রামানুজনের একটি সূত্র থেকে মিলল অসীমসংখ্যক নতুন সূত্রের সন্ধান
- আপডেট সময় : ০৬:৪৮:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

৬ সংখ্যাটিকে যোগফল হিসেবে দুটি আলাদা নিয়মে লেখা যায়। প্রথম নিয়মে যোগ করতে হবে এমন কিছু সংখ্যা, যাদের মধ্যে ব্যবধান অন্তত ২। যেমন, ৬ লেখা যায় ১ + ৫, ২ + ৪ কিংবা শুধু ৬ হিসেবে। অর্থাৎ, মোট তিনভাবে লেখা যায়।
এবার আরেকটি নিয়ম দেখা যাক। এবারের শর্ত হলো, ৫ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ ১ বা ৪ থাকে, শুধু এমন সংখ্যা যোগ করতে হবে। যেমন ১, ৪, ৬, ৯, ১১, ১৪…। এই নিয়মে ৬ সংখ্যাটিকে লেখা যায় ১ + ১ + ১ + ১ + ১ + ১ বা ১ + ১ + ৪ কিংবা শুধু ৬ হিসেবে। অর্থাৎ, এখানেও উত্তর তিন।
দুটি নিয়ম একেবারেই আলাদা। প্রথমটিতে সংখ্যাগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট ব্যবধান থাকতে হবে, দ্বিতীয়টিতে সংখ্যাগুলোকে ৫ দিয়ে ভাগ করলে থাকতে হবে নির্দিষ্ট ভাগশেষ। অথচ ৬ সংখ্যার ক্ষেত্রে দুই নিয়মেই যোগফল লেখার উপায় পাওয়া গেল তিনটি করে।
মজার বিষয় হলো, এটি শুধু ৬ সংখ্যার জন্যই সত্য নয়, যেকোনো ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যার ক্ষেত্রেই এই দুই নিয়মে যোগফল লেখার উপায়সংখ্যা সমান। একে বলে রজার্স–রামানুজন আইডিন্টিটি। বাংলায় আমরা বলতে পারি রজার্স–রামানুজন অভেদ। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গণিতবিদেরা এই অভেদ নিয়ে কাজ করছেন। এবার গবেষকেরা দেখিয়েছেন, এটি আরও বড় এক গাণিতিক কাঠামোর ছোট্ট একটি উদাহরণ। এমন আরও অসংখ্য অভেদের সন্ধান পাওয়া সম্ভব।
এই কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন ভারতীয় গণিতবিদ শ্রীনিবাস রামানুজন, যুক্তরাষ্ট্রের এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইফেং হুয়াং এবং আরও কয়েকজন গণিতবিদ। তাঁদের গবেষণায় সংখ্যার সূত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্যামিতি ও গাণিতিক গিঁটের ধারণা। এমনকি জটিল প্রমাণটি সম্পন্ন করতে সাহায্য করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও। একেক করে আলোচনা করা যাক। প্রথমে রামানুজনের সূত্রের গল্প দিয়েই শুরু করি।
.রামানুজনের সৃজনশীলতা.
রামানুজনের অসাধারণ গাণিতিক ক্ষমতা হার্ডিকে মুগ্ধ করে। হার্ডি তাঁকে ইংল্যান্ডে আসার আমন্ত্রণ জানান। পরে তাঁর সহযোগিতায় রামানুজনের গবেষণার নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
.
