হামের টিকা ঠিকমতো কাজে আসছে না, ২৭ শতাংশ শিশুর অ্যান্টিবডি হয়নি
- আপডেট সময় : ০৯:২২:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, হামের টিকা দেওয়ার পরও ২৭ শতাংশ শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) গড়ে ওঠেনি। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে না ওঠার এমন প্রবণতা ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে বেশি। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের টিকা ঠিকমতো কাজে আসছে না। টিকা ও টিকাদানব্যবস্থা নিয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে।
সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা বলছেন, হাম–রুবেলার জাতীয় টিকা ক্যাম্পেইনের পর দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের শরীরে হাম প্রতিরোধ পরিস্থিতি জানতে প্রথমবারের মতো এই গবেষণা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর; রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, ইস্টার্ন মেডিটেরানিয়ান পাবলিক হেলথ নেটওয়ার্ক ও ঢাকা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজের ১২ জন গবেষক ও কর্মকর্তা গবেষণাটি করেছেন। গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছে আইইডিসিআর। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের কাছ থেকে প্রথম আলো গবেষণার সারসংক্ষেপ পেয়েছে।
এ বছর মার্চে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর স্বাস্থ্য বিভাগ ২০ এপ্রিল দেশজুড়ে হাম–রুবেলার টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করে। ছয় মাস বয়স থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই ক্যাম্পেইন শেষ হয় ২০ মে। এর আগে এপ্রিল মাস থেকে স্বাস্থ্য বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তারা বলেন যে ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার তিন থেকে চার সপ্তাহের পর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসবে। যদিও ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পাঁচ মাস পরও হামের সংক্রমণ থামেনি।
এই পরিস্থিতিতে হামের টিকা শিশুদের শরীরে কতটা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলছে এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় টিকা ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন রয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা টিকার কার্যকারিতা নিয়ে একটি গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলে আসছেন।
.
জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের টিকা ঠিকমতো কাজে আসছে না। টিকা ও টিকাদানব্যবস্থা নিয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে।
.
আইডিসিআরের নেতৃত্বে নতুন গবেষণাটি হয়েছে জাতীয় হাম–রুবেলার টিকা ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পর এ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে। ঢাকা, ময়মনসিংহ ও মুন্সিগঞ্জ জেলার ছয়টি উপশহর ও গ্রাম এলাকার ৩০৯টি শিশুকে এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এসব শিশুর বয়স ছিল ৯ থেকে ৫৯ মাস। শিশুরা টিকা পেয়েছে কি না, গবেষকেরা তা নিশ্চিত হন টিকা কার্ড দেখে এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে। এদের রক্তের নমুনা আইইডিসিআরের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়।
গবেষকেরা দেখেছেন, ৩০৯টি শিশুর মধ্যে ২০৩টির বা ৬৫.৭ শতাংশের শরীরে হামের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। ২১টি বা ৬.৮ শতাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি সীমান্ত এলাকায় (বর্ডার লাইন)।
.৬ মাস থেকে ৯ বছরের শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২ সপ্তাহের মধ্যে হামের টিকা দিতে হবে.
স্বাস্থ্য খাতের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিজ্ঞানী প্রথম আলোকে বলেছেন, এই ২১ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে এটা বলা যাবে না, অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি এটাও বলা যাবে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০৯ শিশুর মধ্যে ৮৫টির শরীরে কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। অর্থাৎ টিকা পাওয়ার পরও ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুর শরীরে হামের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। রোগ প্রতিরোধ গড়ে ওঠার প্রবণতা ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের তুলনায় ১৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে বেশি।
গবেষকেরা বলছেন, এক ডোজ টিকায় যত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠে, দুই বা তিন ডোজ টিকায় তার চেয়ে বেশি ক্ষমতা গড়ে ওঠে। কিন্তু হামের সংক্রমণ বা বিস্তার থামানোর জন্য যতটা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠা দরকার, তার চেয়ে অনেক কম রোগ প্রতিরোধক্ষমতা শিশুদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে।
.
গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০৯ শিশুর মধ্যে ৮৫টির শরীরে কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। অর্থাৎ টিকা পাওয়ার পরও ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুর শরীরে হামের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। রোগ প্রতিরোধ গড়ে ওঠার প্রবণতা ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের তুলনায় ১৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে বেশি।
.
টিকাবিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টিকার কার্যকারিতা শিশুর বয়সের সঙ্গে কিছুটা সম্পর্কিত। ৬ মাস বয়সে টিকা দিলে ১০০টির মধ্যে ৫০টির রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠবে। ৯ মাস বয়সে টিকা দিলে ১০০টির মধ্যে ৮৫টির রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠবে। আবার ১২ মাস বয়সে টিকা দিলে ৯০ শতাংশ শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠবে।
কিন্তু আইইডিসিআরের নেতৃত্বে হওয়া গবেষণায় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠা শিশুর হার অনেক কম। কেন এমন হলো?
টিকা–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) যত টিকা ব্যবহৃত হয়, তার সবই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত। এই টিকার মান যাচাই করা হয় না। মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা নেই। ধরেই নেওয়া হয় টিকার মানে কোনো ঘাটতি নেই।
.৪৬ লাখ শিশুকে হিসাবের বাইরে রেখে হামের টিকা.
