ইন্টারনেট স্বাধীনতায় বাংলাদেশের উন্নতি, গণমাধ্যম নিয়ে উদ্বেগ
- আপডেট সময় : ০২:৩৭:৪১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

ইন্টারনেটে নাগরিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বিশ্বে সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছে বাংলাদেশ। তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে এখনো উদ্বেগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউসের করা ‘ফ্রিডম অন দ্য নেট ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ফ্রিডম হাউসের ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ১২ মাসের পরিস্থিতির ভিত্তিতে এটি তৈরি করা হয়েছে।
ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্টারনেটে নাগরিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ১০০ স্কোরের মধ্যে এ বছর বাংলাদেশের স্কোর ৫০। আগের দুই বছরে এই স্কোর ছিল যথাক্রমে ৪০ ও ৪৫। অবশ্য টানা দুই বছর ধরে অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশের নাগরিকেরা ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনো ‘আংশিক স্বাধীন’।
প্রতিবেদনে ৩৮টি দেশের ইন্টারনেট স্বাধীনতার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। বাংলাদেশের ৫ পয়েন্ট অগ্রগতির ৪ পয়েন্ট এসেছে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে। বাকি ১ পয়েন্ট এসেছে অনলাইন আধেয়র (কনটেন্টে) ওপর বিধিনিষেধ কমার কারণে।
.
বিশ্বে ইন্টারনেট স্বাধীনতা টানা ১৬তম বছরের মতো কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ২০১৬ সালের পর এই প্রথম বাংলাদেশে পুরো এক বছর ইন্টারনেট ‘শাটডাউনের’ (ইন্টারনেট পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ) ঘটনা ঘটেনি। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও এরপর নেওয়া সংস্কার উদ্যোগকে বাংলাদেশের ইন্টারনেট স্বাধীনতার অগ্রগতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে ফ্রিডম হাউস।
ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদনে বিশ্বের প্রায় ৭১ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীকে ইন্টারনেট স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ‘মুক্ত নয়’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। ৩১ শতাংশ ব্যবহারকারী রয়েছেন ‘আংশিক মুক্ত’ শ্রেণিতে। আর মাত্র ৯ দশমিক ১ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মুক্ত ইন্টারনেট পরিবেশে রয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৯১ স্কোর নিয়ে তালিকায় শীর্ষে রয়েছে এস্তোনিয়া। চীন, ইরান ও মিয়ানমার ৯ স্কোর নিয়ে সবচেয়ে নিচের অবস্থানে রয়েছে। রাশিয়ার স্কোর ১৬, পাকিস্তানের ২৭ ও ভারতের ৫০।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোনো দেশের স্কোর ৭০ থেকে ১০০-এর মধ্যে থাকলে সেটিকে ইন্টারনেটে ‘স্বাধীন’, ৪০ থেকে ৬৯-এর মধ্যে থাকলে সেটিকে ‘আংশিক স্বাধীন’ ও ০ থেকে ৩৯-এর মধ্যে থাকলে দেশটি ‘স্বাধীন নয়’ বলে বিবেচনা করা হয়।
ফ্রিডম হাউস বলেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী দলের সমাবেশ ও আন্দোলনের সময় প্রায়ই ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হতো। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়ও ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল। এসব কারণে দেশটির ইন্টারনেট স্বাধীনতার পরিসর সংকুচিত হয়।
.
ইন্টারনেট স্বাধীনতার উন্নতি হলেও সাংবাদিকদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ফ্রিডম হাউস। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের ২৮০ জনের বেশি সাংবাদিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনলাইন সংবাদমাধ্যমে কাজ করা সাংবাদিকেরাও রয়েছেন।
এসব মামলার বেশির ভাগই ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের সঙ্গে সম্পর্কিত। ওই সংবাদগুলোকে আওয়ামী লীগের প্রতি অতিরিক্ত সহানুভূতিশীল বলে মনে করা হয়েছিল।
ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও স্বাধীন এ দুই সংবাদমাধ্যমকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতপন্থী বলে প্রচার করা হয়। এরপর একদল মানুষ সংবাদমাধ্যম দুটির কার্যালয়ে হামলা চালায় এবং ভবনে আগুন দেয়। এতে সেখানে কর্মরত সাংবাদিকেরা বিপদের মুখে পড়েন। ফ্রিডম হাউস এ ঘটনাকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে তুলে ধরেছে।
.
প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপ করা বিধিনিষেধের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার কখনো কখনো আওয়ামী লীগ সরকারের মতোই দমনমূলক কৌশল ব্যবহার করেছে।
নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ
প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট স্বাধীনতার অগ্রগতি দেখিয়েছে, কীভাবে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ডিজিটাল দমন-পীড়নের অবসান ঘটিয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
ফ্রিডম হাউসের মতে, গণ–আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। তবে এই অগ্রগতি ধরে রাখা এবং টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।




















