ঢাকা ০৯:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জামায়াত–কওমির বিরোধ কেন, কোথা থেকে এর শুরু

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:০৬:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির মানচিত্রে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কওমিপন্থীদের সম্পর্ক একটি দীর্ঘদিনের জটিল গল্প।

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মাওলানা আবদুল মালেকের একটি বক্তব্য সম্প্রতি রাজনীতির মাঠে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। নির্বাচনের আগেও তিনি ভোটারদের সতর্ক করে বলেছিলেন, মনোগ্রামে কোরআনের আয়াত থাকলেই কোনো দল ‘হক’ হয়ে যায় না। কিন্তু এবার এক মাহফিলে জামায়াত জোটে যোগ দেওয়াকে তিনি ‘গোমরাহি’ (পথভ্রষ্ট) বলেছেন।

মাওলানা আবদুল মালেক নিজে কওমি ধারার মানুষ, কওমি শিক্ষার্থীদের উচ্চতর গবেষণা প্রতিষ্ঠান মারকাযুদ দাওয়াহর শিক্ষাসচিব। তাঁর কথায় তাই একজন আলেমের ব্যক্তিগত মত ছাড়িয়ে একটি ধারার দীর্ঘদিনের অস্বস্তির আভাস পাওয়া যায়।

যদিও জামায়াত নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৃণমূলের ক্ষোভ দেখা গেছে। তাঁরা প্রশ্ন রেখেছেন, সরকারি দলের লোকজনের দেশজুড়ে অন্যায় নিয়ে খতিব চুপ কেন? একটি ভিডিওতে জামায়াতের সংসদ সদস্য আমির হামজাকে বলতে শোনা গেছে, বড় মসজিদের ইমাম খেপে গেছেন।

.ঐতিহ্যগত অবস্থান থেকে সরে এসেছে জামায়াত.পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে যাওয়া হবে দুঃখজনক.

জোটে থাকা এনসিপির ইসলামিক উইং ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের বেশির ভাগ সদস্য কওমিপড়ুয়া। তাঁদের মুখপাত্র বলেছেন, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি আর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়।

আঁচ লেগেছে মাওলানা মামুনুল হকের গায়েও। তাঁর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জামায়াতের জোটে আছে। অথচ তিনি কওমি ধারার সমাদৃত শাইখুল হাদিস আজিজুল হকের সন্তান, নিজেও শাইখুল হাদিস। পাল্টা জবাবে মামুনুল হক বলেছেন, মাওলানা আবদুল মালেক আলেম হিসেবে উঁচু দরের হলেও রাজনীতিতে তাঁর শিষ্যত্ব তিনি নেননি।

এর মধ্যে আগুনে ঘি পড়েছে হেফাজতে ইসলামের ‘ইসলামি ঐক্য’ উদ্যোগে। কওমি ধারার সবচেয়ে প্রভাবশালী এই সংগঠন সাতটি কওমি রাজনৈতিক দলকে এক ছাতার নিচে আনতে চাইছে। সেখানে জামায়াত নেই সত্য, অথচ ওই সাত দলের দুটি জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ। কয়েক মাস ধরে চলা এ উদ্যোগ আটকে আছে একটা প্রশ্নে: এই ঐক্যের পরে জামায়াতের জোটে কোনো দল থাকতে পারবে কি না।

.

হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশিরউল্লাহ বিবিসিকে বলেছেন, পারবে না। তিনি এ-ও স্পষ্ট করেছেন যে জামায়াতের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ রাজনৈতিক নয়, ধর্মীয়।
হেফাজত আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর ভাষা আরও কঠিন। ২০২৫ সালের আগস্টে চট্টগ্রামের একটি মাহফিলে তিনি জামায়াতকে ‘ধোঁকাবাজ ইসলামি দল’ এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের মানদণ্ডে ‘কাদিয়ানিদের চেয়েও খারাপ’ বলেছেন বলে গণমাধ্যমে এসেছে।

প্রতিক্রিয়ায় এই মন্তব্যকে ‘অসত্য, বানোয়াট ও কুরুচিপূর্ণ’ বলেছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। অতীতে জামায়াত এমন আক্রমণ সাধারণত এড়িয়ে যেত। বোঝা যায়, এবার সে নীতি ভেঙেছে।

প্রশ্ন ওঠে, ইসলামি রাজনীতির সবাই প্রায় একই লক্ষ্যের কথা বলেন, তবু কওমি আলেমদের একটি বড় অংশ জামায়াতকে এত দূরের মনে করেন কেন?

উত্তরে বলা যায়, বিরোধের কারণ একটি নয়, তিনটি। ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ‘আকিদা’র তর্ক আছে। ইসলামের ব্যাখ্যা দেওয়ার কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে, সেই প্রতিযোগিতা আছে। আর আছে ইতিহাসের জমে থাকা সন্দেহ।

তাহলে কেন আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কওমি আলেমরা কখনো জামায়াতের সঙ্গে বসেন, কখনো তাকে গোমরাহ বলে ঠেলে দেন। কারণ ‘বিশ্বাস’ বদলায় না, বদলায় রাজনীতির হিসাব।

.ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বই: ইসলামি আন্দোলন নিয়ে কিছু অনালোচিত প্রশ্ন.ব্যারিস্টার রাজ্জাকের স্মৃতিকথা: ’৭১ ইস্যুতে ক্ষমা চাওয়া প্রশ্নে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব.

