দুই পা হারানো সাখাওয়াতের হাতে হুইলচেয়ার, ঘরে এক মাসের বাজার
- আপডেট সময় : ০৭:১১:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

জীবনের কাছে হার মানতে চাননি সাখাওয়াত হোসেন। কিন্তু চার বছর আগে অসুস্থতার কারণে তাঁর দুই পা অবশ হয়ে যায়। একপর্যায়ে কেটে ফেলতে হয় দুটি পা-ই। বদলে যায় জীবনের চেনা ছন্দ। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে থাকলেও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর আর্থিক অসচ্ছলতা তাঁকে ক্রমেই অসহায় করে তোলে।
সংসারের হাল ধরতে দেড় বছর আগে শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার নংগরপাড়া থেকে গাজীপুরে আসেন সাখাওয়াত। ভেবেছিলেন, কোনোভাবে একটি কাজ জুটিয়ে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেবেন। কিন্তু দুই পা না থাকায় কাজ পাননি কোথাও। শেষ পর্যন্ত জীবিকা নির্বাহের জন্য বেছে নিতে হয় ভিক্ষাবৃত্তি। বর্তমানে জয়দেবপুর রেলস্টেশন ও গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে ভিক্ষা করে চলে তাঁর সংসার। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে জয়দেবপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার মুক্তারটেক নিয়ামত সড়কের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি।
.
একটি হুইলচেয়ার সাখাওয়াতের চলাচলকে কিছুটা সহজ করতে পারত। কিন্তু সেই সামর্থ্যও ছিল না পরিবারের। ছয় মাস ধরে একটি হুইলচেয়ারের আশায় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ঘুরেছেন সাখাওয়াত। পাননি কাঙ্ক্ষিত সহায়তা। অভাবের সংসারে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানোও ছিল কঠিন। নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারের টাকাই যেখানে জোটে না, সেখানে সন্তানদের খাতা-কলম কিনে দেওয়া ছিল তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
সাখাওয়াতের এই বাস্তবতার কথা জানতে পেরে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে গাজীপুর বন্ধুসভা। প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একটি ভালো কাজ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে একটি হুইলচেয়ার, পরিবারের জন্য এক মাসের নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার এবং দুই সন্তানের জন্য এক বছরের শিক্ষাসামগ্রী। ২৭ অক্টোবর এগুলো উপহার দেওয়া হয়।
উপহার হিসেবে দেওয়া বাজারের মধ্যে ছিল চাল, ডাল, আটা, তেল, আলু, পেঁয়াজ, লবণ, রসুন, চিনি, মুড়ি, ডিম, সুজি, সাবান, হলুদ, মরিচ, ধনে, মসলা, জিরাগুঁড়া, দুধ, ভিমবার, হুইল পাউডার, নুডলসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। শিক্ষাসামগ্রীর মধ্যে ছিল স্কুলব্যাগ, খাতা, পেনসিল, রাবার, পেনসিল বক্স, ক খ গ–এর গল্প, বর্ণ থেকে গল্প, এসো বাংলা শিখি প্রথম ভাগ, রংপেনসিল ইত্যাদি।
.
হুইলচেয়ার পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘একটা হুইলচেয়ারের জন্য ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ঘুরেছি। কেউ এই সাহায্যটুকুও করেনি। এই চেয়ার ও এক মাসের বাজার পেয়ে আমার অনেক উপকার হলো। আল্লাহ আপনাদের অসিলায় আমাকে বাঁচালেন। বই, ব্যাগ ও খাতা পেয়ে আমার বাচ্চাদেরও অনেক উপকার হলো। আমার নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তাই বাচ্চাদের খাতা-কলম কিনে দিতে পারি না।’
সাখাওয়াতের স্ত্রীর কণ্ঠেও ফুটে ওঠে স্বস্তি ও কৃতজ্ঞতা। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে সাদিয়াকে বই-খাতা ও ব্যাগ দিয়েছেন, খুব উপকার হলো। অনেক দিন ধরে মেয়েটা হাতে করে বই নিয়ে স্কুলে যায়। বাজার কেনার টাকাও থাকে না। অনেক দিন পর ভালো-মন্দ খেতে পারব।’
শিক্ষাসামগ্রী পেয়ে খুশি সাত বছর বয়সী মাদ্রাসাপড়ুয়া সাদিয়া আক্তার। তার ছোট্ট কথায় ধরা পড়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখার প্রত্যয়। সাদিয়া বলে, ‘আমি এখন থেকে মন দিয়ে পড়াশোনা করব আর তোমাদের জন্যে দোয়া করব।’
.
উদ্যোগ সম্পর্কে গাজীপুর বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসেন বলেন, ‘প্রথম আলোর ২৮ বছর পূর্তি উপলক্ষে আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। প্রতিবছরের মতো এবারও আমাদের বন্ধুরা একটি ভালো কাজ করেছে। আমাদের সব বন্ধুই মানবিক। সবাইকে শুভেচ্ছা জানাই।’
সভাপতি বাবুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বরাবরের মতো এবারও একটি ভালো কাজ করতে পেরেছি। আমাদের বন্ধুরা মানবিক বন্ধু হিসেবে এগিয়ে যাবে।’
এ বিষয়ে প্রথম আলো গাজীপুর প্রতিনিধি মাসুদ রানা বলেন, ‘এমন একটি ভালো কাজের জন্য বন্ধুদের অনেক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ। আমার মনে হয়, এই সহায়তা তাঁর অনেক কাজে লাগবে। এক মাসের বাজার ও হুইলচেয়ার দিয়ে তাঁর পাশে থাকতে পেরে আমাদের খুব ভালো লাগছে। গাজীপুর বন্ধুসভার সব বন্ধুকে এমন দারুণ কাজের জন্যে ভালোবাসা জানাই। তবে সাখাওয়াতের জন্য শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তাই নয়, দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও জরুরি।’
.
পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সাখাওয়াতের জন্য একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। তাঁকে কাজ খুঁজে দিতে বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করছি।’
প্রথম আলোর গাজীপুর অফিসের নিচে সাখাওয়াতের হাতে এসব উপহারসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। বন্ধুসভার সদস্যরা তাঁকে বাসা থেকে নিয়ে আসেন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর বন্ধুসভার সহসভাপতি আশিকুল ইসলাম খান, সাংগঠনিক সম্পাদক নাছির উদ্দিন, দপ্তর সম্পাদক মারফুয়া আহম্মেদ, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক তামিম মল্লিক, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া সম্পাদক ইতিহাস সরকার, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সম্পাদক মো. ইসমাইল, কার্যনির্বাহী সদস্য ইয়াকিনুর ইসলাম ভূঁইয়া, বন্ধু মারুফ আল ইমন, রাহুল হোসেন, বৃষ্টি আক্তার, নাঈমা আক্তার, আফরিন জাহান, ফাতেমা আক্তার, মাহমুদুল হাসানসহ অনেকে।
সাধারণ সম্পাদক, গাজীপুর বন্ধুসভা