টিকাবিশেষজ্ঞ তাজুল এ বারি প্রথম আলোকে বলেন, ‘টিকার কার্যকারিতা নষ্ট বা হ্রাস পেতে পারে একাধিক কারণে। টিকা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে হয় এবং পরিবহন করতে হয়। এটা অনেক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এর কোনো একটি পর্যায়ে তাপমাত্রার হেরফের হতে পারে। তাতে টিকার মান পড়ে যেতে পারে।’
.
টিকার কার্যকারিতা নষ্ট বা হ্রাস পেতে পারে একাধিক কারণে। টিকা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে হয় এবং পরিবহন করতে হয়। এটা অনেক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এর কোনো একটি পর্যায়ে তাপমাত্রার হেরফের হতে পারে। তাতে টিকার মান পড়ে যেতে পারে।
টিকাবিশেষজ্ঞ তাজুল এ বারি
.
তাজুল এ বারি আরও বলেন, শিশু যদি অতিমাত্রায় অপুষ্টির শিকার হয়, তাহলে তার শরীরে টিকা কম কার্যকর হয়। অন্যদিকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়া শিশুর শরীরে হামের টিকা বেশি কার্যকর। তিনি বলেন, ‘ঠিক কোন কারণে টিকা কার্যকর হচ্ছে না, তা অনুসন্ধান জরুরি।’
.
৭০ জন দেশি–বিদেশ বিশেষজ্ঞকে নিয়ে গঠিত যৌথ স্বাধীন পর্যালোচনা দল ১৪ অক্টোবর রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ তুলে ধরে। তাতে বলা হয়, ইপিআইয়ের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে প্রতিবছর প্রায় ২০ শতাংশ শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বাদ পড়ে।
ওই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, টিকার ব্যাপারে অন্ধ থাকা উচিত নয়। শিশুদের বিশুদ্ধ টিকা দিতে হবে। টিকা উৎপাদন থেকে শুরু করে বিমানবন্দর হয়ে নানা পথ ঘুরে অবশেষে টিকা শিশুর কাছে পৌঁছায়। পুরো ব্যবস্থার মধ্যে টিকার কার্যকারিতা যেন বজায় থাকে, সে ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ব্যাপারে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, গ্যাভিসহ সবার সহযোগিতা চান।
.
প্রতি চার বছর পরপর জাতীয় ক্যাম্পেইন নিশ্চিত করতে হবে। বড় পরিকল্পনা হাতে না নিলে হামের জটিল পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ বের হতে পারবে না।
সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে–নজির আহমেদ
.
এখন আইইডিসিআরের গবেষণায় টিকা দেওয়ার পরও ২৭ শতাংশ শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠতে দেখা যায়নি। এর অর্থ বিপুলসংখ্যক শিশু হামে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। এসব শিশুর বয়স বাড়ছে, তারা টিকার আওতার বাইরে চলে যাচ্ছে।
গতকাল সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘টিকার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, বহু দেশে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে।’ আইইডিসিআরের নেতৃত্বে হওয়া গবেষণার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি খুব ছোট গবেষণা, নমুনা কম। এই গবেষণার ফলাফল থেকে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। আরও বড় গবেষণা দরকার।’
.
ওই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, টিকার ব্যাপারে অন্ধ থাকা উচিত নয়। শিশুদের বিশুদ্ধ টিকা দিতে হবে। টিকা উৎপাদন থেকে শুরু করে বিমানবন্দর হয়ে নানা পথ ঘুরে অবশেষে টিকা শিশুর কাছে পৌঁছায়। পুরো ব্যবস্থার মধ্যে টিকার কার্যকারিতা যেন বজায় থাকে, সে ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ব্যাপারে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, গ্যাভিসহ সবার সহযোগিতা চান।
.
পরিস্থিতি জানতে ও বুঝতে আরও বড় ধরনের গবেষণা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এস এম এ সাফি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তিন হাজার শিশুর নমুনা নিয়ে একটি গবেষণা হচ্ছে। ৩০টি উপজেলার প্রতিটি থেকে ১০০ করে শিশুর নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
.
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ৩৮৮ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে। এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ বছর হামের উপসর্গ নিয়ে ২ লাখ ২২ হাজার ৫৫২ জন সারা দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে। এ বছর হামে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ২৩৩ জনের। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ১২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০৪ জনের।
এই পরিস্থিতিতে টিকার কভারেজ ৯৫ শতাংশের ওপর নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে–নজির আহমেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি হামের টিকা ঠিকমতো কাজে আসছে না। টিকা দেওয়ার বয়সসীমাও বাড়াতে হবে। পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনতে হবে। একপর্যায়ে তা ১৮ বছর পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। প্রতি চার বছর পরপর জাতীয় ক্যাম্পেইন নিশ্চিত করতে হবে। বড় পরিকল্পনা হাতে না নিলে হামের জটিল পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ বের হতে পারবে না।’
.মারা যাওয়া ৯২% শিশু হামের
























