ঢাকা ১১:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কলোরাডোর সান জুয়ান রেঞ্জে: একপশলা মুক্তি আর টেলুরাইড

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:১২:৩৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সামারের ছুটি প্রায় শেষের পথে। ক্যালেন্ডারের পাতার দিকে তাকিয়ে বুকটা একটু কেঁপে উঠল, কারণ ভার্সিটির ফল সেমিস্টার একবার শুরু হয়ে গেলে ল্যাব আর পড়াশোনার চাপে আর কোনো দিকে তাকানোর ফুরসত মিলবে না। পিএইচডি জীবনের নিরবচ্ছিন্ন ব্যস্ততায় নতুন করে ডুবে যাওয়ার আগেই কয়েকটা দিন বুক ভরে নিশ্বাস নেওয়ার বড় প্রয়োজন ছিল। সেই ভাবনা থেকেই আমি আর বউ বসে চটজলদি প্ল্যান করে ফেললাম। কোনো দীর্ঘ প্রস্তুতি ছাড়া স্রেফ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঠিক করে ফেললাম গন্তব্য—দক্ষিণ কলোরাডোর পাহাড়ি স্বর্গ টেলুরাইড (Telluride)।

টেলুরাইড এমন এক জায়গা, যা সারা বছরই পর্যটকদের চুম্বকের মতো টানে। আর সেখানে হোটেলভাড়া যেন আকাশ ছুঁতে চায়। বিশেষ করে ফল সিজনে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত, যখন এখানকার পাহাড়ি উপত্যকা অ্যাসপেন পাতার সোনালি আভায় মোড়ানো থাকে, তখন সেখানে পা ফেলার তিলমাত্র জায়গা থাকে না। ভাগ্যবশত রাতের মধ্যেই সবকিছু গুছিয়ে, ঘোরার ছক কেটে এবং থাকার একটা বন্দোবস্ত করে পরদিন আগস্টের ৫ তারিখ সকাল ঠিক ৭টায়, গাড়ির চাকা ঘুরিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমরা দুজন।

বোন্ডারকে পেছনে ফেলে গাড়ি ছুটে চলল। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার দীর্ঘ ড্রাইভ শেষে আমরা পৌঁছালাম গানিসনে। সকালের নাশতা সেরে গাড়ির ট্যাংকটাও পূর্ণ করে নিলাম। এরপর শুরু হলো আসল রোমাঞ্চ। গানিসন ছাড়িয়ে যতই এগোতে লাগলাম, পথ যেন রূপকথার ক্যানভাস হয়ে উঠতে লাগল। ইউএস হাইওয়ে ৫০ ধরে এগিয়ে চলার সময় চোখে পড়ল গানিসন ন্যাশনাল ফরেস্টের আদিম সবুজ আর দিগন্তে দাঁড়িয়ে থাকা ব্লু মেসা রিজার্ভারের শান্ত জলরাশি। কাছেই কলোরাডোর বুক চিরে গড়ে ওঠা ‘ব্ল্যাক ক্যানিয়ন অব দ্য গানিসন’-এর খাড়া, পাথুরে দেয়াল দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় ছিল না। ঐতিহাসিক এই অঞ্চলের প্রতিটি পাহাড়ি বাঁকে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ছড়িয়ে ছিল। কতবার যে গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলতে বাধ্য হয়েছি, তার ইয়ত্তা নেই।

আমাদের পথ এগিয়ে চলল উরের দিকে। এই আগস্টের সময়টায় অ্যাসপেন ও তার আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চলে ওয়াইল্ডফায়ার চলছিল, তাই দূর থেকেই আকাশে ছাই আর ধোঁয়ার অদ্ভুত এক চাদর চোখে পড়ছিল। বাতাসটা কিছুটা ভারী মনে হচ্ছিল। কিন্তু আনকম্পাগ্রে ন্যাশনাল ফরেস্টের সীমানায় পৌঁছাতেই যেন জাদুবলে ধোঁয়াশা কেটে গিয়ে আকাশ স্বচ্ছ হয়ে উঠল। সেই নীল আকাশের নিচে পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা খরস্রোতা আনকম্পাগ্রে নদী রূপালি ফিতার মতো আমাদের পাশে পাশে চলতে লাগল, যেন দূর থেকে হাতছানি দিয়ে স্বাগত জানাচ্ছিল।

