কোরআনে যে ৩ শ্রেণিকে ‘নির্বোধ’ বলা হয়েছে
- আপডেট সময় : ০৫:৪০:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে

পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারায় বলা হয়েছে, “আর যখন তাদের বলা হয়, ‘অন্যান্য লোক যেভাবে ইমান এনেছে তোমরাও সেভাবে ইমান আনো’, তখন তারা বলে, ‘নির্বোধরা যেভাবে ইমান এনেছে আমরাও কি সেভাবে ইমান আনব?’ সাবধান, তারাই তো নির্বোধ, কিন্তু তারা জানে না।” (আয়াত: ১৩)
মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্ব এক চিরন্তন বাস্তবতা। যখনই কোনো সংস্কারক সমাজে সত্যের ডাক দিয়েছেন, তখনই কায়েমি স্বার্থবাদীরা এর বিরোধিতা করেছে।
নবীজির মক্কা ও মদিনার জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একত্ববাদের প্রচারণাকে স্তব্ধ করতে তৎকালীন সমাজে মূলত তিনটি পৃথক বিরোধী পক্ষের জন্ম হয়েছিল।
এই তিন পক্ষের বিরোধিতার ধরন, মনস্তত্ত্ব ও পদ্ধতি ছিল একেবারেই আলাদা। আজকের আধুনিক সমাজেও সত্যের পথে চলা মানুষদের এই তিন শ্রেণির বিরোধিতার মুখেই পড়তে হয়।
প্রথম পক্ষটির প্রতিনিধিত্ব করত মক্কার অভিজাত ও প্রভাবশালী নেতারা। তারা মহানবী (সা.) ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে শত্রুতা ঘোষণা করেছিল। যদিও তাদের শত্রুতার মাঝেও এক ধরনের আভিজাত্য থাকত, তবে সামান্য যুক্তিবোধ ও শিষ্টাচারও দেখা যেত।
এর একটি চমৎকার উদাহরণ হলো আবু জাহেলের ঘটনা। একবার আবু জাহেল নবীজিকে (সা.) অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করে। এই খবর পেয়ে নবীজির চাচা সাহাবি হামজা (রা.) ছুটে এসে হাতের ধনুক দিয়ে আবু জাহেলের মাথায় প্রচণ্ড জোরে আঘাত করেন, ফলে তার মাথা ফেটে রক্ত বের হতে থাকে।
তখন আবু জাহেলের গোত্র বনু মাখজুমের লোকেরা হামজার ওপর চড়াও হতে চাইলে আবু জাহেল তাদের নিবৃত্ত করে বলে, “আবু উমারাহকে (হামজা) ছেড়ে দাও, কারণ, আমি তার ভাতিজাকে জঘন্য ভাষায় গালমন্দ করেছিলাম।” (ইবনে হিশাম, আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ, ১/২৯২, দারুল জিল, বৈরুত, ১৯৯০)
এই শ্রেণির বিরোধীদের চিন্তার জগৎ এতটা সংকীর্ণ ছিল না। যুক্তির মুখোমুখি হলে তারা তা নিয়ে অন্তত ভাবত। যেমন, কুরাইশ নেতা উতবা ইবনু রাবিয়াহ একবার বিশাল ধনসম্পদ ও ক্ষমতার প্রলোভন নিয়ে নবীজির (সা.) কাছে আপসপ্রস্তাব নিয়ে আসে।
কিন্তু নবীজি (সা.) যখন তার সামনে কোরআন পাঠ করেন, তখন সে হতবাক হয়ে যায়
নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গিয়ে বলে, “আমি এমন কিছু কথা শুনেছি, যা আমি আগে কখনো শুনিনি। শপথ খোদার, এটি কোনো কবিতা নয়, জাদু নয়, এমনকি কোনো জাদুকরের মন্ত্রও নয়। হে কোরাইশ, আমার কথা শোনো। এই লোকটিকে তার কাজের ওপর ছেড়ে দাও। সে যা বলছে, তার পেছনে এক বিশাল ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে।” (ইবনে হিশাম, আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ, ১/২৯২, দারুল জিল, বৈরুত, ১৯৯০)
এই শ্রেণির মানুষদের মোকাবিলায় আজও প্রয়োজন প্রজ্ঞা, ধৈর্য এবং অকাট্য যুক্তির ব্যবহার, যেন তারা সত্য অনুধাবন করতে পারে।
