ঢাকা ০১:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পত্রিকার পাতায় সাজানো মণ্ডপ, বার্তা সঠিক তথ্যের

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৪০:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সাইকেলের সামনের খাঁচায়, পেছনের ক্যারিয়ারে রাখা হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকা। সে সাইকেল নিয়ে ছুটছেন হকার। আবার আরেক পাশে পত্রিকার পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানি। নানা বয়সী আগ্রহী পাঠকের ভিড়। তাঁরা আসছেন, দেখছেন। পছন্দের পত্রিকা থেকে সঠিক ও নির্ভুল সংবাদ খুঁজে নিচ্ছেন।

ডিজিটাল সময়ে এভাবেই ছাপা পত্রিকার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে চট্টগ্রাম নগরের এক দুর্গাপূজার মণ্ডপে। ‘যুগান্তরের বার্তা বহন’ থিমে এবারের পূজার আয়োজন সাজিয়েছে নগরের পতেঙ্গার কাঠগড় মোড় এলাকার পতেঙ্গা শ্যামা সংঘ। ব্যতিক্রমী এমন আয়োজন দেখতে পুণ্যার্থীদের পাশাপাশি দর্শনার্থীদেরও ভিড় জমেছে মণ্ডপে।

পতেঙ্গা শ্যামা সংঘের সভাপতি পিকলু দেব প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবারের শারদ উৎসবে “যুগান্তরের বার্তা বহন” শিরোনামে আমরা যে থিম করেছি, তাতে আমাদের মূল প্রতিপাদ্য বার্তা হারিয়ে যায়, বাহনের ইতিহাস থেকে যায়।’

সরেজমিনে দেখা যায়, মন্দিরের প্রধান ফটকে ব্যানার টানানো হয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে ‘যুগান্তরের বার্তা বহন’। একটু ভেতরে ঢুকলেই নারী-পুরুষের জন্য আলাদা সারি করা হয়েছে।

মূল ফটক পেরিয়ে দ্বিতীয় ফটকে সবকিছু পত্রিকা দিয়ে সাজানো হয়েছে। ফটকের এক পাশে লেখা রয়েছে, ‘গন্তব্য, কবুতর, আকাশ, দূরত্ব, মুদ্রণযন্ত্র, কাগজ, বহু পাঠক, সংবাদপত্র, হকার ও মানুষের দরজা।’ অপর পাশে নানা পাঠকের পত্রিকা পড়ার ছবি। ওপরে শিরোনাম করা হয়েছে, ‘যুগান্তরের বার্তা বহন’।

দ্বিতীয় ফটক দিয়ে ঢুকতেই মন্দিরের প্যান্ডেলে সাজানো হয়েছে দেশের প্রচারিত বিভিন্ন সংবাদপত্র দিয়ে। পুরোনো সংবাদপত্রের ওপরে আঁকা হয়েছে গ্রাফিতি। শুরুতেই এক দোকানি তাঁর দোকানে সাজিয়ে রেখেছেন বিভিন্ন পত্রিকা। আগ্রহী পাঠকের কাছে বিক্রি করছেন ও নিজেও পত্রিকা পড়ছেন।

মন্দিরের ঠিক যেখানে দুর্গাপ্রতিমা রাখা হয়েছে, তার সামনে একটি সাইকেল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন হকার। স্বাভাবিক হকারের মতো সাইকেলের সামনের খাঁচায় নানা পত্রিকায় রাখা হয়েছে এবং পেছনে বাঁধা রয়েছে আরও এক বান্ডিল পত্রিকা।

প্যান্ডেলের দেয়ালে থাকা কাপড়ে নানা বাণী লেখা রয়েছে। কোথাও লেখা হয়েছে, ‘খবরের পথ বদলেছে বদলেছে তার বাহন, মানুষের হাতে আজও চলে যুগান্তরের বার্তা বহন’, ‘কালির অক্ষর কাগজ পেল ছাপা হলো খবর, এক পাতাতেই ছড়িয়ে গেল কত মুহূর্তের খবর’।

আয়োজকেরা জানিয়েছেন, পত্রিকার নানা বিবর্তন হয়েছে। কিন্তু এখনো মানুষের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দেন হকারেরা। তাঁদের এখনো চিত্র বদলাইনি। তাঁরা মানুষের কাছে কীভাবে খবর পৌঁছে দিতেন? সে খবর মানুষ বিশ্বাস করে কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতেন, সেটাই চিত্রে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

আয়োজকেরা বলেন, আগে মানুষের কানে কানে খবর পৌঁছাত। তারপর ছাপা কাগজের যুগ। এখন ডিজিটাল মিডিয়া। কিন্তু তথ্য কিংবা খবরের ধরন বদলেছে। উপস্থাপনা বদলেছে। ছড়িয়ে পড়ছে অপতথ্য ও ভুল তথ্য। এমন তথ্যের ভিড়ে সঠিক তথ্য পাওয়ার জন্য মানুষকে পত্রিকা পড়তে হবে। সঠিক গণমাধ্যম চিহ্নিত করে সঠিক তথ্য গ্রহণ করতে হবে। কানকথা নয়, ছড়িয়ে পড়া কোনো কথা নয়, নিজে পড়ে-শুনে সেটি বিশ্বাস করতে হবে। মূলত সমাজকে এ বার্তা দিতে চেয়েছেন তাঁরা।