দুই
রজার্স–রামানুজন অভেদের ইতিহাস বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯১২ সালে। তখন শ্রীনিবাস রামানুজনের বয়স মাত্র ২৪ বছর। ভারতের মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্টে কেরানির চাকরি করতেন তিনি। কিন্তু চাকরি করে তেমন মজা পেতেন না। পাবেন কীভাবে, মন যে পড়ে থাকে গণিতের দুনিয়ায়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে খাতা ভরে লিখে রাখতেন নতুন নতুন গাণিতিক সূত্র। এসব সূত্রের অনেকগুলোর প্রমাণ তাঁর কাছে ছিল না। তবু সেগুলো যে সত্য, সে বিষয়ে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল।
নিজের সূত্রগুলো নিয়ে ব্রিটিশ গণিতবিদদের কাছে চিঠি পাঠাতে শুরু করেন রামানুজন। স্বাভাবিকভাবেই অনেকে তা খুলেও দেখেননি। কেউ কেউ আবার অবহেলায় ছুড়ে ফেলেছেন সামান্য এক কেরানির চিঠি। কিন্তু হাতের পাঁচ আঙুল যেমন সমান নয়, তেমনি সব মানুষও তো একরম হন না। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন গণিতবিদের কাছে পাঠানো সেই চিঠিগুলোর একটি গিয়ে পৌছেছিল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ জি এইচ হার্ডির কাছে।
.
চিঠিটি হাতে পেয়ে হার্ডির প্রথমে সন্দেহ হয়েছিল। তবু সন্দেহ দূরে সরিয়ে অচেনা অখ্যাত এক কেরানির পাঠানো গাণিতিক সূত্রগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখনে। সূত্রগুলো ভালো করে দেখার পর বুঝতে পারেন, এগুলো কোনো সাধারণ মানুষের কাজ নয়। রামানুজনের অসাধারণ গাণিতিক ক্ষমতা তাঁকে মুগ্ধ করে। হার্ডি তাঁকে ইংল্যান্ডে আসার আমন্ত্রণ জানান। পরে তাঁর সহযোগিতায় রামানুজনের গবেষণার নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
.জিনিয়াস রামানুজান.
নিজের সূত্রগুলো নিয়ে ব্রিটিশ গণিতবিদদের কাছে চিঠি পাঠাতে শুরু করেন রামানুজন। স্বাভাবিকভাবেই অনেকে তা খুলেও দেখেননি। কেউ কেউ আবার অবহেলায় ছুড়ে ফেলেছেন সামান্য এক কেরানির চিঠি।
.
রামানুজনের পাঠানো সূত্রগুলোর মধ্যে দুটি ছিল বিশেষভাবে বিস্ময়কর। একদিকে ছিল অসীমসংখ্যক পদের যোগফল, অন্যদিকে অসীমসংখ্যক গুণফল। দুটি রাশির গঠন এতটাই আলাদা যে সেগুলোর মান সমান হওয়ার তেমন কোনো সহজ প্যাটার্ন চোখে পড়ত না। কিন্তু সূত্র দুটি বলছে, এই যোগফল ও গুণফল আসলে সমান।
১৯১৬ সালে ব্রিটিশ গণিতবিদ পার্সি ম্যাকমোহন সূত্র দুটির মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটি সম্পর্ক বুঝতে পারেন। তিনি এগুলোকে সংখ্যার বিভাজন বা পার্টিশন নামে একটি গণিতের ধারণার সঙ্গে যুক্ত করেন।
পার্টিশন মানে হলো কোনো একটি পূর্ণসংখ্যাকে ছোট ছোট পূর্ণসংখ্যার যোগফল হিসেবে লেখার উপায়। যেমন, ৪ সংখ্যাটিকে লেখা যায় ৪, ৩ + ১, ২ + ২, ২ + ১ + ১ কিংবা ১ + ১ + ১ + ১ হিসেবে। অর্থাৎ ৪ সংখ্যাটিকে পাঁচ ভাবে লেখা যায়। তাই ৪ সংখ্যার পাঁচটি পার্টিশন। যোগের ক্রম বদলালে সেটি নতুন পার্টিশন হিসেবে ধরা হয় না। যেমন, ১ + ৩ এবং ৩ + ১ একই পার্টিশন।
এই ধারণা নিয়ে আগেও কাজ করেছিলেন বিখ্যাত গণিতবিদ লিওনার্ড অয়লার। তিনি দেখিয়েছিলেন, দেখতে আলাদা কিছু গাণিতিক সমস্যাকে সংখ্যার পার্টিশন গণনার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। ম্যাকমোহনও রামানুজনের সূত্রের ক্ষেত্রে একই ধরনের একটি সম্পর্ক খুঁজে পান।
.পাই ও টাউ দ্বন্দ্ব.
