ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে সংখ্যালঘুদের ভোটে নজর বিএনপি ও জামায়াতের
- আপডেট সময় : ১০:১৬:০৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের ভাষ্য, এ আসনে সংখ্যালঘু ভোটার ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি।
.
বালিয়া বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। সড়কের পাশে গোটা কয়েক রিকশা ভ্যান নিয়ে অপেক্ষায় চালকেরা। তাঁদের মধ্যে চলছে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের হিসাব-নিকাশ। তাঁদের একজন বললেন, ‘তোমরা যাই কহ, ধানের শীষই জিতিবে।’ পাশ থেকে একজন বৃদ্ধ বললেন, ‘দাঁড়িপাল্লাক ফেলায় দেছেন?’ তাঁদের কথা শুনে হরেক চন্দ্র বললেন, ‘এইঠে জিতিবা গেলে হামারলার ভোট নাগিবেই।’
কিছুক্ষণ পর ভেঙে গেল আড্ডা। হরেক চন্দ্রের সঙ্গে শুরু হলো কথা। এই আসনে বরাবর আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়ী হতো জানিয়ে হরেক চন্দ্র বললেন, ‘অ্যালাতো আওয়ামী লীগও নাই, নৌকাও নাই। বিএনপি আর জামায়াতের মধ্যে লড়াই হছে। হামার (সনাতনী সম্প্রদায়) ভোট নাকি দুই দলেরই নাগে। দিন-রাত ধানের শীষ আর দাঁড়িপাল্লার লোক বাড়ি বাড়ি যাছে। ভোট চাহেছে। তাই হামরা একনা চাপত আছু।’
.
উপনির্বাচন ঘিরে ভূল্লী উপজেলার বালিয়া বাজারের হরেক চন্দ্রের এই কথা যেন আরও অনেক এলাকার ভোটারদের মনের কথা। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই আসনে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় রাজনীতিক, ভোটার ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এবারের উপনির্বাচনেও হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট জয়-পরাজয় ঠিক করবে। তাই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের নজরও সেদিকে।
.
আমাদের বাড়ির জবা ফুলে আপনাদের পূজা হয়। আবার আপনাদের বাড়ির তুলসীগাছের পাতায় আমাদের অসুখ সারে। আমি এমনই একটা পরিবেশে বড় হয়েছি। আমার শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকতে কখনোই আপনাদের ক্ষতি হতে দেব না।
মির্জা ফয়সল আমীন, বিএনপির প্রার্থী
.
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতির শপথ নেওয়ার পর আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য এই উপনির্বাচনে রাষ্ট্রপতির ছোট ভাই জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আব্দুল আলীম নিজামী (বটগাছ) ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে মূল লড়াই হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা।
.
ভোটের নতুন সমীকরণ
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দাপট ছিল। বিগত ১১টি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সাতবার, বিএনপি চারবার ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী একবার জয়ী হন। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন থেকে এ আসনটিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। আসনটিতে মোট ভোটার ৫ লাখ ১১ হাজার ৬২৯ জন। হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের ভাষ্য, এ আসনে সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজারের ওপরে। তাঁরা আওয়ামী লীগের ‘ভোটব্যাংক’ বলে প্রচার আছে। তাঁদের ভোটেই নির্ধারিত হয় প্রার্থীর জয়-পরাজয়।
.
হিন্দু–অধ্যুষিত সব কেন্দ্রে বিএনপি চায় গত নির্বাচনের ফল ধরে রাখতে; আর জামায়াত চায় সেখানে ভাগ বসাতে।
.
এবার কী করবেন সংখ্যালঘুরা
সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের দক্ষিণ বঠিনা গ্রামের ভোটকেন্দ্র দক্ষিণ বঠিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কেন্দ্রটিতে মোট ভোটার ৩ হাজার ১৪৯ জন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, তাঁদের অধিকাংশই হিন্দু সম্প্রদায়ের। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এই কেন্দ্রে ধানের শীষ পেয়েছিল ১ হাজার ৮৭৬টি ভোট। আর দাঁড়িপাল্লা পায় ৫০৯টি ভোট।
.
২০২৪ সালের আগস্টে হিন্দু ভাই-বোনদের ওপর যখন হামলা হয়েছিল, সে সময় আমরা তাঁদের পাশে ছিলাম। আমি নির্বাচিত হলে সেই হামলার প্রতিটি ঘটনার বিচার পাবেন। সেই দিনগুলোতে আমি যেমন তাঁদের পাশে ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব।
দেলাওয়ার হোসেন, জামায়াতের প্রার্থী
.
দক্ষিণ বঠিনা গ্রামের রাস্তার পশ্চিম অংশ ও বাগপুরের এলাকার ভোটকেন্দ্র ফাড়াবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়। কেন্দ্রটিতে মোট ভোট ৩ হাজার ৭৫৯ জন। স্থানীয়দের হিসাবে, কেন্দ্র দুটির মোট ভোটারের প্রায় ৮০ শতাংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের। এখানে ধানের শীষ পেয়েছিল ২ হাজার ১৯৬ ভোট আর দাঁড়িপাল্লা পায় ৪৭৬ ভোট। উত্তর ঠাকুরগাঁও এলাকার ভোটকেন্দ্র রাংরাই পুকুর শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কেন্দ্রে মোট ভোটার ২ হাজার ৩০ জন। এখানে ধানের শীষের প্রার্থী মির্জা ফখরুল পান ১ হাজার ৩৫৩ ভোট, তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লার দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছিলেন ২২৯টি ভোট।
হিন্দু–অধ্যুষিত এমন সব কেন্দ্রে বিএনপি চায় গত নির্বাচনের ফল ধরে রাখতে; আর জামায়াত চায় সেখানে ভাগ বসাতে।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ঠাকুরগাঁও জেলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কুমার গুপ্ত বলেন, দেশে নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুদের মধ্যে একধরনের শঙ্কা কাজ করে। এবারের উপনির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম নয়। ভোটের পরে যেন কেউ ভয়ভীতি বা হামলার শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
.
যা বলছেন প্রার্থীরা
সংখ্যালঘু ভোটারদের উদ্দেশে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন বলেন, ‘আমার বাড়ি কালীবাড়িতে। সেখানকার মন্দিরের দেয়াল আমাদের জায়গার সীমানা। মন্দিরের আশপাশে আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে। আমাদের বাড়ির জবা ফুলে আপনাদের পূজা হয়। আবার আপনাদের বাড়ির তুলসীগাছের পাতায় আমাদের অসুখ সারে। আমি এমনই একটা পরিবেশে বড় হয়েছি। আমার শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকতে কখনোই আপনাদের ক্ষতি হতে দেব না।’
.
ভোটাররা যাতে ভীতিমুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে। শুধু ভোটের দিন নয়, ভোটের পরও তারা এলাকায় অবস্থান করবে।
কামরুল ইসলাম, উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা
.
অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের আগস্টে হিন্দু ভাই-বোনদের ওপর যখন হামলা হয়েছিল, সে সময় আমরা তাঁদের পাশে ছিলাম। আমি নির্বাচিত হলে সেই হামলার প্রতিটি ঘটনার বিচার পাবেন। সেই দিনগুলোতে আমি যেমন তাঁদের পাশে ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব।’
উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, ভোটাররা যাতে ভীতিমুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে। শুধু ভোটের দিন নয়, ভোটের পরও তারা এলাকায় অবস্থান করবে।




















