ঢাকা ০২:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সরকার পতন নয়, অবাধ নির্বাচন চাই: বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের সঙ্গে তুলনার জবাবে শশী থারুর উত্তাল ফ্রান্স, কয়েকটি শহরে কারফিউ জারি ৯ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭৩, মব সহিংসতায় ১৮৭: এইচআরএসএস বন্দিতালিকায় দুজনের নাম থাকলেও শাস্তির তথ্য কেন ঊহ্য রাখা হলো, প্রশ্ন ঢাকার আফগানিস্তানের কাছে ১৫৮ রানের বড় ব্যবধানে হারল জিম্বাবুয়ে পদপিষ্টের ঘটনার শোক কাটিয়ে মহা অষ্টমীর উৎসব কলকাতায় তেলেগু ও কানপুরী সম্প্রদায়ের যোগ্যদের চাকরি দেওয়ার ঘোষণা স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর রোনালদোকে এক মাসের নিষেধাজ্ঞা ও ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করল পর্তুগাল টুপটুপ রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপকের ৭ দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ রাতে ‘গুজব’, সকালে ‘পদত্যাগের সিদ্ধান্ত’, দুপুরে ‘স্বেচ্ছায় অব্যাহতি’: ইশরাকের যত বক্তব্য

‘মানুষ আমাকে বিধবা বানিয়ে দিল’

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৫৮:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

‘মানুষ আমার কী যে ক্ষতিটা করে দিল, আমাকে বিধবা বানিয়ে দিল। আমার ছোট্ট ছেলে দুটোকে এতিম করে দিল। এখন আমার সংসার চলবে কীভাবে? আমার স্বামী মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সংসারটা চালাতেন, আমাদের খাওয়াতেন। এখন তো আর তিনি ফিরে আসবেন না। কোলে আট মাসের বাচ্চা নিয়ে আমি কোথায় যাব? আমার সন্তান দুটোর দায়িত্ব কে নেবে?’

আহাজারি করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের স্ত্রী নাজমা খাতুন। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাঁর স্বামীকে গত মঙ্গলবার দফায় দফায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

নিহত শামীম সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামসুল রহমানের ছেলে। শামীমের বড় ছেলে আয়ানের বয়স ১২। সে নানাবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করে। ছোট ছেলে আরহামের বয়স মাত্র আট মাস। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন নাজমা।

নাজমা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। নিয়মিত ওষুধ খেতে হতো। কিন্তু আর্থিক সংকটে অনেক সময় ওষুধ কেনার টাকা জোগাড় করতে পারতেন না। কখনো মানুষের কাছে, কখনো স্বজনদের কাছ থেকে টাকা চেয়ে ওষুধ কিনতেন। মাঝেমধ্যে কাজ করে আয় করার চেষ্টা করতেন। দুই-তিন দিন কাজ করার পর আবার অসুস্থ হয়ে ঘরে পড়ে থাকতেন।

নাজমা বলেন, ‘আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তেমন কোনো গন্ডগোল বা ঝামেলা হয়নি। তাঁর (শামীম) মাথা মাঝেমধ্যে গরম হয়ে যেত। আবার এক-দুই ঘণ্টা পর ঠিক হয়ে যেত। এ কারণে আমি বলেছিলাম, আমাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে। মাথা ঠিক হলে আবার ফিরে আসব। সেই জন্য বাবার বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু এমন হবে কখনো ভাবতে পারিনি।’

শামীমকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে দেবহাটা থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয় আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে।

মামলার পর দুজন গ্রেপ্তার হলেও প্রধান আসামিকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। শনিবার সকালেও তিনি ফেসবুকে সক্রিয় ছিলেন। শামীমকে নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে যাচ্ছেন। সকাল সাড়ে ৯টায় একটি পোস্টে ধর্মীয় বিষয়ে মন্তব্যের প্রতিবাদ, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এবং সাগর-রুনি হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনার বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। পোস্টে শামীমের কথোপকথনের একটি অডিও যুক্ত করা হয়।

নিহত শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মামলা করার পর দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে এখনো প্রধান আসামি আমিনী গ্রেপ্তার হননি। তিনি এখনো ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর ভাই মানসিকভাবে অসুস্থ থাকা অবস্থায় যেসব কথা বলেছিলেন, সেগুলো প্রচার করে যাচ্ছেন। তাঁরা চান এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হোক।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, আজকের মধ্যে প্রধান আসামি আমিনীকে গ্রেপ্তার করতে পারবেন বলে আশা করছেন। গতকাল শুক্রবার ভোরে উপজেলার সুবর্ণাবাদ ও নাজিরের ঘের এলাকা থেকে এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

গত সোমবার শামীম ও তাঁর স্ত্রী নাজমার মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডার সময় ধারণ করা একটি অডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য আছে—এমন অভিযোগ উঠলে শামীমের বাড়িতে হামলার চেষ্টা করা হয়। ওই দিন স্থানীয় একটি বাজারে শামীমকে প্রথম মারধর করা হয়। এ ঘটনার পর শামীম বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। স্বজনেরা তাঁকে স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে চিকিৎসা দেন।

পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে একদল লোক ওই পল্লিচিকিৎসকের চেম্বার থেকে শামীমকে বের করে আবার মারধর করেন। পুলিশ উদ্ধার করে তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। পরে ফজলুল হকের নেতৃত্বে রাতে মিছিল নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে হামলা করা হয়। সেখান থেকে শামীমকে ছিনিয়ে নিয়ে আবার পেটানো হয়। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে শামীম মারা যান।