অবশেষে পৌঁছালাম উরেতে। চারপাশ থেকে আকাশছোঁয়া খাড়া পাহাড় দিয়ে ঘেরা এই ছোট্ট শহরটিকে দেখলে মনে হয়, পাহাড়েরা পরম আদরে তাকে কোলে আগলে রেখেছে। এখানকার ন্যাচারাল হট স্প্রিংসে আমরা একটু লম্বা বিরতি নিলাম। খনিজের উষ্ণ ছোঁয়ায় দীর্ঘ ড্রাইভের ক্লান্তি নিমেষেই উবে গেল। সেখানে ফ্রেশ হয়ে হালকা খাবার খেয়ে আবার স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখলাম। এবার শুরু হলো কলোরাডোর অন্যতম রোমাঞ্চকর পথ, ঐতিহাসিক ‘মিলিয়ন ডলার হাইওয়ে’ (ইউ.এস. রুট ৫৫০)। যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাইভিংপ্রেমীদের কাছে এই পথ এক অপার স্বর্গ। এক পাশে খাড়া পাথুরে পাহাড়, অন্য পাশে কোনো গার্ডরেল ছাড়া গভীর খাদ, আর সামনে দিগন্তবিস্তৃত সান জুয়ান পর্বতমালা। স্থানীয় বাসিন্দারা ভালোবেসে একে ‘আমেরিকার সুইজারল্যান্ড’ বলে ডাকেন। সেখানে দাঁড়িয়ে যখন শীতল বাতাস গায়ে মাখছিলাম, মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর কোনো এক শান্ত, অচেনা চূড়ায় এসে দাঁড়িয়েছি। কিছু দূর গিয়েই রাস্তার ঠিক পাশেই চোখে পড়ল প্রায় দুই শ ফুট উঁচু থেকে গর্জন করে নেমে আসা ‘বিয়ার ক্রিক ফলস’। সেই জলপ্রপাতের কাছে গাড়ি থামিয়ে পাহাড়ি জলকণার ঠান্ডা স্পর্শ নিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম।

দুপুর গড়িয়ে রোদ তখন নরম হতে শুরু করেছে। পাহাড়ের শীতল ছায়া গায়ে মেখে আমরা এগোচ্ছিলাম ঐতিহাসিক খনি শহর সিলভারটনের দিকে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯ হাজার ফুটের বেশি উঁচুতে অবস্থিত এই ছোট্ট শহর যেন উনিশ শতকের কোনো চলচ্চিত্রের সেট। শহরের পাশ দিয়েই কুলকুল শব্দে বয়ে চলেছে অনিমাস নদী, যা স্থানীয় স্প্যানিশ ভাষায় ‘রিভার অব লস্ট সোলস’ বা হারিয়ে যাওয়া আত্মার নদী নামে পরিচিত। সান জুয়ান পর্বতমালার ছায়ায় অনিমাসের কাচের মতো স্বচ্ছ পানির স্রোত আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা পুরোনো রেললাইনের ইতিহাস মিলে সেখানে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে রেখেছিল। নদীর ধারে কিছুক্ষণ হেঁটে পাহাড়ের নির্জনতা অনুভব করে সিলভারটনে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম।

