সুন্দরগঞ্জে ফের অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব, প্রতিরোধে নেই পদক্ষেপ
- আপডেট সময় : ১১:০১:১৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯৩ বার পড়া হয়েছে

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় আবারও গবাদিপশুর মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। রোগাক্রান্ত গরু জবাই ও মাংস কাটাকাটির পর পাঁচজনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। এতে খামারি ও পশু মালিকদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে আক্রান্তদের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু রয়েছে কি না, তা এখনো পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়নি।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, আক্রান্তদের লক্ষণ দেখে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ থাকার প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত ও কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
আক্রান্তরা হলেন উপজেলার কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের দুলাল গ্রামের মো. নবীর হোসেনের ছেলে মো. জাহেদুল ইসলাম (৫০), মো. আব্দুল কুদ্দুস মিয়ার ছেলে মো. খায়রুল ইসলাম (৩৫), মো. আজিজল হকের ছেলে মো. আজগর আলী (৪৮), মো. আজির উদ্দিনের ছেলে মো. আবুল হোসেন (৫০) ও মো. হাবিজার রহমানের ছেলে মো. নাজমুল হক (৪০)।
আক্রান্ত মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। জীবানু আছে কি না আতঙ্ক কাজ করছে ভিতরে ভিতরে। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা ইউনিয়ন পরিষদের কোনো লোক খোঁজ নেননি। তবে পশু হাসপাতালের লোকজন এসেছিলেন এবং তারা গরু ছাগলগুলোকে ভ্যাকসিন দিচ্ছেন।’
বেলকা ইউনিয়নের তরুণ উদ্যোক্তা ও খামারি জিয়াউর রহমান সরকার বলেন, ‘এনথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেই শুধু প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তৎপরতা চোখে পড়ে। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেই তাদের আর খোঁজ থাকে না। নিয়মিত টিকাদান ও আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা যথাযথভাবে হচ্ছে না। প্রাণিসম্পদ দপ্তরের গাফিলতির কারণেই অনেক খামারি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।’
সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার কসাই মো. নয়া মিয়া বলেন, ‘১৫ ইউনিয়ন ও পৌরসভা মিলে সপ্তাহে প্রায় ৩’শ গরু জবাই হয়। পৌরসভার গরুগুলো পরীক্ষা করে জবাই করা হয়। বাকী ১৫ ইউনিয়নের খবর জানি না। তবে পরীক্ষা ছাড়া কোনো গরু জবাই করা ঠিক না। প্রশাসনের তদারকি করা দরকার।’
কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মনোয়ার আলম সরকার বলেন, ‘বিষয়টি আমি চৌকিদারের মাধ্যমে জেনেছি। শুনলাম পশু হাসপাতালের লোকজন এসেছিলেন। তারাও আমাকে বলেননি।’
তার ইউনিয়নে পরীক্ষা ছাড়াই যত্রতত্র গরু জবাই হয় বিষয়টি স্বীকার করে তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি ভাবে কোনো মনিটরিং নেই। সে কারণে এ অবস্থা।’
এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কে. এম. ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, ‘অসুস্থ গরু জবাই করা হয়েছে গত মাসের ২৫ তারিখে। আমরা সংবাদ পেয়েছি ৩১ তারিখে। এরপরে গিয়ে আর মাংস পাইনি। কারো ফ্রীজে আছে কি না সেটাও জানার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা বলেছেন সবগুলো মাংস তারা খাওয়া শেষ করেছেন। বর্তমানে ওই এলাকায় গরু ছাগলের ভ্যাকসিন দেয়া হচ্ছে।’
এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আতিয়ার রহমান সোহাগ বলেন, ‘আহতদের লক্ষণ দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তাদের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ থাকতে পারে। তবে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কারণ অ্যানথ্রাক্স শনাক্তে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা উপজেলা পর্যায়ে তো দূরের কথা, জেলা পর্যায়েও রয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে তাদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাদের কেহই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসেননি। আমরাই তাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মো. কামরুল হাসানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘পরীক্ষা ছাড়া কোনো গরু জবাই করার সুযোগ নেই। বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের। ভবিষ্যতে পরীক্ষা ছাড়া যেন কোনো গরু জবাই করা না হয়, সে বিষয়ে কসাইদের নিয়ে সভা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।’

প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর অ্যানথ্রাক্স রোগের উপসর্গ নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের পশ্চিম বেলকা গ্রামের আবুল হোসেনের স্ত্রী মোছাঃ রোজিনা বেগম (৪৫) নামের এক নারীর মৃত্যু হয়েছে।
রোজিনা বেগমের তিনটি ছাগল ছিল। এর মধ্যে একটি ছোট ছাগল অসুস্থ হয়ে পড়ে। বেগতিক অবস্থা দেখে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সেটি জবাই করেন। এ সময় তার হাতের আঙুলে ক্ষত হয়। পরে স্থানীয় পল্লিচিকিৎসকের পরামর্শ নেন। এতে কাজ না হলে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং শেষে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়।
এছাড়াও একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর বেলকা ইউনিয়নের কিশামত সদর গ্রামের মো. মাহবুবুর রহমানের একটি রোগাক্রান্ত গরু জবাই করা হয়। মাংস কাটাকাটির কাজে যুক্ত ছিলেন স্থানীয় ১১ জন। এর চারদিন পর ২ অক্টোবর তাদের সবার শরীরের বিভিন্ন অংশে ফোসকা দেখা দেয়। পচন ধরে মাংসে। বিশেষ করে হাত, নাক, মুখ ও চোখে এসব উপসর্গ দেখা দেয়। পরে তারা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন। একই সময়ে সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডেও অসুস্থ গরুর জবাই ও মাংস কাটাকাটির সঙ্গে যুক্ত থাকায় ৬ জন আহত হয়েছিলেন।
















