রোদের শেষ রেখা
- আপডেট সময় : ০৯:৪২:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

‘দ্য মোর আই সি ইউ, আই অ্যাম ইন লাভ।’ কতবার ফোনের দিকে তাকিয়েছি। যতটা ভেঙে যাওয়ার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে আর দাঁড়ানো যায় না, এখন সেখানে আমি। পাজামার ফিতে নেমে এসেছে, অন্তর্বাসহীন শরীর, হাত–পা থরথর কাঁপছে। তাকিয়ে আছি দেয়ালের ছবিটার দিকে—ছ’ফুট উচ্চতার যুবায়ের হাসান—আমার নিঃশব্দ আততায়ী।
আগামীকাল রাতেই ওর ফ্লাইট। তাহলে আমরা একই শহরে শ্বাস নিচ্ছি বিশ ঘণ্টারও কম সময়। ছাইভরা অ্যাশট্রেটা পড়ে আছে। দুমাস ধরে যুবায়ের এখানে থাকে না। অ্যাশট্রেটায় এখনো ওর ঠোঁটের শেষ মার্লবোরো। অ্যাশট্রেটা ওর মেরিল্যান্ডের বাসায় ছিল। আমিই কিনে দিয়েছিলাম।
মেরিল্যান্ডে বাসাটা ছিল ছোট, সাত-আট ফুটের ঘর। একজন কালো মিক্সড রুমমেট ছিল ওর, যার চেহারা অনেকটা বব ডিলানের মতো আর ছেলেটার বান্ধবী—কালো মেয়েটা, যার অপুষ্ট শরীরের ওপর থেকে বেরিয়ে থাকত শীর্ণ নদীর মতো ক্লিভেজ। ছেলেটার ছিল ব্রেইড করা চুল। একটু কাছে গেলেই উৎকট নারকেল তেলের গন্ধ আর প্রতি রাতে ওদের দেয়াল ভেদ করে আসত নীল ছবির মতো শীৎকার।
ফিলাডেলফিয়া থেকে মাঝে মাঝেই যেতাম ওকে দেখতে, সন্ধ্যায় যে ট্রেনটা ছাড়ে, তাতে। বাস স্টপেজ থেকে একটা সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসতে হতো, যে সিঁড়ির এক পাশের হাতল নেই। তারপর সিঁড়িগুলো কয়েক দিকে ভাগ হয়ে একদিক এসে মিশেছে রেলস্টেশনে। স্টেশনের এক পাশে সাদা ম্যাগনোলিয়ার ঝাড়। আর রাস্তার ওপাশে যেখানে ট্রাফিক সিগন্যালের খুঁটি, সেখানে দাঁড়িয়ে এক পাইন।
.
স্টেশনটা অনেক পুরোনো। হঠাৎ করে ঢুকলে মনে হবে একটা কাঠের আলমারিতে ঢুকে পড়েছি। দেয়াল, ছাদ, চেয়ার—চারদিকেই কাঠ। ট্রেন এলেই হুইসেল শুনে ওপরে ওঠার সিঁড়িতে হুড়মুড় করত কিছু কালো মানুষ। এক প্রশস্ত নাকের ইথিওপিয়ান আমাদের টিকিট দেখত আর আমরা নকল হাসি দিয়ে থ্যাঙ্ক ইউ বলতাম। কম্পার্টমেন্টে উঠে গেলে সহজেই চোখে পড়ত স্টেশনের পাশের নিচের রাস্তা, যেখানে রাত নামলেই ফুটপাতটা বুকে জড়িয়ে শুয়ে থাকত কিছু গৃহহীন মানুষ।
যুবায়ের নিতে আসত স্টেশনে। আর সব হারিয়ে যখন একটু একটু করে গুছিয়ে নিচ্ছি, তখনো যেন সে এল আমার জীবনের এক থেমে থাকা স্টেশনে, যে স্টেশন হারিয়ে গিয়েছিল শহরের মানচিত্র থেকে, সেই স্টেশনের এক বিকল ইঞ্জিনে ধোঁয়া তুলল সে।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে যুবায়েরের করনার্ডস হিলের স্টুডেন্ট হাউজিংয়ে যাওয়ার আগে যে রাস্তাটা পড়ে, ওখানে একদিন তুষারে হেঁটেছিলাম। চাকরি করলেও ও খরচ বাঁচাতে ছাত্রদের সঙ্গেই থাকত। যেদিন প্রথম নিতে এল, যুবায়েরের ওই দীর্ঘ শরীরটা সেই তুষারের খোলা রাতের হু হু বাতাসকে উষ্ণ করে তুলেছিল আর কিছুটা উষ্ণ ও আমাকে করে তুলছিল। ওই রাতে ওর কাছে আমি ছিলাম সাদা কাচের জারে সাজানো পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান ওয়াইন, যার ওকে খুব দরকার।
যুবায়েরের সঙ্গে পরিচয়টা এ দেশে এসে। বাংলাদেশি ডায়াস্পোরাদের নিয়ে একটা কাজে। ইউনিভার্সিটি কমিউনিটির একটা কাজে সে ফোন করেছিল কয়েকবার। অনেকটা সামাজিক বিরতির পর, আমার কণ্ঠস্বর তখনো ফিকে, মানুষের সঙ্গে কথাবার্তায় ঠিক অভ্যস্ত হতে পারিনি। গান গাইতে জানি বলে, এখানকার মোবাশ্বের ভাই জোর করে, বিএসএর কালচারাল প্রেসিডেন্ট করে দিয়েছে। তাতে খুব যে অস্বস্তিতে পড়েছি তা নয়, তবে কখনো ভাবিনি এভাবে আবার জনারণ্যে ফিরতে পারব!
