নেতানিয়াহুর সাফল্যে আশা দেখছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
- আপডেট সময় : ১২:৩২:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

ইসরায়েলের নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা হয়নি। তবে বুথফেরত জরিপ এবং এ পর্যন্ত গণনা হওয়া ভোট থেকে স্পষ্ট, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। তাঁর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী রাজনৈতিক জোটও আসনের হিসাবে এগিয়ে। যদিও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ৬১টি আসন তাঁর জোট পাচ্ছে না, এটা নিশ্চিত।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত সোয়া আটটা পর্যন্ত ৯৭ শতাংশ ভোট গণনা হয়েছে।
ইসরায়েলের দৈনিক হারেৎজ–এর তথ্য অনুযায়ী, এতে নেতানিয়াহুর জোট ৫৩ এবং সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৮ আসন পাওয়ার পথে। অন্যদিকে আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে। ফলে নেতানিয়াহুকে বাদ দিয়ে সরকার গঠন করতে হলে বিরোধীদের আরব দলগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন প্রয়োজন।
.ক্ষমতা হারানোর ভয়েই কি আরব দলগুলোর ওপর আক্রমণ বাড়িয়েছেন নেতানিয়াহু.
সমস্যা হলো, আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা নিয়ে বিরোধী শিবিরে তীব্র আপত্তি রয়েছে। আইজেনকট নিজেও নির্বাচনের আগে আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের পথে বাধা তৈরি করে, এমন অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর সম্ভাব্য ডানপন্থী শরিকদের আপত্তিও প্রবল। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁরা মত বদলাবেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বিরোধীরা সরকার গঠন করতে না পারলে নেতানিয়াহু তাঁদের একাংশকে নিজের দিকে টেনে একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন। সরকার গঠনের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে আবার নির্বাচন হতে পারে। তত দিন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পাবেন তিনি। অর্থাৎ সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েও রাজনৈতিকভাবে টিকে যেতে পারেন নেতানিয়াহু।
.যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু এবারও কি টিকে যেতে পারেন, কী কৌশল নিতে পারেন তিনি.
ইসরায়েলের নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সমর্থন জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। সেই সমর্থন ভোটে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নির্ধারণের উপায় এখনো নেই। ট্রাম্প অবশ্য কৃতিত্ব নিতে দেরি করেননি। গত বুধবার সাংবাদিকদের কাছে তিনি দাবি করেন, নেতানিয়াহু প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করেছেন, এর পেছনে তাঁর সমর্থন কাজে লেগেছে। ফল অমীমাংসিত থাকলেও এই পরিস্থিতিতে সমতাকেও জয় হিসেবে দেখা যায়, বলেছেন তিনি।
পরে ট্রুথ সোশ্যালে নিজের অ্যাকাউন্টে প্রচার করা একটি বক্তব্যে ট্রাম্পের সমর্থনের পর নির্বাচনী হাওয়া বদলে যাওয়ার দাবি তুলে ধরা হয়। সম্ভাব্য বড় পরাজয়ের বদলে নেতানিয়াহু যে লড়াইয়ে ফিরে এসেছেন, তার কৃতিত্বও দেওয়া হয় ট্রাম্পকে।
ট্রাম্পের সমর্থক রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা আরও স্পষ্ট ভাষায় নেতানিয়াহুর এই সাফল্যের পেছনে ট্রাম্পের ভূমিকার কথা বলেছেন। রক্ষণশীল বিশ্লেষক মার্ক লেভিন বলেছেন, নির্বাচন-পূর্ব জরিপ মিথ্যা প্রমাণ করে নেতানিয়াহু অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। এর পেছনে অবশ্যই ট্রাম্পের সমর্থন একটি ভূমিকা পালন করেছে। একই কথা বলেছে ট্রাম্প-সমর্থক ব্রেইটবার্ট নিউজ। নেতানিয়াহুর সাফল্যকে তারা ‘পেছন থেকে ফিরে আসা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই দুই নেতার পারস্পরিক বোঝাপড়া ও অংশীদারত্বের ফলে এখন ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান পরিচালনা সম্ভব হবে, এই আশা তাদের।
.