১৯১৬ সালে ব্রিটিশ গণিতবিদ পার্সি ম্যাকমোহন সূত্র দুটির মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটি সম্পর্ক বুঝতে পারেন। তিনি এগুলোকে সংখ্যার বিভাজন বা পার্টিশন নামে একটি গণিতের ধারণার সঙ্গে যুক্ত করেন।
.
রজার্স–রামানুজন অভেদের এক পাশে রয়েছে এমন পার্টিশনের সংখ্যা, যেখানে পাশাপাশি থাকা দুটি পদের ব্যবধান অন্তত ২। অন্য পাশে রয়েছে এমন পার্টিশনের সংখ্যা, যেখানে প্রতিটি পদকে ৫ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ হবে ১ বা ৪। নিয়ম দুটি আলাদা, কিন্তু যেকোনো সংখ্যার জন্য দুই ধরনের পার্টিশনের সংখ্যা সমান।
রামানুজন নিজে এই সূত্রগুলোর প্রমাণ দেওয়ার আগেই ইংরেজ গণিতবিদ লিওনার্ড জেমস রজার্সের লেখা একটি পুরোনো গবেষণাপত্রে এদের একটি প্রমাণ খুঁজে পান। রজার্স এর আগে সূত্রগুলো প্রমাণ করেছিলেন। তাই সূত্র দুটি পরিচিত হয় রজার্স–রামানুজন অভেদ নামে।
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গণিতবিদ জর্জ অ্যান্ড্রুজের মতে, বিংশ শতাব্দীর বেশির ভাগ সময় এই অভেদকে গণিতের একটি বিচ্ছিন্ন রত্নের মতোই মনে করা হতো। কেউ ধারণা করেননি, এর পেছনে এত বড় একটি তত্ত্ব লুকিয়ে থাকতে পারে।
.১০০ বছর আগের রামানুজনের পাইয়ের সূত্রগুলো যেভাবে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে কাজে লাগছে.
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গণিতবিদ জর্জ অ্যান্ড্রুজের মতে, বিংশ শতাব্দীর বেশির ভাগ সময় এই অভেদকে গণিতের একটি বিচ্ছিন্ন রত্নের মতোই মনে করা হতো।
.
তিন
১৯৭০-এর দশকের শুরুতে রজার্স–রামানুজন অভেদের মতো আরও অসংখ্য অভেদের একটি পরিবার খুঁজে পান জর্জ অ্যান্ড্রুজ। পরে জানতে পারেন, গণিতবিদ বেসিল গর্ডন এর আগেই একই ফলাফল বের করেছিলেন। নতুন কিছু আবিষ্কারের আনন্দের বদলে অ্যান্ড্রুজ তখন কিছুটা হতাশই হয়েছিলেন! তবে নতুন এই অভেদগুলো পরিচিতি পায় অ্যান্ড্রুজ–গর্ডন অভেদ নামে।
এরপর দেখা যায়, এই অভেদগুলোর সম্পর্ক শুধু সংখ্যার হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গণিতের আরও কয়েকটি শাখায় এগুলোর উপস্থিতি রয়েছে। যেমন রিপ্রেজেন্টেশন থিওরি, সিমেট্রিক ফাংশন এবং পদার্থবিজ্ঞানের হার্ড হেক্সাগন মডেল।
হার্ড হেক্সাগন মডেলে দেখা হয়, কোনো পৃষ্ঠের ওপর গ্যাসের পরমাণুগুলো কীভাবে ত্রিভুজাকারে সাজতে পারে। বিষয়টি শুনতে সংখ্যার সূত্র থেকে অনেক দূরের মনে হলেও, সেখানে রজার্স–রামানুজন অভেদের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
অ্যান্ড্রুজ এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, গ্রাফাইটের পাতের ওপর তরল হিলিয়াম ঢাললে তার আচরণের সঙ্গে রজার্স–রামানুজন অভেদের সম্পর্ক থাকবে, এমন কথা কে ভেবেছিল! গণিতের একটি সূত্র যে এত ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে দেখা দিতে পারে, সেটিই গবেষকদের আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। তবে তখনো কেউ জানতেন না, আরও বড় কোনো গাণিতিক কাঠামোর মধ্যে এসব অভেদকে একসঙ্গে ব্যাখ্যা করা সম্ভব কি না।
.গণিতবিদদের চোখে গণিতের সবচেয়ে কঠিন ৫০টি সমস্যা.