দিন শেষে আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য ছিল ডুরাঙ্গো। সান জুয়ানের এই অঞ্চলে টেলুরাইড বা সিলভারটনের চড়া খরচের মধ্যে তুলনামূলকভাবে একমাত্র এখানেই একটি সাধ্যের মধ্যে সুন্দর হোটেল পাওয়া গিয়েছিল। বিকেলের আলো মিলিয়ে যখন ডুরাঙ্গোয় পৌঁছালাম, শরীর আর সায় দিচ্ছিল না। দ্রুত হোটেলে চেক-ইন করে একটু বিশ্রাম নিলাম। রাতের বেলা শহরের এক পরিচিত দেশীয় স্বাদের ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁয় গিয়ে খেলাম মনের মতো গরম খাবার। দীর্ঘ পাহাড়ি ড্রাইভের শারীরিক ক্লান্তি চোখে রাজ্যের ঘুম নামিয়ে আনছিল, কিন্তু মনে ছিল চাপা উত্তেজনা। কারণ, কাল সকালেই শুরু হবে স্বপ্নের টেলুরাইডের পথে আসল অভিযান।

পরদিন খুব ভোরেই ঘুম ভেঙে গেল। দ্রুত প্রস্তুত হয়ে হোটেলের চেকআউট সম্পন্ন করলাম। সকালের নাশতা সারতে ঢুঁ মারলাম ম্যাকডোনাল্ডসে। ঝটপট নাশতা শেষ করে ঠিক সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম টেলুরাইডের উদ্দেশ্যে। ডুরাঙ্গো থেকে টেলুরাইডের এই পথ যেন এক অন্য পৃথিবী। আমরা ড্রাইভ করে যাচ্ছিলাম বিশাল সান জুয়ান ন্যাশনাল ফরেস্ট ও লিজার্ড হেড পাসের ভেতর দিয়ে। চারপাশের অনিন্দ্যসুন্দর পাহাড়গুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল। ঘন পাইন আর দেবদারুর বনে ঘেরা এই পাহাড়ি পথ দিয়ে যেতে যেতে মনে মনে ভাবছিলাম, আর মাত্র কয়েকটা সপ্তাহ পরই যখন ফল কালার শুরু হবে, তখন অ্যাসপেনের সোনালি রূপ এই পুরো জঙ্গলকে কেমন মোহনীয় চিত্রে রূপান্তর করবে! সেই কল্পনাই মনটাকে এক অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরিয়ে দিচ্ছিল।

অবশেষে আমরা পৌঁছালাম কাঙ্ক্ষিত টেলুরাইডে। পাহাড়ের খাড়া উপত্যকায় লুকানো রূপকথার মতো এক ছোট, ছিমছাম আর দারুণ গোছানো শহর। শহরের নির্ধারিত পার্কিংয়ে গাড়িটা রেখে আমরা প্রায় ১৫ মিনিট হেঁটে চলে এলাম গন্ডোলা স্টেশনে। টেলুরাইডের এই গন্ডোলাটি উত্তর আমেরিকার অন্যতম বিরল ও কলোরাডোর সবচেয়ে সুন্দর ফ্রি পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশন। আমরা চেপে বসলাম কাচের তৈরি সেই কেবিনে। শুরু হলো প্রায় ১৪ মিনিটের এক অভূতপূর্ব আর ভাষায় বর্ণনাতীত যাত্রা। যত ওপরে উঠছি, পায়ের নিচে টেলুরাইড শহরটি যেন পুতুলের ঘরের মতো ছোট হয়ে আসছিল। ১০ হাজার ৫০০ ফুট উচ্চতায় পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত সান সোফিয়া স্টেশনে যখন পৌঁছালাম, চোখের সামনে খুলে গেল সান জুয়ান মাউন্টেন রেঞ্জের এক মহাজাগতিক রূপ! দিগন্তজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তুষারশুভ্র আর পাথুরে শৃঙ্গগুলোর দিকে তাকিয়ে বসে বসে সেই অপার সৌন্দর্য উপভোগ করার লোভ আমরা কিছুতেই সামলাতে পারলাম না। পাহাড়ের শীতল শান্ত বাতাস আর চোখের সামনের সেই ক্যানভাস মন থেকে সব ধরনের ক্লান্তি মুছে দিচ্ছিল। পাহাড়ের চূড়ায় প্রায় এক ঘণ্টার মতো মায়াবী সময় কাটিয়ে আমরা আবার গন্ডোলায় চড়ে নিচে নেমে এলাম। এরপর কিছু সময় কাটল টেলুরাইডের বর্ণিল ও ঐতিহাসিক ডাউনটাউনের অলিগলিতে হেঁটে।

