চড়া সুদে ঋণ, অন্যের সহায়তা, জমি বিক্রির টাকায় চিকিৎসা
- আপডেট সময় : ০৩:৫০:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

গত ১৯ সেপ্টেম্বর কিশোরী তমা আক্তারের হঠাৎ পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হয়। বাবা–মা প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। এরপর ১৩ অক্টোবর তাকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগে। তমার কিডনি জটিলতা শনাক্ত হয়েছে। তার রক্তে ক্রিয়েটিনিন স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে ২২ গুণ বেশি। গত রোববার থেকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি রেখে ডায়ালাইসিস শুরু হয়েছে।
গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় হাসপাতালের আইসিইউর সামনে উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায় তমার মা লিপি আক্তারকে। তাঁদের বাড়ি মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার আটিগ্রাম ইউনিয়নে। তিনি জানান, চার সন্তানের মধ্যে তমা সবার বড়। বাকি সন্তানদের নানির কাছে রেখে তিনি ও তাঁর স্বামী হাসপাতালে এসেছেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তমাকে ৩১০ নম্বর ওয়ার্ড থেকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। তাঁরা হাসপাতালের সিঁড়ির নিচে পাটি পেতে থাকছেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় তমার বাবা তরফ আলী আসেন হাতে রক্ত পরীক্ষার ৩৫০ টাকার একটি স্লিপ নিয়ে। এর আগে সকালে ৪০০ টাকার আরেকটি পরীক্ষা করিয়েছেন। পেশায় রংমিস্ত্রি বাবা জানান, সাহায্য নিয়ে, ঋণ করে, জমি বিক্রির টাকা থেকে এক মাসে মেয়ের জন্য ৭২ হাজার টাকা খরচ করেছেন। মেয়ের সুস্থতা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছেন না তিনি।
.
মূলত রোগীর আধিক্য, অস্ত্রোপচারের জন্য অপেক্ষা, দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকার প্রয়োজনীয়তা, অ্যাটেনডেন্টের খরচ বহন—ইত্যাদি কারণে রোগীর নিজের পকেট থেকে অর্থ খরচ হয়।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন, পরিচালক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
.স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে ৪২ শতাংশ মানুষ হিমশিম খাচ্ছে.
গতকাল ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে আরও চারটি পরিবারের বাবা–মায়ের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরাও সন্তানদের নিয়ে এসেছেন এবং চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন তাঁর কার্যালয়ে প্রথম আলোকে বলেন, মূলত রোগীর আধিক্য, অস্ত্রোপচারের জন্য অপেক্ষা, দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকার প্রয়োজনীয়তা, অ্যাটেনডেন্টের খরচ বহন—ইত্যাদি কারণে রোগীর নিজের পকেট থেকে অর্থ খরচ হয়। এই হাসপাতালে ২ হাজার ৬০০ শয্যা রয়েছে। আর রোগী থাকে ৪ হাজারের বেশি। এই হাসপাতাল থেকে কোনো রোগীকে ভর্তি না করে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। ফলে বাজেটের তুলনায় রোগীর চাপ অনেক বেশি। এরপরও বেশির ভাগ ওষুধ হাসপাতাল থেকে রোগীকে সরবরাহ করা হয়, যথেষ্ট পরিমাণে খাবার দেওয়া হয়। তিনি জানান, রোগীর সেবায় বাজেট আরও বাড়ানো হচ্ছে, এতে রোগীর নিজের পকেট থেকে খরচ কমতে পারে।
.স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬০ শতাংশ যায় ওষুধে, বেশির ভাগই দিতে হয় রোগীকে.
তমার বাবা তরফ আলী বলেন, মেয়ে অসুস্থ হওয়ার পর সিটি স্ক্যান ও অন্যান্য পরীক্ষায় প্রথম দিনই সাড়ে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়। মেয়ের কিডনি জটিলতা শনাক্ত হওয়ার পর এমআরআই করার জন্য চিকিৎসক ঢাকায় যেতে বলেন। ৬ অক্টোবর ঢাকায় একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ১২ হাজার টাকায় এমআরআই করান। মানিকগঞ্জে ফিরে যাওয়ার পর মেয়ের অবস্থা গুরুতর হলে ১৩ অক্টোবর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এনে ভর্তি করান। এখন পর্যন্ত তিনটি ডায়ালাইসিস হয়েছে। প্রতি ডায়ালাইসিসে খরচ ৪০০ টাকা। ওষুধপথ্য কিছু হাসপাতাল থেকে দেয়, কিছু বাইরে কিনতে হচ্ছে। হাসপাতালের দরিদ্র তহবিল থেকে সাহায্য করা হবে বলে গতকাল জানানো হয়েছে।
মা লিপি আক্তার বলেন, গ্রামে তাঁর স্বামীর কোনো ভিটেমাটিও নেই। তাঁরা অন্যের বাড়িতে থাকেন। তিনি নিজের বাবার বাড়ি থেকে জমির কিছু ভাগ পেয়েছিলেন। তাঁদের কিছু ঋণ ছিল, ঋণদাতার ক্রমাগত চাপের মুখে ওই জমি চাচাতো ভাইয়ের কাছে এক লাখ টাকায় বিক্রি করেন পাঁচ মাস আগে। ঋণ শোধের পর ১৫–২০ হাজার টাকা হাতে ছিল, সেই টাকাও মেয়ের চিকিৎসায় খরচ করে ফেলেছেন। নিজেদের খরচ কমাতে সকালে দুজন দুটো রুটি আর দুপুরে শুধু ডাল–ভাত খান। মেয়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমার মেয়েটা যে কী সুন্দর! মনে হয় যেন কোনো বড়লোকের মেয়ে। কেউ যদি আমার মেয়ের চিকিৎসার দায়িত্ব নিত, আমি তাঁদের বাসায় দাসি হয়ে থাকতাম!’
