১৩০ বছর পর ভ্যান গঘের আঁকা স্টারি নাইটের রহস্যের সমাধান
- আপডেট সময় : ০৭:১৮:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের আঁকা বিখ্যাত ছবি ‘দ্য স্টারি নাইট’। এ ছবির পেছনের রহস্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, ছবিটি আঁকার সময় ভ্যান গঘ শুধু নিজের কল্পনাশক্তি ব্যবহার করেননি; বরং ১৮৮৯ সালে ফ্রান্সের যে মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে তিনি ছিলেন, সেখান থেকে রাতের আকাশ যেমন দেখা যেত, সম্ভবত তিনি সেটাই ফুটিয়ে তুলেছেন।
সম্প্রতি এক গবেষণা দলের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ছবিটিতে যে আকাশ ও মহাজাগতিক দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা আসলে ১৮৮৯ সালের ২২ জুলাইয়ের ভোরের আকাশ হতে পারে। এই গবেষণার ফলাফল ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ নামের বিজ্ঞান জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
এর আগে সাধারণত মনে করা হতো, ভ্যান গঘ ১৮৮৯ সালের জুন মাসেই বিখ্যাত এ চিত্রকর্ম এঁকেছিলেন, যেখানে বাঁকা চাঁদ, শুক্র গ্রহ, ঘূর্ণমান নক্ষত্র, একটি ছোট গ্রাম ও উঁচু সাইপ্রাসগাছ দেখা যায়। তবে নতুন এ গবেষণায় দাবি করা হলো, ছবিটি সম্ভবত জুন মাসের প্রায় এক মাস পরে আঁকা হয়েছিল।
.ভ্যান গঘের সেরা ১০ চিত্রকর্ম.
ছবির সময়পর্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন
শিল্প–ইতিহাসবিদদের মতে, ভ্যান গঘ ১৮৮৯ সালের জুন মাসে ফ্রান্সের যে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, সেখানেই ‘দ্য স্টারি নাইট’ ছবিটি এঁকেছিলেন। এর কিছুদিন আগেই এক সহকর্মীর সঙ্গে ঝগড়া করে তিনি নিজের কান কেটে ফেলেছিলেন।
তবে নতুন এ গবেষণার প্রধান গবেষক ও দক্ষিণ কোরিয়ান বিজ্ঞানী এলিজা জং-হিউন কিম জানান, চিত্রকর্মটিতে ফুটিয়ে তোলা নক্ষত্র ও চাঁদের অবস্থানের সঙ্গে ১৮৮৯ সালের ২২ জুলাইয়ের রাতের আকাশের সবচেয়ে বেশি মিল রয়েছে। কিমের মতে, কোনো দুটি রাতের আকাশই হুবহু এক হয় না। ভ্যান গঘ হয়তো আকাশের সেই সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো খেয়াল করেছিলেন এবং সেটাই তাঁর ছবিতে তুলে ধরেছিলেন।
নতুন এ হিসাব একটি পুরোনো ধাঁধার সমাধান সামনে এনেছে। কারণ, ১৮৮৯ সালের জুনের মাঝমাঝিতে চাঁদের যে দশা ছিল, ছবির আঁকা সরু বাঁকা চাঁদের সঙ্গে তার কোনো মিল ছিল না।
অবশ্য অন্য এক গবেষক হোসে লুইস আরাগন জানিয়েছেন, ২২ জুলাই তারিখটি দারুণ একটি সম্ভাবনা হলেও এটিকে একেবারে চূড়ান্ত ধরে না নিয়ে একটি নতুন তত্ত্ব হিসেবে দেখা যেতে পারে।
.ভ্যান গঘের স্টারি নাইট ছবিতে লুকিয়ে থাকা বিজ্ঞান.