এই বিরোধ বাইরে থেকে আসেনি। এর সূচনা জামায়াতের ভেতর থেকেই। ১৯৪১ সালে জামায়াত যখন যাত্রা শুরু করে, তখন কওমি বা দেওবন্দি ঘরানার কয়েকজন আলেম তার সঙ্গে ছিলেন। মাওলানা মনজুর নোমানি তাঁদের একজন, দলের প্রতিষ্ঠাতা ও নায়েবে আমির। প্রতিষ্ঠাতাদের আরেকজন দেওবন্দের পরিচালনা কমিটির সদস্য আবুল হাসান আলী নদভি, যিনি জামায়াতের প্রথম মজলিসে শুরার সদস্যও হয়েছিলেন। দুজনই এক বছরের মধ্যেই সংগঠন ছেড়ে যান।

নোমানি পরে মাওলানা মওদুদি কে সাথ মেরি রেফাকত কি সরগুজশত (মাওলানা মওদুদির সঙ্গে আমার সাহচর্যের ইতিকথা) বইয়ে লেখেন, নবীজী (সা.) প্রিয় সহচর তথা সাহাবি, পূর্বসূরি আলেম আর ইসলামের আধ্যাত্মিকতা নিয়ে জামায়াতের প্রধান প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদির কিছু লেখার সঙ্গে তিনি একমত হতে পারেননি।

আলী নদভি তাঁর আত্মজীবনী কারওয়ানে জিন্দেগিতে লিখেছেন, মাওলানা মওদুদি ইবাদত, তাসাউফ আর বিশ্বাসের লক্ষ্যকে ‘ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার’ উপায় হিসেবে দেখেছেন। নদভির মতে, ইসলামি রাষ্ট্র ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। চূড়ান্ত লক্ষ্য মানুষের অন্তরে আল্লাহর দাসত্ব সৃষ্টি আর পরকালের মুক্তি।

.

এই দুজন ভারতের আলেম। বাংলাদেশে একই ধারার অগ্রগণ্য নাম গোপালগঞ্জের সদর সাব হুজুর হিসেবে পরিচিত এবং ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী। তিনি বহু বছর জামায়াতকে সমর্থন করেছিলেন। পরে জামায়াত ও মওদুদির বিশ্বাস আর প্রয়োগের সমালোচনা করে ‘ভুল সংশোধন’ নামে একটি বই লেখেন।

জামায়াত নিয়ে এ তিনজনের সমালোচনার একটাই ফল নিয়ে আসে—জামায়াতের সঙ্গে দেওবন্দি ধারার বিরোধকে আর ‘বাইরের মাদ্রাসাওয়ালাদের হিংসা’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। একসময়ের ঘরের মানুষেরাই জামায়াত নিয়ে এসব সমালোচনা বা অভিযোগ তুলেছেন। যদিও তাঁদের সমালোচনা নিয়ে জামায়াতেরও নিজস্ব ব্যাখ্যা বা পাল্টা জবাব আছে।

জামায়াতের সাবেক নেতা এই কওমি আলেমদের এসব সমালোচনার পর দুই পক্ষের বিরোধ আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। ১৯৫১ সালের ৩ আগস্ট দেওবন্দি ঘরানার প্রবীণ আলেমরা একটি যৌথ ফতোয়ায় মওদুদির চিন্তা আর জামায়াতের কিছু সিদ্ধান্তকে ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদার পরিপন্থী’ বলেন।

.জামায়াত সমর্থনে জোয়ার বা হাইপ, ’৯১-এর পুনরাবৃত্তির আলাপ ও বাস্তবতা.

অভিযোগ ছিল মূলত তিনটি। প্রথমত, সাহাবিদের সমালোচনা। দ্বিতীয়ত, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, অর্থাৎ নামাজ, রোজা, হজের মতো ইবাদতকে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ হিসেবে দেখা। তৃতীয়ত, নবীদের নিষ্পাপ না মানা।

স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন দেওবন্দের শাইখুল হাদিস হুসাইন আহমদ মাদানি, অধ্যক্ষ কারি মুহাম্মদ তৈয়্যেব, ফাজায়িলে আমাল –এর লেখক মুহাম্মদ যাকারিয়া, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সম্পাদক মুহাম্মদ মিয়াঁ প্রমুখ।

ফতোয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা মওদুদির বইপত্র আর জামায়াতের তৎকালীন প্রচারপত্র ও সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করেই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছান। ফতোয়াটি প্রথম ছাপা হয় দিল্লির দৈনিক আল-জমিয়ত-এ। পরে দেওবন্দের মুখপত্র মাসিক দারুল উলুম-এ পূর্ণাঙ্গ রূপে পুনর্মুদ্রিত হয়। এরপর নানা সময়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে দেওবন্দ একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।

.

না, প্রশ্ন আছে ধর্মীয় কর্তৃত্বেরও—ইসলাম কী বলে, তা ঠিক করবেন কে? যিনি বছরের পর বছর মাদ্রাসায় পড়ে ইসলামের শাস্ত্রীয় ‘সনদের ধারাবাহিকতা’ অর্জন করেছেন, তিনি? নাকি যিনি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভালো লেখার জোরে ইসলামের কথা বলছেন, তিনিও?

মাওলানা মওদুদি নিজে প্রথাগত আলেম ছিলেন না। জামায়াত গড়ে উঠেছে আদর্শবাদী কর্মী বাহিনীর ওপর, সেখানে নেতৃত্বের শর্ত আলেমের সনদ নয়। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক মুহাম্মদ কাসিম জামান দ্য উলামা ইন কনটেম্পোরারি ইসলাম বইয়ে দেখিয়েছেন, আধুনিক যুগে উপমহাদেশের আলেমদের সঙ্গে মাওলানা মওদুদির মতো ‘সাধারণ শিক্ষিত’ ইসলামি চিন্তাবিদদের টানাপোড়েনের বড় জায়গা এই কর্তৃত্বের প্রশ্ন।

জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইয়েদ ওয়ালি রেজা নসর মাওলানা মওদুদি অ্যান্ড দ্য মেকিং অব ইসলামিক রিভাইভালিজম বইয়ে দেখিয়েছেন, মাওলানা মওদুদি ধর্মীয় নেতৃত্বের ভার আলেমের সনদের চেয়ে আদর্শবাদী কর্মীদের হাতে রাখতে চেয়েছিলেন।
কওমি আলেমদের কাছে এটি একটি চ্যালেঞ্জ। তাঁরা নিজেদের ধর্মের ধারক মনে করেন।

.সমাজে ধর্মীয় বিতর্কের রূপান্তর ও মীমাংসা–অমীমাংসার সীমানা.