শামীমের স্ত্রী নাজমা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিচার চাই। আমার স্বামী যদি কোনো অন্যায় করে থাকতেন, তাঁকে পুলিশের কাছে দিত, আইনের হাতে তুলে দিত। কেন এভাবে তাঁকে মেরে ফেলল? তিনি মানসিক রোগী ছিলেন, তাঁর মাথায় সমস্যা ছিল এটা সবাই জানত। যারা আমার এত বড় ক্ষতি করেছে, তাদের বিচার চাই।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

‘মানুষ আমাকে বিধবা বানিয়ে দিল’

আপডেট সময় : ০৮:৫৮:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

‘মানুষ আমার কী যে ক্ষতিটা করে দিল, আমাকে বিধবা বানিয়ে দিল। আমার ছোট্ট ছেলে দুটোকে এতিম করে দিল। এখন আমার সংসার চলবে কীভাবে? আমার স্বামী মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সংসারটা চালাতেন, আমাদের খাওয়াতেন। এখন তো আর তিনি ফিরে আসবেন না। কোলে আট মাসের বাচ্চা নিয়ে আমি কোথায় যাব? আমার সন্তান দুটোর দায়িত্ব কে নেবে?’

আহাজারি করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের স্ত্রী নাজমা খাতুন। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাঁর স্বামীকে গত মঙ্গলবার দফায় দফায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

নিহত শামীম সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামসুল রহমানের ছেলে। শামীমের বড় ছেলে আয়ানের বয়স ১২। সে নানাবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করে। ছোট ছেলে আরহামের বয়স মাত্র আট মাস। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন নাজমা।

নাজমা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। নিয়মিত ওষুধ খেতে হতো। কিন্তু আর্থিক সংকটে অনেক সময় ওষুধ কেনার টাকা জোগাড় করতে পারতেন না। কখনো মানুষের কাছে, কখনো স্বজনদের কাছ থেকে টাকা চেয়ে ওষুধ কিনতেন। মাঝেমধ্যে কাজ করে আয় করার চেষ্টা করতেন। দুই-তিন দিন কাজ করার পর আবার অসুস্থ হয়ে ঘরে পড়ে থাকতেন।

নাজমা বলেন, ‘আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তেমন কোনো গন্ডগোল বা ঝামেলা হয়নি। তাঁর (শামীম) মাথা মাঝেমধ্যে গরম হয়ে যেত। আবার এক-দুই ঘণ্টা পর ঠিক হয়ে যেত। এ কারণে আমি বলেছিলাম, আমাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে। মাথা ঠিক হলে আবার ফিরে আসব। সেই জন্য বাবার বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু এমন হবে কখনো ভাবতে পারিনি।’

শামীমকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে দেবহাটা থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয় আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে।

মামলার পর দুজন গ্রেপ্তার হলেও প্রধান আসামিকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। শনিবার সকালেও তিনি ফেসবুকে সক্রিয় ছিলেন। শামীমকে নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে যাচ্ছেন। সকাল সাড়ে ৯টায় একটি পোস্টে ধর্মীয় বিষয়ে মন্তব্যের প্রতিবাদ, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এবং সাগর-রুনি হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনার বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। পোস্টে শামীমের কথোপকথনের একটি অডিও যুক্ত করা হয়।

নিহত শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মামলা করার পর দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে এখনো প্রধান আসামি আমিনী গ্রেপ্তার হননি। তিনি এখনো ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর ভাই মানসিকভাবে অসুস্থ থাকা অবস্থায় যেসব কথা বলেছিলেন, সেগুলো প্রচার করে যাচ্ছেন। তাঁরা চান এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হোক।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, আজকের মধ্যে প্রধান আসামি আমিনীকে গ্রেপ্তার করতে পারবেন বলে আশা করছেন। গতকাল শুক্রবার ভোরে উপজেলার সুবর্ণাবাদ ও নাজিরের ঘের এলাকা থেকে এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

গত সোমবার শামীম ও তাঁর স্ত্রী নাজমার মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডার সময় ধারণ করা একটি অডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য আছে—এমন অভিযোগ উঠলে শামীমের বাড়িতে হামলার চেষ্টা করা হয়। ওই দিন স্থানীয় একটি বাজারে শামীমকে প্রথম মারধর করা হয়। এ ঘটনার পর শামীম বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। স্বজনেরা তাঁকে স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে চিকিৎসা দেন।

পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে একদল লোক ওই পল্লিচিকিৎসকের চেম্বার থেকে শামীমকে বের করে আবার মারধর করেন। পুলিশ উদ্ধার করে তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। পরে ফজলুল হকের নেতৃত্বে রাতে মিছিল নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে হামলা করা হয়। সেখান থেকে শামীমকে ছিনিয়ে নিয়ে আবার পেটানো হয়। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে শামীম মারা যান।

শামীমের স্ত্রী নাজমা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিচার চাই। আমার স্বামী যদি কোনো অন্যায় করে থাকতেন, তাঁকে পুলিশের কাছে দিত, আইনের হাতে তুলে দিত। কেন এভাবে তাঁকে মেরে ফেলল? তিনি মানসিক রোগী ছিলেন, তাঁর মাথায় সমস্যা ছিল এটা সবাই জানত। যারা আমার এত বড় ক্ষতি করেছে, তাদের বিচার চাই।’