নেতানিয়াহু ও তাঁর জোট জরিপে পিছিয়ে থাকলেও ভোটের ফলে সে হিসাব পাল্টে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির সমর্থকেরাও সেই আশাই পোষণ করছেন। এই মুহূর্তে অধিকাংশ জনমত জরিপে ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টি মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিশ্চিত ভরাডুবির মুখে। ট্রাম্প-ভক্তদের আশা, জরিপ সঠিক নয়। স্পাকার মাইক জনসন ফক্স নিউজকে বলেছেন, যেসব জরিপে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের কথা বলা হচ্ছে, তারা ভুল। কারণ, একদিকে ত্রুটিপূর্ণ বিশ্লেষণ, অন্যদিকে রিপাবলিকান সমর্থকদের গোনার বাইরে রাখার ফলে এসব জরিপে সঠিক চিত্রটি ফুটে ওঠেনি। তাঁর দাবি, রিপাবলিকান ভোটাররা এসব জরিপ নিয়ে মোটেই উদ্বিগ্ন নয়।
একই কথা ট্রাম্পেরও। নির্বাচনী প্রচারে তাঁর সমর্থকদের বিপুল উপস্থিতি উল্লেখ করে সব নেতিবাচক জরিপকে তিনি ‘ফেক নিউজ’ বলে খারিজ করে দিয়েছেন।
সমাবেশের ভিড় অবশ্য প্রতিনিধিত্বশীল জনমত জরিপের বিকল্প নয়। ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলও যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকানদের একই ধরনের সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। কিন্তু নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে সমর্থকদের মনোবল ধরে রাখতে এই তুলনা কাজে লাগতে পারে।
.
ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর একটি নির্বাচনী অস্ত্র ছিল ভীতি। ইসরায়েল শত্রুবেষ্টিত, হামাস ও ইরান যেকোনো সময় তার ওপর থাবা বসাতে পারে। এ অবস্থায় একমাত্র তিনিই পারেন ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। ট্রাম্পের প্রচারেও ভীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তিনি বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে তাঁর প্রশাসনের অর্জন নস্যাৎ হবে এবং দেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। তাঁর এই প্রচারকৌশলের একটি দিক হলো মুসলিম প্রার্থী ও অভিবাসীদের নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে তুলে ধরা।
মিশিগানের ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদকে ট্রাম্প ‘জিহাদি’ আখ্যা দিয়েছেন এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন। আল-সাইয়েদের সঙ্গে ওই সংগঠনের সম্পর্কের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি; তিনিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কিন্তু নির্বাচনের আগে এমন অভিযোগ বারবার উচ্চারণের মাধ্যমে তাঁকে বিপজ্জনক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
.
রাজনৈতিক বক্তব্যে ভীতি ছড়ানোর পাশাপাশি ভয় পাওয়ার মতো কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলেছে ট্রাম্প প্রশাসন। শোনা যাচ্ছে, ভোটকেন্দ্রে অভিবাসন পুলিশ পাঠানো হতে পারে। প্রশাসন অবশ্য বলেছে, আইস এজেন্টদের দিয়ে ভোটকেন্দ্রে টহল দেওয়ানোর পরিকল্পনা নেই, কিন্তু সে কথায় সবাই আশ্বস্ত, তা মনে হয় না। আরও ভয়ের কথা, বিচার বিভাগ প্রায় এক হাজার নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ফেডারেল ভোটাধিকার আইন পালিত হচ্ছে কি না, দেখতে পর্যবেক্ষক পাঠানোর ব্যবস্থা পুরোনো। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক পর্যবেক্ষক আগে কখনোই পাঠানো হয়নি। ভোটাধিকার নিয়ে কাজ করেন, এমন একাধিক সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, ভোটকেন্দ্রের আশপাশে ফেডারেল এজেন্টদের উপস্থিতি কোনো কোনো ভোটারকে ভোটদানে অনুৎসাহিত করবে।
ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকদের কেউ কেউ অবশ্য আরও কয়েক কদম এগিয়ে সশস্ত্র প্রহরার কথা বলছেন। তাঁর সাবেক প্রধান কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন গত জুনে লাস ভেগাসের ‘ফ্রড ফাইটার সামিটে’ রিপাবলিকান সমর্থকদের প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানান। যদি স্থানীয় আইন অস্ত্র বহনে আপত্তি না করে, তাহলে তাঁরা অস্ত্র নিয়ে যাবেন, এমন কথাও তিনি বলেন।
.
রিপাবলিকান সমর্থকদের অস্ত্র হাতে ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার ঘটনা আগেও ঘটেছে। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অ্যারিজোনায় ট্রাম্পপন্থী একটি সংগঠনের সশস্ত্র সদস্যরা ব্যালট জমা দেওয়ার বাক্সের কাছে নজরদারি চালিয়েছিলেন। ভোটারদের ভয় দেখানোর অভিযোগে পরে ফেডারেল আদালত তাঁদের কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ আরোপ করেন।
নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোটকেন্দ্রে সশস্ত্র উপস্থিতি কিছু ভোটারকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সিনসিনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডেভিড নিভেন আলাবামার ২০১৭ সালের বিশেষ সিনেট নির্বাচন বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, ভোটকেন্দ্রের বাইরে পুলিশের উপস্থিতির সঙ্গে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের অংশগ্রহণ আনুমানিক ৩২ শতাংশ কম হওয়ার সম্পর্ক ছিল। ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিসের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, অধিকাংশ ভোটার বাস্তবে সশস্ত্র এজেন্টদের মুখোমুখি না হলেও সেই সম্ভাবনার ভয় তাঁদের কাউকে কাউকে ভোটদান থেকে বিরত রাখতে পারে।
