যেহেতু হাদিসেই আছে, আলেমরা নবীদের উত্তরসূরি (সুনানে তিরমিজি: ২৬২২)। অথচ একটি রাজনৈতিক সংগঠন সেই ধারকের ভূমিকা কেড়ে নিতে চাইছে, এমন ধারণা তাঁদের মধ্যে কাজ করে। কওমি অঙ্গনে একটি আশঙ্কাও ঘোরে—জামায়াতের শক্তি বাড়লে তারা মাদ্রাসা ও মসজিদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে চাইবে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর এমন অভিযোগ বিভিন্ন এলাকা থেকে শোনাও গেছে।

আজকের রাজনীতিতেও এর ছায়া স্পষ্ট। নারীনীতি, ধর্মীয় অবমাননা বা ভোটের প্রশ্নে হেফাজত আর জামায়াত দুই পক্ষই একই ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর সমর্থন চায়। ফলে বিশ্বাসের তর্ক সহজেই ‘নেতৃত্ব দেবে কে’ প্রশ্নে গড়িয়ে যায়। না, এর মানে এ নয় যে ‘আকিদা’র আপত্তি শুধু অজুহাত। বরং তর্কটা এত তীব্র হয়, কারণ তার পেছনে একটা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও আছে।

.

পুরোনো ক্ষতের প্রথমটি ১৯৪৭। দেশভাগের সময় দেওবন্দি আলেমরা নিজেরাই বিভক্ত ছিলেন। হোসাইন আহমদ মাদানি অখণ্ড ভারতে মিলিত জাতীয়তার পক্ষে ছিলেন, শাব্বির আহমদ উসমানি পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে। মাওলানা মওদুদি মুসলিম লীগের নেতৃত্বের ইসলামি যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, আবার মিলিত জাতীয়তার তত্ত্বেরও বিরোধী ছিলেন। পাকিস্তান হওয়ার পর তিনি সেখানে গিয়ে ইসলামি সংবিধানের দাবি তোলেন। পাকিস্তানপন্থী আলেমরা তখন ক্ষুব্ধ হন যে যিনি আন্দোলনে ছিলেন না, তিনি এখন ফল খেতে চাইছেন।

সংকট হয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ঘিরেও। জামায়াতের সর্বৈব ভূমিকা তখন অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে। কিন্তু কওমি রাজনীতিকদের প্রধান অংশটি ভারতের মাদানি পরিবারের নেতৃত্বাধীন জমিয়ত প্রভাবিত হওয়ায় তারা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে ভূমিকা রাখেন, আর নেজামে ইসলাম প্রভাবিত অংশটি নীরবতা বেছে নেয়।

আজ কওমি নেতারা জামায়াতের বিরুদ্ধে যে যুক্তি দেন, তার মধ্যে ‘একাত্তর’ ভারী নয় বটে। কিন্তু জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা যে জোট থাকা কওমি নেতাদের কাঁধে বাড়তি রাজনৈতিক ঝুঁকি চাপায়—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

.বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক: ‘একাত্তর কার্ড’ যেভাবে ভারসাম্য রাখছে.বিএনপি কেন জুলাইয়ের মালিকানা জামায়াত-এনসিপির হাতে তুলে দিচ্ছে.

আবার ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরও দুই পক্ষের সম্পর্কে গভীর ছাপ ফেলেছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, হেফাজতের ঢাকা অভিমুখী কর্মসূচিতে জামায়াত-শিবির জনবল ও রসদ দিয়ে সহায়তা করেছিল। হেফাজতকে তখন বিভিন্ন মহল থেকে জামায়াতের ‘সহযোগী’ বলা হচ্ছিল। এর জবাবে হেফাজতের তৎকালীন আমির গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জামায়াতের সহযোগী বলার চেয়ে বরং গুলি করে মেরে ফেলুন।’ এমনকি ৫ মের রাতের পর কওমি অঙ্গনের বড় অংশে ধারণা হয়, জামায়াত তাঁদের কাঁধে ভর করে নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিল করতে চেয়েছিল।

অবিশ্বাস কিন্তু একতরফা নয়। ২০১৮ সালে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাসনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পর হেফাজত নেতারা শুকরানা মাহফিলে জড়ো হলে জামায়াত নেতারা তাকে কওমি আলেমদের ‘রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ’ আর ‘আওয়ামী লীগ সরকারের হাতে ব্যবহৃত’ হওয়া বলেও মন্তব্য করেন।

.

