শতবর্ষের পথে শামসুর রাহমান: সাহিত্য, স্মৃতি ও আমাদের দায়
- আপডেট সময় : ১২:১৬:০৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

২০২৬ সালের ২৩ অক্টোবর কবি শামসুর রাহমানের ৯৭তম জন্মবার্ষিকী। ২০২৯ সালে শততম হবে। অর্থাৎ শামসুর রাহমানের মৃত্যুর প্রায় দুই দশক পর তাঁর জন্মবার্ষিকী নিয়ে কথা বলা কেবল একজন প্রয়াত কবিকে স্মরণ করার জন্য নয়; বরং এটি আমাদের বর্তমানকে বোঝার একটি সাহিত্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। আর একই সঙ্গে এটিও মনে করিয়ে দিতে চাই, কবির শততম জন্মবার্ষিকীর জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত। প্রস্তুতিস্বরূপ অন্তত তিনটি কাজ করা প্রয়োজন: সাহিত্য সংরক্ষণ ও প্রকাশ, চর্চা ও প্রসার এবং স্মৃতি রক্ষা। শামসুর রাহমানের মতো এই উচ্চতার কবির জন্য এর থেকে কম কিছু হওয়া উচিত নয়।
সাহিত্য সংরক্ষণের জন্য কবির প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত সব কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ এবং চিঠি ইত্যাদি সংগ্রহ করে নির্ভরযোগ্য ‘রচনাবলি’ প্রকাশ করা প্রয়োজন। এই কাজটি খুবই দ্রুত হওয়া উচিত৷ কারণ, কাজটি দ্রুত হলেই কবির পরিবার–পরিজন খুব বেশি সাহায্য করতে পারবে। সংরক্ষণের অভাবে বহু মাস্টারপিস কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল আর্কাইভও খুব জরুরি। এমনটা হলে নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছে খুব সহজে পৌঁছে যাবে। এসবের পাশাপাশি কবির শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো বিভিন্ন ভাষায় না হলেও অন্তত ইংরেজিতে অনুবাদ করা প্রয়োজন। এমনটা হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভিন্ন দেশের বড় বড় কবিদের সঙ্গে কবি শামসুর রাহমানের তুলনামূলক অধ্যয়ন হওয়ার সুযোগ হয়ে উঠবে।
.
কবির জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর কবিতা নিয়ে আবৃত্তি অনুষ্ঠান, সেমিনার ও সাহিত্য আড্ডার আয়োজন করা। বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ চাইলে দীর্ঘমেয়াদি ‘কবি শামসুর রাহমান ফেলোশিপ’ চালু করতে পারে। যেখানে নিয়মিত সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হতে পারে। আর এমনটা হলে কবির সাহিত্যকর্মের ওপর গবেষণা হওয়ার একটা বন্দোবস্ত হবে। উন্মোচিত হবে নতুন নতুন দিক।
.
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো চর্চা ও প্রসার। কবির জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর কবিতা নিয়ে আবৃত্তি অনুষ্ঠান, সেমিনার ও সাহিত্য আড্ডার আয়োজন করা। বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ চাইলে দীর্ঘমেয়াদি ‘কবি শামসুর রাহমান ফেলোশিপ’ চালু করতে পারে। যেখানে নিয়মিত সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হতে পারে। আর এমনটা হলে কবির সাহিত্যকর্মের ওপর গবেষণা হওয়ার একটা বন্দোবস্ত হবে। উন্মোচিত হবে নতুন নতুন দিক।
তৃতীয়টি হলো স্মৃতিরক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করা, যেখানে কবির ব্যবহৃত জিনিসপত্র, খাতা, কলম ও দুর্লভ ছবি ইত্যাদি সহকারে একটি সংগ্রহশালা থাকবে। নরসিংদীর রায়পুরায় পাড়াতলী কলিম উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ে ‘কবি শামসুর রাহমান স্মৃতি গ্রন্থাগার’ ২০০৯ সালে নির্মিত হলেও তা আলোর মুখ আর দেখেনি কখনো।
.
এরপরও প্রস্তুতিস্বরূপ এই মহাযজ্ঞ আয়োজন করা চাট্টিখানি কথা নয়। কারণ, শামসুর রাহমান প্রতিভাবান কবি। আর প্রতিভাবানরা সহজে কোনো কিছু মেনে নেন না। সমাজের সেলাই করা কাপড়ের মধ্যে নিজেদের ঢুকিয়ে দেন না। তাই প্রতিভাবান কবিদের যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে। জীবদ্দশাতে তো বটেই; মৃত্যুর পরেও তা চলমান থাকতে পারে। উদাহরণ হিসেবে মহাকবি জন মিল্টনের কথাই ধরা যাক। সমসাময়িক রাজনৈতিক বৈরিতার সম্মুখীন হওয়ার পরও সাহিত্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিশেষ করে কুৎসা তাঁকে খানিকটা পর্দার আড়ালে নিয়ে চলে যায়। এই কাজ জারি থাকে বহু বছর। এমনকি টি এস এলিয়টও অনেক সময় ধরে মিল্টন–বিরোধী সমালোচনায় নিয়োজিত ছিলেন। যদিও পরবর্তী সময়ে তিনি তাঁর নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। যেমনটা বুঝতে পেরেছিলেন কবিগুরু নিজেও: মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্যের কড়া সমালোচনা করেছিলেন প্রথম জীবনে। কিন্তু সেই মিল্টনই ইংরেজি ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি। সেই মধুসূদনই বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি।
.