.
একটা উদ্দাম ঘোড়ার মতো অথচ নিঃশব্দে ছুটতে হয়েছে বিগত কয়েক বছর। কোর্টের এ বারান্দা থেকে ও বারান্দা। না, জয়ী হতে পারিনি। শেষমেশ এই স্কলারশিপটাই নতুন করে বাঁচার পথ দিল। আমার ছেলে আরিয়ানের তখন চার বছর, কাস্টডি মামলায় হেরে অতটুকুন বাচ্চাটাকে রেখেই চলে এলাম। আমার সাবেক স্বামীর সঙ্গে লড়াইয়ে ক্রমেই ক্লান্ত আর আর্থিকভাবেও কুলিয়ে উঠতে পারছিলাম না। মা–বাবা, ভাইয়েরা অনেকটাই অসন্তুষ্ট। ভাই তো বলেই দিল, ‘ও তো ওর বাবার কাছে ভালোই আছে, তুই কেন বাড়াবাড়ি করছিস। ছেলের কাস্টডি পেলে কি খুব ভালো হবে তোর? কেউ বিয়ে করবে, দায়িত্ব নিতে চাইবে?’ ভাইয়া কিন্তু আরিয়ানকে ভালোই বাসত। তবে তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙাটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়।
যুবায়ের যখন ফোন করত, স্পষ্টত বুঝতে পারছিলাম প্রয়োজনের চেয়ে বেশিই ফোন করা হচ্ছে এবং যথাসম্ভব দূরত্ব রেখে কথা বলেও বুঝতে পারছিলাম, দূরত্বটা কেন জানি থাকছে না।
একদিন মন খারাপ ছিল। খুব টেনেটুনে চলি, মামলার খরচ, কিছু ঋণ হয়েছিল। সামনে আরিয়ানের বার্থডে, ওকে একটা কিডস কার কিনে দিতে হবে, আরিয়ান গাড়ি খুব পছন্দ করে। বিগত দুবছর ওকে কিছু দিতে পারিনি, আর ওর বাবাও দিতে দেয়নি, কত করজোড় করেছি!
কিছু খেতে ইচ্ছা করছিল না, তবু ফ্রিজ খুললাম। ফোনে রিং বাজছে। যুবায়েরের টেক্সট—ফ্রি আছ? একটা ডিম বের করতে করতে উত্তর দিলাম ‘হুম’। ফ্রাইপ্যানটা বসিয়ে ডিম ছাড়লাম ফোন কানে নিয়েই। যুবায়ের কথা বলে চলেছে—ওর সেই কণ্ঠস্বর—যেন এক নির্জন অরণ্যে হাঁটছে কেউ, দূর থেকে ভেসে আসছে তার প্রতিধ্বনি। নাকি বহুদিন কোনো পুরুষের সঙ্গে একান্ত আলাপন নেই বলে এ আমার হ্যালুসিনেশন!
.