তবু ঐক্যের চেষ্টাও কম হয়নি। কওমি আলেম আর জামায়াতকে বারবার একই মঞ্চেও দেখা গেছে। সত্তরের দশকে আইয়ুববিরোধী বিরোধী জোটগুলোতে নেজামে ইসলাম ও জামায়াত একসঙ্গে ছিল। নব্বইয়ের দশকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে দুই পক্ষ আলাদা ব্যানারে হলেও একই দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। ১৯৯৯ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট গঠিত হলে ইসলামী ঐক্যজোট আর জামায়াত একই জোটে বসে, ক্ষমতার অংশীদারও হয়।

এসব ইতিহাস নিয়ে জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম বাংলাদেশে ইসলামী ঐক্য প্রচেষ্টার ইতিহাস নামে একটি বইও লিখেছেন। সেখানে তিনি মামুনুল হকের বাবা শাইখুল হাদিস আজিজুল হকের ‘প্রচেষ্টা’র প্রশংসা করেছেন।

কিন্তু ওই জোট কওমি অঙ্গনে প্রবল প্রশ্নও তুলেছিল। অনেক আলেম বলেছিলেন, মাওলানা মওদুদির আকিদা যাঁরা ভুল মনে করেন, তাঁরা একই জোটে কীভাবে? চরমোনাইয়ের তৎকালীন পীর সৈয়দ ফজলুল করীম জামায়াতের ‘ত্রুটিপূর্ণ আকিদা’র প্রশ্নে ঐক্যজোট থেকে বেরিয়ে যান। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একটি অংশ আপত্তি জানায়।

.

আশির দশকের কওমি ঘরানার অন্যতম নেতা এবং সে সময়ের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হাফেজ্জী হুজুরের খেলাফত আন্দোলনের অবস্থান ছিল, ইসলামপন্থীদের ঐক্য হওয়া উচিত দেওবন্দি আকিদার ভিত্তিতে, মওদুদিপন্থী বা অন্য কোনো দলের পেছনে থেকে নয়। পরে কওমি দলগুলো নিয়ে গঠিত ‘ইসলামী ঐক্যজোট’ই ভেঙে কয়েক টুকরা হয়ে যায়।

যদিও ২৪ পরবর্তী নতুন পরিস্থিতিতে ইসলামি দলগুলোর ভোটবাক্স একটা করার উদ্যোগ এসেছিল দীর্ঘদিনের বিরোধী জামায়াত ও চরমোনাইয়ের মাধ্যমে। কিন্তু সেখানে অন্যান্য ‘ইসলামী দল’ যুক্ত হতে হতে চরমোনাই বেরিয়ে গেল। কেউ কেউ জামায়াতের সঙ্গে থাকল, কেউ সমঝোতা করল বিএনপির সঙ্গে, কেউ স্বতন্ত্র অবস্থানে থাকল। এক বাক্স পরিণত হলো তিন বাক্সে।

ফলে এখন অন্তত কওমি দলগুলোর বহু বিভক্ত টুকরোগুলোই আবার জোড়া লাগাতে চায় হেফাজত। কেন? কারণ, চব্বিশের পর আরও একটি লক্ষ করার মতো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে-কওমিপন্থিদের জামায়াতে যোগদান, যা এতদিন ছিল বিরল। একসময় গণতন্ত্রবিরোধী ‘জিহাদি’ বক্তব্যের জন্য পরিচিত মুফতি আলী হাসান উসামাসহ কওমি পড়ুয়া বেশ কয়েকজন আলেম, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক জামায়াতে নাম লিখিয়েছেন। নতুন যোগ দেওয়া কেউ কেউ কওমি মাদ্রাসায় শিবিরের কমিটি গঠনের দাবিও তুলেছেন।

অনেকে মনে করেন, হেফাজতের ঐক্য-উদ্যোগের মূল কারণ এটাই যে প্রবীণ আলেমরা আশঙ্কা করছেন, কওমি দলগুলোর অনৈক্য তাদের শক্তিহীন করছে, আর তরুণ প্রজন্ম আস্থা হারাচ্ছে। জামায়াতে যোগদান সেই হতাশারই প্রতিক্রিয়া।

.বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, সিপিবি, ইসলামী আন্দোলন নীতিগত প্রশ্নে যা বলছে.ইতিহাসের মনগড়া ভাষ্য তৈরিতে বিজেপির পথ ধরেছে জামায়াত.

এবার প্রশ্ন ওঠে, এতই যদি বিরোধ জামায়াতের সঙ্গে, তাহলে আবার জোট বাঁধেন কেন? আকিদার আপত্তি তো সেই ১৯৫১ সালে যেমন ছিল, তেমনই আছে। আকিদাই যদি সব ঠিক করে, তাহলে তো এই যাওয়া-আসা ঘটার কথা না।

বোঝা যায়, আকিদা একটি দেয়াল বটে, কিন্তু সেই দেয়ালের দরজা কখন খুলবে, ঠিক করে রাজনীতির হিসাব—কে ক্ষমতার কত কাছে, কার ভোট কোথায়, কার নেতৃত্ব কতটা টলছে। কারও ‘গোমরাহি’ বা কারও ‘ধোঁকাবাজ’ বলা, কারও ‘বাস্তবতা’ কিংবা কারও মিলতে মিলতে গিয়ে জোট ভাঙা—সবই এই এক হিসাবের ভিন্ন ভিন্ন ফলও হতে পারে।

কিন্তু এই ফল ঠিক কি বেঠিক কিংবা সেটা ভালো কি মন্দ, কারা সঠিক কারা না—তা বুঝতে আমাদের আরও অপেক্ষা করা লাগতে পারে। জামায়াতের পক্ষ থেকে কওমি আলেমদের মনের সংশয় দূর করার মতো স্পষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান আছে কি নেই—তা–ও পরিষ্কার নয়।

শুধু এটুকু স্পষ্ট যে কিছু বিষয়ে মাওলানা মওদুদির ‘বিতর্কিত অবস্থান’ ঘিরে কীভাবে জামায়াত এবং সেখানে কতটুকু ছাড় দেবে তারা—সেই প্রশ্নের খোলামেলা উত্তর ছাড়া কওমিদের মনের দেয়াল আশু ভাঙবে না। আর বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের রাজনীতির মানচিত্রের জটিলতারও সুরাহা হবে না।

  • মনযূরুল হক প্রথম আলোর ধর্ম বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
    মতামত লেখকের নিজস্ব

