ঢাকা ০৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আজ যখন তওবা করলেও আল্লাহ ক্ষমা করবেন না ফ্রান্সে লাখো মানুষের বিক্ষোভ, শহরে শহরে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ, গ্রেপ্তার প্রায় ১০০০ সহযোগীকে ছাড়াতে যাচ্ছিলেন আদালতে, পথে পিস্তল-গুলিসহ গ্রেপ্তার সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকের শেয়ার, তবু বিনিয়োগে আগ্রহ কম ধুলার নিচে ৫০০ বছরের ইতিহাস, ঝেড়েমুছে সাজাল বন্ধুসভা এইচএসসির ফল প্রকাশ ২৯ অক্টোবর ওপেনিংয়ের পুরনো দুশ্চিন্তা নিয়েই স্পিন সামলানোর প্রস্তুতি বাংলাদেশের যুবদল নেতা হত্যার ঘটনায় ছাত্রদল নেতাকে প্রধান আসামি করে মামলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক স্খলনে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত শাস্তির দাবি হেফাজতে ইসলামের

ফ্রান্সে লাখো মানুষের বিক্ষোভ, শহরে শহরে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ, গ্রেপ্তার প্রায় ১০০০

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:৩৮:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল শনিবার বিক্ষোভ করেছেন লাখো মানুষ। এতে শিক্ষার্থী, শ্রমিক, পেশাজীবী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ যোগ দেন। রাজধানী প্যারিস ছাড়াও লিঁও, নিস, তুলুজসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে পুলিশ।

বিক্ষোভ ঘিরে গতকাল ফ্রান্সজুড়ে প্রায় এক হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুধু প্যারিসে এক লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শিক্ষকসংকট ও স্কুলের জরাজীর্ণ অবকাঠামো নিয়ে গত মাসে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। ধীরে ধীরে শ্রমিকসংগঠনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি নানা পরিষেবার সংকটের অসন্তোষ থেকে আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৭ অক্টোবর তাঁদের বিক্ষোভ ব্যাপক সহিংতায় রূপ নেয়। বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ভাঙচুর আগুন ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কারফিউ জারি করে কর্তৃপক্ষ।

.

কিন্তু দাবি আদায় না হওয়ায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় ছাত্রসংগঠন ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো। গত কয়েক দিনে ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সরকার বৈঠক করলেও সমাধান আসেনি। এ পরিস্থিতিতে গতকাল আবার রাস্তায় নামেন আন্দোলনকারীরা। গতকালের বিক্ষোভে শিক্ষার্থী সংগঠনের পাশাপাশি ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলন, সিজিটি, সিএফডিটিসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন অংশ নেয়।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গতকাল দেশজুড়ে ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। এর মধ্যে প্যারিসে অংশ নেন ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ। তবে শ্রমিক সংগঠন সিজিটির দাবি, গতকাল ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ৮ লাখ মানুষ রাস্তায় নামেন। এর মধ্যে শুধু প্যারিসেই ছিলেন ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। ফ্রান্সের দক্ষিণ উপকূলের বন্দরনগরী মার্সেইয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় ১ লাখ মানুষ। অবশ্য পুলিশের হিসাবে, এ সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার।

.

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্নীতির প্রতিবাদসহ নানা দাবিতে ফ্রান্স ছাড়াও গত প্রায় এক সপ্তাহের ইউরোপের অন্তত ১০টি দেশে বিক্ষোভ হয়েছে। গতকাল স্পেন ও আলবেনিয়াতেও বিক্ষোভ হয়েছে। ইতালিতে নতুন কর্মসূচি ঘিরে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। তুরস্কে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও সংবাদমাধ্যম বন্ধের প্রতিবাদে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন।

.

ফ্রান্সে পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে গতকাল বিভিন্ন শহরে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। প্যারিসে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও লিঁও, নিস, লিল, মার্সেই, মন্টপেলিয়ে, নঁত ও তুলুজে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। লিঁও, লিল, মন্টপেলিয়ে, নঁত ও তুলুজে বিক্ষোভকারীদের শহরের কেন্দ্রস্থলে যাওয়া ঠেকাতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে।

রাজধানীতে মিছিল চলাকালে পুলিশ তিন হাজারের বেশি মানুষকে থামিয়ে তল্লাশি করেছে। এ সময় ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

.

