যুবসমাজ ধ্বংসের কারিগর রেজাউল, মাদক সম্রাট সালাম ঠসার উত্তরসূরি
- আপডেট সময় : ১০:২৮:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ জুন ২০২৬ ২৫১ বার পড়া হয়েছে

একসময় কৃষি আর ছোট ব্যবসার শান্ত গ্রাম ছিল গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের রামদেব গ্রামের হাসানগঞ্জ রেলওয়ে এলাকা। সেই গ্রামে এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ ‘মাদক’। কিশোর থেকে তরুণ, ছাত্র থেকে কর্মজীবী, একে একে মাদকের জালে জড়িয়ে পড়ছেন এলাকার মানুষ। আর এই ধ্বংসযজ্ঞের মূলহোতার নাম রেজাউল করিম (৪৮)। রামদেব গ্রামের মরহুম রইচ উদ্দিনের এই ছেলে এখন এলাকায় পরিচিত মাদক সম্রাট হিসেবে।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, রেজাউল করিম দীর্ঘদিন ধরে নিজ বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, ফেন্সিডিল ও হুইস্কিসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ মাদকের একটি সক্রিয় নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে আসছে। শুধু বিক্রিই নয়, নিজেও মাদক সেবন করে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মাদক সংক্রান্ত একাধিক মামলা থাকলেও থামেনি তার কার্যক্রম।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিদিন ৮০০ থেকে ৯০০ পিস ইয়াবা বিভিন্ন সহযোগীর মাধ্যমে বিক্রি করে রেজাউল করিম। এলাকার ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা এই সাপ্লাই চেইনে রয়েছে একাধিক স্তর, যেখানে স্থানীয় কিশোর-তরুণরাও বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রেজাউল করিম শুধু স্থানীয় পর্যায়ে নয়, আশপাশের একাধিক ইউনিয়নেও নিয়মিত মাদক সরবরাহ করে। এই নেটওয়ার্কে প্রতিটি স্তরের আলাদা ভূমিকা নির্ধারিত রয়েছে এবং এটি একটি সংগঠিত চক্র হিসেবে কাজ করে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এবং একাধিক সূত্রে জানা যায়, রেজাউলের এই মাদক সাম্রাজ্যের শিকড় আরও গভীরে। সে পূর্বে বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের সাতগিরি গ্রামের কুখ্যাত মাদক সম্রাট আব্দুস সালাম ওরফে সালাম ঠসার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিল। শুধু সহযোগীই নয়, রেজাউল হলেন সালাম ঠসার ভাগিনা। সেই পারিবারিক সম্পর্ক ও আস্থার সুবাদেই সালাম ঠসার মাদক নেটওয়ার্কে রেজাউলের প্রবেশ ঘটে। সালাম ঠসার হাত ধরেই এই অঞ্চলে মাদকের সয়লাব শুরু হয়েছিল। ধীরে ধীরে রেজাউল সেই নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে সালাম ঠসা নিহত হলে পুরো মাদকচক্রের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় রেজাউলের হাতে। মামার গড়ে যাওয়া নেটওয়ার্ক, সাপ্লাই চেইন আর পুরনো যোগাযোগ ব্যবহার করে রেজাউল ধীরে ধীরে নিজেকে এলাকার মাদক সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। স্থানীয়দের ভাষায়, একটি শূন্যস্থান তৈরি হয়েছিল, রেজাউল সেটি পূরণ করেছে আরও বেপরোয়াভাবে।
গোপনে ধারণকৃত একটি ভিডিওতে রেজাউল করিম নিজেই মাদক সেবন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। ভিডিওটি এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। রেজাউল করিম ইতোপূর্বে মাদক মামলায় গ্রেফতার হয়েছিল। তবে জামিনে মুক্তির পর থেমে থাকেনি, বরং আরও সংগঠিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, এই মাদক সিন্ডিকেট এতদিন ধরে টিকে থাকার পেছনে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা। তা না হলে বারবার অভিযোগ উঠলেও কীভাবে এই চক্র এতটা নির্বিঘ্নে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার এক অভিভাবক বলেন, ‘এখন অনেক পরিবার আতঙ্কে থাকে। সন্তান কখন কোন পথে চলে যাচ্ছে, সেটা বোঝার উপায় নেই। ছেলেকে বাইরে পাঠাতেও ভয় লাগে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় মাদক এখন এতটাই সহজলভ্য হয়ে পড়েছে যে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া তরুণদের একটি অংশও এতে জড়িয়ে পড়ছে। পাড়ার মোড়ে, চায়ের দোকানে, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশেও মাদকের সহজপ্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা। এর প্রভাব পড়ছে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক নিরাপত্তার ওপর।
স্থানীয়রা প্রশাসনের কাছে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই মাদক সিন্ডিকেট আরও বিস্তৃত হয়ে পুরো এলাকার সামাজিক কাঠামোকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একটি প্রজন্ম যে ধ্বংসের মুখে এগিয়ে যাচ্ছে, সেই প্রজন্মকে বাঁচাতে এখনই সময় বলে মনে করছেন তারা।
জামায়াত নেতা ও হাসানগঞ্জ বাজারের সার-কীটনাশক ব্যবসায়ী এম. জে. মিলন সরকার বলেন, হাসানগঞ্জ মসজিদ সংলগ্ন এলাকার মরহুম রইচ উদ্দিনের পুত্র রেজাউল করিম দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারের সাথে জড়িত। সে প্রতিদিন ৯০০ থেকে ১,০০০ পিস ইয়াবা এবং গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য হাসানগঞ্জ, পীরগাছা, মিঠাপুকুর, বামনডাঙ্গা ও সুন্দরগঞ্জের বিভিন্ন পয়েন্টে সরবরাহ করে থাকে। এই মাদকের ভয়াল ছোবলে এলাকার তরুণ ও ছাত্রসমাজ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
তিনি আরও বলেন, রেজাউল করিম অতীতে একাধিকবার কারাভোগ করেছে এবং তার বিরুদ্ধে বর্তমানেও মামলা রয়েছে। র্যাবের অভিযানে কুখ্যাত মাদক সম্রাট সালাম ঠসার মৃত্যুর পর সে তার মাদক সাম্রাজ্য পরিচালনা করে আসছে। আমরা প্রশাসনের কাছে আবেদন জানাচ্ছি, অতি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই যুবসমাজকে মাদকের অভিশাপ থেকে রক্ষা করুন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিএনপি নেতা মোহাম্মদ শামীম মিয়া বলেন, ‘হাসানগঞ্জ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা, বিশেষ করে ইয়াবা বাণিজ্য নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। রেজাউল নামের এক ব্যক্তি এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ থাকলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভের মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। আমরা চাই, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক এবং এলাকাকে মাদকমুক্ত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সুন্দরগঞ্জ উপজেলা শাখার প্রধান সমন্বয়কারী মো. লুৎফর রহমান বকসি বলেন, ‘বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি, হাসানগঞ্জ রেলস্টেশন মসজিদ সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা রেজাউল করিম মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এর ফলে এলাকার অনেক তরুণ নেশার প্রতি আসক্ত হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’
এ বিষয়ে মাদক কারবারি রেজাউল করিমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বামনডাঙ্গা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ আব্দুস সবুর বলেন, ‘আমাদের মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। কেউ মাদক সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে এবং উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।’


