একটা উদ্দাম ঘোড়ার মতো অথচ নিঃশব্দে ছুটতে হয়েছে বিগত কয়েক বছর। কোর্টের এ বারান্দা থেকে ও বারান্দা। না, জয়ী হতে পারিনি। শেষমেশ এই স্কলারশিপটাই নতুন করে বাঁচার পথ দিল। আমার ছেলে আরিয়ানের তখন চার বছর, কাস্টডি মামলায় হেরে অতটুকুন বাচ্চাটাকে রেখেই চলে এলাম। আমার সাবেক স্বামীর সঙ্গে লড়াইয়ে ক্রমেই ক্লান্ত আর আর্থিকভাবেও কুলিয়ে উঠতে পারছিলাম না।
.
—কেন মন খারাপ করে আছ?
ও বলে চলেছে—
—জানো, তোমার সঙ্গে কথা বললে মনে হয় এক শান্ত দিঘির পাশে বসে আছি, যার জল নীরবে বয়ে যাচ্ছে।
কিছু বলিনি অনেকক্ষণ, ওপরতলার অ্যাপার্টমেন্টের বাচ্চারা খেলছে, ধুপধাপ শোনা যাচ্ছে।
—কথা বলছ না যে?
কিঞ্চিৎ অস্বস্তি নিয়ে বললাম, কতজনকে বলেছ এই কথা?
—তাও তো গোটা দশেক হবেই। দাঁড়াও মেসেঞ্জার ঘেঁটে সঠিক সংখ্যাটা জানাই।
এটুকু বলে হাসল কিছুটা।
—মাইন্ড করলে? না, এগজাক্ট এই কথা বলিনি কাউকে। তবে ধরো অন্য কিছু বলেছি। আরও তীব্র গভীর কিছু।
—আমি কি তা জানতে চেয়েছি!
—বাহ, ভারি ডিপ্লোম্যাট তো তুমি! উত্তর জেনে নিয়ে এখন বলছ জানতে চাও না।
—আচ্ছা ফোন রাখো, জানতে চাই না কিছুই।
সত্যি আর কথাও বলতে ইচ্ছা করছিল না। যুবায়ের আমার ব্যাচমেট, অবিবাহিত। ও আমার সম্পর্কে কিছুই জানে না, কথাতে এটুকু বুঝেছি। আচ্ছা, ওকে কি বলা উচিত সব? কিন্তু কীভাবে বলব? ও হয়তো আমাকে নিয়ে কিছুই ভাবছে না। বহুদিন তো মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক কথা হয় না, আমিই হয়তো সব বেশি বেশি ভাবছি। স্পষ্ট স্বরে বললাম, রাখছি।
যুবায়েরের কণ্ঠ একটু দ্বিধান্বিত—
—রেখে দেবে সত্যি?
—হ্যাঁ, তাই তো বললাম। শুনতে পাওনি?
—না পাইনি।
—রেখে দেওয়ার কথা বলছি তো।
—এবারও শুনতে পাইনি।
—আশ্চর্য ব্যাপার তো। ইয়ার্কি করছ?
—না, সমুদ্রের ঢেউ গুনছি। তুমি কথা বললে মনে হয় ঢেউ ভেসে আসছে অনেক দূরের সমুদ্র থেকে, আর সেখানে দাঁড়িয়ে তুমি খোলা চুলে, আর তোমাকে খুব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমি।
—ভালো ফ্লার্টিং জানো তো। কিছুক্ষণ আগেই দিঘি আর এখন সমুদ্র বলছ! আর এদিকে আমি কোনো দিন সমুদ্রেই যাইনি।
জানি না কথাটা কীভাবে বলেছিলাম। ওর কণ্ঠে আর্দ্র সহানুভূতি।
—যাওনি তো কী হয়েছে। মনে মনে তো যেতে পারো। মনে মনে চাইলেই সবখানে যাওয়া যায়। মনের জগৎ অনেক বড়, বিনা পয়সায় সব ঘুরে আসতে পারো।
.
ও কী সব বলে চলেছে! সামারে বাসার সামনে থেকে একটা সোফা কুড়িয়ে এনেছিলাম, সেটাতে হেলান দিয়ে ভাবছি—সমুদ্রে গেছি আরিয়ানের সঙ্গে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, আরিয়ানকে পানি থেকে তুলতে পারছি না।
চুপ ছিলাম হয়তো অনেকক্ষণ।
—সিলভি, কথা বলছ না যে, খুব জ্ঞান দিয়ে ফেললাম নাকি? নাকি মাইন্ড করেছ?
—কিছুটা তো দিয়েছ অবশ্যই। সরি, ঘুম পাচ্ছে, তুমি তো কাজের কথা কিছু বলছ না।
—আরেকটু থাকো না প্লিজ?
—কোথায়?