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, অনেক স্কুল ভবনের অবস্থা বেশ নাজুক, শিক্ষকেরা কম বেতনে অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, শ্রেণিকক্ষে ধারণক্ষমতার চেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। তাঁরা এসব সমস্যার সমাধান চান। পাশাপাশি স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনলাইন ব্যবস্থা ‘পারকুরসুপ’ বাতিলেরও দাবি জানাচ্ছেন।

শ্রমিক সংগঠন সলিদেয়ারের প্রতিনিধি মুরিয়েল গিলবার্ট বলেন, এই দেশে মানুষের মধ্যে বিপুল ক্ষোভ রয়েছে। মজুরি যে পর্যায়ে বাড়ানো উচিত ছিল, এখনো তা বাড়ানো হয়নি।

.

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় শিক্ষার্থীদের ২০ জন প্রতিনিধির সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর ভাষ্য, প্রেসিডেন্ট ভর্তিব্যবস্থা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে তাতে তাঁরা সন্তুষ্ট নন। তাই তাঁরা শনিবার বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

.

ফ্রান্সে ১৭ অক্টোবর বিক্ষোভে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি ঠেকাতে এবার আগের চেয়ে ১০ হাজার বেশি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। প্রস্তুত রাখা হয় সাঁজোয়া যান, হেলিকপ্টার ও জলকামান।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লোরঁ নুনেজ বলেছেন, বিক্ষোভ ঘিরে প্রায় এক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিক্ষোভ শুরুর আগে তল্লাশি চালানো হয়। এতে আতশবাজি, ধাতব বল, গুলতিসহ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন জিনিস পাওয়া গেছে।

.

গতকাল প্যারিসের মিছিলের পথ নিয়েও বিরোধ হয়। শেষ মুহূর্তে পুলিশ কেন্দ্রের বাস্তিল এলাকা থেকে সরিয়ে দক্ষিণ–পূর্ব প্রান্তের পোর্ত দিতালিতে মিছিল শুরুর নির্দেশ দেয়। পুলিশের যুক্তি, আগের পথে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হামলার শিকার হতে পারে।

শ্রমিক সংগঠনগুলো অনিচ্ছা সত্ত্বেও নতুন পথ মেনে নেয়। গতকাল শ্রমিক সংগঠনগুলো ছাড়া অন্য কোনো সংগঠন বা প্ল্যাটফর্মকে বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এটাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন শ্রমিক সংগঠন সলিদেয়ারের প্রতিনিধি গিলবার্ট। বিভিন্ন সংগঠনের অভিযোগ, এতে প্রতিবাদ জানানোর অধিকার খর্ব হচ্ছে।

.

লিওঁর নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা এলাকায় সড়ক অবরোধের চেষ্টাকারী প্রায় ১৫০ জনকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। বোর্দোয়ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মানুষ জড়ো হন। সেখানকার শ্রমিক ইউনিয়ন নেত্রী ব্রিজিত কুদের্ক বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তাঁরা শিক্ষার্থীদের পাশে থাকবেন।’ নিস শহরে কয়েক শ মানুষকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ।

ভাঙচুরের আশঙ্কায় বিভিন্ন শহরে বহু দোকানের জানালা কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। বন্ধ রাখা হয় ল্যুভর, অরসে, পিকাসো জাদুঘরসহ বড় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। গতকাল প্যারিসের ২০টির বেশি মেট্রো স্টেশনও বন্ধ ছিল।

.

সাম্প্রতিক সংঘর্ষে কিশোর–কিশোরীদের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তুলুজের ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী এলা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলে, ‘এখন বিক্ষোভে গেলে আমার কী হতে পারে, তা নিয়ে ভয় হয়। কিন্তু আমরা হাল ছাড়তে পারি না।’

প্যারিসে বিক্ষোভে আসা ২৬ বছর বয়সী নার্স ক্লেয়ার বলেন, ‘সবাই ভাঙচুর করতে আসেনি। আমরা কেউ কেউ শুধু বলতে এসেছি, আমরা আরও ভালো ভবিষ্যৎ চাই।’

.

ব্যবসায়ী ও কর্মীদের উদ্বেগও রয়েছে। গাড়িভাড়া প্রতিষ্ঠানের কর্মী দমিনিক বলেন, তাঁর অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে, যাঁরা ভাঙচুর ও চুরি করতে আসেন। এটা উদ্বেগজনক।

অরলিয়ঁ শহরে গতকাল বিরোধীদলীয় নেত্রী মারি লো পেনের কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালির সম্মেলনবিরোধী মিছিল হয়েছে। ছয় মাস পরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে সম্মেলনটি হয়েছে। পুলিশের হিসাবে, সেখানে বিক্ষোভে প্রায় ১১ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ২৬ হাজার। বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট মাখোঁর পদত্যাগের দাবি জানান।

ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলনকারীরা আগামী শনিবার পার্লামেন্ট ও নগরভবনগুলোর সামনে সমাবেশ ও অবস্থানের ডাক দিয়েছে। গতকাল প্যারিসের বিক্ষোভে যোগ দিয়ে বামপন্থী নেতা জ্যঁ–লুক মেলঁশোঁ বলেছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহেই বিক্ষোভ চলবে।

.

