‘ছেলেটাকে ছাড়া পৃথিবীটা বড্ড শূন্য, কীভাবে বাকিটা জীবন কাটাব’
- আপডেট সময় : ০৬:৪৪:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

কুমিল্লার কোটবাড়ীর গন্ধমতী এলাকায় নুরজাহান ভিলার তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটটির দরজার পাশে লেখা—‘অপ্রতিমদের বাসা, প্রযত্নে নাহিদ ও শাহরিয়ার’। ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম আর বেঁচে নেই। যে ছেলেকে ঘিরে ছিল বাবা-মায়ের সব স্বপ্ন, তাকে হারানোর এক মাস পেরিয়ে গেছে। শোকের ভারে তাঁদের কাছে সময় যেন থমকে আছে।
ছেলের হাসি, কথা আর ছোটাছুটিতে একসময় মুখর থাকা বাসাটিতে এখনো ফিরে আসে তার স্মৃতি। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মা নাহিদা বেগম ও বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের জীবন যেন দুই ভাগে বিভক্ত—অপ্রতিমকে নিয়ে কাটানো দিনগুলো আর তাকে ছাড়া বেঁচে থাকার কঠিন বর্তমান। এখন তাঁরা সন্তান হত্যার বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
ফিরোজ শাহরিয়ার সোমবার দুপুরে প্রথম আলোকে মুঠোফোনে বলেন, ‘আমাদের পুরোটা অস্তিত্বজুড়ে ছেলেটা। তাকে নিয়ে আমার আর নাহিদার সব স্বপ্ন ছিল। কিন্তু ছেলেটা নেই এক মাস হলো। অপ্রতিমকে ছাড়া পৃথিবীটা বড্ড শূন্য লাগছে। কীভাবে বাকিটা জীবন কাটাব, নিজেও জানি না।’
‘স্ত্রীকে কীভাবে সান্ত্বনা দেব’অপ্রতিমের মৃত্যুর পর থেকেই ভেঙে পড়েছেন তার মা নাহিদা বেগম। তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার এতটাই অবনতি হয়েছিল যে স্বজনেরা তাঁকে ঠিকমতো খাওয়াতেও পারছিলেন না। ঘটনার চার-পাঁচ দিন পর তিনি কুমিল্লা ছেড়ে ঢাকায় বোনের বাসায় চলে যান। বর্তমানে সেখানেই আছেন।
সোমবার দুপুরে স্ত্রীকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে আমাদের পুরো পৃথিবীটাই যেন হারিয়ে ফেলেছি। ছেলেটা খুন হওয়ার পর আমার স্ত্রীর জীবন নিয়েও শঙ্কিত ছিলাম। সে কিছুই খেতে চাইত না। কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছিল। অবস্থাটা এমন হয়েছিল—আমিও তো সন্তানহারা। স্ত্রীকে কীভাবে সান্ত্বনা দেব বা আমরা কে কাকে সান্ত্বনা দেব?’
ফিরোজ শাহরিয়ার জানান, ঢাকায় যাওয়ার পর নাহিদার শারীরিক অবস্থা আগের মতোই ছিল। পরে তাঁকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নেওয়া হয়। এখন কিছুটা ঘুমাতে পারছেন, খেতেও পারছেন। তবে ছেলেকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি।ফিরোজ শাহরিয়ারের কথায়, স্ত্রীর সঙ্গে যখনই কথা হয়, তখনই অপ্রতিমকে ঘিরে তাঁর অসহায়ত্বের কথা শোনেন। স্ত্রী কখনো কারও সঙ্গে কথা বলে মন হালকা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানেও ফিরে আসে অপ্রতিমের স্মৃতি।
ফিরোজ শাহরিয়ারের ভাষায়, ‘মাঝেমধ্যে মনে হয় কারও সঙ্গে ফোনে কথা বললে ভালো লাগবে। কিন্তু ফোনে কথা বলতে গেলেও অপ্রতিমের ছবিটা আমার আর নাহিদার সামনে ভেসে ওঠে। নিজেকে সামলাতে পারছি না।’
বিচারের অপেক্ষায় পরিবার১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার কোটবাড়ীর গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। সে কুমিল্লা কোটবাড়ীর বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে পরিকল্পিতভাবে নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। এতে তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে তিনজন হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেন এবং একজন সহযোগিতা করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন কিশোর। তবে তাদের বয়স নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছে অপ্রতিমের পরিবার। প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের প্রকৃত বয়স নির্ধারণের দাবিও জানিয়েছিলেন পরিবার ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
তবে এখন পরিবারের কাছে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাই অগ্রাধিকার পাচ্ছে। সোমবার এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমরা খুনিদের দ্রুত বিচার দেখতে চাই। এখন সেই প্রক্রিয়ায় গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। পুলিশ বলছে, দুই-তিন দিনের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দেবে। এরপর আমরা আইনজীবীর মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় যাব।’
গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্ত প্রায় শেষ। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পুলিশের হাতে এসেছে। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।




