—বুকের বাঁ পাশে।
বিরক্তি দেখিয়ে ফোন কেটে দিলাম। না, কী করছি আমি? এসব ছেলেমানুষি তো বছর পাঁচ–ছয় আগেই পার করে এসেছি।
যুবায়েরই আবার ফোন দিল, কয়েকবার। সে রাতে আরও কিছু কথা হলো। শুয়ে পড়ার পর মনে হচ্ছিল আমার ফেসবুকের ছবিগুলো নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে যুবায়ের দেখেছে। নিশ্চয়ই আমি ওকে আকর্ষণ করেছি। আকৃষ্ট না হলে ছেলেরা কি কথা বলে? আচ্ছা, ছবিগুলো দেখার সময় ও কি দেখেনি আরিয়ানের ছবিগুলো। ও কি কিছু বুঝতে পারেনি, নাকি আমার ভাইয়ের বাচ্চা ভেবে গুলিয়ে ফেলেছে? নাহ, ও যদি জানেই আরিয়ানের কথা, তাহলে কি আর এভাবে কথা বলবে!
ফেসবুকে ওর একটা ছবি ছিল নববর্ষে স্কাই ব্লু পাঞ্জাবি পরে তোলা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি ওর মন্তব্যের ঘর। এত দ্বিধাদ্বন্দ্ব, তবু কেন পড়েছি জানি না। বুঝতে পারছি, আমার এত দিনের প্রতিরক্ষাবলয়, রূঢ়তার শিকল সব ভেঙে যাচ্ছে, ক্রমেই মোহাবিষ্ট হয়ে মায়া জমাচ্ছে, জেগে উঠছে এক একাকী শরীর। কিন্তু ওর হিউমার, সপ্রতিভ আচরণ—ওকে দাবি করতে সাহস হতো না ঠিক। ও আবার তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ছেড়ে যাবে না তো আমাকে? ও কি ভাবতে পারবে আমিও দামি, আমার সাহচর্যই পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান!
.
এর মাঝে সপ্তাহখানেক কথা হয়নি। ল্যাব নিয়ে খুব ব্যস্ততা ছিল, ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। এসে ডিনার বানিয়ে মাকে হয়তো ফোন করে মামলার আপডেট নিই হেয়ারিং থাকলে। ফ্রাইডে সন্ধ্যায় যুবায়ের ফোন দিল, ওর গলার স্বর স্বাভাবিক ছিল না। ওর মায়ের কথা বলল, মাকে হারিয়েছিল ছোটবেলায়—কণ্ঠস্বরে নিশ্চুপ বিষণ্ণতা, কুয়াশায় মোড়া একটা অস্বচ্ছ দূরের পৃথিবী থেকে যেন কথা বলছিল সেদিন। বলল, সৎভাইবোনদের খুব ভালোবাসে। ও যখন ওর ভাইবোনদের কথা বলত, মনে মনে ভাবতাম ওই বাড়িতে বউ হয়ে হাঁটছি আর ওরা আমাকে ঘিরে হট্টগোল করছে আর যুবায়ের সেই হট্টগোলেও কাকে যেন খুঁজছে। তারপর হঠাৎ আমাকে পেয়ে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে গেছে ছাদে, একটা চিল আমাদের দেখে আকাশে উড়ে গেল বিস্তৃত ডানায় আর ও আমার কানের লতি চুম্বন করে ফিসফিস করে বলছে—
—সিলভি, এইবার তুমি মুক্ত স্বাধীন, আবার ওড়ো, স্বপ্ন দেখো, যা ইচ্ছা তা–ই করো।
যুবায়ের সেদিন যা বলেছিল, সেই শব্দগুলো আমি শুনেছিলাম আরও একবার অন্য আরেকজনের কাছে। কিন্তু সে তো থাকেনি!
—সিলভি, আমার একটা নারী চাই, নিজস্ব নারী, নদীর মতো নারী, উইল ইউ বি মাই গার্ল ফর এভার?
যুবায়েরের আকুতি ছিল ‘উই ফেল ইন লাভ ইন অক্টোবর’ এর সেই গানের মতো। বাইরেও তখন সত্যি হেমন্ত এসেছে। বাড়িগুলোর খয়েরি ছাদে হলুদ কমলা পাতারা রঙিন ঝাঁকালো চুলের মতো ছেয়ে আছে। সামনের লেটার বক্সগুলোর ওপর ম্যাপলের পাতার ঝুরি লাগিয়ে ডেকোরেশন করেছে কেউ কেউ। আর পিচের রাস্তায় ঝরাপাতারা উড়ছে। এর মধ্যে আমার ছেলে আরিয়ানের সঙ্গে এই এক বছরে কথা বলতে পারিনি এক দিনও, ওর বাবা দেয়নি।
.
