিসিএস দিচ্ছেন, এমনটা কি কল্পনা করা যায়? পোশাকশিল্পের ক্ষেত্রে আমরা বরং সম্পূর্ণ উল্টো চিত্রটি দেখি। পোশাকশ্রমিকদের সন্তানেরা বেশির ভাগই স্কুল থেকে ঝরে পড়ে এবং দ্রুত কাজে লেগে যায়। বেশির ভাগই দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগই পায় না। অথচ সরকারি মিলের শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের মধ্যে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার রেওয়াজ বহুদিনের। মিলশ্রমিকদের সন্তানেরা সবাই স্কুলে যাচ্ছে এবং স্কুলের পর কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। লিটু মিয়ার মেয়ের মতোই কলোনির অন্য বাড়িগুলোতেও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা আছেন। কেউবা পাস করে বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউবা ঢাকার কোনো কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছেন এমন উদাহরণও আছে। এবং এটা সরকারি পাটকলশ্রমিকদের জীবনমান বোঝার জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ সূচক তো অবশ্যই।

লিটু মিয়ার মেয়ের পড়ার টেবিলে ছিল হুমায়ূন আহমেদ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও ইমদাদুল হক মিলনের বই এবং একটি রান্নার বই। পরে আরও দুজন পাটকলশ্রমিকের ঘরেও গল্পের বই চোখে পড়ল। প্রশ্ন জাগল, আমাদের দেশে গল্পের বই কারা কেনে? শুধুই মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত? পোশাকশ্রমিক বা বেসরকারি মিলশ্রমিকের ঘরে গল্পের বইয়ের দেখা পাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। দেশি যেসব প্রকাশনী সস্তা কাগজে গল্পের বই ছাপে, তাদের বাজার কী রকম? মানসম্মত মজুরি পাওয়া শ্রমিকদের সন্তানেরা গল্পের বই কেনা শুরু করলে এসব দেশীয় প্রকাশনীর বাজার কি বিকশিত হতো?

পাবলিক মিলের বেতন বেশি, পাবলিক মিল লোকসানে চলে, পাবলিক মিলগুলোকে বছরে ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়, অথচ পাবলিক মিলের শ্রমিকের বর্ধিত ক্রয়ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে একটি শিক্ষিত পরবর্তী প্রজন্ম গড়ে উঠেছে। গড়ে উঠেছে একটি গোটা অঞ্চলের স্থানীয় অর্থনীতি। দক্ষিণের পাটকল বা উত্তরবঙ্গের চিনিকলশ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও সরকারি মজুরির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এলাকার ভাতের হোটেল, কাপড়ের বাজার, ছাপা লুঙ্গির ফ্যাক্টরি, বাচ্চাদের খেলনা, কাঠের ফার্নিচার থেকে শুরু করে দেশীয় কেক, বিস্কুট, চানাচুর, চিপস বা কোক-পেপসির ছোট-বড় অসংখ্য দোকানের ভবিষ্যৎ। অর্থাৎ মিলগুলো লাভে চলছে না লোকসানে চলছে—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই পাটকল-চিনিকলশ্রমিকদের বাড়তি খরচ করতে পারার সক্ষমতার ওপর অনেকগুলো অঞ্চলের স্থানীয় অর্থনীতি নির্ভরশীল। অথচ চাল, ডাল কিনতেই যাঁদের বেতন ফুরিয়ে যায়, সেই বেসরকারি মিলের শ্রমিকদের বাসস্থানের আশপাশে এত বিচিত্র বাহারি পণ্যের অর্থনীতি গড়ে ওঠার সুযোগ আছে কি?

কাজেই এটি পরিষ্কার যে শ্রমিকের ‘বেশি’ মজুরিকে শুধু ‘উৎপাদন খরচ’ বা ‘লোকসানের কারণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা একটি ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। শ্রমিকের বর্ধিত ক্রয়ক্ষমতাকে স্থানীয় অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে দেখতে না পারা এবং দরিদ্র শ্রমিককে নিম্নমধ্যবিত্তের কাতারে নিয়ে আসার প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচনা করতে না পারা মূলধারার অর্থনীতিবিদদের স্থানীয় অর্থনীতির বহুবিধ বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার প্রমাণই বহন করে।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, দরিদ্র শ্রমিক থেকে নিম্নমধ্যবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত হয়ে ওঠার এই প্রক্রিয়ায় যেহেতু স্থানীয় বাজার ও জাতীয় অর্থনীতিতে বহু রকমের পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়, এই চাহিদাকে ঘিরে দেশীয় শিল্পায়নের একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

ওপরের আলাপটি মূলত তিনটি বিষয় মাথায় রেখে করা হয়েছে।এক. নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে রূপান্তরিত হওয়ার অর্থনৈতিক পূর্বশর্ত

দুই. শ্রমিকের বাড়তে থাকা ক্রয়ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে মধ্যবিত্তের বিকাশ ও স্থানীয় পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি।

এবং তিন. রপ্তানিমুখী শিল্পের ওপর একচেটিয়া নির্ভরশীলতার বিপরীতে স্থানীয় বাজার ও স্থানীয় শিল্পায়নের গুরুত্বদান।