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

জামায়াত–কওমির বিরোধ কেন, কোথা থেকে এর শুরু

আপডেট সময় : ০৭:০৬:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির মানচিত্রে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কওমিপন্থীদের সম্পর্ক একটি দীর্ঘদিনের জটিল গল্প।

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মাওলানা আবদুল মালেকের একটি বক্তব্য সম্প্রতি রাজনীতির মাঠে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। নির্বাচনের আগেও তিনি ভোটারদের সতর্ক করে বলেছিলেন, মনোগ্রামে কোরআনের আয়াত থাকলেই কোনো দল ‘হক’ হয়ে যায় না। কিন্তু এবার এক মাহফিলে জামায়াত জোটে যোগ দেওয়াকে তিনি ‘গোমরাহি’ (পথভ্রষ্ট) বলেছেন।

মাওলানা আবদুল মালেক নিজে কওমি ধারার মানুষ, কওমি শিক্ষার্থীদের উচ্চতর গবেষণা প্রতিষ্ঠান মারকাযুদ দাওয়াহর শিক্ষাসচিব। তাঁর কথায় তাই একজন আলেমের ব্যক্তিগত মত ছাড়িয়ে একটি ধারার দীর্ঘদিনের অস্বস্তির আভাস পাওয়া যায়।

যদিও জামায়াত নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৃণমূলের ক্ষোভ দেখা গেছে। তাঁরা প্রশ্ন রেখেছেন, সরকারি দলের লোকজনের দেশজুড়ে অন্যায় নিয়ে খতিব চুপ কেন? একটি ভিডিওতে জামায়াতের সংসদ সদস্য আমির হামজাকে বলতে শোনা গেছে, বড় মসজিদের ইমাম খেপে গেছেন।

.ঐতিহ্যগত অবস্থান থেকে সরে এসেছে জামায়াত.পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে যাওয়া হবে দুঃখজনক.

জোটে থাকা এনসিপির ইসলামিক উইং ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের বেশির ভাগ সদস্য কওমিপড়ুয়া। তাঁদের মুখপাত্র বলেছেন, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি আর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়।

আঁচ লেগেছে মাওলানা মামুনুল হকের গায়েও। তাঁর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জামায়াতের জোটে আছে। অথচ তিনি কওমি ধারার সমাদৃত শাইখুল হাদিস আজিজুল হকের সন্তান, নিজেও শাইখুল হাদিস। পাল্টা জবাবে মামুনুল হক বলেছেন, মাওলানা আবদুল মালেক আলেম হিসেবে উঁচু দরের হলেও রাজনীতিতে তাঁর শিষ্যত্ব তিনি নেননি।

এর মধ্যে আগুনে ঘি পড়েছে হেফাজতে ইসলামের ‘ইসলামি ঐক্য’ উদ্যোগে। কওমি ধারার সবচেয়ে প্রভাবশালী এই সংগঠন সাতটি কওমি রাজনৈতিক দলকে এক ছাতার নিচে আনতে চাইছে। সেখানে জামায়াত নেই সত্য, অথচ ওই সাত দলের দুটি জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ। কয়েক মাস ধরে চলা এ উদ্যোগ আটকে আছে একটা প্রশ্নে: এই ঐক্যের পরে জামায়াতের জোটে কোনো দল থাকতে পারবে কি না।

.

হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশিরউল্লাহ বিবিসিকে বলেছেন, পারবে না। তিনি এ-ও স্পষ্ট করেছেন যে জামায়াতের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ রাজনৈতিক নয়, ধর্মীয়।
হেফাজত আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর ভাষা আরও কঠিন। ২০২৫ সালের আগস্টে চট্টগ্রামের একটি মাহফিলে তিনি জামায়াতকে ‘ধোঁকাবাজ ইসলামি দল’ এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের মানদণ্ডে ‘কাদিয়ানিদের চেয়েও খারাপ’ বলেছেন বলে গণমাধ্যমে এসেছে।

প্রতিক্রিয়ায় এই মন্তব্যকে ‘অসত্য, বানোয়াট ও কুরুচিপূর্ণ’ বলেছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। অতীতে জামায়াত এমন আক্রমণ সাধারণত এড়িয়ে যেত। বোঝা যায়, এবার সে নীতি ভেঙেছে।

প্রশ্ন ওঠে, ইসলামি রাজনীতির সবাই প্রায় একই লক্ষ্যের কথা বলেন, তবু কওমি আলেমদের একটি বড় অংশ জামায়াতকে এত দূরের মনে করেন কেন?

উত্তরে বলা যায়, বিরোধের কারণ একটি নয়, তিনটি। ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ‘আকিদা’র তর্ক আছে। ইসলামের ব্যাখ্যা দেওয়ার কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে, সেই প্রতিযোগিতা আছে। আর আছে ইতিহাসের জমে থাকা সন্দেহ।

তাহলে কেন আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কওমি আলেমরা কখনো জামায়াতের সঙ্গে বসেন, কখনো তাকে গোমরাহ বলে ঠেলে দেন। কারণ ‘বিশ্বাস’ বদলায় না, বদলায় রাজনীতির হিসাব।

.ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বই: ইসলামি আন্দোলন নিয়ে কিছু অনালোচিত প্রশ্ন.ব্যারিস্টার রাজ্জাকের স্মৃতিকথা: ’৭১ ইস্যুতে ক্ষমা চাওয়া প্রশ্নে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব.