অ্যান্ড্রুজের প্রশ্ন, গ্রাফাইটের পাতের ওপর তরল হিলিয়াম ঢাললে তার আচরণের সঙ্গে রজার্স–রামানুজন অভেদের সম্পর্ক থাকবে, এমন কথা কে ভেবেছিল!
.
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসেন ইফেং হুয়াং। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সময় তিনি এমন কিছু গাণিতিক সমস্যা নিয়ে কাজ করছিলেন, যেখানে ম্যাট্রিক্স ও বক্ররেখা একসঙ্গে আসে।
ম্যাট্রিক্স হলো সংখ্যার আয়তাকার বিন্যাস। খাতায় সারি ও কলাম করে সংখ্যা সাজিয়ে যেমন একটি ছক তৈরি করা যায়, ম্যাট্রিক্সও অনেকটা তেমন। তবে এই ছকের সংখ্যাগুলো দিয়ে যোগ, গুণসহ নানা গাণিতিক কাজ করা যায়। আর ম্যাট্রিক্সের গুণের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। সাধারণভাবে দুটি ম্যাট্রিক্সের গুণের ক্রম বদলালে ফল বদলে যায়। অর্থাৎ, A × B এবং B × A সব সময় সমান হয় না।
তবে বিশেষ কিছু ম্যাট্রিক্সের ক্ষেত্রে ক্রম বদলালেও ফল একই থাকে। একে বলে বিনিময়যোগ্য হওয়া। এ ধরনের ম্যাট্রিক্সকে অনেকটা স্থানাঙ্কের মতো ব্যবহার করে বক্ররেখার সমীকরণে বসানো যায়।
ধরা যাক, একটি সাধারণ বক্ররেখার সমীকরণ y = x²। এখন x ও y-এর জায়গায় দুটি ম্যাট্রিক্স বসানো হলো। প্রশ্ন হলো, কোন কোন জোড়া ম্যাট্রিক্স বসালে সমীকরণটি সত্য হবে? এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর বের করা যায়। কিন্তু সব বক্ররেখা মসৃণ নয়। কিছু বক্ররেখায় এমন বিন্দু থাকে, যেখানে রেখাটি হঠাৎ বাঁক নেয় বা একটি সরু চূড়ার মতো তৈরি হয়। এ ধরনের বিশেষ বিন্দুকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি। উদাহরণ হিসেবে y² = x³ সমীকরণের বক্ররেখার কথা বলা যায়। x ও y উভয়ের মান শূন্য হলে বক্ররেখাটি সেখানে একটি তীক্ষ্ণ বিন্দু তৈরি করে। সাধারণ মসৃণ বক্ররেখার জন্য যে গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়, এমন বিশেষ বিন্দুতে তা আর সহজে কাজ করে না।
.বিশ্বের সবচেয়ে নিখুঁত ছক্কা তৈরিতে গণিতবিদদের লেখেছে ১৫ বছর.
তবে বিশেষ কিছু ম্যাট্রিক্সের ক্ষেত্রে ক্রম বদলালেও ফল একই থাকে। একে বলে বিনিময়যোগ্য হওয়া। এ ধরনের ম্যাট্রিক্সকে অনেকটা স্থানাঙ্কের মতো ব্যবহার করে বক্ররেখার সমীকরণে বসানো যায়।
.