ঘড়ির কাঁটা তখন জানিয়ে দিচ্ছিল, এবার ফেরার পালা। শুরু হলো বোন্ডারে ফেরার অতিদীর্ঘ এক যাত্রা। সামনে শত শত মাইলের পাহাড়ি হাইওয়ে। ফেরার পথে মাঝে শুধু দুবার আমরা গাড়ি থামালাম, একবার দুপুরের খাবারের জন্য আর আরেকবার বিকেলের হালকা নাশতা ও গাড়িতে তেল নেওয়ার জন্য।

দীর্ঘ ৯ ঘণ্টার ড্রাইভ শেষে যখন আমরা নিজেদের চেনা শহর বোন্ডারে ফিরে এলাম, রাত তখন ঠিক ১১টা। চেনা শহরে ফিরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি বুক ছুঁয়ে গেল। নিজের ভালোবাসার বোন্ডারও যেন এক অপরূপ শান্তির আশ্রয়। বাসায় ঢুকে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে, রাতের খাবারটা খেয়েই একঘুমে রাত পার। কারণ, কাল থেকেই আবার শুরু হচ্ছে নতুন সেমিস্টার, গবেষণার খাতা আর সেই চিরচেনা কাজের চাপ। তবে মনের কোণে জমে রইল সান জুয়ানের পাহাড় আর টেলুরাইডের সেই সোনালি রূপকথার স্মৃতি, যা আগামী দিনগুলোতে কাজের মধ্যেও দারুণ এক সতেজতা দিয়ে যাবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

কলোরাডোর সান জুয়ান রেঞ্জে: একপশলা মুক্তি আর টেলুরাইড

আপডেট সময় : ০৯:১২:৩৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সামারের ছুটি প্রায় শেষের পথে। ক্যালেন্ডারের পাতার দিকে তাকিয়ে বুকটা একটু কেঁপে উঠল, কারণ ভার্সিটির ফল সেমিস্টার একবার শুরু হয়ে গেলে ল্যাব আর পড়াশোনার চাপে আর কোনো দিকে তাকানোর ফুরসত মিলবে না। পিএইচডি জীবনের নিরবচ্ছিন্ন ব্যস্ততায় নতুন করে ডুবে যাওয়ার আগেই কয়েকটা দিন বুক ভরে নিশ্বাস নেওয়ার বড় প্রয়োজন ছিল। সেই ভাবনা থেকেই আমি আর বউ বসে চটজলদি প্ল্যান করে ফেললাম। কোনো দীর্ঘ প্রস্তুতি ছাড়া স্রেফ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঠিক করে ফেললাম গন্তব্য—দক্ষিণ কলোরাডোর পাহাড়ি স্বর্গ টেলুরাইড (Telluride)।

টেলুরাইড এমন এক জায়গা, যা সারা বছরই পর্যটকদের চুম্বকের মতো টানে। আর সেখানে হোটেলভাড়া যেন আকাশ ছুঁতে চায়। বিশেষ করে ফল সিজনে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত, যখন এখানকার পাহাড়ি উপত্যকা অ্যাসপেন পাতার সোনালি আভায় মোড়ানো থাকে, তখন সেখানে পা ফেলার তিলমাত্র জায়গা থাকে না। ভাগ্যবশত রাতের মধ্যেই সবকিছু গুছিয়ে, ঘোরার ছক কেটে এবং থাকার একটা বন্দোবস্ত করে পরদিন আগস্টের ৫ তারিখ সকাল ঠিক ৭টায়, গাড়ির চাকা ঘুরিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমরা দুজন।