এই বিরোধ বাইরে থেকে আসেনি। এর সূচনা জামায়াতের ভেতর থেকেই। ১৯৪১ সালে জামায়াত যখন যাত্রা শুরু করে, তখন কওমি বা দেওবন্দি ঘরানার কয়েকজন আলেম তার সঙ্গে ছিলেন। মাওলানা মনজুর নোমানি তাঁদের একজন, দলের প্রতিষ্ঠাতা ও নায়েবে আমির। প্রতিষ্ঠাতাদের আরেকজন দেওবন্দের পরিচালনা কমিটির সদস্য আবুল হাসান আলী নদভি, যিনি জামায়াতের প্রথম মজলিসে শুরার সদস্যও হয়েছিলেন। দুজনই এক বছরের মধ্যেই সংগঠন ছেড়ে যান।

নোমানি পরে মাওলানা মওদুদি কে সাথ মেরি রেফাকত কি সরগুজশত (মাওলানা মওদুদির সঙ্গে আমার সাহচর্যের ইতিকথা) বইয়ে লেখেন, নবীজী (সা.) প্রিয় সহচর তথা সাহাবি, পূর্বসূরি আলেম আর ইসলামের আধ্যাত্মিকতা নিয়ে জামায়াতের প্রধান প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদির কিছু লেখার সঙ্গে তিনি একমত হতে পারেননি।

আলী নদভি তাঁর আত্মজীবনী কারওয়ানে জিন্দেগিতে লিখেছেন, মাওলানা মওদুদি ইবাদত, তাসাউফ আর বিশ্বাসের লক্ষ্যকে ‘ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার’ উপায় হিসেবে দেখেছেন। নদভির মতে, ইসলামি রাষ্ট্র ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। চূড়ান্ত লক্ষ্য মানুষের অন্তরে আল্লাহর দাসত্ব সৃষ্টি আর পরকালের মুক্তি।

.

এই দুজন ভারতের আলেম। বাংলাদেশে একই ধারার অগ্রগণ্য নাম গোপালগঞ্জের সদর সাব হুজুর হিসেবে পরিচিত এবং ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী। তিনি বহু বছর জামায়াতকে সমর্থন করেছিলেন। পরে জামায়াত ও মওদুদির বিশ্বাস আর প্রয়োগের সমালোচনা করে ‘ভুল সংশোধন’ নামে একটি বই লেখেন।

জামায়াত নিয়ে এ তিনজনের সমালোচনার একটাই ফল নিয়ে আসে—জামায়াতের সঙ্গে দেওবন্দি ধারার বিরোধকে আর ‘বাইরের মাদ্রাসাওয়ালাদের হিংসা’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। একসময়ের ঘরের মানুষেরাই জামায়াত নিয়ে এসব সমালোচনা বা অভিযোগ তুলেছেন। যদিও তাঁদের সমালোচনা নিয়ে জামায়াতেরও নিজস্ব ব্যাখ্যা বা পাল্টা জবাব আছে।

জামায়াতের সাবেক নেতা এই কওমি আলেমদের এসব সমালোচনার পর দুই পক্ষের বিরোধ আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। ১৯৫১ সালের ৩ আগস্ট দেওবন্দি ঘরানার প্রবীণ আলেমরা একটি যৌথ ফতোয়ায় মওদুদির চিন্তা আর জামায়াতের কিছু সিদ্ধান্তকে ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদার পরিপন্থী’ বলেন।

.জামায়াত সমর্থনে জোয়ার বা হাইপ, ’৯১-এর পুনরাবৃত্তির আলাপ ও বাস্তবতা.

অভিযোগ ছিল মূলত তিনটি। প্রথমত, সাহাবিদের সমালোচনা। দ্বিতীয়ত, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, অর্থাৎ নামাজ, রোজা, হজের মতো ইবাদতকে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ হিসেবে দেখা। তৃতীয়ত, নবীদের নিষ্পাপ না মানা।

স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন দেওবন্দের শাইখুল হাদিস হুসাইন আহমদ মাদানি, অধ্যক্ষ কারি মুহাম্মদ তৈয়্যেব, ফাজায়িলে আমাল –এর লেখক মুহাম্মদ যাকারিয়া, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সম্পাদক মুহাম্মদ মিয়াঁ প্রমুখ।

ফতোয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা মওদুদির বইপত্র আর জামায়াতের তৎকালীন প্রচারপত্র ও সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করেই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছান। ফতোয়াটি প্রথম ছাপা হয় দিল্লির দৈনিক আল-জমিয়ত-এ। পরে দেওবন্দের মুখপত্র মাসিক দারুল উলুম-এ পূর্ণাঙ্গ রূপে পুনর্মুদ্রিত হয়। এরপর নানা সময়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে দেওবন্দ একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।

.

না, প্রশ্ন আছে ধর্মীয় কর্তৃত্বেরও—ইসলাম কী বলে, তা ঠিক করবেন কে? যিনি বছরের পর বছর মাদ্রাসায় পড়ে ইসলামের শাস্ত্রীয় ‘সনদের ধারাবাহিকতা’ অর্জন করেছেন, তিনি? নাকি যিনি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভালো লেখার জোরে ইসলামের কথা বলছেন, তিনিও?

মাওলানা মওদুদি নিজে প্রথাগত আলেম ছিলেন না। জামায়াত গড়ে উঠেছে আদর্শবাদী কর্মী বাহিনীর ওপর, সেখানে নেতৃত্বের শর্ত আলেমের সনদ নয়। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক মুহাম্মদ কাসিম জামান দ্য উলামা ইন কনটেম্পোরারি ইসলাম বইয়ে দেখিয়েছেন, আধুনিক যুগে উপমহাদেশের আলেমদের সঙ্গে মাওলানা মওদুদির মতো ‘সাধারণ শিক্ষিত’ ইসলামি চিন্তাবিদদের টানাপোড়েনের বড় জায়গা এই কর্তৃত্বের প্রশ্ন।

জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইয়েদ ওয়ালি রেজা নসর মাওলানা মওদুদি অ্যান্ড দ্য মেকিং অব ইসলামিক রিভাইভালিজম বইয়ে দেখিয়েছেন, মাওলানা মওদুদি ধর্মীয় নেতৃত্বের ভার আলেমের সনদের চেয়ে আদর্শবাদী কর্মীদের হাতে রাখতে চেয়েছিলেন।
কওমি আলেমদের কাছে এটি একটি চ্যালেঞ্জ। তাঁরা নিজেদের ধর্মের ধারক মনে করেন।

.সমাজে ধর্মীয় বিতর্কের রূপান্তর ও মীমাংসা–অমীমাংসার সীমানা.

