ঢাকা ০৬:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
‘ছেলেটাকে ছাড়া পৃথিবীটা বড্ড শূন্য, কীভাবে বাকিটা জীবন কাটাব’ যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগ গরম খুন্তির ছ্যাঁকা, চোখে মরিচের গুঁড়া—বিমানের সাবেক এমডির বাসায় গৃহকর্মী নির্যাতনের বর্ণনা অভিযোগপত্রে বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায় আনিসা ইউরোপের দেশে দেশে কেন বিক্ষোভ করছেন মানুষ রাসায়নিক–নির্ভরতা থেকে জৈব বিকল্প খুঁজছে বাংলাদেশ এআইয়ের যুগে মানুষের বুদ্ধিমত্তাই আসল—ফরিদ জাকারিয়া কম্বোডিয়ার ডিটেনশন সেন্টার থেকে উদ্ধার ৩০ বাংলাদেশি দেশে ফিরছেন কাল মঙ্গলবার শিক্ষার্থীদের যুক্তি ও গবেষণাধর্মী চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে ইসলামি আইনে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ কী কী, কেন এই শাস্তি

রাসায়নিক–নির্ভরতা থেকে জৈব বিকল্প খুঁজছে বাংলাদেশ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:৩৪:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হু হু করে কমছে প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার রপ্তানি। যার সরাসরি ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন ও কৃষি খাতে। এই ভূরাজনৈতিক সংকটের খেসারত দিতে হচ্ছে ভূখণ্ডগতভাবে বহুদূরে থাকা বাংলাদেশকেও। বাংলাদেশে হঠাৎ তীব্র হয়ে যায় কৃত্রিম, প্রকৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের সংকট। চ্যানেল নিউজ এশিয়া (সিএনএ) সেপ্টেম্বরে ‘আ লাইফ উইদাউট অয়েল’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকদের নানা সংকটের তথ্য তুলে ধরেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সারের প্রায় ৮৫ শতাংশই আমদানি করে। বিশ্ববাণিজ্যে ব্যবহৃত ইউরিয়ার ৩০ শতাংশ ও অ্যামোনিয়ার ২৫ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ হয়। সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাজারে সারের দাম একলাফেই প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ওপর অভ্যন্তরীণ গ্যাস–সংকটের কারণে বাংলাদেশের পাঁচটি প্রধান ইউরিয়া কারখানার মধ্যে চারটির উৎপাদনই বন্ধ হয়ে গেছে।

ধান রোপণের মৌসুমে সারের তীব্র সংকট কৃষকদের সামনে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। দেশের প্রান্তিক এলাকায় সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ আছে। এ ছাড়া পেট্রলের প্যানিক বাইয়িং বা আতঙ্কে কেনাকাটার কারণে পরিবহনব্যবস্থায় স্থবিরতা আছে। বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৪৯ হাজার টন কীটনাশক প্রয়োজন হয়। কীটনাশক না পাওয়ায় ফসল পোকামাকড়ের আক্রমণে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। কারওয়ান বাজারের মতো বড় পাইকারি বাজারে মধ্যরাতেও খাদ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করতে বেগ পাচ্ছে। পরিবহন খরচ বৃদ্ধি ও জোগান হ্রাসের প্রভাবে খুচরা বাজারে সবজি ও ফলের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স সূচকে ১২৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। বাংলাদেশ মাঝারি মাত্রার ক্ষুধাপীড়িত দেশের তালিকার দেশ। খাদ্য সরবরাহের এই ব্যাঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিশ্বে শিল্পভিত্তিক কৃষি মূলত একফসলি চাষ ও জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তৈরি নাইট্রোজেন সারের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল। তবে এই মডেল দীর্ঘ মেয়াদে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রমাণিত হচ্ছে। নাইট্রোজেনভিত্তিক সংশ্লেষিত সার (যেমন: অ্যামোনিয়াম ও সালফার) সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাটির পিএইচ মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমিয়ে দেয়। ফলে মাটি অতিরিক্ত অম্লীয় হয়ে পড়ে এবং ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানগুলো উদ্ভিদ শোষণ করতে পারে না। একই সঙ্গে মাটির বন্ধু কেঁচো ও উপকারী অণুজীব মারা যায়। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৯৫ শতাংশ কৃষক অতিরিক্ত মাত্রায় নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফার ব্যবহার করেন। অনেক ক্ষেত্রে কৃষক সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে ২ থেকে ৫ গুণ বেশি সার ব্যবহার করেন। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ২০১৫–২০১৭ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জরিপ করা ১০ হাজার ক্যানসার রোগীর মধ্যে অন্তত ১০০ জনই কৃষক। যার অন্যতম কারণ অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ও সার ছিটানো।