বোন্ডারকে পেছনে ফেলে গাড়ি ছুটে চলল। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার দীর্ঘ ড্রাইভ শেষে আমরা পৌঁছালাম গানিসনে। সকালের নাশতা সেরে গাড়ির ট্যাংকটাও পূর্ণ করে নিলাম। এরপর শুরু হলো আসল রোমাঞ্চ। গানিসন ছাড়িয়ে যতই এগোতে লাগলাম, পথ যেন রূপকথার ক্যানভাস হয়ে উঠতে লাগল। ইউএস হাইওয়ে ৫০ ধরে এগিয়ে চলার সময় চোখে পড়ল গানিসন ন্যাশনাল ফরেস্টের আদিম সবুজ আর দিগন্তে দাঁড়িয়ে থাকা ব্লু মেসা রিজার্ভারের শান্ত জলরাশি। কাছেই কলোরাডোর বুক চিরে গড়ে ওঠা ‘ব্ল্যাক ক্যানিয়ন অব দ্য গানিসন’-এর খাড়া, পাথুরে দেয়াল দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় ছিল না। ঐতিহাসিক এই অঞ্চলের প্রতিটি পাহাড়ি বাঁকে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ছড়িয়ে ছিল। কতবার যে গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলতে বাধ্য হয়েছি, তার ইয়ত্তা নেই।

আমাদের পথ এগিয়ে চলল উরের দিকে। এই আগস্টের সময়টায় অ্যাসপেন ও তার আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চলে ওয়াইল্ডফায়ার চলছিল, তাই দূর থেকেই আকাশে ছাই আর ধোঁয়ার অদ্ভুত এক চাদর চোখে পড়ছিল। বাতাসটা কিছুটা ভারী মনে হচ্ছিল। কিন্তু আনকম্পাগ্রে ন্যাশনাল ফরেস্টের সীমানায় পৌঁছাতেই যেন জাদুবলে ধোঁয়াশা কেটে গিয়ে আকাশ স্বচ্ছ হয়ে উঠল। সেই নীল আকাশের নিচে পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা খরস্রোতা আনকম্পাগ্রে নদী রূপালি ফিতার মতো আমাদের পাশে পাশে চলতে লাগল, যেন দূর থেকে হাতছানি দিয়ে স্বাগত জানাচ্ছিল।

অবশেষে পৌঁছালাম উরেতে। চারপাশ থেকে আকাশছোঁয়া খাড়া পাহাড় দিয়ে ঘেরা এই ছোট্ট শহরটিকে দেখলে মনে হয়, পাহাড়েরা পরম আদরে তাকে কোলে আগলে রেখেছে। এখানকার ন্যাচারাল হট স্প্রিংসে আমরা একটু লম্বা বিরতি নিলাম। খনিজের উষ্ণ ছোঁয়ায় দীর্ঘ ড্রাইভের ক্লান্তি নিমেষেই উবে গেল। সেখানে ফ্রেশ হয়ে হালকা খাবার খেয়ে আবার স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখলাম। এবার শুরু হলো কলোরাডোর অন্যতম রোমাঞ্চকর পথ, ঐতিহাসিক ‘মিলিয়ন ডলার হাইওয়ে’ (ইউ.এস. রুট ৫৫০)। যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাইভিংপ্রেমীদের কাছে এই পথ এক অপার স্বর্গ। এক পাশে খাড়া পাথুরে পাহাড়, অন্য পাশে কোনো গার্ডরেল ছাড়া গভীর খাদ, আর সামনে দিগন্তবিস্তৃত সান জুয়ান পর্বতমালা। স্থানীয় বাসিন্দারা ভালোবেসে একে ‘আমেরিকার সুইজারল্যান্ড’ বলে ডাকেন। সেখানে দাঁড়িয়ে যখন শীতল বাতাস গায়ে মাখছিলাম, মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর কোনো এক শান্ত, অচেনা চূড়ায় এসে দাঁড়িয়েছি। কিছু দূর গিয়েই রাস্তার ঠিক পাশেই চোখে পড়ল প্রায় দুই শ ফুট উঁচু থেকে গর্জন করে নেমে আসা ‘বিয়ার ক্রিক ফলস’। সেই জলপ্রপাতের কাছে গাড়ি থামিয়ে পাহাড়ি জলকণার ঠান্ডা স্পর্শ নিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম।