চাঁদ ও নক্ষত্রের নতুন সূত্র
ভ্যান গঘের কাজের প্রতি ভালো লাগা থেকেই ২০১৯ সালে ফ্রান্সে যান গবেষক কিম। সে সময় তিনি জুন ও জুলাই মাসে ফ্রান্সের আকাশ পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি লক্ষ করেন, জুলাই মাসের আকাশে কিছু উজ্জ্বল তারা দেখা যায়, যা জুন মাসে অতটা স্পষ্ট ছিল না।
এরপর বিজ্ঞানীরা আরও পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে দেখেন। ১৮৮৯ সালের ২২ জুলাইয়ের দিকে ভোরের আকাশে চাঁদের আকৃতি হুবহু ছবির মতো বাঁকা বা অর্ধচন্দ্রের মতো ছিল। এ ছাড়া পুব আকাশে শুক্র গ্রহের পাশেই বৃষ রাশির হাইডস নক্ষত্রগুচ্ছ উঠতে দেখা গিয়েছিল।
সে সময়ের আবহাওয়া কেমন ছিল, তা পরীক্ষা করেও বিজ্ঞানীরা দেখেন, ভ্যান গঘের পক্ষে রাতের আকাশ পরিষ্কার দেখার পূর্ণ সুযোগ ছিল।
গবেষকেরা সে সময়ের একটি ঘটনার সময়পর্বও গবেষণা করে দেখেন। ভ্যান গঘ ও তাঁর ভাইয়ের লেখা চিঠিপত্র বিশ্লেষণ করে তাঁরা বুঝতে পারেন, সে সময় ভ্যান গঘের মানসিক অসুস্থতার ঘটনাটি জুনের পরিবর্তে জুলাই মাসের দিকে ঘটেছিল। এ ছাড়া চিঠিতে একধরনের পতঙ্গ বা সিকাডার উল্লেখ ছিল, যা গরমকালের সঙ্গে মিলে যায়।
তাঁদের এই পদ্ধতির সঠিকতা যাচাই করার জন্য গবেষকেরা ভ্যান গঘের আঁকা অন্য ছবির নক্ষত্র বা চাঁদের পজিশন নিয়েও পরীক্ষা চালান। অন্য এক গবেষক অ্যারাগন এ গবেষণাকে জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থবিদ্যা ও শিল্পকলার এক চমৎকার মেলবন্ধন বলে প্রশংসা করেছেন।
.ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে কে এগিয়ে.
সেই আকাশ ও কল্পনা
চিত্রকর্মটিতে রাতের আকাশের আসল মিল পাওয়ার কথা বললেও গবেষকরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘দ্য স্টারি নাইট’ ছবির প্রতিটি খুঁটিনাটি একদম নিখুঁতভাবে কোনো একটি নির্দিষ্ট রাতের আকাশ নয়।
ভ্যান গঘ মূলত হাসপাতালের একটি স্টুডিওতে বসে আগের স্কেচ ও স্মৃতি থেকে ছবিটি এঁকেছিলেন। গবেষক অ্যারাগন জানান, এই আকাশ হয়তো বেশ কয়েকটি রাতের আকাশের স্মৃতি থেকে। ভ্যান গঘ নিজেও একসময় এমন কথা বলেছিলেন।
অ্যারাগনের মতে, এই গবেষণার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, শিল্পী প্রকৃতির দিকে কতটা গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, ছবিটি শুধু কোনো অবাস্তব কল্পনা নয়, বরং ভ্যান গঘ চারপাশের প্রকৃতি খুব নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।
এদিকে কিম দীর্ঘদিন ধরে ছবিটি নিয়ে গবেষণা করলেও নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টে রাখা মূল ‘দ্য স্টারি নাইট’ ছবিটি তিনি এখনো সামনাসামনি দেখেননি। গবেষণা প্রকাশের পর এবার তাঁর ইচ্ছা নিজে গিয়ে আসল মাস্টারপিসটি দেখে আসা।
সব মিলিয়ে বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত এ চিত্রকর্মকে দেখার ক্ষেত্রে নতুন একটি ভাবনা সামনে এসেছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ২২ জুলাই তারিখটি নিয়ে গবেষকদের দাবিটি পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য গবেষণাটি আরও পর্যালোচনার দরকার।
সূত্র: ইয়াহু নিউজ, নিউইয়র্ক পোস্ট
.সকালে ঘুম থেকে ওঠা মানুষ কি রাত জাগা মানুষের চেয়ে বেশি ভালো

