শামসুর রাহমানের কবিতা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আমরা দেখি জাতীয়তাবাদী সমালোচনা খুব অগ্রাধিকার পাচ্ছে। সেটা হয়তো সময়ের দাবি ছিল। আবার পুরাণভিত্তিক সমালোচনার ক্ষেত্রেও দেখি কোনো না কোনোভাবে জাতীয়তাবাদী সমালোচনা ঠাঁই করে নিয়েছে। এমনটা চলতে থাকলে দেখা যাবে মুষ্টিমেয় কবিতার মধ্যেই পাঠক ও সমালোচক ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই এখন সময় এসেছে শামসুর রাহমানের কবিতাকে বিভিন্ন সমালোচনার লেন্স দিয়ে দেখার।
.
শামসুর রাহমানেরও প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে। সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাজনৈতিক বাইনারির অংশ। সেখানে কাব্য ও শিল্প অনুপস্থিত। উপস্থিত রয়েছে আদর্শগত ও রাজনৈতিক পার্থক্য। রাজনৈতিক ও আদর্শিক মেরুকরণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে ব্যক্তি মূল্যায়ন। ফলে শামসুর রাহমানের কবিতার নান্দনিকতা, আধুনিকতা বা শব্দের কারিগরি নিয়ে আলোচনা তেমন হয়নি বললেই চলে। এরপরও উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন হুমায়ুন আজাদ: শামসুর রাহমান/নিঃসঙ্গ শেরপা নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা গ্রন্থ রচনা করেছেন ১৯৮৩ সালে। পরবর্তী সময়ে গাজী আজিজুর রহমান আরেকটি বই লেখেন কবিদের কবি: জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান, আবুল হাসান ২০১০ সালে। এই বইয়েও ছোট পরিসরে শামসুর রাহমান নিয়ে বেশ ভালো কাজ হয়েছে। এই দুটি বই ছাড়া শামসুর রাহমানের সাহিত্যকর্মের ওপর তেমন কোনো সিরিয়াস কাজ হয়েছে বলে মনে হয় না। এ ছাড়া বিভিন্ন পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন, মাসিক, ত্রৈমাসিক ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় শামসুর রাহমানকে নিয়ে অসংখ্য লেখা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সেসব প্রয়াসও খুব খারাপ নয়। তবে এখন একটু ভিন্নভাবে কাজ করার সময় এসেছে।
.
শামসুর রাহমানের কবিতা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আমরা দেখি জাতীয়তাবাদী সমালোচনা খুব অগ্রাধিকার পাচ্ছে। সেটা হয়তো সময়ের দাবি ছিল। আবার পুরাণভিত্তিক সমালোচনার ক্ষেত্রেও দেখি কোনো না কোনোভাবে জাতীয়তাবাদী সমালোচনা ঠাঁই করে নিয়েছে। এমনটা চলতে থাকলে দেখা যাবে মুষ্টিমেয় কবিতার মধ্যেই পাঠক ও সমালোচক ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই এখন সময় এসেছে শামসুর রাহমানের কবিতাকে বিভিন্ন সমালোচনার লেন্স দিয়ে দেখার। লেন্সগুলো আধুনিক নয় তবে তা কখনো শামসুর রাহমানের ওপর তেমনভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। কিংবা খুব কম বাঙালি কবি–সাহিত্যিকের কপালেই তা জুটেছে। যেমন উত্তর-ঔপনিবেশিক সমালোচনা, মার্ক্সবাদী সমালোচনা, আধুনিকতাবাদী ও অস্তিত্ববাদী সমালোচনা, আর্কিটাইপাল সমালোচনা, আন্তপাঠিক সমালোচনা বা ইন্টারটেক্সচুয়াল সমালোচনা ইত্যাদি।
.
জাতীয়তাবাদী সমালোচনা তাঁর কবিতায় বাঙালি জাতীয় পরিচয়, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনাকে বুঝতে সাহায্য করেছে। আর পুরাণভিত্তিক সমালোচনার মাধ্যমে তাঁর কবিতায় পৌরাণিক চরিত্র, প্রতীক ও আখ্যানের পুনর্ব্যবহার এবং সেগুলোর নতুন অর্থ নির্মাণ বিশ্লেষণও করা হয়েছে খানিকটা; যদিও এই দুই ক্ষেত্রেই আরও বিশদভাবে কাজ করার সুযোগ আছে।
.
আর অন্যদিকে উত্তর-ঔপনিবেশিক সমালোচনা সাংস্কৃতিক আধিপত্য, রাজনৈতিক দমন ও প্রতিরোধের দিকগুলো সাধারণত উন্মোচন করে। শামসুর রাহমানের কবিতাতেও বিস্তর সুযোগ রয়েছে। মার্ক্সবাদী সমালোচনা শ্রেণিবৈষম্য, শোষণ, ক্ষমতা ও সামাজিক অন্যায়ের বিশ্লেষণেও কার্যকর হতে পারে। আধুনিকতাবাদী ও অস্তিত্ববাদী সমালোচনার সাহায্যে নগরজীবন, নিঃসঙ্গতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও অস্তিত্বের সংকট অনুধাবন করার জন্য শামসুর রাহমান হয়তো বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি। এই সময়ে খুব বেশি আলোচিত হচ্ছে পরিবেশগত সমালোচনা বা ইকোক্রিটিসিজম। আর জোরেশোরে খুব উচ্চারিত হচ্ছে উত্তর-মানবতাবাদ বা পোস্টহিউম্যানিজম। এসব তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগের সময়ও এসেছে।
তাই শামসুর রাহমানের ৯৭তম জন্মবার্ষিকী যতটা না কবির নিজের তার চেয়েও অনেক বেশি পাঠক ও সমালোচকের। আর সময় যত যাবে এই দায়ের বোঝা ততই বাড়বে।





