দুপুর গড়িয়ে রোদ তখন নরম হতে শুরু করেছে। পাহাড়ের শীতল ছায়া গায়ে মেখে আমরা এগোচ্ছিলাম ঐতিহাসিক খনি শহর সিলভারটনের দিকে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯ হাজার ফুটের বেশি উঁচুতে অবস্থিত এই ছোট্ট শহর যেন উনিশ শতকের কোনো চলচ্চিত্রের সেট। শহরের পাশ দিয়েই কুলকুল শব্দে বয়ে চলেছে অনিমাস নদী, যা স্থানীয় স্প্যানিশ ভাষায় ‘রিভার অব লস্ট সোলস’ বা হারিয়ে যাওয়া আত্মার নদী নামে পরিচিত। সান জুয়ান পর্বতমালার ছায়ায় অনিমাসের কাচের মতো স্বচ্ছ পানির স্রোত আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা পুরোনো রেললাইনের ইতিহাস মিলে সেখানে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে রেখেছিল। নদীর ধারে কিছুক্ষণ হেঁটে পাহাড়ের নির্জনতা অনুভব করে সিলভারটনে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম।

দিন শেষে আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য ছিল ডুরাঙ্গো। সান জুয়ানের এই অঞ্চলে টেলুরাইড বা সিলভারটনের চড়া খরচের মধ্যে তুলনামূলকভাবে একমাত্র এখানেই একটি সাধ্যের মধ্যে সুন্দর হোটেল পাওয়া গিয়েছিল। বিকেলের আলো মিলিয়ে যখন ডুরাঙ্গোয় পৌঁছালাম, শরীর আর সায় দিচ্ছিল না। দ্রুত হোটেলে চেক-ইন করে একটু বিশ্রাম নিলাম। রাতের বেলা শহরের এক পরিচিত দেশীয় স্বাদের ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁয় গিয়ে খেলাম মনের মতো গরম খাবার। দীর্ঘ পাহাড়ি ড্রাইভের শারীরিক ক্লান্তি চোখে রাজ্যের ঘুম নামিয়ে আনছিল, কিন্তু মনে ছিল চাপা উত্তেজনা। কারণ, কাল সকালেই শুরু হবে স্বপ্নের টেলুরাইডের পথে আসল অভিযান।

পরদিন খুব ভোরেই ঘুম ভেঙে গেল। দ্রুত প্রস্তুত হয়ে হোটেলের চেকআউট সম্পন্ন করলাম। সকালের নাশতা সারতে ঢুঁ মারলাম ম্যাকডোনাল্ডসে। ঝটপট নাশতা শেষ করে ঠিক সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম টেলুরাইডের উদ্দেশ্যে। ডুরাঙ্গো থেকে টেলুরাইডের এই পথ যেন এক অন্য পৃথিবী। আমরা ড্রাইভ করে যাচ্ছিলাম বিশাল সান জুয়ান ন্যাশনাল ফরেস্ট ও লিজার্ড হেড পাসের ভেতর দিয়ে। চারপাশের অনিন্দ্যসুন্দর পাহাড়গুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল। ঘন পাইন আর দেবদারুর বনে ঘেরা এই পাহাড়ি পথ দিয়ে যেতে যেতে মনে মনে ভাবছিলাম, আর মাত্র কয়েকটা সপ্তাহ পরই যখন ফল কালার শুরু হবে, তখন অ্যাসপেনের সোনালি রূপ এই পুরো জঙ্গলকে কেমন মোহনীয় চিত্রে রূপান্তর করবে! সেই কল্পনাই মনটাকে এক অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরিয়ে দিচ্ছিল।

