তিন পরিযায়ীর মহাবিপদ
- আপডেট সময় : ১২:২০:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

গত শীতে গিয়েছিলাম সোনাদিয়া দ্বীপে। তিন প্রজাতির বিরল পরিযায়ী দেখার আশায়। এগুলো হলো চামচঠুঁটো বাটান, বড় নট আর নর্ডম্যানের সবুজ পা। তিনটিরই দেখা পেয়েছি, তবে সময় লেগেছে দুই দিন। তিনটি পাখিই এখন মহাবিপদে আছে। বিশ্বব্যাপী বিপন্ন পাখির তালিকায় স্থান পাওয়া এই তিন প্রজাতিকে এখনো সোনাদিয়ায় দেখা গেলেও একেবারে সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে।
২০০৬ সাল থেকে নিয়মিত সোনাদিয়ায় পাখি দেখতে যাই। গত ২০ বছরে দ্বীপটির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। মানুষের বিচরণ বেড়েছে। কাদাচরও আগের তুলনায় বেড়েছে, কিন্তু কাদাচরের পাখি বাড়েনি।
সোনাদিয়ায় মূলত যাওয়া হয় সৈকত পাখির ঝাঁক দেখতে। এখনো এখানে হাজার হাজার সৈকত পাখির দেখা মেলে; সব মিলিয়ে প্রতি শীতে ৭ থেকে ১০ হাজার পরিযায়ী পাখি দেখা যায় এই দ্বীপে। তবে সম্প্রতি সায়েম চৌধুরী তাঁর এক গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন, সোনাদিয়াসহ উপকূলজুড়ে পরিযায়ী সৈকত পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। ২০ প্রজাতির সৈকত পাখির তুলনামূলক বিশ্লেষণে তিনি দেখেছেন, এর মধ্যে ১২ প্রজাতির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা আমাদের দেশের জন্য মোটেই ভালো খবর নয়। এই প্রজাতির মধ্য থেকে তিনটি পরিযায়ীর গল্প বলি।
প্রথমটি চামচঠুঁটো বাটান। ১০-১৫ বছর আগেও সোনাদিয়ায় গড়ে ৩০টি করে এই পাখি দেখা যেত। এখন সংখ্যাটি ১০-এর নিচে নেমে এসেছে; গত শীত মৌসুমে দেখা গেছে মাত্র তিনটি। অথচ ২০১৭ সালে সোনাদিয়ার কালাদিয়ায় আমি একসঙ্গে ১২টি চামচঠুঁটো বাটান দেখেছিলাম।
চামচঠুঁটো বাটান ছোট্ট একটি পরিযায়ী সৈকত পাখি। এটি মূলত রাশিয়ার চুকোটকা ও কামচাটকা অঞ্চলে প্রজনন করে, যার দূরত্ব সোনাদিয়া থেকে আট হাজার কিলোমিটারের বেশি। মাত্র ৩০ গ্রাম ওজনের এই পরিযায়ীর জন্য সোনাদিয়া দ্বীপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
গোটা পৃথিবীতে এই প্রজাতির পাখি টিকে আছে মাত্র ৪৪৩টি। সোনাদিয়ায় আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পাখিটিকে এখন আর তেমন দেখা যায় না, যা আমাদের জন্য বড় ক্ষতি। মাত্র দুই দশকেই পাখিটি এখান থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। সোনাদিয়ায় এর আসা বন্ধ হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে বাংলাদেশেরই।
দ্বিতীয় পরিযায়ী সৈকত পাখিটি বড় নট। বিশ্বব্যাপী বিপন্ন এই পাখি বাংলাদেশেও অনেক কমে গেছে এবং বছরে গড়ে ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ হারে কমছে। এটিকেও সোনাদিয়ায় দেখা যায়।
একসময় সোনাদিয়ায় পাঁচ শর মতো বড় নট দেখা যেত, এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। পাখিটি থাকে সোনাদিয়ার কাদাচরে। গত ২০ বছরে যতবার সোনাদিয়ায় গিয়েছি, ততবারই এর দেখা পেয়েছি। গত বছরের পাখিশুমারিতে উপকূলের অন্য জায়গাতেও কয়েকটি দেখা গেছে। বড় নটকে প্রায়ই লাল নটের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়, তাই চিনতে অসুবিধা হয়। এটিও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া পরিযায়ী পাখি, বাংলাদেশে দেখা যায় শীতকালে।
তৃতীয় পাখিটি নর্ডম্যানের সবুজপা। এটিও বিশ্বব্যাপী বিপন্ন পাখির তালিকায় রয়েছে, আর এ দেশে এর অবস্থা ভয়াবহ। সাম্প্রতিক সময়ে সোনাদিয়া ছাড়া অন্য কোথাও এর দেখা মিলছে না বললেই চলে। এই বিরল পাখিটিকে আমি সোনাদিয়াতেই পাঁচ-ছয়বার দেখেছি। এই পাখিটিও গড়ে বছরে ১৫ দশমিক ৫ ভাগ কমে যাচ্ছে।
যেকোনো পাখিদেখিয়ের জন্য সোনাদিয়া এক অসাধারণ জায়গা। অথচ পৃথিবীর বুকে সোনাদিয়া যে এক মহামূল্যবান স্থান, তা পাখিদেখিয়েরা ছাড়া আর কারও নজরে আসেনি বললেই চলে। সোনাদিয়াকে ঘিরে প্রায়ই মহাপরিকল্পনা হয়। উন্নয়ন হয়তো ঠিকই হবে, কিন্তু হারিয়ে যাবে এই বিরল পরিযায়ীরা।



















