ঢাকা ০৯:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
পাঠকের ছবি (২০ অক্টোবর ২০২৬) তোয়ালে যেভাবে বাঁচিয়ে দিল বোল্ড হওয়া ব্যাটসম্যানকে সৌদিতে মৃত্যুদণ্ডের আগের দিন মেয়ের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা হয় বাবার ১০ বছর পর কেমন হবে দেশের আবাসন খাত | রিয়েল এস্টেট কানেক্ট বাংলাদেশ বান্দরবানে হোটেল–মোটেলে শতভাগ বুকিং, করোনা মহামারির পর সর্বোচ্চ পর্যটক ফ্রান্সে বিক্ষোভের সময় সিটি হলে আগুন দেওয়ার অভিযোগে একজন গ্রেপ্তার, কী পরিচয় তাঁর পিএসজিকে সেই ৬-১ মনে করিয়ে নিজেদের ক্ষতও দেখাল বার্সেলোনা আগে পদ ছেড়েছেন প্রায় তিন ডজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নেশার টাকা না পেয়ে মাকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ, ছেলে আটক এআই কি কাজ সহজ করছে, নাকি কাজের চাপ বাড়াচ্ছে

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ডের আগের দিন মেয়ের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা হয় বাবার

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:৫৬:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয় সুইটি আক্তারের। সেই সংসার টেকেনি। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে চলে আসেন বাবার বাড়িতে। এরপর পরিবারের চাপে আরেকজনকে বিয়ে করেন। কিন্তু স্বামী সৌদি আরবে যাওয়ার পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। কী করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এবং বাবার সংসারের অভাব দূর করতে তিন বছর আগে সৌদি আরবে যান সুইটি আক্তার। সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতেন তিনি। কিন্তু সৌদি আরবে যাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় তিনি গ্রেপ্তার হন।

তখন সুইটি আক্তার পরিবারকে জানিয়েছিলেন, সৌদি আরবে তাঁর সঙ্গে কাজ করা অন্য নারীরা অবৈধভাবে একটি গাড়ি কিনেছেন। এ ঘটনায় তাঁদের সঙ্গে তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কারাগারে থাকলেও মা–বাবার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তাঁর। কোনো কারণে ফোন দিতে না পারলেও দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করেছিলেন তিনি। সর্বশেষ ১৩ অক্টোবর (গত মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় বাবার সঙ্গে তাঁর কথা হয়। এর দুই দিন পর সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর পান মা–বাবা।

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করার পর দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড সম্প্রতি কার্যকর করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ১৪ অক্টোবর (গত বুধবার) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)। যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তাঁরা হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার।

মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহুরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনাটি তাঁরা জেনেছেন।

সুইটি আক্তারের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায়। এই উপজেলার একটি গ্রামের মো. ফজল মিয়া ও জহুরা বেগমের মেয়ে সুইটি। পাঁচ বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন তিনি।

আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে সুইটি আক্তারের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, উঠানে কয়েকজন জড়ো হয়ে কথা বলছেন। তাঁদের কেউ সুইটির স্বজন, কেউবা প্রতিবেশী। সুইটির মা–বাবা তখন ঘরের বারান্দায় বসে ছিলেন।

মেয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতেই কান্না শুরু করেন মা জহুরা বেগম। কোনোরকমে নিজেকে সামলে বললেন, ‘আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও রে।’কান্নার কারণে কথা বলতে পারছিলেন না জহুরা বেগম। একপর্যায়ে বললেন, ‘মা তুই কত দুঃখ পাইয়া গেছস, কেউর কাছে কইলি না। আমার কাছেও কইলি না…আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও। আমি ওরে দেহুম।’