ইতালিতে গতকাল শিক্ষায় বরাদ্দ কমানো, বাসাভাড়া ও জ্বালানির খরচ নিয়ে শিক্ষার্থী, ট্রাকচালক ও কৃষকেরা আন্দোলন করছেন। গত সপ্তাহের সহিংসতার পর মিলানে ৫০০ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গতকালও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ভাঙচুরের ভয়ে কিছু দোকান বন্ধ রাখা হয়।

এএফপি জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সরকার অপ্রাপ্তবয়স্কদের আটকের নিয়ম সহজ করা এবং তাদের ভাঙচুরের জন্য অভিভাবকদের জরিমানার বিধান অনুমোদন করেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সামলাতে ট্রাকচালক ও জেলেদের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

.

স্পেনের মাদ্রিদেও গতকাল সরকারি অবসরভাতা বা পেনশন সুরক্ষার দাবিতে হাজারো মানুষ মিছিল করেছেন। গতকাল মাদ্রিতে অন্তত ২৫ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। বাড়িভাড়া ও আবাসনের খরচ নিয়েও আন্দোলন চলছে। মাদ্রিদের পুয়ের্তা দেল সোল চত্বরে প্রায় এক মাস ধরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছেন কিছু আন্দোলনকারী।

.

আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় দুর্নীতি ও নিম্নমানের জীবনযাত্রার প্রতিবাদে প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবিতে গতকালও বিক্ষোভ হয়েছে। সেখানে কয়েক দিনের সংঘর্ষে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। আটক হয়েছেন কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী। সরকারি ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্দোলনকর্মী সিদোরেলা ভাতনিকাই এএফপিকে বলেন, এটি মানুষের অধিকার ও আইনের শাসনেরও প্রশ্ন।

.

ইস্তাম্বুল ও আঙ্কারায় গতকাল হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেন। এতে সাংবাদিকদের সঙ্গে মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিরাও অংশ নেনে। পুলিশের হিসাবে, তুর্কি সাংবাদিক ইউনিয়নের হিসাবে, দুই মাসে ১১ সাংবাদিককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

চলতি মাসে হাল্ক টিভিতে অভিযান চালিয়ে সম্প্রচার বন্ধ ও সরকারি প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। বন্ধ করা হয়েছে টিটুয়েন্টিফোরের ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টও। সাংবাদিক জাফের আরাপকিরলি বলেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষের খবর পাওয়ার অধিকার রক্ষারও প্রতিবাদও চলবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

ফ্রান্সে লাখো মানুষের বিক্ষোভ, শহরে শহরে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ, গ্রেপ্তার প্রায় ১০০০

আপডেট সময় : ০৩:৩৮:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল শনিবার বিক্ষোভ করেছেন লাখো মানুষ। এতে শিক্ষার্থী, শ্রমিক, পেশাজীবী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ যোগ দেন। রাজধানী প্যারিস ছাড়াও লিঁও, নিস, তুলুজসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে পুলিশ।

বিক্ষোভ ঘিরে গতকাল ফ্রান্সজুড়ে প্রায় এক হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুধু প্যারিসে এক লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শিক্ষকসংকট ও স্কুলের জরাজীর্ণ অবকাঠামো নিয়ে গত মাসে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। ধীরে ধীরে শ্রমিকসংগঠনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি নানা পরিষেবার সংকটের অসন্তোষ থেকে আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৭ অক্টোবর তাঁদের বিক্ষোভ ব্যাপক সহিংতায় রূপ নেয়। বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ভাঙচুর আগুন ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কারফিউ জারি করে কর্তৃপক্ষ।

.

কিন্তু দাবি আদায় না হওয়ায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় ছাত্রসংগঠন ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো। গত কয়েক দিনে ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সরকার বৈঠক করলেও সমাধান আসেনি। এ পরিস্থিতিতে গতকাল আবার রাস্তায় নামেন আন্দোলনকারীরা। গতকালের বিক্ষোভে শিক্ষার্থী সংগঠনের পাশাপাশি ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলন, সিজিটি, সিএফডিটিসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন অংশ নেয়।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গতকাল দেশজুড়ে ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। এর মধ্যে প্যারিসে অংশ নেন ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ। তবে শ্রমিক সংগঠন সিজিটির দাবি, গতকাল ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ৮ লাখ মানুষ রাস্তায় নামেন। এর মধ্যে শুধু প্যারিসেই ছিলেন ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। ফ্রান্সের দক্ষিণ উপকূলের বন্দরনগরী মার্সেইয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় ১ লাখ মানুষ। অবশ্য পুলিশের হিসাবে, এ সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার।

.

