প্যারাগন এগ্রো’র দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমি ও স্থানীয় জনগণ
- আপডেট সময় : ০৬:০১:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬ ৫৫ বার পড়া হয়েছে

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার মধ্যমকুড়া এলাকায় স্থাপিত প্যারাগন ফিড লিমিটেড এগ্রোর দূষণে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের ফসলি জমি ও স্থানীয় জনজীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির বর্জ্য ও দুর্গন্ধে এলাকার কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেশি দামের লোভে মধ্যমকুড়া গ্রামের অনেক কৃষক তাদের দুই ফসলি জমি প্যারাগন এগ্রোর কাছে বিক্রি করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এর বর্জ্য ও দূষণের কারণে আশপাশের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা।
ডিম উৎপাদন, মুরগির খাদ্য ও জৈব সার—এই তিন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। এর ফলে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ও তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের গ্রামগুলোতে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই দুর্গন্ধ প্রায় তিন থেকে চার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে অনেক সময় ঘরের ভেতরেও থাকা দায় হয়ে পড়ে।
মাঠে এখন আর আগের মতো বোরো ধানের আবাদ দেখা যাচ্ছে না। ধানগাছের গোড়া পচে যাওয়ায় অনেক জমিতে ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন কৃষকদের হতাশা আর হাহাকার বিরাজ করছে। একই সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে মাঠের পানিতে দূষণ ছড়িয়ে পড়ায় দেশীয় মাছের বিচরণ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আগে যেসব মাঠে হাঁসের ঝাঁক দেখা যেত, সেখানেও এখন আর হাঁস পালন করা যাচ্ছে না।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে প্যারাগন ফিড লিমিটেড এগ্রো। প্রথমে পরিবেশ অধিদফতরের কাছ থেকে সাত একর জমিতে অবস্থানগত ছাড়পত্র নেয় প্রতিষ্ঠানটি। পরে ধাপে ধাপে অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে লেয়ার মুরগি থেকে ডিম উৎপাদনের অনুমোদন পায়। প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ডিম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম শুরু করলেও বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ ডিম উৎপাদন করছে।
এর পাশাপাশি ফিড ও জৈব সার উৎপাদনের অনুমোদনও নেয় প্রতিষ্ঠানটি। বর্জ্য শোধনের জন্য ঘণ্টায় তিন হাজার লিটার সক্ষমতার একটি ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) স্থাপনের অনুমোদন নেওয়া হলেও বাস্তবে সেখানে মাত্র এক হাজার লিটার বর্জ্য শোধনের সক্ষমতার একটি ছোট ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২৮ একর জমিজুড়ে বর্তমানে প্রায় ২১ লাখ মুরগি লালন-পালন করা হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই বর্জ্যের একটি অংশ সঠিকভাবে শোধন না করেই আশপাশের জমি ও পানিতে মিশে যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানের উত্তর পাশের মাঠের পানির সঙ্গে রাসায়নিক ও বিষ্ঠা মিশ্রিত দূষিত পানি দক্ষিণ দিকের ভাটির জমিতে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করে অন্তত একশ একর জমির বোরো ধানের আবাদ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
শুধু কৃষিজমিই নয়, দূষিত পানি যেসব পুকুরে গিয়ে পড়ছে সেসব পুকুরের মাছও মারা যাচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, আগে এসব এলাকায় দেশীয় মাছ প্রচুর পাওয়া যেত, কিন্তু এখন তা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
এছাড়াও প্যারাগনের ভারি যানবাহনের চাপে কাকরকান্দি চৌরাস্তা মোড় থেকে মধ্যমকুড়া পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার পাকা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সরু রাস্তায় দীর্ঘ সময় ধরে এসব ভারি যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকায় স্থানীয়দের নিয়মিত যানজটের ভোগান্তিও পোহাতে হচ্ছে।
ঘাকপাড়া গ্রামের কৃষক রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে প্যারাগন কোম্পানি। বাতাস যখন এদিকে আসে, তখন দুর্গন্ধে ঘরে থাকা যায় না।’
বিন্নিবাড়ি গ্রামের শহর আলী বলেন, ‘এই এলাকায় এখন কেউ সমন্ধ করতে চায় না। দুর্গন্ধের কারণে এলাকার পরিবেশ খুব খারাপ হয়ে গেছে।’
একই গ্রামের বাসিন্দা খোরশেদ আলম জানান, ‘পচা দুর্গন্ধে ভাত খাওয়াও কঠিন হয়ে গেছে। চারদিকে এত মাছি যে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করাই কষ্টকর।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে প্যারাগন ফিড লিমিটেড এগ্রোর সহকারী মহাব্যবস্থাপক আনোয়ারুক হক বলেন, ‘আমরা ঘণ্টায় এক হাজার লিটার বর্জ্য শোধনের সক্ষমতার একটি ইটিপি চালু করেছি। আরও একটি বড় ইটিপি স্থাপনের কাজ চলছে। এছাড়া কনভেয়ার বেল্ট ও ড্রায়ার পদ্ধতিতে জৈব সার উৎপাদনের কার্যক্রম শুরু হলে দূষণের সমস্যা আর থাকবে না। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।’
এ বিষয়ে শেরপুর পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা পরিদর্শনে গিয়ে ঘণ্টায় এক হাজার লিটার সক্ষমতার একটি ইটিপি পেয়েছি, যা পর্যাপ্ত নয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি তিন হাজার লিটার সক্ষমতার ইটিপি স্থাপনের অনুমোদন নিয়েছে এবং সেটির কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে, পুরো ইটিপি চালু হলে এবং ড্রায়ার পদ্ধতি কার্যকর হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উন্নতি হবে।’
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এই দূষণের কারণে এলাকার কৃষি ও পরিবেশ আরও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

