অবশেষে আমরা পৌঁছালাম কাঙ্ক্ষিত টেলুরাইডে। পাহাড়ের খাড়া উপত্যকায় লুকানো রূপকথার মতো এক ছোট, ছিমছাম আর দারুণ গোছানো শহর। শহরের নির্ধারিত পার্কিংয়ে গাড়িটা রেখে আমরা প্রায় ১৫ মিনিট হেঁটে চলে এলাম গন্ডোলা স্টেশনে। টেলুরাইডের এই গন্ডোলাটি উত্তর আমেরিকার অন্যতম বিরল ও কলোরাডোর সবচেয়ে সুন্দর ফ্রি পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশন। আমরা চেপে বসলাম কাচের তৈরি সেই কেবিনে। শুরু হলো প্রায় ১৪ মিনিটের এক অভূতপূর্ব আর ভাষায় বর্ণনাতীত যাত্রা। যত ওপরে উঠছি, পায়ের নিচে টেলুরাইড শহরটি যেন পুতুলের ঘরের মতো ছোট হয়ে আসছিল। ১০ হাজার ৫০০ ফুট উচ্চতায় পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত সান সোফিয়া স্টেশনে যখন পৌঁছালাম, চোখের সামনে খুলে গেল সান জুয়ান মাউন্টেন রেঞ্জের এক মহাজাগতিক রূপ! দিগন্তজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তুষারশুভ্র আর পাথুরে শৃঙ্গগুলোর দিকে তাকিয়ে বসে বসে সেই অপার সৌন্দর্য উপভোগ করার লোভ আমরা কিছুতেই সামলাতে পারলাম না। পাহাড়ের শীতল শান্ত বাতাস আর চোখের সামনের সেই ক্যানভাস মন থেকে সব ধরনের ক্লান্তি মুছে দিচ্ছিল। পাহাড়ের চূড়ায় প্রায় এক ঘণ্টার মতো মায়াবী সময় কাটিয়ে আমরা আবার গন্ডোলায় চড়ে নিচে নেমে এলাম। এরপর কিছু সময় কাটল টেলুরাইডের বর্ণিল ও ঐতিহাসিক ডাউনটাউনের অলিগলিতে হেঁটে।

ঘড়ির কাঁটা তখন জানিয়ে দিচ্ছিল, এবার ফেরার পালা। শুরু হলো বোন্ডারে ফেরার অতিদীর্ঘ এক যাত্রা। সামনে শত শত মাইলের পাহাড়ি হাইওয়ে। ফেরার পথে মাঝে শুধু দুবার আমরা গাড়ি থামালাম, একবার দুপুরের খাবারের জন্য আর আরেকবার বিকেলের হালকা নাশতা ও গাড়িতে তেল নেওয়ার জন্য।

দীর্ঘ ৯ ঘণ্টার ড্রাইভ শেষে যখন আমরা নিজেদের চেনা শহর বোন্ডারে ফিরে এলাম, রাত তখন ঠিক ১১টা। চেনা শহরে ফিরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি বুক ছুঁয়ে গেল। নিজের ভালোবাসার বোন্ডারও যেন এক অপরূপ শান্তির আশ্রয়। বাসায় ঢুকে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে, রাতের খাবারটা খেয়েই একঘুমে রাত পার। কারণ, কাল থেকেই আবার শুরু হচ্ছে নতুন সেমিস্টার, গবেষণার খাতা আর সেই চিরচেনা কাজের চাপ। তবে মনের কোণে জমে রইল সান জুয়ানের পাহাড় আর টেলুরাইডের সেই সোনালি রূপকথার স্মৃতি, যা আগামী দিনগুলোতে কাজের মধ্যেও দারুণ এক সতেজতা দিয়ে যাবে।