.স্বাস্থ্যসেবায় মাথাপিছু সরকারি খরচ মাত্র ১০৭০ টাকা.
ডিএমসির বার্ন ইউনিটের বারান্দায় (রেড ইউনিটের অতিরিক্ত শয্যা ৩) প্রায় চার মাস ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন জুয়েল সরদার (৩৬)। পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার কাটাখালী ইউনিয়নে বাড়ি। পেশায় তিনি জেলে। চার মাস আগে মাছ ধরতে গিয়ে ট্রলার থেকে পড়ে যান, ট্রলার তাঁর ওপর দিয়ে চলে যায়। তাঁর ডান পা মারাত্মক জখম হয়েছে। তিনি জানান, চার মাসে তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে আড়াই লাখ টাকা চড়া সুদে নিয়েছেন। এক বছরে সুদসহ ফেরত দিতে হবে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
জুয়েল জানান, বাড়িতে তিন সন্তান রেখে স্ত্রী শাহানাকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন। পায়ে অস্ত্রোপচার হয়েছে। ১০ দিন আগেও দিনে ১৫টি করে ওষুধ খেতে হতো। এর মধ্যে ১০টি নিজের কিনে খেতে হয়েছে। দুটো ইনজেকশন নিতে হতো ৮৫০ টাকা করে। ১০–১২ দিন আগে ইনজেকশন শেষ হয়েছে, ওষুধের পরিমাণ কমে এসেছে। এখন ৫টি ওষুধের মধ্যে চারটি হাসপাতাল থেকে পান।
.চড়া সুদে ৮ হাজার টাকা ধার, চার সন্তান নিয়ে হাসপাতালে মা .
ঢাকা মেডিকেলের অর্থোপেডিক বিভাগের নারী ওয়ার্ডে ইট দিয়ে বাঁ পায়ে ট্রাকশন দিয়ে রাখা হয়েছে কাজল রানীকে। তিনি ব্যথায় গোঙাচ্ছিলেন। তিনি ও সঙ্গে থাকা পরিবারের তিন সদস্য জানান, কাজল রানীর বাড়ি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলায়। গত বৃহস্পতিবার রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকার সময় একজন মোটরসাইকেলচালক তাঁকে ধাক্কা দেন। কাজল রানী বলেন, স্বামী এখন বেকার। তাঁর দুই মেয়ে। চিকিৎসার খরচ জোগাতে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন। গত এক সপ্তাহে ৯টি পরীক্ষা ও ওষুধ কেনা বাবদ তাঁর ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের শিশু ওয়ার্ডে (রেড ইউনিট) চার বছরের তাহমিদ অস্ত্রোপচারের জন্য ভর্তি হয়েছে। নড়াইলের কালিয়া উপজেলার শরিফুল ইসলাম ও রাবেয়া খানমের তিন সন্তানের মধ্যে সে ছোট। মা রাবেয়া খানম বলেন, গত বছরের ২৮ নভেম্বর পাশের বাসায় কুলখানির অনুষ্ঠানের জন্য উঠানে বড় চুলায় রান্না হচ্ছিল, তাহমিদ সেই চুলায় পড়ে যায়। এতে তার বাঁ হাত ও পা পুড়ে গেছে। হাতের তিনটি আঙুল একসঙ্গে লেগে রয়েছে, অস্ত্রোপচার করতে হবে। শিশুটির বাবা একটি প্রতিষ্ঠানে অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত। কষ্ট করে হলেও তিনি ছেলের সুস্থতার জন্য টাকা জোগাড় করছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক সার্জন (বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ) মো. হারুনুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার বিনা মূল্যে করা হয়, বেশির ভাগ ওষুধও দেওয়া হয়। এই বিভাগে যে রোগীরা ভর্তি হন, তাঁদের দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়। রোগীদের পুষ্টিকর খাবার বেশি লাগে। রোগীদের সঙ্গে পরিবারের একাধিক সদস্য থাকেন। ফলে রোগীর চেয়ে নিজেদের খরচই অনেক বেশি হয়।