মন্দির পরিক্রমায় মণ্ডপে আসেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুরজিৎ চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘থিমটি দেখে আমার ভালো লেগেছে। আমাদের যুবসমাজের জন্য একটা বার্তা এখানে দেওয়া হয়েছে। এখানকার থিমটা যুবসমাজকে সঠিক তথ্য গ্রহণে অনুপ্রাণিত করবে।’

পতেঙ্গা শ্যামা সংঘের সহসাধারণ সম্পাদক অনিক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, মানুষ এখন পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন। তার ধারাবাহিকতায় এখন মানুষ পত্রিকা কম পড়ছেন। ডিজিটাল মিডিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। ডিজিটাল মিডিয়ায় প্রচারিত সব তথ্য সব সময় সত্য হয় এমন নয়, সেটি যাচাই করতে হলে পত্রিকার পাতায় চোখ রাখতে হয়। এ শিল্পটি যেন হারিয়ে না যায়, মানুষ যেন সঠিক তথ্য খোঁজার জন্য পত্রিকার পাতা উল্টায়, সে জন্য তারা মূলত একটা মেসেজ দিতে চেয়েছেন সমাজকে।

অনিক চৌধুরী বলেন, কবুতরের ডানায় বার্তা বহন থেকে শুরু করে ঢোলের শব্দ, রানারের ছুটে চলা, সাইকেলের গতি পেরিয়ে আজকের পেপারওয়ালা—সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার এই ধারাবাহিক যাত্রায় সময়ের বিবর্তন, যোগাযোগের পরিবর্তন এবং যুগে যুগে নীরবে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া বার্তাবাহকদের অবদান তুলে ধরতে চেয়েছেন তাঁরা। তাঁর মতে, এই আয়োজন কেবল একটি শিল্পনির্মাণ নয়; এটি ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা এবং সেই সব নীরব বার্তাবাহকের নিরলস শ্রম ও আত্মত্যাগের প্রতি এক আন্তরিক শ্রদ্ধার্ঘ্য।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

পত্রিকার পাতায় সাজানো মণ্ডপ, বার্তা সঠিক তথ্যের

আপডেট সময় : ১০:৪০:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সাইকেলের সামনের খাঁচায়, পেছনের ক্যারিয়ারে রাখা হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকা। সে সাইকেল নিয়ে ছুটছেন হকার। আবার আরেক পাশে পত্রিকার পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানি। নানা বয়সী আগ্রহী পাঠকের ভিড়। তাঁরা আসছেন, দেখছেন। পছন্দের পত্রিকা থেকে সঠিক ও নির্ভুল সংবাদ খুঁজে নিচ্ছেন।

ডিজিটাল সময়ে এভাবেই ছাপা পত্রিকার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে চট্টগ্রাম নগরের এক দুর্গাপূজার মণ্ডপে। ‘যুগান্তরের বার্তা বহন’ থিমে এবারের পূজার আয়োজন সাজিয়েছে নগরের পতেঙ্গার কাঠগড় মোড় এলাকার পতেঙ্গা শ্যামা সংঘ। ব্যতিক্রমী এমন আয়োজন দেখতে পুণ্যার্থীদের পাশাপাশি দর্শনার্থীদেরও ভিড় জমেছে মণ্ডপে।

পতেঙ্গা শ্যামা সংঘের সভাপতি পিকলু দেব প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবারের শারদ উৎসবে “যুগান্তরের বার্তা বহন” শিরোনামে আমরা যে থিম করেছি, তাতে আমাদের মূল প্রতিপাদ্য বার্তা হারিয়ে যায়, বাহনের ইতিহাস থেকে যায়।’

সরেজমিনে দেখা যায়, মন্দিরের প্রধান ফটকে ব্যানার টানানো হয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে ‘যুগান্তরের বার্তা বহন’। একটু ভেতরে ঢুকলেই নারী-পুরুষের জন্য আলাদা সারি করা হয়েছে।

মূল ফটক পেরিয়ে দ্বিতীয় ফটকে সবকিছু পত্রিকা দিয়ে সাজানো হয়েছে। ফটকের এক পাশে লেখা রয়েছে, ‘গন্তব্য, কবুতর, আকাশ, দূরত্ব, মুদ্রণযন্ত্র, কাগজ, বহু পাঠক, সংবাদপত্র, হকার ও মানুষের দরজা।’ অপর পাশে নানা পাঠকের পত্রিকা পড়ার ছবি। ওপরে শিরোনাম করা হয়েছে, ‘যুগান্তরের বার্তা বহন’।