হুয়াং এই ধরনের বক্ররেখায় ম্যাট্রিক্সের সমাধান গণনা করতে শুরু করেন। অর্থাৎ, বক্ররেখার সমীকরণ সত্য প্রমাণ করে, এমন কত জোড়া ম্যাট্রিক্স পাওয়া যায় তা বের করার চেষ্টা করেন। একসময় তিনি দেখলেন, y² = x³ সমীকরণের ক্ষেত্রে ম্যাট্রিক্সের এই হিসাব করতে গিয়ে রজার্স–রামানুজন অভেদের একটি দিক ফিরে আসছে। ব্যাপারটি তাঁকে অবাক করে। দুটি বিষয়কে এক করার মতো কোনো পরিচিত কারণ ছিল না। তাঁর মনে হলো, এটি নিছক কাকতালীয় হওয়ার কথা নয়।
সেখান থেকেই হুয়াংয়ের মনে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয়। একটি বিশেষ বক্ররেখার ক্ষেত্রে যদি রজার্স–রামানুজন অভেদ পাওয়া যায়, তাহলে অন্য সিঙ্গুলার বক্ররেখাগুলোর ক্ষেত্রেও কি নতুন নতুন অভেদ পাওয়া সম্ভব?
হুয়াং এই ধারণা নিয়ে কয়েকজন গণিতবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁদের একজন ছিলেন ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ কেন ওনো। প্রথমে ওনোর কাছে ধারণাটি অবাস্তব মনে হয়েছিল। তিনি বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব দেননি। কিন্তু ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ আলেক্সেই ওব্লোমকভ ধারণাটিতে আগ্রহী হন। তিনি বীজগণিতীয় জ্যামিতি ও গিঁট তত্ত্বের সংযোগস্থল নিয়ে গবেষণা করেন। ওব্লোমকভ বুঝতে পারেন, হুয়াংয়ের সমস্যার সঙ্গে জ্যামিতির একটি গভীর সম্পর্ক থাকতে পারে।
.তিনটি ঘনসংখ্যার যোগফল কীভাবে ১১৪ হবে.
প্রথমে ওনোর কাছে ধারণাটি অবাস্তব মনে হয়েছিল। তিনি বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব দেননি। কিন্তু ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ আলেক্সেই ওব্লোমকভ ধারণাটিতে আগ্রহী হন।
.
এর মধ্যে হুয়াং ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির গণিতবিদ রুওফান জিয়াং ম্যাট্রিক্সের সমাধান গণনার একটি নিয়মিত পদ্ধতি তৈরি করেন। এবার ওব্লোমকভ সমস্যাটিতে জ্যামিতির ধারণা যোগ করেন। y² = x³ বক্ররেখার যে বিন্দুতে তীক্ষ্ণ খাঁজ তৈরি হয়েছে, সেখানে খুব কাছ থেকে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। গণিতবিদেরা এই বক্ররেখাকে যে চার মাত্রার জ্যামিতিক পরিসরে বিবেচনা করেন, সেখানে ওই বিন্দুর চারপাশে একটি অতি ছোট গোলক কল্পনা করা যায়। বক্ররেখাটি সেই গোলকের পৃষ্ঠকে ছেদ করে একটি বন্ধ লুপ তৈরি করে। আর সেই লুপের আকৃতি হলো ট্রেফয়েল নট।
দড়ি বা সুতো দিয়ে গিঁট বাঁধার অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই আছে। একটি দড়ির দুই প্রান্ত পেঁচিয়ে বা একটির ওপর আরেকটি চালিয়ে তৈরি করা হয় গিঁট। গণিতেও গিঁট নিয়ে গবেষণা করা হয়। তবে এখানে গিঁট বলতে সাধারণ দড়ির গিঁট বোঝায় না। বরং একটি দড়ির দুই প্রান্ত জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয় বন্ধ লুপ। এরপর সেই লুপকে বিভিন্নভাবে পেঁচিয়ে তৈরি করা হয় নানা আকৃতি।
গাণিতিক গিঁটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এর কোনো খোলা প্রান্ত নেই। অর্থাৎ দড়িটির দুই প্রান্ত জোড়া লাগানো থাকে। ফলে একে টেনে লম্বা করা, বাঁকানো কিংবা পেঁচানো গেলেও দড়ি না কেটে বা নিজের ভেতর দিয়ে না চালিয়ে গিঁটের প্রকৃতি বদলানো যায় না।
.শিশুরা কীভাবে গণিত শেখে.