যুবায়েরই আবার ফোন দিল, কয়েকবার। সে রাতে আরও কিছু কথা হলো। শুয়ে পড়ার পর মনে হচ্ছিল আমার ফেসবুকের ছবিগুলো নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে যুবায়ের দেখেছে। নিশ্চয়ই আমি ওকে আকর্ষণ করেছি। আকৃষ্ট না হলে ছেলেরা কি কথা বলে? আচ্ছা, ছবিগুলো দেখার সময় ও কি দেখেনি আরিয়ানের ছবিগুলো। ও কি কিছু বুঝতে পারেনি, নাকি আমার ভাইয়ের বাচ্চা ভেবে গুলিয়ে ফেলেছে?
.
মাঝে মাঝে বেশ ঠান্ডা পড়ে। পুলওভার চাপিয়ে সেই ঝরাপাতায় হাঁটতে বের হই। বিকেলের দিকে এখনো কিছু বাচ্চা ব্যাকইয়ার্ডে খেলে। যুবায়ের ফোন দিলে, হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতাম। যুবায়ের একদিন হঠাৎ এত কাতর হয়ে পড়ল। ধাতব কিছুতে ধার দিলে যেমন আর্তনাদের মতো শব্দ হয়, ওর কণ্ঠে তেমন বিষণ্ণতা। হঠাৎ আবদার জানাল—
—সিলভি, তুমি কি সন্ধ্যার ট্রেনটা ধরে এক্ষুনি আসতে পারবে?
ওর কথায় হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। যুবায়ের বলে চলেছে—
—ডিসেম্বরের ছুটি পর্যন্ত তো অপেক্ষা করতে পারব না। আমার যে এক্ষুনি তোমাকে চাই।
ও খুব ছুঁতে চাইত। বলত, তুমি চোখ বন্ধ করো। তারপর মনের জগতে যেখানে ইচ্ছা যাওয়া যায়, সেই খেলাটা খেলত। পাহাড় পর্বত কত কিছু ঘুরিয়ে আনত। একদিন বলল, এই মিথ্যে খেলা আর ভালো লাগছে না। আমার সত্যি পুতুলটাকে চাই। ওটা চাবি দিয়ে ঘোরাব এক্ষুনি। আমার শহরে আসবে? রাখবে এই অভুক্ত বালকের কথা?
—আচ্ছা, আসব। কবে বলে দাও?
—বললাম না? আজই।
—সে কি আর হয়? উইন্টার ব্রেক হলে আসি।
ওর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ—
—তুমি কিন্তু শাড়ি পরে আসবে। আর সেদিন উন্মাদ হব আমি। তুমি আটকাতে পারবে না।
—মানে?
—তুমি জানো না সিলভি, কী এক প্রচণ্ড ঝোড়ো ভিজে বাতাস হব সেদিন আমি, তুমি কিছুতেই আমাকে আটকাতে পারবে না। আমি তোমাকে ভেজাবই, তোমার ঘাড়ে গালে চুমু খাব, পেছন থেকে তোমার কোমর জড়িয়ে ধরব। আর আর কি করব জানো?
.
চোখ ভিজে যাচ্ছিল আমার। ডিসেম্বরের শীত তখন জেঁকে বসেছে। জানালা দিয়ে দেখছি একজন লোক ড্রাইভওয়েতে এই ঠান্ডায়ও গাড়ি পরিষ্কার করছে। সেদিকে তাকিয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করছি, নিজেকে কি ক্রমাগত এক অবধারিত সর্বনাশের দিকে টেনে নিচ্ছি? কেন ভুলে যাচ্ছি, আমি একজন পাঁচ বছরের ছেলের মা। না, আমি এখনো ওকে কথাটা বলে উঠতে পারিনি, আমার আরিয়ানের কথাটা!
যুবায়ের বলে চলেছে—
—বাড়িতে আমার মা সব সময় খুব শাড়ি পরত জানো? আমি মায়ের আঁচল ধরে থাকতাম, তারপর একদিন হঠাৎ দেখলাম আঁচলটা নেই।
চুপ ছিলাম, আর কী বলা যায় এ রকম গভীর শূন্যতার উত্তরে!
