ছাগল খুঁজতে গিয়ে চিতা বাঘের সামনে পড়েন শরীফা বেগম
- আপডেট সময় : ১১:১৪:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

শরীফা বেগমের ছয়টি ছাগল। গোচারণভূমিতে চরা শেষে প্রতিদিন ঘরে ফিরে আসে ছাগলের দল। ২৫ অক্টোবর শরীফা বেগম খেয়াল করেন ছয়টির মধ্যে ফিরেছে পাঁচটি। অন্য ছাগলটির সন্ধানে সীমান্তের কাছে গেলেই পড়েন চিতা বাঘের সামনে। বাঘটির আক্রমণে আহত হন শরীফা বেগম। তাকে উদ্ধার করতে এসে আহত হয় আরও দুজন।
২৫ অক্টোবর বিকেলে লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের আমঝোল সীমান্তে এ আক্রমণের ঘটনাটি ঘটে। ওই দিনই ঢাকা থেকে বন বিভাগের বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের চার সদস্য ঘটনাস্থলে যান। চিতা বাঘটির সন্ধানে ব্যাপক তল্লাশি চালিয়ে কোনো হদিস পাওয়া না পেয়ে শুক্রবার ঢাকায় ফিরে এসেছে দলটি।
দলটির ধারণা, চিতা বাঘটি ভারতে ফিরে গেছে। এ দলের অন্যতম সদস্য বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের বন্য প্রাণী পরিদর্শক আবদুল্লাহ আস সাদিক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আমঝোল গ্রামের বাসিন্দা শরীফা বেগমের ছয়টি ছাগল ছিল। এর মধ্যে একটি ছাগল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ছাগলের সন্ধানে বেরিয়ে তিনি চিতা বাঘের সামনে পড়ে যান।
সাদিক বলেন, চিতা বাঘের আক্রমণে ছাগলটি মারা গেছে। পায়ের ছাপ ও ছাগলের শরীরে কামড়ের গভীরতা থেকে নিশ্চিত হয়েছেন, এটি চিতা বাঘ। সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে অনেকে গরু, ছাগল চরাতে দেন।
.
ডুয়ার্স বা বক্সারের জঙ্গল থেকে আসতে পারে চিতা বাঘটি
আবদুল্লাহ আস সাদিক বলেন, আমঝোল সীমান্তে ভারতীয় অংশের সঙ্গেই একটি শালবন, বাঁশঝাড় ও বিস্তীর্ণ ধানিজমি আছে। এর বাইরে সীমান্তের কাছাকাছি ভারতের দুটি সংরক্ষিত বন আছে। একটি ডুয়ার্স, অন্যটি বক্সার। এ অঞ্চল ভারতীয় চিতা বাঘের প্রধান আবাসস্থল। সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া যেভাবে দেওয়া আছে তাতে বাঘ আসার সুযোগ নেই। তবে সীমান্তের ভারতীয় অংশে বেশ কিছু বড় সেগুন ও শিমুলগাছ আছে। তাঁর ধারণা, চিতা বাঘ ক্ষিপ্রতার সঙ্গে গাছ বেয়ে উঠতে পারে। বাঘটি কোনো একটি গাছ বেয়ে কাঁটাতারের বেড়ার ওপর লাফ দিয়ে বাংলাদেশ অংশে ঢুকে পড়েছে।
.
পাঁচ ইউনিয়নে তল্লাশি, চার দিন ধরে আতঙ্ক
ঢাকা থেকে যাওয়া চার সদস্যের দলটির কার্যক্রম তদারক করছিলেন বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের প্রধান বন সংরক্ষক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিজিবির সহায়তা নিয়ে গোতামারীসহ সীমান্তঘেঁষা পাঁচ ইউনিয়নে তল্লাশি চালিয়েছি। মানুষকে সতর্ক করতে মাইকিং করেছি। সর্বশেষ বিজিবির থার্মাল ড্রোনে বাঘটির সর্বশেষ অবস্থান ছিল সীমান্তের কাছাকাছি। সেটি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের বনে চলে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মিজানুর রহমান বলেন, এর আগেও ওই অঞ্চলে মাঝে মাঝে সীমান্ত পেরিয়ে চিতা বাঘ আসে। বন বিভাগ বলছে, চিতা বাঘ সাধারণত তিস্তা ও ধরলা নদীর অববাহিকা, চা–বাগান এবং উঁচু ফসলের খেত ধরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে। খাবারের সন্ধানে বা আবাসস্থল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন এলাকার খোঁজে এরা মাঝেমধ্যে উঁচু গাছ বেয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে।
.
চিতা বাঘ মারতে হাজার হাজার মানুষ
রংপুর বন বিভাগ বলছে, ২৫ অক্টোবর চিতা বাঘের আক্রমণে তিনজন আহত হওয়ার পর আমঝোল এলাকায় হাজার হাজার মানুষ বাঘটি পিটিয়ে মারতে লাঠিসোঁটা নিয়ে জড়ো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও চিতা বাঘটিকে নিরাপদে ফিরে যেতে সহায়তা করতে বিজিবি ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পরবর্তী সময়ে রাতে বিজিবির থার্মাল ড্রোনের মাধ্যমে সীমান্তের কাছে চিতা বাঘটির অবস্থান শনাক্ত করা হয়। প্রাণীটিকে নিরাপদে উদ্ধারের জন্য রংপুর সামাজিক বন বিভাগ ওই দিনই স্থানীয় বনকর্মীদের সারা রাত সে স্থানে পাহারায় রাখে।
বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান প্রথম আলোকে বলেন, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়সহ সীমান্তবর্তী এলাকায় চিতা বাঘ আসা একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কয়েক বছর আগেও পঞ্চগড়ে একটি চিতা বাঘকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
রেজা খান বলেন, ‘বন্য প্রাণী নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো সংবেদনশীলতা তৈরি হয়নি। কারণ, ছোটবেলা থেকে এসব বিষয় নিয়ে আমাদেরকে সংবেদনশীল করে তোলার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে, সামাজিকভাবে আমরা বন্য প্রাণীবিমুখ হয়ে পড়েছি। কোনো নীলগাই, হরিণ, চিতা এমনকি একটি ছোট বনবিড়াল দেখলেও সবাই লাঠিসোঁটা নিয়ে হত্যা করতে নেমে যায়।’ এ ধরনের বন্য প্রাণী লোকালয়ে চলে এলে কীভাবে অগ্রিম সতর্কবাতা সবাইকে দেওয়া যায়, সেটার এক পথ খুঁজে বের করতে পরামর্শ দেন তিনি।