এসব সমস্যার বিকল্পে কৃষকেরা কাজ করছেন। বাংলাদেশের আনারসের রাজধানীখ্যাত টাঙ্গাইলের মধুপুরে মোট আনারসের ৬০ শতাংশের বেশি উৎপাদিত হয়। এখানকার স্থানীয় কৃষকেরা কেঁচো সারের মাধ্যমে সফলভাবে চাষাবাদ করছেন। রাসায়নিক সারের মতো হঠাৎ অতিরিক্ত পুষ্টি না দিয়ে ভার্মিকম্পোস্ট মাটিকে ধীর ও টেকসই গতিতে সুষম পুষ্টি জোগায় এবং মাটির স্বাভাবিক জৈব গুণাগুণ ফিরিয়ে আনে। গ্যাসের সংকটে বালাইনাশক আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঝিনাইদহের নারী কৃষকেরা রাসায়নিক সার ও কীটনাশক পুরোপুরি ত্যাগ করেছেন। নিজ উদ্যোগে প্রাকৃতিক জৈব উপায়ে তৈরি বালাইনাশক ব্যবহার করছেন তাঁরা।

১৯৯০ সালে বাংলাদেশে ব্যবহৃত কৃষি রাসায়নিকের পরিমাণ ছিল তিন হাজার মেট্রিক টন, যা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫ হাজার মেট্রিক টনে। এর পেছনে বড় কারণ ছিল উচ্চ রাসায়নিক–নির্ভর বিদেশি হাইব্রিড বীজ। বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ২৭ হাজার টন তেলবীজ আমদানি করে। এই নির্ভরতা কমাতে বীজ বিজ্ঞানীরা দেশীয় বীজ নিয়ে গবেষণা করছেন। এই বীজ স্থানীয় জলবায়ু, মাটি ও বৃষ্টির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ছাড়াই স্বাভাবিক ফলন দেয়।

সূত্র: চ্যানেল নিউজ এশিয়া (সিএনএ)

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

রাসায়নিক–নির্ভরতা থেকে জৈব বিকল্প খুঁজছে বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ০৫:৩৪:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হু হু করে কমছে প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার রপ্তানি। যার সরাসরি ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন ও কৃষি খাতে। এই ভূরাজনৈতিক সংকটের খেসারত দিতে হচ্ছে ভূখণ্ডগতভাবে বহুদূরে থাকা বাংলাদেশকেও। বাংলাদেশে হঠাৎ তীব্র হয়ে যায় কৃত্রিম, প্রকৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের সংকট। চ্যানেল নিউজ এশিয়া (সিএনএ) সেপ্টেম্বরে ‘আ লাইফ উইদাউট অয়েল’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকদের নানা সংকটের তথ্য তুলে ধরেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সারের প্রায় ৮৫ শতাংশই আমদানি করে। বিশ্ববাণিজ্যে ব্যবহৃত ইউরিয়ার ৩০ শতাংশ ও অ্যামোনিয়ার ২৫ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ হয়। সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাজারে সারের দাম একলাফেই প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ওপর অভ্যন্তরীণ গ্যাস–সংকটের কারণে বাংলাদেশের পাঁচটি প্রধান ইউরিয়া কারখানার মধ্যে চারটির উৎপাদনই বন্ধ হয়ে গেছে।