—আমাকে কোনো দিন প্রত্যাখ্যান করবে না তো সিলভি? আচ্ছা, এখন কি তোমার হাতটা ধরতে পারি? চলো আজ প্যারিস যাই। ভেবে নাও, ইকোনমি ক্লাসে আমার কাঁধে মাথা রেখেছ তুমি।
হঠাৎ অনেকটা জোরালো কণ্ঠে বলে উঠলাম।
—তুমি আমার সম্পর্কে কিছুই জানো না যুবায়ের।
কথাটা বলে নিজের কণ্ঠে নিজেই চমকে গেলাম যেন।
—কী জানতে হবে? না জানলেও অসুবিধা নেই। শুধু জানি, আমার প্রিয়তমা সিলভি, পৃথিবীর সব ফুল যার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েছে আর তার সুঘ্রাণে দস্যুর মতো তাকে ছিন্ন–বিচ্ছিন্ন করছি আমি।
—যুবায়ের! আমি বলছি…
—না, আজ কিছু শুনব না, আজ তোমার হাত ধরবই। তারপর শুরু করব তোমার পায়ের আঙুল থেকে …
—একটু শোনো কথাটা…
না, বলতে পারিনি সেদিনও।
ওর আচরণ ধীরে ধীরে উন্মাদের মতো হয়ে যেতে লাগল। তাহলে, যুবায়েরের মতো সুদর্শন এক পুরুষ সত্যি সিলভির মতো স্বামী পরিত্যক্তা এক নারীকে ভালোবাসে? সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমার শরীরের খবর নিত। জিজ্ঞেস করত পায়ের লোম তুলেছি কি না। আর ওর সব প্রশ্ন আমাকে যেন ক্রমেই আরও নারী করে তুলত।
.
এভাবে কেটে গেল কয়েক মাস। মামলা চলছিল। মা জানাল, কোর্টের কাগজপত্র নাকি এখন আমার পক্ষেই যাচ্ছে। যেহেতু আমি স্বাবলম্বী ও বাচ্চার বয়স এখনো ছয় হয়নি। তবে ছয় হয়ে গেলে, ওর বাবার কাছে কাস্টডি চলে যাবে। আরিয়ানকে এর আগেই আমার আনতে হবে, অর্থনৈতিকভাবেও গুছিয়ে উঠতে হবে। একটুও তো দম ফেলার সময় নেই, কিন্তু একি করছি আমি? নিজেই কি নিজের চিতা জ্বালাচ্ছি?
ল্যাবে আমার পারফরম্যান্স বেশ খারাপ হয়ে পড়েছে। রাত জেগে কথা বলে শরীরেও কুলাতে পারছি না। আগের কাজগুলোই গোঁজামিল দিয়ে চালাচ্ছি যেন। যুবায়েরের বলয় থেকে বের হতে পারছি না কিছুতেই। আমি তো কিশোরী নই, টিনএজার নই। একটা দীর্ঘদিনের বিরতির পর এই বত্রিশ বছরের জীবনের মরচেধরা চাকাটা কত কষ্ট করে আবার ঘোরাতে পেরেছি! সব ঠিক রাখতে না পারলে আরিয়ানকে আনতে পারব না। কাস্টডি মামলায় জিতলেই ভিসার অ্যাপ্লাই করব ভাবছি।
আমেরিকাতে ডেমোক্র্যাটদের তখন অবস্থা কিছুটা বেহাল। প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন হলে সব আবার অনেক কঠিনও হয়ে পড়তে পারে। যুবায়েরের সঙ্গে এই সীমান্ত নীতি নিয়েও কথা হতো। বলত, ‘আচ্ছা সিলভি, তুমি কল্পনা করতে পারো, টেক্সাসে ওই রিও ডি জেনিরো থেকে ভেসে আসছে একই সঙ্গে পানামার জঙ্গল পেরিয়ে আসা কিছু মানুষ। একেবারে শেষ ধাপে ওরা ভেসে যাচ্ছে। আর বাকিরা—তারা তাকিয়ে আছে সেদিকে, তারপর মৃত্যু অবধারিত জেনেও ওরা নেমে পড়ছে পানিতে।’ ওর কথা শুনতে শুনতে মনে হতো আমিও ওই ঠিকানাহীন মানুষ, যে খরস্রোতা জলে নেমে পড়েছে।
ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম আমার সঙ্গ পাওয়ার জন্য সে আকুল হয়ে উঠেছে। বিয়ের জন্য সে দেরি করতে চাইল না কিছুতেই। কিছুটা ভয় হচ্ছিল যদি কাস্টডি মামলা অন্যদিকে মোড় নেয় এই সিদ্ধান্তে। আর এদিকে এই লং ডিসট্যান্স রিলেশনে কাজের তালও রাখতে পারছিলাম না।
তারপর সেদিন কথাটা লিখে পাঠালাম, আরিয়ানের কথাটা। উত্তর এল—‘সিলভি আমি জানি, সবই জানি, তুমি তো তোমার প্রোফাইলেই দিয়ে রেখেছ।’
.