দ্বিতীয় পক্ষটির উন্মেষ ঘটেছিল মূলত হিজরতের পর মদিনায়। এরা হলো মোনাফেকদের দল, যাদের নেতৃত্বে ছিল আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল। এরা মক্কার কাফেরদের মতো প্রকাশ্যে শত্রুতা করার সাহস রাখত না।
তাই এরা মুখে ইসলাম গ্রহণের কথা বলে সমাজের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল এবং অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ফিতনা, বিভেদ ও গুজব ছড়ানোর কাজে লিপ্ত ছিল। এরা ছিল মূলত দৃষ্টিহীন ও মোহগ্রস্ত এক অন্ধ সম্প্রদায়।
চোখের সামনে একজন মহামানব সমাজকে পরিশুদ্ধ করছেন, আল্লাহর বাণী নাজিল হচ্ছে, আর মুমিনরা ত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা দেখাচ্ছেন—এই আলোকিত পরিবেশও তাদের অন্তরকে আলোকিত করতে পারেনি।
বরং সমাজের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা এই শত্রুরাই বাইরের শত্রুদের চেয়ে বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল।
তাদের এই গুপ্তাঘাতের ভয়াবহতা তুলে ধরে পবিত্র কোরআনে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলা হয়েছে, “তারাই প্রকৃত শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকো; আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন, তারা কোন দিকে বিভ্রান্ত হচ্ছে!” (সুরা মোনাফেকুন, আয়াত: ৪)
উপরিউক্ত দুই পক্ষের বাইরে একটি তৃতীয় পক্ষ ছিল, যাদের আরবিতে বলা যায় ‘সফাহ’। এই লেখাটির মূল আলোচনা মূলত এদের ঘিরেই। আভিধানিক অর্থে ‘সফাহ’ বলা হয় এমন বিষয়কে, যা অত্যন্ত হালকা ও ওড়নেচা স্বভাবের; অর্থাৎ যাদের চিন্তাশক্তি অগভীর ও যাদের কাজে কোনো গাম্ভীর্য নেই।
কোরআন তাদের ক্ষেত্রে এই শব্দটি ব্যবহার করে বলেছে, “আর তোমরা নির্বোধদের হাতে তোমাদের ধন-সম্পদ তুলে দিয়ো না।” (সুরা নিসা, আয়াত: ৫)
এই নির্বোধ বা বোকাদের দলটি ছিল সবচেয়ে নিকৃষ্ট। তাদের বিরোধিতার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি ছিল না এবং তারা কোনো সামাজিক শিষ্টাচার, নীতি বা মূল্যবোধের তোয়াক্কা করত না। তাদের কাজ ছিল সবচেয়ে সস্তা, নোংরা ও কদর্য উপায়ে নবীজিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা, গালমন্দ করা এবং শারীরিক কষ্ট দেওয়া।
যুক্তির বিপরীতে তারা বেছে নিয়েছিল ব্যক্তিগত চরিত্র হনন ও উত্যক্ত করার পথ।
নবীজি (সা.) যখন কাবা চত্বরে সিজদারত থাকতেন, তখন উকবা ইবনে আবি মুয়াইত নামক এক ব্যক্তি উটের পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত নাড়িভুঁড়ি এনে তাঁর পিঠের ওপর চাপিয়ে দিত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪০)
আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর মতো মানুষেরা নবীজির চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখত। মক্কার ১৩ বছরের জীবনে এই ‘নির্বোধদের দল’ আবু জাহেলের মতো অহংকারী নেতাদের প্ররোচনায় নবীজিকে এমন সব কুরুচিপূর্ণ উপায়ে কষ্ট দিয়েছে, যা কোনো সুস্থ মস্তিষ্ক কল্পনাও করতে পারে না।

