ধান রোপণের মৌসুমে সারের তীব্র সংকট কৃষকদের সামনে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। দেশের প্রান্তিক এলাকায় সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ আছে। এ ছাড়া পেট্রলের প্যানিক বাইয়িং বা আতঙ্কে কেনাকাটার কারণে পরিবহনব্যবস্থায় স্থবিরতা আছে। বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৪৯ হাজার টন কীটনাশক প্রয়োজন হয়। কীটনাশক না পাওয়ায় ফসল পোকামাকড়ের আক্রমণে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। কারওয়ান বাজারের মতো বড় পাইকারি বাজারে মধ্যরাতেও খাদ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করতে বেগ পাচ্ছে। পরিবহন খরচ বৃদ্ধি ও জোগান হ্রাসের প্রভাবে খুচরা বাজারে সবজি ও ফলের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স সূচকে ১২৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। বাংলাদেশ মাঝারি মাত্রার ক্ষুধাপীড়িত দেশের তালিকার দেশ। খাদ্য সরবরাহের এই ব্যাঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিশ্বে শিল্পভিত্তিক কৃষি মূলত একফসলি চাষ ও জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তৈরি নাইট্রোজেন সারের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল। তবে এই মডেল দীর্ঘ মেয়াদে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রমাণিত হচ্ছে। নাইট্রোজেনভিত্তিক সংশ্লেষিত সার (যেমন: অ্যামোনিয়াম ও সালফার) সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাটির পিএইচ মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমিয়ে দেয়। ফলে মাটি অতিরিক্ত অম্লীয় হয়ে পড়ে এবং ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানগুলো উদ্ভিদ শোষণ করতে পারে না। একই সঙ্গে মাটির বন্ধু কেঁচো ও উপকারী অণুজীব মারা যায়। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৯৫ শতাংশ কৃষক অতিরিক্ত মাত্রায় নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফার ব্যবহার করেন। অনেক ক্ষেত্রে কৃষক সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে ২ থেকে ৫ গুণ বেশি সার ব্যবহার করেন। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ২০১৫–২০১৭ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জরিপ করা ১০ হাজার ক্যানসার রোগীর মধ্যে অন্তত ১০০ জনই কৃষক। যার অন্যতম কারণ অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ও সার ছিটানো।

এসব সমস্যার বিকল্পে কৃষকেরা কাজ করছেন। বাংলাদেশের আনারসের রাজধানীখ্যাত টাঙ্গাইলের মধুপুরে মোট আনারসের ৬০ শতাংশের বেশি উৎপাদিত হয়। এখানকার স্থানীয় কৃষকেরা কেঁচো সারের মাধ্যমে সফলভাবে চাষাবাদ করছেন। রাসায়নিক সারের মতো হঠাৎ অতিরিক্ত পুষ্টি না দিয়ে ভার্মিকম্পোস্ট মাটিকে ধীর ও টেকসই গতিতে সুষম পুষ্টি জোগায় এবং মাটির স্বাভাবিক জৈব গুণাগুণ ফিরিয়ে আনে। গ্যাসের সংকটে বালাইনাশক আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঝিনাইদহের নারী কৃষকেরা রাসায়নিক সার ও কীটনাশক পুরোপুরি ত্যাগ করেছেন। নিজ উদ্যোগে প্রাকৃতিক জৈব উপায়ে তৈরি বালাইনাশক ব্যবহার করছেন তাঁরা।

১৯৯০ সালে বাংলাদেশে ব্যবহৃত কৃষি রাসায়নিকের পরিমাণ ছিল তিন হাজার মেট্রিক টন, যা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫ হাজার মেট্রিক টনে। এর পেছনে বড় কারণ ছিল উচ্চ রাসায়নিক–নির্ভর বিদেশি হাইব্রিড বীজ। বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ২৭ হাজার টন তেলবীজ আমদানি করে। এই নির্ভরতা কমাতে বীজ বিজ্ঞানীরা দেশীয় বীজ নিয়ে গবেষণা করছেন। এই বীজ স্থানীয় জলবায়ু, মাটি ও বৃষ্টির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ছাড়াই স্বাভাবিক ফলন দেয়।

সূত্র: চ্যানেল নিউজ এশিয়া (সিএনএ)