ওব্লোমকভ সমস্যাটিতে জ্যামিতির ধারণা যোগ করেন। y² = x³ বক্ররেখার যে বিন্দুতে তীক্ষ্ণ খাঁজ তৈরি হয়েছে, সেখানে খুব কাছ থেকে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়।
.
বিষয়টি বোঝার জন্য একটি সাধারণ গোলাকার রাবারের ব্যান্ডের কথা ভাবা যেতে পারে। ব্যান্ডটিকে টেনে বা বাঁকিয়ে নানা আকৃতি দেওয়া সম্ভব। কিন্তু কোথাও পেঁচিয়ে আটকে না দিলে সেটি সাধারণ লুপই থেকে যায়।
গাণিতিক গিঁটের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি হলো ট্রেফয়েল নট। নামের অর্থ তিনটি পাতা। এর আকৃতিতে তিনটি বাঁক বা পাপড়ির মতো অংশ দেখা যায়। দেখতে অনেকটা তিন-প্যাঁচের অলংকরণের মতো।
.
একটি বন্ধ দড়ি এমনভাবে পেঁচালে ট্রেফয়েল নট তৈরি হয়, যাতে দড়িটি তিন জায়গায় নিজের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে। ছবিতে এই তিনটি অতিক্রমের স্থানকে ক্রসিং বলা হয়। এই তিনটি ক্রসিংয়ের কারণেই ট্রেফয়েল নটকে সবচেয়ে সরল প্রকৃত গাণিতিক গিঁট বলা হয়। এর চেয়ে কম ক্রসিং দিয়ে প্রকৃত গিঁট তৈরি করা সম্ভব নয়।
.
ট্রেফয়েল নটের একটি মজার বৈশিষ্ট্য হলো, একে দেখতে যতই জটিল মনে হোক, এর গঠন বেশ সরল। একটি বন্ধ দড়ি দিয়ে এই গিঁট তৈরি করা যায়। কিন্তু দড়িটিকে শুধু টেনে বা ঘুরিয়ে আবার সাধারণ গোলাকার লুপে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তা করতে হলে দড়ি কাটতে হবে অথবা দড়িকে নিজের ভেতর দিয়ে চালিয়ে নিতে হবে (ওপরের ছবির মতো)।
.গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও প্রতিসাম্যের জাদু .
একটি বন্ধ দড়ি এমনভাবে পেঁচালে ট্রেফয়েল নট তৈরি হয়, যাতে দড়িটি তিন জায়গায় নিজের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে। ছবিতে এই তিনটি অতিক্রমের স্থানকে ক্রসিং বলা হয়।
.