দ্বিতীয় ফটক দিয়ে ঢুকতেই মন্দিরের প্যান্ডেলে সাজানো হয়েছে দেশের প্রচারিত বিভিন্ন সংবাদপত্র দিয়ে। পুরোনো সংবাদপত্রের ওপরে আঁকা হয়েছে গ্রাফিতি। শুরুতেই এক দোকানি তাঁর দোকানে সাজিয়ে রেখেছেন বিভিন্ন পত্রিকা। আগ্রহী পাঠকের কাছে বিক্রি করছেন ও নিজেও পত্রিকা পড়ছেন।

মন্দিরের ঠিক যেখানে দুর্গাপ্রতিমা রাখা হয়েছে, তার সামনে একটি সাইকেল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন হকার। স্বাভাবিক হকারের মতো সাইকেলের সামনের খাঁচায় নানা পত্রিকায় রাখা হয়েছে এবং পেছনে বাঁধা রয়েছে আরও এক বান্ডিল পত্রিকা।

প্যান্ডেলের দেয়ালে থাকা কাপড়ে নানা বাণী লেখা রয়েছে। কোথাও লেখা হয়েছে, ‘খবরের পথ বদলেছে বদলেছে তার বাহন, মানুষের হাতে আজও চলে যুগান্তরের বার্তা বহন’, ‘কালির অক্ষর কাগজ পেল ছাপা হলো খবর, এক পাতাতেই ছড়িয়ে গেল কত মুহূর্তের খবর’।

আয়োজকেরা জানিয়েছেন, পত্রিকার নানা বিবর্তন হয়েছে। কিন্তু এখনো মানুষের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দেন হকারেরা। তাঁদের এখনো চিত্র বদলাইনি। তাঁরা মানুষের কাছে কীভাবে খবর পৌঁছে দিতেন? সে খবর মানুষ বিশ্বাস করে কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতেন, সেটাই চিত্রে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

আয়োজকেরা বলেন, আগে মানুষের কানে কানে খবর পৌঁছাত। তারপর ছাপা কাগজের যুগ। এখন ডিজিটাল মিডিয়া। কিন্তু তথ্য কিংবা খবরের ধরন বদলেছে। উপস্থাপনা বদলেছে। ছড়িয়ে পড়ছে অপতথ্য ও ভুল তথ্য। এমন তথ্যের ভিড়ে সঠিক তথ্য পাওয়ার জন্য মানুষকে পত্রিকা পড়তে হবে। সঠিক গণমাধ্যম চিহ্নিত করে সঠিক তথ্য গ্রহণ করতে হবে। কানকথা নয়, ছড়িয়ে পড়া কোনো কথা নয়, নিজে পড়ে-শুনে সেটি বিশ্বাস করতে হবে। মূলত সমাজকে এ বার্তা দিতে চেয়েছেন তাঁরা।

মন্দির পরিক্রমায় মণ্ডপে আসেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুরজিৎ চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘থিমটি দেখে আমার ভালো লেগেছে। আমাদের যুবসমাজের জন্য একটা বার্তা এখানে দেওয়া হয়েছে। এখানকার থিমটা যুবসমাজকে সঠিক তথ্য গ্রহণে অনুপ্রাণিত করবে।’

পতেঙ্গা শ্যামা সংঘের সহসাধারণ সম্পাদক অনিক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, মানুষ এখন পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন। তার ধারাবাহিকতায় এখন মানুষ পত্রিকা কম পড়ছেন। ডিজিটাল মিডিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। ডিজিটাল মিডিয়ায় প্রচারিত সব তথ্য সব সময় সত্য হয় এমন নয়, সেটি যাচাই করতে হলে পত্রিকার পাতায় চোখ রাখতে হয়। এ শিল্পটি যেন হারিয়ে না যায়, মানুষ যেন সঠিক তথ্য খোঁজার জন্য পত্রিকার পাতা উল্টায়, সে জন্য তারা মূলত একটা মেসেজ দিতে চেয়েছেন সমাজকে।

অনিক চৌধুরী বলেন, কবুতরের ডানায় বার্তা বহন থেকে শুরু করে ঢোলের শব্দ, রানারের ছুটে চলা, সাইকেলের গতি পেরিয়ে আজকের পেপারওয়ালা—সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার এই ধারাবাহিক যাত্রায় সময়ের বিবর্তন, যোগাযোগের পরিবর্তন এবং যুগে যুগে নীরবে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া বার্তাবাহকদের অবদান তুলে ধরতে চেয়েছেন তাঁরা। তাঁর মতে, এই আয়োজন কেবল একটি শিল্পনির্মাণ নয়; এটি ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা এবং সেই সব নীরব বার্তাবাহকের নিরলস শ্রম ও আত্মত্যাগের প্রতি এক আন্তরিক শ্রদ্ধার্ঘ্য।