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্নীতির প্রতিবাদসহ নানা দাবিতে ফ্রান্স ছাড়াও গত প্রায় এক সপ্তাহের ইউরোপের অন্তত ১০টি দেশে বিক্ষোভ হয়েছে। গতকাল স্পেন ও আলবেনিয়াতেও বিক্ষোভ হয়েছে। ইতালিতে নতুন কর্মসূচি ঘিরে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। তুরস্কে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও সংবাদমাধ্যম বন্ধের প্রতিবাদে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন।

.

ফ্রান্সে পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে গতকাল বিভিন্ন শহরে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। প্যারিসে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও লিঁও, নিস, লিল, মার্সেই, মন্টপেলিয়ে, নঁত ও তুলুজে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। লিঁও, লিল, মন্টপেলিয়ে, নঁত ও তুলুজে বিক্ষোভকারীদের শহরের কেন্দ্রস্থলে যাওয়া ঠেকাতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে।

রাজধানীতে মিছিল চলাকালে পুলিশ তিন হাজারের বেশি মানুষকে থামিয়ে তল্লাশি করেছে। এ সময় ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

.

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, অনেক স্কুল ভবনের অবস্থা বেশ নাজুক, শিক্ষকেরা কম বেতনে অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, শ্রেণিকক্ষে ধারণক্ষমতার চেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। তাঁরা এসব সমস্যার সমাধান চান। পাশাপাশি স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনলাইন ব্যবস্থা ‘পারকুরসুপ’ বাতিলেরও দাবি জানাচ্ছেন।

শ্রমিক সংগঠন সলিদেয়ারের প্রতিনিধি মুরিয়েল গিলবার্ট বলেন, এই দেশে মানুষের মধ্যে বিপুল ক্ষোভ রয়েছে। মজুরি যে পর্যায়ে বাড়ানো উচিত ছিল, এখনো তা বাড়ানো হয়নি।

.

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় শিক্ষার্থীদের ২০ জন প্রতিনিধির সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর ভাষ্য, প্রেসিডেন্ট ভর্তিব্যবস্থা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে তাতে তাঁরা সন্তুষ্ট নন। তাই তাঁরা শনিবার বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

.

ফ্রান্সে ১৭ অক্টোবর বিক্ষোভে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি ঠেকাতে এবার আগের চেয়ে ১০ হাজার বেশি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। প্রস্তুত রাখা হয় সাঁজোয়া যান, হেলিকপ্টার ও জলকামান।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লোরঁ নুনেজ বলেছেন, বিক্ষোভ ঘিরে প্রায় এক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিক্ষোভ শুরুর আগে তল্লাশি চালানো হয়। এতে আতশবাজি, ধাতব বল, গুলতিসহ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন জিনিস পাওয়া গেছে।

.

গতকাল প্যারিসের মিছিলের পথ নিয়েও বিরোধ হয়। শেষ মুহূর্তে পুলিশ কেন্দ্রের বাস্তিল এলাকা থেকে সরিয়ে দক্ষিণ–পূর্ব প্রান্তের পোর্ত দিতালিতে মিছিল শুরুর নির্দেশ দেয়। পুলিশের যুক্তি, আগের পথে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হামলার শিকার হতে পারে।

শ্রমিক সংগঠনগুলো অনিচ্ছা সত্ত্বেও নতুন পথ মেনে নেয়। গতকাল শ্রমিক সংগঠনগুলো ছাড়া অন্য কোনো সংগঠন বা প্ল্যাটফর্মকে বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এটাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন শ্রমিক সংগঠন সলিদেয়ারের প্রতিনিধি গিলবার্ট। বিভিন্ন সংগঠনের অভিযোগ, এতে প্রতিবাদ জানানোর অধিকার খর্ব হচ্ছে।

.

লিওঁর নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা এলাকায় সড়ক অবরোধের চেষ্টাকারী প্রায় ১৫০ জনকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। বোর্দোয়ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মানুষ জড়ো হন। সেখানকার শ্রমিক ইউনিয়ন নেত্রী ব্রিজিত কুদের্ক বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তাঁরা শিক্ষার্থীদের পাশে থাকবেন।’ নিস শহরে কয়েক শ মানুষকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ।

ভাঙচুরের আশঙ্কায় বিভিন্ন শহরে বহু দোকানের জানালা কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। বন্ধ রাখা হয় ল্যুভর, অরসে, পিকাসো জাদুঘরসহ বড় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। গতকাল প্যারিসের ২০টির বেশি মেট্রো স্টেশনও বন্ধ ছিল।

.

