ঢাকা ০২:৩৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান ব্যালন ডি’অর: মেসি, এমবাপ্পে, কেইন, ইয়ামালে আলো ঝলমলে লন্ডন পদ্মা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ ও সেতুর অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আদালত অবমাননার অভিযোগ: ট্রাইব্যুনালে ক্ষমা চাইলেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ার জটিলতা, দূরদূরান্তের শিশুদের শেষ ভরসা ঢাকা এনসিপির স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনের আত্মপ্রকাশ, মাহিন–আরিফের সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বে সেই রনি সিপিবির মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ তুলে হামলা পশ্চিমবঙ্গে ২৫২ মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ, দেওবন্দে ৫ হাজার প্রতিনিধির সম্মেলন চা–বাগানের শিশুদের স্কুলব্যাগ-খাতা-পেনসিল উপহার এক দশকে জাপানে রপ্তানি বেড়েছে ৩৫%, আমদানি ১০%

হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ার জটিলতা, দূরদূরান্তের শিশুদের শেষ ভরসা ঢাকা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০১:২৬:০৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

যশোরের ঝিকরগাছা থেকে ২ মাস ২৭ দিনের নবজাতক আয়মান সাদিককে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন মা সানজিদা খাতুন। নিউমোনিয়া ও তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে শিশুটিকে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছিল টানা ১৬ দিন। কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরং হামের পর নিউমোনিয়ার জটিলতা আরও বাড়ে। নিরুপায় হয়ে সংকটাপন্ন আয়মানকে নিয়ে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আসেন মা। এখানে চিকিৎসার পর অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও শিশুটির কাশি ও শ্বাসকষ্ট এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

শুধু আয়মান নয়, নোয়াখালীর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা শিশুদের গল্পটাও একই রকম। জেলার দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার জাহাজমারা এলাকা থেকে দুই বছরের মেয়ে হামিদাকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন মা নুরজাহান বেগম। তিনি জানান, টানা ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে মেয়ের জ্বর ও ফুসকুড়ি ছিল, একপর্যায়ে রক্ত পরীক্ষায় ম্যালেরিয়াও ধরা পড়ে। কিন্তু পরে তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাকে নিয়ে ঢাকায় ছোটেন। নুরজাহানের অভিযোগ, এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় এসেও হাসপাতালে শুরুতে কাঙ্ক্ষিত অক্সিজেন পেতে তাঁদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। একই জেলার কোম্পানীগঞ্জ থেকে আসা সাত মাসের রাইজানের ক্ষেত্রেও নিউমোনিয়ার পর হাম শনাক্ত হয়; টানা সাত দিন আইসিইউতে থেকেও তার শ্বাসকষ্ট পুরোপুরি কাটেনি।

দেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এভাবেই জটিল ও সংকটাপন্ন অবস্থায় হামে আক্রান্ত শিশুদের রাজধানীর শিশু হাসপাতালে আনা হচ্ছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, এই শিশুদের ক্ষেত্রে দুটি বড় সংকট তৈরি হয়েছে। প্রথমত, রোগটি মারাত্মক পর্যায়ে যাওয়ার কারণ কী এবং দ্বিতীয়ত, হাসপাতালে আসার পর তারা কী ধরনের চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে।

.

শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, মূল সমস্যা তৈরি হচ্ছে চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হওয়ায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাম সঠিকভাবে শনাক্ত না হওয়া এবং নিউমোনিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরও ফেলে রাখায় অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, হামের সবচেয়ে বড় জটিলতা নিউমোনিয়া। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অপুষ্টি। হাসপাতালে আসা শিশুদের প্রায় ৯০ শতাংশই অপুষ্টিতে ভুগছে। অপুষ্টির কারণে তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা একেবারেই ভেঙে পড়ে, যা তাদের জীবন সংকটাপন্ন করে তুলছে।

হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার মার্জিয়া আফরোজের ভাষ্য, নবজাতক থেকে দুই বছর বয়সী শিশুরা হামে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে যেসব শিশু নিয়মিত টিকা পায়নি, তাদের ঝুঁকি মারাত্মক। হামের সঙ্গে ডায়রিয়া, বমি, খিঁচুনি কিংবা নিউমোনিয়া দেখা দিলে সাধারণ অক্সিজেনে শ্বাসকষ্ট সামাল দেওয়া যায় না। তখন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এমনকি ভেন্টিলেশন ছাড়া রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।

.

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, হামে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিশু এখানে চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৯৭ থেকে ৯৮টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ৯৭টি শিশু চিকিৎসাধীন, যার মধ্যে সোমবারই নতুন করে ভর্তি হয়েছে ২৫ জন।

আক্রান্ত শিশুদের বেশির ভাগেরই প্রয়োজন হচ্ছে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন ও আইসিইউ সেবা। কিন্তু হাসপাতালটিতে মোট শয্যা ৭০০টি হলেও আইসিইউ শয্যা মাত্র ১৪টি। ফলে জটিল রোগীদের আইসিইউ নিশ্চিত করা অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেবাদানকারী জনবলের সংকট। ডা. মার্জিয়া আফরোজ বলেন, ‘যে পরিমাণ জটিল রোগী আসছে, সেই অনুপাতে মাথাপিছু চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল অনেক কম।’

তবে হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম দাবি করেন, চিকিৎসকসংকট থাকলেও তাঁরা সেবা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন। হাসপাতালে বর্তমানে প্রায় ৩০০ চিকিৎসক কর্মরত আছেন এবং সেবা আরও গতিশীল করতে আগামী মাসের মধ্যেই নতুন করে আরও ৫০ জন চিকিৎসক নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

.

