গ্রামবাসীর চাঁদায় কেনা হলো খেলার মাঠের জমি, গ্রামজুড়ে উৎসব
- আপডেট সময় : ০৯:৩৬:০৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

গ্রামে কোনো খেলার মাঠ ছিল না। ধান কাটা হলে ফাঁকা জমিতে খেলত শিশুরা, ফসলের আবাদ শুরু হলে বন্ধ হয়ে যেত খেলা। সেই দুর্ভোগ ঘোচাতে গ্রামের ধনী-গরিব সবাই মিলে চাঁদা তুলে খেলার মাঠের জন্য কিনেছেন ৬০ শতাংশ জমি।
দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় গতকাল বৃহস্পতিবার বাদ্য বাজিয়ে জমি বুঝে নেন গ্রামবাসী। সেই থেকে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার দেউলী ইউনিয়নের বাবুপুর গ্রামজুড়ে চলছে উৎসবের আমেজ। এই গ্রামে গতকাল ছেলে–বুড়ো সবাই সারা দিন আনন্দে মেতেছিলেন।
বাবুপুর গ্রামে ৭ শতাধিক পরিবারের বসবাস। এখানে সাড়ে ৩ হাজারের বেশি জনসংখ্যা। এদের বড় অংশ শিশু, কিশোর, যুবক। কিন্তু গ্রামে কোন খেলার মাঠ ছিল না। তাই ক্রীড়াচর্চায় অসুবিধা হতো। এর আগে অনেকবার এ গ্রামের মানুষ মাঠের জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু সফল হতে পারেননি। তবে এবার সফল হয়েছেন।
খেলার মাঠের জন্য জমি কেনার অন্যতম উদ্যোক্তা এ গ্রামের সন্তান এস এম ইকবাল মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘কয়েক মাস আগে এ গ্রামের ক্রীড়াব্যক্তিত্ব খোরশেদ আলমের সঙ্গে পরামর্শ করি। সবাই মিলে টাকা দিয়ে খেলার মাঠের জন্য একটি জমি কেনা যায় কি না। এ প্রস্তাবে উৎসাহ দেখান খোরশেদ আলম। পরে আমরা গ্রামের কয়েকজন বিত্তবান মানুষের সঙ্গে কথা বলি। তাঁদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাই। গত ৮ সেপ্টেম্বর এ ব্যাপারে গ্রামবাসীকে নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মতবিনিময় সভা করি। সেখানে সবাই খেলার মাঠের জন্য জমি কেনার পক্ষে মত দেন। সবাই সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন।’
.
খোরশেদ আলম বলেন, ‘আমি ও ইকবাল মাহমুদ ছাড়াও এ গ্রামের বিত্তশালীদের মধ্যে আজাহার শিকদার, সেলিম আল মামুন, মিজানুর রহমান, মজনু শিকদার, শফিকুল ইসলাম, শুভ প্রামাণিক বড় অঙ্কের টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। গ্রামের সবার কাছেই জমি কেনার জন্য অর্থসহায়তা চাওয়া হয়। গ্রামবাসী কেউ ২০০ টাকা, কেউ ৫০০ টাকা, কেউ ১ হাজার টাকা, কেউ কেউ তাঁদের সামর্থ্য অনুযায়ী ২ হাজার, ৫ হাজার ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেন।’
পরে এই গ্রামের ইকবাল হোসেন সুজনের ৬০ শতাংশ জমি কিনে নেওয়া হয়। প্রতি শতাংশ জমির দাম ধরা হয় ৫২ হাজার টাকা করে। তিনি ১ শতাংশ জমি দান করেন। বৃহস্পতিবার তিনি জমিটি বুঝিয়ে দেন। গ্রামবাসী বাদ্য বাজিয়ে ওই জমি বুঝে নেন। সেখানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। দিনব্যাপী চলে আনন্দ–উৎসব।
.
বৃহস্পতিবার দুপুরে বাবুপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। গ্রামের যুবকেরা ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিয়েছেন অর্থদাতা ও প্রবীণ ব্যক্তিদের।
জমি কেনার অন্যতম উদ্যোক্তা খোরশেদ আলম বলেন, ‘৬০ শতাংশ জমি মাঠের জন্য কিনেছি। পাশে আরও ৬০ শতাংশ কেনার লক্ষ্য রয়েছে। সেভাবেই আমরা কাজ করছি। ১২০ শতাংশ জমি হলে ভালো মানের মাঠ হবে। একদিন এই মাঠকে কেন্দ্র করেই গ্রামের ক্রীড়াচর্চা হবে।’
এই গ্রামের কিশোর হাবিবুল্লাহ সালমান বলে, ‘ধান কাটা হলে খেতে গিয়ে খেলতে পারতাম। আবার ফসল বোনা হলে খেলা বন্ধ হয়ে যেত। এখন মাঠ হলো। আমরা সারা বছরই খেলতে পারব। তাই খুব ভালো লাগছে।’
.
অপর কিশোর রাব্বী জোহা বলে, ‘বাড়ির উঠানে খেলতে গেলে ফুটবলের আঘাতে ঘরের বেড়া ক্ষতি হতো। এ জন্য গালাগালি শুনতে হতো। এখন মাঠে খেলতে পারব।’
প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুল মান্নান ব্যাপারী বলেন, ‘আমরা একটা মাঠের জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। আজ আমাদের স্বপ্নের মাঠ বাস্তবায়ন হলো। তাই খুব আনন্দ লাগছে।’
এ বিষয়ে কথা হয় বাবুপুর মসজিদ কমিটির সভাপতি নজরুল শিকদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, এই মাঠে খেলাধুলা চর্চা হলে কিশোর-যুবকেরা সুস্থ–সুন্দর পরিবেশ পাবে। তারা মাদক ও সন্ত্রাস থেকে দূরে থাকবে। বাবুপুর সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক এবং মোনালিসা উইমেন্স স্পোর্টস একাডেমির পরিচালক মোনালিসা মুন্নি বলেন, বাবুপর গ্রামের মানুষের অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল একটি খেলার মাঠের। সেটির ব্যবস্থা তারা করতে পেরেছে। এটি অনেক বড় প্রাপ্তি।
সরকারি-বেসরকারি কোনো পর্যায়ের সাহায্য ছাড়া একটি গ্রামবাসীর নিজেদের উদ্যোগে খেলার মাঠের জন্য জমি কেনার এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন সরকারি মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল হুদা। তিনি বলেন, ওই গ্রামবাসীকে দেখে আরও অনেক গ্রামের মানুষ অনুপ্রাণিত হবে।
