যাহোক, এই বক্ররেখার ম্যাট্রিক্স গণনা থেকে যেমন রজার্স–রামানুজন অভেদ পাওয়া যায়, জ্যামিতিক বিশ্লেষণেও তেমনই ট্রেফয়েল নটের সঙ্গে সেই অভেদের সম্পর্ক দেখা যায়। অন্য বক্ররেখা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পাওয়া যায় অন্য ধরনের গিঁট। সেখান থেকে বেরিয়ে আসে নতুন নতুন অভেদ।
এভাবে হুয়াং, জিয়াং ও ওব্লোমকভ একটি বড় অনুমান দাঁড় করান। তাঁদের নামের আদ্যক্ষর দিয়ে এর নাম হয় হুয়াং–জিয়াং–ওব্লোমকভ বা HJO অনুমান।
এই অনুমান অনুযায়ী, a ও b নামে দুটি পূর্ণসংখ্যা নেওয়া যাবে, যাদের প্রত্যেকটি ১-এর চেয়ে বড় এবং যাদের কোনো সাধারণ গুণনীয়ক নেই। তখন x-এর a ঘাত এবং y-এর b ঘাত সমান বক্ররেখা নিয়ে ম্যাট্রিক্সের সমাধান গণনা করলে একটি রজার্স–রামানুজন ধরনের অভেদ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ , xᵃ = yᵇ।
এখানে a-এর প্রতিটি মানের জন্য নতুন অভেদের একটি পরিবার থাকার কথা বলা হয়েছে। a = 2 হলে পাওয়া যায় অ্যান্ড্রুজ–গর্ডন অভেদ। এর বাইরে বড় মানগুলো নিয়ে আগে কাজ হয়নি। প্রতিটি বক্ররেখার সঙ্গে আবার আলাদা গাণিতিক গিঁট যুক্ত থাকে। যেমন, a = 2 ও b = 3 হলে পাওয়া যায় ট্রেফয়েল নট। অন্য মানের ক্ষেত্রে পাওয়া যায় আরও জটিল টোরাস নট।
অর্থাৎ, একটি পরিচিত অভেদের পেছনে যে জ্যামিতি ও গিঁটের ধারণা কাজ করছে, তা দিয়ে অসংখ্য নতুন অভেদের পথ খোলা সম্ভব।
.জ্যামিতির মজা, মজার জ্যামিতি.
এখানে a-এর প্রতিটি মানের জন্য নতুন অভেদের একটি পরিবার থাকার কথা বলা হয়েছে। a = 2 হলে পাওয়া যায় অ্যান্ড্রুজ–গর্ডন অভেদ। এর বাইরে বড় মানগুলো নিয়ে আগে কাজ হয়নি।
.
চার
নতুন ধারণা দাঁড় করানো এক বিষয়, আর সেটি গাণিতিকভাবে প্রমাণ করা আরেক বিষয়। হুয়াংয়েরা জানতেন, তাঁদের অনুমানের প্রমাণ সহজ হবে না। ২০২৩ সালে হুয়াং আবার গণিতবিদদের কাছে ই-মেইল পাঠাতে শুরু করেন। এবার সংখ্যাটি ছিল ৪০-এর বেশি। বিভিন্ন সেমিনারেও তিনি নিজের কাজ উপস্থাপন করেন।
এবার কেন ওনোও আগ্রহী হয়ে ওঠেন। আগে যে ধারণাকে তিনি অবাস্তব ভেবেছিলেন, সেটিই এবার তাঁর কাছে অসাধারণ মনে হলো। তিনি এই গবেষণায় যোগ দেন। তত দিনে ওনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যাক্সিওম ম্যাথের প্রতিষ্ঠাতা গণিতবিদ হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। হুয়াং ও কেন ওনোর সঙ্গে যোগ দেন প্রতিষ্ঠানটির আরেক গণিতবিদ কেনি লাও। তাঁরা তিনজন মিলে অ্যাক্সিওমপ্রুভার নামে এআইয়ের সাহায্যে প্রমাণের কাজ শুরু করেন।
এখানে এআইকে সরাসরি কোনো পরিচিত সমস্যা সমাধান করতে বলা হয়নি। কারণ, বিষয়টি এত নতুন ছিল যে এ নিয়ে আগে কোনো গবেষণা বা প্রকাশিত তথ্যই ছিল না। এখানে অ্যাক্সিওমপ্রুভার কাজ করেছে একজন গবেষণা সহকারীর মতো। মানুষ যতটা সময় নিয়ে পরীক্ষা করতে পারত, তার চেয়ে অনেক বড় পরিসরে সম্ভাব্য গাণিতিক ধারণা ও পদ্ধতি যাচাই করতে পেরেছে এই এআই ব্যবস্থা।
.৩৫০ বছরের গাণিতিক ধাঁধা মাত্র ১১ দিনে সমাধান করল এআই.