সাম্প্রতিক সংঘর্ষে কিশোর–কিশোরীদের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তুলুজের ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী এলা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলে, ‘এখন বিক্ষোভে গেলে আমার কী হতে পারে, তা নিয়ে ভয় হয়। কিন্তু আমরা হাল ছাড়তে পারি না।’

প্যারিসে বিক্ষোভে আসা ২৬ বছর বয়সী নার্স ক্লেয়ার বলেন, ‘সবাই ভাঙচুর করতে আসেনি। আমরা কেউ কেউ শুধু বলতে এসেছি, আমরা আরও ভালো ভবিষ্যৎ চাই।’

.

ব্যবসায়ী ও কর্মীদের উদ্বেগও রয়েছে। গাড়িভাড়া প্রতিষ্ঠানের কর্মী দমিনিক বলেন, তাঁর অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে, যাঁরা ভাঙচুর ও চুরি করতে আসেন। এটা উদ্বেগজনক।

অরলিয়ঁ শহরে গতকাল বিরোধীদলীয় নেত্রী মারি লো পেনের কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালির সম্মেলনবিরোধী মিছিল হয়েছে। ছয় মাস পরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে সম্মেলনটি হয়েছে। পুলিশের হিসাবে, সেখানে বিক্ষোভে প্রায় ১১ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ২৬ হাজার। বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট মাখোঁর পদত্যাগের দাবি জানান।

ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলনকারীরা আগামী শনিবার পার্লামেন্ট ও নগরভবনগুলোর সামনে সমাবেশ ও অবস্থানের ডাক দিয়েছে। গতকাল প্যারিসের বিক্ষোভে যোগ দিয়ে বামপন্থী নেতা জ্যঁ–লুক মেলঁশোঁ বলেছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহেই বিক্ষোভ চলবে।

.

ইতালিতে গতকাল শিক্ষায় বরাদ্দ কমানো, বাসাভাড়া ও জ্বালানির খরচ নিয়ে শিক্ষার্থী, ট্রাকচালক ও কৃষকেরা আন্দোলন করছেন। গত সপ্তাহের সহিংসতার পর মিলানে ৫০০ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গতকালও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ভাঙচুরের ভয়ে কিছু দোকান বন্ধ রাখা হয়।

এএফপি জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সরকার অপ্রাপ্তবয়স্কদের আটকের নিয়ম সহজ করা এবং তাদের ভাঙচুরের জন্য অভিভাবকদের জরিমানার বিধান অনুমোদন করেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সামলাতে ট্রাকচালক ও জেলেদের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

.

স্পেনের মাদ্রিদেও গতকাল সরকারি অবসরভাতা বা পেনশন সুরক্ষার দাবিতে হাজারো মানুষ মিছিল করেছেন। গতকাল মাদ্রিতে অন্তত ২৫ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। বাড়িভাড়া ও আবাসনের খরচ নিয়েও আন্দোলন চলছে। মাদ্রিদের পুয়ের্তা দেল সোল চত্বরে প্রায় এক মাস ধরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছেন কিছু আন্দোলনকারী।

.

আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় দুর্নীতি ও নিম্নমানের জীবনযাত্রার প্রতিবাদে প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবিতে গতকালও বিক্ষোভ হয়েছে। সেখানে কয়েক দিনের সংঘর্ষে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। আটক হয়েছেন কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী। সরকারি ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্দোলনকর্মী সিদোরেলা ভাতনিকাই এএফপিকে বলেন, এটি মানুষের অধিকার ও আইনের শাসনেরও প্রশ্ন।

.

ইস্তাম্বুল ও আঙ্কারায় গতকাল হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেন। এতে সাংবাদিকদের সঙ্গে মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিরাও অংশ নেনে। পুলিশের হিসাবে, তুর্কি সাংবাদিক ইউনিয়নের হিসাবে, দুই মাসে ১১ সাংবাদিককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

চলতি মাসে হাল্ক টিভিতে অভিযান চালিয়ে সম্প্রচার বন্ধ ও সরকারি প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। বন্ধ করা হয়েছে টিটুয়েন্টিফোরের ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টও। সাংবাদিক জাফের আরাপকিরলি বলেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষের খবর পাওয়ার অধিকার রক্ষারও প্রতিবাদও চলবে।