চিকিৎসকেরা বলছেন, শিশুরা যেন জটিল অবস্থায় না পৌঁছায়, সে জন্য নির্ধারিত সময়ে নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করাই প্রধান উপায়। শিশুদের জ্বর, সর্দি-কাশি বা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে অবহেলা না করে শুরুতেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, বারবার বমি বা ডায়রিয়ার মতো কোনো ‘বিপৎসংকেত’ দেখা দেওয়া মাত্রই সময় নষ্ট না করে শিশুকে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ার জটিলতা, দূরদূরান্তের শিশুদের শেষ ভরসা ঢাকা

আপডেট সময় : ০১:২৬:০৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

যশোরের ঝিকরগাছা থেকে ২ মাস ২৭ দিনের নবজাতক আয়মান সাদিককে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন মা সানজিদা খাতুন। নিউমোনিয়া ও তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে শিশুটিকে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছিল টানা ১৬ দিন। কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরং হামের পর নিউমোনিয়ার জটিলতা আরও বাড়ে। নিরুপায় হয়ে সংকটাপন্ন আয়মানকে নিয়ে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আসেন মা। এখানে চিকিৎসার পর অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও শিশুটির কাশি ও শ্বাসকষ্ট এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

শুধু আয়মান নয়, নোয়াখালীর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা শিশুদের গল্পটাও একই রকম। জেলার দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার জাহাজমারা এলাকা থেকে দুই বছরের মেয়ে হামিদাকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন মা নুরজাহান বেগম। তিনি জানান, টানা ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে মেয়ের জ্বর ও ফুসকুড়ি ছিল, একপর্যায়ে রক্ত পরীক্ষায় ম্যালেরিয়াও ধরা পড়ে। কিন্তু পরে তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাকে নিয়ে ঢাকায় ছোটেন। নুরজাহানের অভিযোগ, এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় এসেও হাসপাতালে শুরুতে কাঙ্ক্ষিত অক্সিজেন পেতে তাঁদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। একই জেলার কোম্পানীগঞ্জ থেকে আসা সাত মাসের রাইজানের ক্ষেত্রেও নিউমোনিয়ার পর হাম শনাক্ত হয়; টানা সাত দিন আইসিইউতে থেকেও তার শ্বাসকষ্ট পুরোপুরি কাটেনি।

দেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এভাবেই জটিল ও সংকটাপন্ন অবস্থায় হামে আক্রান্ত শিশুদের রাজধানীর শিশু হাসপাতালে আনা হচ্ছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, এই শিশুদের ক্ষেত্রে দুটি বড় সংকট তৈরি হয়েছে। প্রথমত, রোগটি মারাত্মক পর্যায়ে যাওয়ার কারণ কী এবং দ্বিতীয়ত, হাসপাতালে আসার পর তারা কী ধরনের চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে।

.

শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, মূল সমস্যা তৈরি হচ্ছে চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হওয়ায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাম সঠিকভাবে শনাক্ত না হওয়া এবং নিউমোনিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরও ফেলে রাখায় অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, হামের সবচেয়ে বড় জটিলতা নিউমোনিয়া। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অপুষ্টি। হাসপাতালে আসা শিশুদের প্রায় ৯০ শতাংশই অপুষ্টিতে ভুগছে। অপুষ্টির কারণে তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা একেবারেই ভেঙে পড়ে, যা তাদের জীবন সংকটাপন্ন করে তুলছে।

হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার মার্জিয়া আফরোজের ভাষ্য, নবজাতক থেকে দুই বছর বয়সী শিশুরা হামে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে যেসব শিশু নিয়মিত টিকা পায়নি, তাদের ঝুঁকি মারাত্মক। হামের সঙ্গে ডায়রিয়া, বমি, খিঁচুনি কিংবা নিউমোনিয়া দেখা দিলে সাধারণ অক্সিজেনে শ্বাসকষ্ট সামাল দেওয়া যায় না। তখন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এমনকি ভেন্টিলেশন ছাড়া রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।

.

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, হামে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিশু এখানে চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৯৭ থেকে ৯৮টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ৯৭টি শিশু চিকিৎসাধীন, যার মধ্যে সোমবারই নতুন করে ভর্তি হয়েছে ২৫ জন।

আক্রান্ত শিশুদের বেশির ভাগেরই প্রয়োজন হচ্ছে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন ও আইসিইউ সেবা। কিন্তু হাসপাতালটিতে মোট শয্যা ৭০০টি হলেও আইসিইউ শয্যা মাত্র ১৪টি। ফলে জটিল রোগীদের আইসিইউ নিশ্চিত করা অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেবাদানকারী জনবলের সংকট। ডা. মার্জিয়া আফরোজ বলেন, ‘যে পরিমাণ জটিল রোগী আসছে, সেই অনুপাতে মাথাপিছু চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল অনেক কম।’

তবে হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম দাবি করেন, চিকিৎসকসংকট থাকলেও তাঁরা সেবা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন। হাসপাতালে বর্তমানে প্রায় ৩০০ চিকিৎসক কর্মরত আছেন এবং সেবা আরও গতিশীল করতে আগামী মাসের মধ্যেই নতুন করে আরও ৫০ জন চিকিৎসক নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

.

চিকিৎসকেরা বলছেন, শিশুরা যেন জটিল অবস্থায় না পৌঁছায়, সে জন্য নির্ধারিত সময়ে নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করাই প্রধান উপায়। শিশুদের জ্বর, সর্দি-কাশি বা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে অবহেলা না করে শুরুতেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, বারবার বমি বা ডায়রিয়ার মতো কোনো ‘বিপৎসংকেত’ দেখা দেওয়া মাত্রই সময় নষ্ট না করে শিশুকে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।