২০২৩ সালে হুয়াং আবার গণিতবিদদের কাছে ই-মেইল পাঠাতে শুরু করেন। এবার সংখ্যাটি ছিল ৪০-এর বেশি। বিভিন্ন সেমিনারেও তিনি নিজের কাজ উপস্থাপন করেন।
.
এআইয়ের আরেকটি কাজ ছিল প্রমাণটিকে লিন নামে একটি বিশেষ ভাষায় রূপান্তর করা। এই ভাষায় লেখা গাণিতিক প্রমাণ কম্পিউটারের মাধ্যমে যাচাই করা যায়। ফলে প্রমাণের প্রতিটি ধাপ ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়। প্রায় সাত মাস ধরে মানুষ ও এআই একসঙ্গে কাজ করেছে। শেষ পর্যন্ত গণিতের পাঁচটি আলাদা শাখার ধারণা একত্র করে HJO অনুমানের প্রমাণ তৈরি করেন তাঁরা। মানুষ ও এআইয়ের এই যৌথ প্রচেষ্টাতেই প্রমাণের কাজটি সম্পন্ন হয়।
২০২৬ সালের আগস্টে গবেষকেরা তাঁদের HJO অনুমানটি arXiv প্রিপ্রিন্ট সার্ভারে প্রকাশ করেন। সেপ্টেম্বর মাসে তাঁরা এর প্রমাণও প্রকাশ করেন। অর্থাৎ, আগে যে সম্পর্কটি ছিল অনুমান, সেটির পক্ষে এখন পূর্ণাঙ্গ গাণিতিক প্রমাণ হাজির করা হয়েছে।
গবেষকেরা এখন সেই কাঠামোর অন্য দিকগুলো অনুসন্ধান করছেন। ওব্লোমকভ জানিয়েছেন, তাঁরা ট্রেফয়েল নটের বদলে হপফ লিংক নিয়ে কাজ করার একটি নতুন পথ খুঁজে পেয়েছেন। হপফ লিংক হলো দুটি আলাদা বৃত্তাকার লুপ, যেগুলো পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে জড়ানো যে একটিকে অন্যটি থেকে আলাদা করা যায় না। এ নিয়ে তাঁদের পরবর্তী গবেষণাপত্র তৈরি হচ্ছে।
.মুখস্থ না করেই নামতা মনে রাখার কৌশল.
প্রায় সাত মাস ধরে মানুষ ও এআই একসঙ্গে কাজ করেছে। শেষ পর্যন্ত গণিতের পাঁচটি আলাদা শাখার ধারণা একত্র করে HJO অনুমানের প্রমাণ তৈরি করেন তাঁরা।
.
এদিকে ফিল্ডস পদকজয়ী গণিতবিদ পিটার শোলৎসও হুয়াংয়ের কিছু ধারণা আরও এগিয়ে নিয়ে কয়েকটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। হুয়াং ও ওব্লোমকভ দুজনেই মনে করেন, xᵃ = yᵇ ধরনের বক্ররেখা কেবল শুরু। সিঙ্গুলারিটির আরও অনেক ধরন রয়েছে, যেগুলো নিয়ে গবেষণা করা যেতে পারে।
একটি সমস্যার শুরু হয়েছিল রামানুজনের সময়ে, কিন্তু তার কাজ চলছে এখনো। গণিতের সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই। একটি ছোট প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এমন সব সম্পর্কের সন্ধান পাওয়া যায়, যেগুলোর কথা আগে কেউ ভাবেনি!
সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান
.নদী গণিতের যে নিয়ম মেনে চলে
