চোখ ভিজে যাচ্ছিল আমার। ডিসেম্বরের শীত তখন জেঁকে বসেছে। জানালা দিয়ে দেখছি একজন লোক ড্রাইভওয়েতে এই ঠান্ডায়ও গাড়ি পরিষ্কার করছে। সেদিকে তাকিয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করছি, নিজেকে কি ক্রমাগত এক অবধারিত সর্বনাশের দিকে টেনে নিচ্ছি? কেন ভুলে যাচ্ছি, আমি একজন পাঁচ বছরের ছেলের মা। না, আমি এখনো ওকে কথাটা বলে উঠতে পারিনি, আমার আরিয়ানের কথাটা!
.
ভেতরের এক বিরাট গুমোট যেন বেরিয়ে গেল। তার মানে সব জেনেই ও আমাকে গ্রহণ করতে চায়। আরিয়ানের জন্য একটা বাবা দরকার। এই দেশে ওকে আনতে পারলে, আমি, যুবায়ের আর আরিয়ান—একটা সুন্দর সংসার হবে আমার। এবার খুব সুন্দর করে সংসার করব, সব ছাড় দেব, সব ছাড়। ঝগড়া, জেদ, কিছুই করব না—বেঁচে ওঠার এই শেষ ভেলাটা হারাব না কিছুতেই।
যুবায়ের বুদ্ধি দিল ওর শহরের ভার্সিটিতে যেতে। ফান্ড জোগাড় হলো না ঠিক, তবু চলে গেলাম। যাওয়ার পর যেই ট্রেনে উঠে দেখতে যেতাম ওকে, যে ট্রেনে একবার উঠে পড়লেই যুবায়ের আবিষ্কার করতে পারত আমার শরীর, সেই ট্রেনটা যে রেললাইন দিয়ে গিয়ে স্টেশনে থামত, আমরা ওখানে হাঁটতাম।
আমরা বিয়ে করেছিলাম এখানে, মোবাশ্বের ভাইয়েরা সব আয়োজন করল। প্রথম তিন মাস ভালোই কাটল। যুবায়ের যখন জানাল ঘটনাটা ওর বাসায়, ওর বাবা মেনে নিল না। এদিকে আমার লেখাপড়ার অবস্থা এত খারাপ হয়ে গিয়েছিল। স্কলারশিপ বন্ধ হবার অবস্থা। যুবায়ের বলল, তার রিমোট, অল্প বেতনের চাকরি, তাতে সে পুরো সংসারের ভার নিতে পারবে না, দেশেও তার অনেক দায়িত্ব, আমি যেন পড়া ছেড়ে দিই। স্কলারশিপ বন্ধের পর ওর আচরণ আরও বদলাল। একদিন বলেই বসল, ‘এভাবে তো হয় না সিলভি!’
তারপর যেই হাতে সে চুমু খেত, সেই হাত দিয়ে যেন খুব ভালো বাসন মাজতে পারি, তাই নিয়ে গেল শহরের সব রেস্তোঁরায়। এক রুমের বাসা। অনেকটা ও একাই সব ভার নিচ্ছে সংসারের। খুব খিটখিটে মেজাজ থাকে ওর। লোন করে সেমিস্টার ফি দিয়েছি। ল্যাবে কাজ করার চেষ্টা করছি, যদিও টাকাপয়সা পাই না। সামারে ও হঠাৎ বলল, বাড়ি যাবে, বাবার অসুখ।
ওর পরিবারের সঙ্গে আমার কথা হয়নি কোনো দিন, ওর বাবা আমাকে নিয়ে অনেক অপমানজনক কথা বলেছিল, যা খুব বিদ্ধ করত আমাকে।
.