যেহেতু হাদিসেই আছে, আলেমরা নবীদের উত্তরসূরি (সুনানে তিরমিজি: ২৬২২)। অথচ একটি রাজনৈতিক সংগঠন সেই ধারকের ভূমিকা কেড়ে নিতে চাইছে, এমন ধারণা তাঁদের মধ্যে কাজ করে। কওমি অঙ্গনে একটি আশঙ্কাও ঘোরে—জামায়াতের শক্তি বাড়লে তারা মাদ্রাসা ও মসজিদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে চাইবে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর এমন অভিযোগ বিভিন্ন এলাকা থেকে শোনাও গেছে।

আজকের রাজনীতিতেও এর ছায়া স্পষ্ট। নারীনীতি, ধর্মীয় অবমাননা বা ভোটের প্রশ্নে হেফাজত আর জামায়াত দুই পক্ষই একই ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর সমর্থন চায়। ফলে বিশ্বাসের তর্ক সহজেই ‘নেতৃত্ব দেবে কে’ প্রশ্নে গড়িয়ে যায়। না, এর মানে এ নয় যে ‘আকিদা’র আপত্তি শুধু অজুহাত। বরং তর্কটা এত তীব্র হয়, কারণ তার পেছনে একটা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও আছে।

.

পুরোনো ক্ষতের প্রথমটি ১৯৪৭। দেশভাগের সময় দেওবন্দি আলেমরা নিজেরাই বিভক্ত ছিলেন। হোসাইন আহমদ মাদানি অখণ্ড ভারতে মিলিত জাতীয়তার পক্ষে ছিলেন, শাব্বির আহমদ উসমানি পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে। মাওলানা মওদুদি মুসলিম লীগের নেতৃত্বের ইসলামি যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, আবার মিলিত জাতীয়তার তত্ত্বেরও বিরোধী ছিলেন। পাকিস্তান হওয়ার পর তিনি সেখানে গিয়ে ইসলামি সংবিধানের দাবি তোলেন। পাকিস্তানপন্থী আলেমরা তখন ক্ষুব্ধ হন যে যিনি আন্দোলনে ছিলেন না, তিনি এখন ফল খেতে চাইছেন।

সংকট হয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ঘিরেও। জামায়াতের সর্বৈব ভূমিকা তখন অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে। কিন্তু কওমি রাজনীতিকদের প্রধান অংশটি ভারতের মাদানি পরিবারের নেতৃত্বাধীন জমিয়ত প্রভাবিত হওয়ায় তারা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে ভূমিকা রাখেন, আর নেজামে ইসলাম প্রভাবিত অংশটি নীরবতা বেছে নেয়।

আজ কওমি নেতারা জামায়াতের বিরুদ্ধে যে যুক্তি দেন, তার মধ্যে ‘একাত্তর’ ভারী নয় বটে। কিন্তু জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা যে জোট থাকা কওমি নেতাদের কাঁধে বাড়তি রাজনৈতিক ঝুঁকি চাপায়—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

.বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক: ‘একাত্তর কার্ড’ যেভাবে ভারসাম্য রাখছে.বিএনপি কেন জুলাইয়ের মালিকানা জামায়াত-এনসিপির হাতে তুলে দিচ্ছে.

আবার ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরও দুই পক্ষের সম্পর্কে গভীর ছাপ ফেলেছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, হেফাজতের ঢাকা অভিমুখী কর্মসূচিতে জামায়াত-শিবির জনবল ও রসদ দিয়ে সহায়তা করেছিল। হেফাজতকে তখন বিভিন্ন মহল থেকে জামায়াতের ‘সহযোগী’ বলা হচ্ছিল। এর জবাবে হেফাজতের তৎকালীন আমির গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জামায়াতের সহযোগী বলার চেয়ে বরং গুলি করে মেরে ফেলুন।’ এমনকি ৫ মের রাতের পর কওমি অঙ্গনের বড় অংশে ধারণা হয়, জামায়াত তাঁদের কাঁধে ভর করে নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিল করতে চেয়েছিল।

অবিশ্বাস কিন্তু একতরফা নয়। ২০১৮ সালে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাসনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পর হেফাজত নেতারা শুকরানা মাহফিলে জড়ো হলে জামায়াত নেতারা তাকে কওমি আলেমদের ‘রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ’ আর ‘আওয়ামী লীগ সরকারের হাতে ব্যবহৃত’ হওয়া বলেও মন্তব্য করেন।

.