কিন্তু এই পরিপ্রেক্ষিতে সম্পূরক কিছু প্রশ্ন করা আবশ্যক; যেমন বাজারের হাতে ছেড়ে দিলেই কি আপনা-আপনি শিল্পায়ন ঘটে যায়?উত্তর : না।

স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পায়ন ঘটা মানেই কি শ্রমিক উপযুক্ত মজুরি পাবে বা শ্রমিকের জীবনমান বৃদ্ধি পাবে?উত্তর : না।

মারাত্মক খরচবহুল জীবনব্যয়ের বাস্তবতায় দরিদ্র বা নিম্নবিত্ত শ্রমিক একটু বেশি মজুরি পেলেই কি ‘মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা’ অর্জন করতে পারবে?উত্তর : না।

অথবা মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটলেই কি স্থানীয় শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রচুরসংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরি হবে?উত্তর : অটোমেশনের বাস্তবতায় শিল্পের ধরন ও অঞ্চলভেদে কর্মসংস্থান তৈরি হয়।

বলা বাহুল্য, প্রতিটি প্রশ্নই আলাদা করে বিশদ আলোচনার দাবি রাখে। তবে সংক্ষিপ্ত আকারে বলা যেতে পারে যে দিনে দিনে মারাত্মক ব্যয়বহুল হয়ে ওঠা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন, পরিবহন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি ছাড়াও শ্রমিকের আবাসনসংকট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ বিপর্যয়, বিশুদ্ধ পানির অপ্রতুলতা, পুলিশি নিপীড়ন, চাঁদাবাজি ও প্রায় অকার্যকর রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবতায় শুধু নিম্নবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লেই বা মধ্যবিত্তের বিকাশের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পায়ন ঘটলেই সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির চেহারা পাল্টে যাবে—এমন সরলীকরণ করার উপায় নেই। বরং রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে না পারলে, সুলভে ইউটিলিটি সেবা প্রদান করতে না পারলে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, পরিবহন বা আবাসনসংক্রান্ত পলিসিগুলোতে গণমুখী/অধিকারভিত্তিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটাতে না পারলে, শুধু আর্থিক ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়ানো ও মধ্যবিত্তের চাহিদামতো পণ্য সরবরাহ করে দীর্ঘ মেয়াদে একটি টেকসই ও বৈষম্যবিহীন অর্থনীতি তৈরি করা আদৌ সম্ভব নয়।

ইউএনসিটিএডি ২০১৩।। United Nations Conference on Trade and Development (UNCTAD), Trade and Development Report, 2013, New York and Geneva।

এডিবি ২০১০।। Asian Development Bank (ADB), The Rise of Asia’s Middle Class, https://www.adb.org/sites/default/files/publication/27726/ki2010-special-chapter.pdf, প্রবেশ: ১০ই জুন, ২০২২।

খারাস ২০১১।। Homi Kharas, ‘The Rise of the Middle Class’, in Ejaz Ghani (ed.), Reshaping Tomorrow: Is South Asia Ready for the Big Leap?, New Delhi: Oxford University Press।

জাইকা ২০১৬।। Japan International Cooperation Agency (JICA), Emerging Middle Income Class in Bangladesh, March 2016, https://www.jica.go.jp/bangladesh/bangland/pdf/about/Middle%20Income%20Survey.pdf, প্রবেশ: ১০ই জুন, ২০২২।

প্যালে ১৯৯৬।। Thomas Palley, ‘The Forces Making for an Economic Collapse’, The Atlantic, July 1996, https://www.theatlantic.com/magazine/archive/1996/07/the-forces-making-for-an-economic-collapse/376621/, প্রবেশ: ১০ই জুন, ২০২২।

বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ ২০১৫।। The Boston Consulting Group, The Surging Consumer Market Nobody Saw Coming, October 2015, https://www.bcg.com/publications/2015/bangladesh-the-surging-consumer-market-nobody-saw-coming, প্রবেশ: ১০ই জুন, ২০২২।

ম্যাকেন্জি গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ২০০৭।। McKinsey Global Institute, How India’s Rising and Unique Middle Class Will Reshape Global Consumer Markets, May 2007, https://www.mckinsey.com/mgi/overview/in-the-news/next-big-spenders-indian-middle-class, প্রবেশ: ১০ই জুন, ২০২২।

সেন ২০১৫।। Binayak Sen, Size and Growth of Middle Class in Bangladesh: Trends, Drivers and Policy Implications, Dhaka: Bangladesh Institute of Development Studies।

ড. মাহা মির্জা উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক। খণ্ডকালীন শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি জার্মানির বিলেফেল্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনৈতিক অর্থনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁর পিএচডির বিষয় ছিল: স্টেট বিজনেস নেক্সাস এন্ড ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ: দি কেস অফ এশিয়া এনার্জি, বিজিএমইএ, এন্ড কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ বিশ্লেষণমূলক সাময়িকী ‘সর্বজনকথা’র সম্পাদনা পর্ষদে যুক্ত আছেন। সর্বজনকথা এবং প্রথম আলোতে নিয়মিত উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ে লেখালেখি করেন।

নোট: আর্কাইভ থেকে প্রকাশিত। দেখুন, প্রতিচিন্তা, দ্বাদশ বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, ঢাকা, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২২