রেস্টুরেন্টে কাজ, ক্লাস, ল্যাব সব মিলিয়ে এত কাহিল লাগত। যুবায়ের তখন দেশে, একদিন লইয়ার জানাল, বিয়ে করাতে নাকি আরিয়ানের কাস্টডি মামলা আমার বিপক্ষে চলে গেছে। আমি হেরে গেছি, চূড়ান্ত রায় কিছুদিনের মধ্যেই। আমার পরাজয়ের কারণ হিসেবে কোর্টের একটা ভিডিও লইয়ার পাঠাল—সেখানে আরিয়ান বলছে, ‘আই হেট মাই মাদার।’ ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ছে, ওর সৎমাকে নিয়ে চমৎকার সংসার নাকি ওদের, ঠিক যেই সংসারটা আমি যুবায়েরের কাছে চেয়েছিলাম। মা–বাবাও আমাকে সেখানে অশান্তি না করতে পরামর্শ দিয়েছে, ছেলে বড় হলে নাকি আমাকে ঠিকই দেখতে আসবে একদিন। সেই ছেলেটা, যেই ছেলেটাকে আমি জন্ম দিয়েছি, তিন বছর পর্যন্ত প্রতিপালন করেছি, সে একদিন আমাকে দেখতে আসবে, এটাই যথেষ্ট? এটাই যথেষ্ট এই সমাজের কাছে!
প্রফেসর হেরল্ড মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করেছে—ঠিক আছি কি না? কিন্তু বলে উঠতে পারিনি। যদি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব না—এই ভেবে একেবারে বাদ দিয়ে দেয়। এই মুহূর্তে লেখাপড়া না চালালে ভিসা স্ট্যাটাস হারাব।
এক মাস পর যেদিন দেশ থেকে ও ফিরল, জানাল, আনতে যেতে হবে না। একাই উবার নেবে। তারপর একটা কাজ সেরে আসবে। সন্ধ্যা গড়াল, এল না। রাতে টেক্সট করল, উঠেছে এখানকার ব্যাচেলরদের বাসায়। সেদিনই জানাল ডিভোর্স দিয়েছে আমাকে এইবার দেশে গিয়ে, ওর মা–বাবার ইচ্ছা, ওর কিছু করার ছিল না। ওর টেক্সটের শেষ লাইন—‘সিলভি আমাকে ক্ষমা করো’—এটুকুই।
.
তারপর, আমাদের আর দেখা হয়নি এই এক শহরে থেকেও। যুবায়েরকে আর বলতে পারিনি আমার দ্বিতীয় সন্তান আগমনের কথা। এখানে এবরশন ইলিগ্যাল। আমার দ্বিতীয় সন্তান, তাকে যদি পৃথিবীতে আনি, সে কি একই কথা বলবে?—‘আই হেট মাই মাদার।’
যুবায়েরের অন্যত্র চাকরি হয়েছে, ইন পারসন জব নাকি। আজ কিছু জিনিসপত্র নিতে আসবে, তাই লিখেছে বহুদিন পর। আমি কি আজ দেখতে পাব ওকে? ওর নাকের ঘাম, ও কাছে এলে ওর প্রিয় পারফিউমের ঘ্রাণ, সব পাব? ও কি শেষবারের মতো আমাকে একটা আলিঙ্গন করতে পারে, ঠিক যেরকম প্রথম দিন ও আমাকে ভেঙে চুরমার করে ফেলেছিল।
আজ খুব রোদ উঠেছে। জানালা দিয়ে রোদের রেখারা আসছে। এই ঐশ্বর্যময় পৃথিবীর কিছুই আর আমার আয়ত্তে নেই—এক দীনহীন, ব্যর্থ মা যাকে বলে। পেটটাকে উন্মুক্ত করে জানালার খুব কাছে এসে দাঁড়ালাম। সিলিংটাতে ঝুলে যাবার আগে লিখেছি শেষ চিঠিটা ওকে। কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি আমার জীবনের অনেকটা বছর পর পুরুষের স্পর্শ দেবার জন্য। ছাদের ঠিক যেখানে ফ্যানটা, রোদের রেখাগুলো মিশেছে। সেখানে হাত রেখেই পৃথিবীর শেষ রোদ ছোঁব। আরেকটা চিঠি লিখেছি ছেলেকে। আরিয়ান কি ক্ষমা করবে আমাকে? আরিয়ান, আমার চিঠিটা তোমার কাছে পৌঁছাবে কি না জানি না, বাবা। চিঠিটা হাতে পেলে তুমি কি আবার বলবে—‘আই হেট মাই মাদার’, যেটা তুমি কোর্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলেছিলে?


