তবু ঐক্যের চেষ্টাও কম হয়নি। কওমি আলেম আর জামায়াতকে বারবার একই মঞ্চেও দেখা গেছে। সত্তরের দশকে আইয়ুববিরোধী বিরোধী জোটগুলোতে নেজামে ইসলাম ও জামায়াত একসঙ্গে ছিল। নব্বইয়ের দশকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে দুই পক্ষ আলাদা ব্যানারে হলেও একই দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। ১৯৯৯ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট গঠিত হলে ইসলামী ঐক্যজোট আর জামায়াত একই জোটে বসে, ক্ষমতার অংশীদারও হয়।

এসব ইতিহাস নিয়ে জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম বাংলাদেশে ইসলামী ঐক্য প্রচেষ্টার ইতিহাস নামে একটি বইও লিখেছেন। সেখানে তিনি মামুনুল হকের বাবা শাইখুল হাদিস আজিজুল হকের ‘প্রচেষ্টা’র প্রশংসা করেছেন।

কিন্তু ওই জোট কওমি অঙ্গনে প্রবল প্রশ্নও তুলেছিল। অনেক আলেম বলেছিলেন, মাওলানা মওদুদির আকিদা যাঁরা ভুল মনে করেন, তাঁরা একই জোটে কীভাবে? চরমোনাইয়ের তৎকালীন পীর সৈয়দ ফজলুল করীম জামায়াতের ‘ত্রুটিপূর্ণ আকিদা’র প্রশ্নে ঐক্যজোট থেকে বেরিয়ে যান। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একটি অংশ আপত্তি জানায়।

.

আশির দশকের কওমি ঘরানার অন্যতম নেতা এবং সে সময়ের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হাফেজ্জী হুজুরের খেলাফত আন্দোলনের অবস্থান ছিল, ইসলামপন্থীদের ঐক্য হওয়া উচিত দেওবন্দি আকিদার ভিত্তিতে, মওদুদিপন্থী বা অন্য কোনো দলের পেছনে থেকে নয়। পরে কওমি দলগুলো নিয়ে গঠিত ‘ইসলামী ঐক্যজোট’ই ভেঙে কয়েক টুকরা হয়ে যায়।

যদিও ২৪ পরবর্তী নতুন পরিস্থিতিতে ইসলামি দলগুলোর ভোটবাক্স একটা করার উদ্যোগ এসেছিল দীর্ঘদিনের বিরোধী জামায়াত ও চরমোনাইয়ের মাধ্যমে। কিন্তু সেখানে অন্যান্য ‘ইসলামী দল’ যুক্ত হতে হতে চরমোনাই বেরিয়ে গেল। কেউ কেউ জামায়াতের সঙ্গে থাকল, কেউ সমঝোতা করল বিএনপির সঙ্গে, কেউ স্বতন্ত্র অবস্থানে থাকল। এক বাক্স পরিণত হলো তিন বাক্সে।

ফলে এখন অন্তত কওমি দলগুলোর বহু বিভক্ত টুকরোগুলোই আবার জোড়া লাগাতে চায় হেফাজত। কেন? কারণ, চব্বিশের পর আরও একটি লক্ষ করার মতো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে-কওমিপন্থিদের জামায়াতে যোগদান, যা এতদিন ছিল বিরল। একসময় গণতন্ত্রবিরোধী ‘জিহাদি’ বক্তব্যের জন্য পরিচিত মুফতি আলী হাসান উসামাসহ কওমি পড়ুয়া বেশ কয়েকজন আলেম, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক জামায়াতে নাম লিখিয়েছেন। নতুন যোগ দেওয়া কেউ কেউ কওমি মাদ্রাসায় শিবিরের কমিটি গঠনের দাবিও তুলেছেন।

অনেকে মনে করেন, হেফাজতের ঐক্য-উদ্যোগের মূল কারণ এটাই যে প্রবীণ আলেমরা আশঙ্কা করছেন, কওমি দলগুলোর অনৈক্য তাদের শক্তিহীন করছে, আর তরুণ প্রজন্ম আস্থা হারাচ্ছে। জামায়াতে যোগদান সেই হতাশারই প্রতিক্রিয়া।

.বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, সিপিবি, ইসলামী আন্দোলন নীতিগত প্রশ্নে যা বলছে.ইতিহাসের মনগড়া ভাষ্য তৈরিতে বিজেপির পথ ধরেছে জামায়াত.

এবার প্রশ্ন ওঠে, এতই যদি বিরোধ জামায়াতের সঙ্গে, তাহলে আবার জোট বাঁধেন কেন? আকিদার আপত্তি তো সেই ১৯৫১ সালে যেমন ছিল, তেমনই আছে। আকিদাই যদি সব ঠিক করে, তাহলে তো এই যাওয়া-আসা ঘটার কথা না।

বোঝা যায়, আকিদা একটি দেয়াল বটে, কিন্তু সেই দেয়ালের দরজা কখন খুলবে, ঠিক করে রাজনীতির হিসাব—কে ক্ষমতার কত কাছে, কার ভোট কোথায়, কার নেতৃত্ব কতটা টলছে। কারও ‘গোমরাহি’ বা কারও ‘ধোঁকাবাজ’ বলা, কারও ‘বাস্তবতা’ কিংবা কারও মিলতে মিলতে গিয়ে জোট ভাঙা—সবই এই এক হিসাবের ভিন্ন ভিন্ন ফলও হতে পারে।

কিন্তু এই ফল ঠিক কি বেঠিক কিংবা সেটা ভালো কি মন্দ, কারা সঠিক কারা না—তা বুঝতে আমাদের আরও অপেক্ষা করা লাগতে পারে। জামায়াতের পক্ষ থেকে কওমি আলেমদের মনের সংশয় দূর করার মতো স্পষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান আছে কি নেই—তা–ও পরিষ্কার নয়।

শুধু এটুকু স্পষ্ট যে কিছু বিষয়ে মাওলানা মওদুদির ‘বিতর্কিত অবস্থান’ ঘিরে কীভাবে জামায়াত এবং সেখানে কতটুকু ছাড় দেবে তারা—সেই প্রশ্নের খোলামেলা উত্তর ছাড়া কওমিদের মনের দেয়াল আশু ভাঙবে না। আর বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের রাজনীতির মানচিত্রের জটিলতারও সুরাহা হবে না।

  • মনযূরুল হক প্রথম আলোর ধর্ম বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
    মতামত লেখকের নিজস্ব