৩৮ বছরে সোয়া দুই কোটি কিউসেক পানি থেকে বঞ্চিত তিস্তা
- আপডেট সময় : ০৬:৫৭:৪৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬ ৩৯ বার পড়া হয়েছে

সিকিম থেকে উৎপত্তি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা নদী নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারী দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। একসময় বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলার মানুষের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত এই নদী এখন পানিশূন্যতার কারণে চরম সংকটে।
অভিযোগ রয়েছে, ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে গত ৩৮ বছরে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা সোয়া দুই কোটি কিউসেক পানি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এতে নদীর গভীরতা কমে বিস্তীর্ণ এলাকায় চর জেগে উঠেছে এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। তিস্তা ব্যারাজ থেকে ভাটির কুড়িগ্রাম পর্যন্ত অধিকাংশ অংশ এখন বালুচরে পরিণত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে প্রতিদিন ৭ থেকে ১০ হাজার কিউসেক পানি প্রয়োজন হলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ কিউসেক। জানুয়ারি থেকে মার্চ শুষ্ক মৌসুম হিসেবে বিবেচিত হলেও নভেম্বর থেকেই পানির প্রবাহ কমতে শুরু করে।
১৯৮৭ সালে ভারতের গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণের পর থেকেই তিস্তার পানিপ্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। হিসাব অনুযায়ী, গত ৩৮ বছরে শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনীয় পানির বিপরীতে বিপুল পরিমাণ পানি প্রবাহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে নদী অববাহিকা। বাস্তবে গড়ে স্বল্পমাত্রার পানি পাওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে হঠাৎ পানি ছেড়ে দেওয়ায় নদীতে প্রবাহ বেড়ে প্রায় এক লাখ কিউসেকে পৌঁছায়, ফলে তিস্তাপাড়ে প্রায়ই বন্যা দেখা দেয় এবং ঘরবাড়ি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে গড়ে এক হাজার কিউসেক পানি পাওয়া যাচ্ছে। সেচ কার্যক্রম সচল রাখতে তিস্তা ব্যারাজের অধিকাংশ গেট বন্ধ রাখতে হচ্ছে, ফলে ভাটির দিকে স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা যাচ্ছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, তিস্তা ব্যারাজের ভাটিতে নদীর বড় অংশজুড়ে পানি নেই, শুধু বিস্তীর্ণ বালুচর। নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও মানুষ হেঁটেই নদী পার হচ্ছেন।
বাইশপুকুর গ্রামের বাসিন্দা রইচ উদ্দিন বলেন, “নদীতে পানি না থাকায় নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, এতে আমাদের জীবিকা বন্ধ হয়ে গেছে।”
পানির অভাবে তিস্তাপাড়ের বহু খেয়াঘাট বন্ধ হয়ে গেছে। রংপুরের গঙ্গাচড়া ও কাউনিয়া উপজেলায় চরাঞ্চলে এখন ভুট্টা, চিনাবাদাম ও মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হলেও সেচের খরচ বেড়ে গেছে কয়েক গুণ।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, আগে নদীর পানি দিয়েই সহজে সেচ দেওয়া যেত, এখন পাম্প ও যন্ত্রনির্ভর সেচ ব্যবস্থায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
লক্ষ্মীটারি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় গাছপালা মারা যাচ্ছে, চরাঞ্চল ক্রমেই মরুকরণের দিকে যাচ্ছে। এতে মৎস্যজীবী ও মাঝিমাল্লারা কর্মহীন হয়ে পড়ছেন।
তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে যৌথ নদী কমিশনের (জিআরসি) সর্বশেষ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২০০৫ সালে। এরপর একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
নদী গবেষক অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, তিস্তা নদী রক্ষায় এর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি, নইলে নদী ও নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্য চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

