পরে কথা হয় সুইটি আক্তারের বাবা মো. ফজল মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একটি এজেন্সির মাধ্যমে ২০২৩ সালের মার্চে সৌদি আরবে যায় মেয়ে। সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করত। সৌদিতে যাওয়ার পর প্রায় ছয় মাস মেয়ের সঙ্গে তাঁদের নিয়মিত কথা হতো। এরপর হঠাৎ একদিন মেয়ে ফোন করে জেলে বন্দী থাকার কথা জানায়। ওর (সুইটি) কয়েকজন বান্ধবী অবৈধভাবে নাকি একটি গাড়ি কিনেছিল, সে কারণে অন্যদের সঙ্গে মেয়েকেও গ্রেপ্তার করেছে। কারাগারে থাকা অবস্থায় কোনো কোনো সময় এক সপ্তাহ আবার কোনো সময় এক মাস পর কথা হতো। এভাবে এক বছর চলার পর হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।’

ফজল মিয়া বলেন, দীর্ঘ এক বছর পর সুইটি আবার ফোনে যোগাযোগ করে। তখনো জেলে থাকার কথা বলেছিল। ফোন না দিলেও দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করেছিল। এভাবে প্রায় চার মাস চলে। এরপর আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। সর্বশেষ মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) মাগরিবের নামাজের পর সুইটির সঙ্গে কথা হয়। তবে বিচার বা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কিছু জানায়নি।

স্বজনেরা মনে করেন, সুইটি আক্তার সৌদি আরবে কারও না কারও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটি পরিবারের কেউ বিশ্বাস করেন না।

সুইটির মা–বাবার সঙ্গে কথা বলার সময় সেখানে ছিলেন তাঁর চাচাতো বোন সালমা আক্তার। বয়সে তিনি সুইটির বড়। তিনি বলেন, স্বামীর সংসারে থাকার সৌভাগ্য হয়নি সুইটির। দ্বিতীয় বিয়ের পর ধারদেনা করে জামাতাকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। পরে ভাগ্য বদলাতে মেয়েকে এক বোনের কাছে রেখে সৌদি আরবে যান সুইটি। তাঁর মেয়ে (৯) স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।

কথা বলার সময় বারবার কান্না করছিলেন সালমা আক্তার। একপর্যায়ে কিছুটা স্বাভাবিক হলে তিনি বলেন, সুইটি কোনো অন্যায় কাজ করতে পারে না। পরে বলেন, ‘আমার চাচায় মাটি কাইট্যা ভাত খায়। অভাবের সংসার। বাপ–মায়ের অভাবে…বাইরে গেছে। ওরা পাঁচটা বোন। চাচার কোনো ছেলে নাই। ওর (সুইটি) যে এই অবস্থা অইবো, জানলে কি আর বিদেশে যাইবার দিতাম।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ডের আগের দিন মেয়ের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা হয় বাবার

আপডেট সময় : ০৬:৫৬:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয় সুইটি আক্তারের। সেই সংসার টেকেনি। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে চলে আসেন বাবার বাড়িতে। এরপর পরিবারের চাপে আরেকজনকে বিয়ে করেন। কিন্তু স্বামী সৌদি আরবে যাওয়ার পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। কী করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এবং বাবার সংসারের অভাব দূর করতে তিন বছর আগে সৌদি আরবে যান সুইটি আক্তার। সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতেন তিনি। কিন্তু সৌদি আরবে যাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় তিনি গ্রেপ্তার হন।

তখন সুইটি আক্তার পরিবারকে জানিয়েছিলেন, সৌদি আরবে তাঁর সঙ্গে কাজ করা অন্য নারীরা অবৈধভাবে একটি গাড়ি কিনেছেন। এ ঘটনায় তাঁদের সঙ্গে তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কারাগারে থাকলেও মা–বাবার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তাঁর। কোনো কারণে ফোন দিতে না পারলেও দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করেছিলেন তিনি। সর্বশেষ ১৩ অক্টোবর (গত মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় বাবার সঙ্গে তাঁর কথা হয়। এর দুই দিন পর সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর পান মা–বাবা।

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করার পর দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড সম্প্রতি কার্যকর করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ১৪ অক্টোবর (গত বুধবার) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)। যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তাঁরা হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার।

মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহুরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনাটি তাঁরা জেনেছেন।

সুইটি আক্তারের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায়। এই উপজেলার একটি গ্রামের মো. ফজল মিয়া ও জহুরা বেগমের মেয়ে সুইটি। পাঁচ বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন তিনি।

আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে সুইটি আক্তারের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, উঠানে কয়েকজন জড়ো হয়ে কথা বলছেন। তাঁদের কেউ সুইটির স্বজন, কেউবা প্রতিবেশী। সুইটির মা–বাবা তখন ঘরের বারান্দায় বসে ছিলেন।

মেয়ের কথা জিজ্ঞাসা করতেই কান্না শুরু করেন মা জহুরা বেগম। কোনোরকমে নিজেকে সামলে বললেন, ‘আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও রে।’কান্নার কারণে কথা বলতে পারছিলেন না জহুরা বেগম। একপর্যায়ে বললেন, ‘মা তুই কত দুঃখ পাইয়া গেছস, কেউর কাছে কইলি না। আমার কাছেও কইলি না…আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও। আমি ওরে দেহুম।’

পরে কথা হয় সুইটি আক্তারের বাবা মো. ফজল মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একটি এজেন্সির মাধ্যমে ২০২৩ সালের মার্চে সৌদি আরবে যায় মেয়ে। সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করত। সৌদিতে যাওয়ার পর প্রায় ছয় মাস মেয়ের সঙ্গে তাঁদের নিয়মিত কথা হতো। এরপর হঠাৎ একদিন মেয়ে ফোন করে জেলে বন্দী থাকার কথা জানায়। ওর (সুইটি) কয়েকজন বান্ধবী অবৈধভাবে নাকি একটি গাড়ি কিনেছিল, সে কারণে অন্যদের সঙ্গে মেয়েকেও গ্রেপ্তার করেছে। কারাগারে থাকা অবস্থায় কোনো কোনো সময় এক সপ্তাহ আবার কোনো সময় এক মাস পর কথা হতো। এভাবে এক বছর চলার পর হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।’

ফজল মিয়া বলেন, দীর্ঘ এক বছর পর সুইটি আবার ফোনে যোগাযোগ করে। তখনো জেলে থাকার কথা বলেছিল। ফোন না দিলেও দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করেছিল। এভাবে প্রায় চার মাস চলে। এরপর আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। সর্বশেষ মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) মাগরিবের নামাজের পর সুইটির সঙ্গে কথা হয়। তবে বিচার বা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কিছু জানায়নি।

স্বজনেরা মনে করেন, সুইটি আক্তার সৌদি আরবে কারও না কারও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটি পরিবারের কেউ বিশ্বাস করেন না।

সুইটির মা–বাবার সঙ্গে কথা বলার সময় সেখানে ছিলেন তাঁর চাচাতো বোন সালমা আক্তার। বয়সে তিনি সুইটির বড়। তিনি বলেন, স্বামীর সংসারে থাকার সৌভাগ্য হয়নি সুইটির। দ্বিতীয় বিয়ের পর ধারদেনা করে জামাতাকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। পরে ভাগ্য বদলাতে মেয়েকে এক বোনের কাছে রেখে সৌদি আরবে যান সুইটি। তাঁর মেয়ে (৯) স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।

কথা বলার সময় বারবার কান্না করছিলেন সালমা আক্তার। একপর্যায়ে কিছুটা স্বাভাবিক হলে তিনি বলেন, সুইটি কোনো অন্যায় কাজ করতে পারে না। পরে বলেন, ‘আমার চাচায় মাটি কাইট্যা ভাত খায়। অভাবের সংসার। বাপ–মায়ের অভাবে…বাইরে গেছে। ওরা পাঁচটা বোন। চাচার কোনো ছেলে নাই। ওর (সুইটি) যে এই অবস্থা অইবো, জানলে কি আর বিদেশে যাইবার দিতাম।’