শামসুর রাহমানের সাক্ষাৎকার: সময় সব ধূসর করে দেয়
- আপডেট সময় : ০৯:৪২:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

২০০৩ সালের ১৬ অক্টোবর শ্যামলীর বাসভবনে শামসুর রাহমানের এ সাক্ষাত্কার নিয়েছিলেন নাসির আলী মামুন। সাক্ষাৎকারটি প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৭ সালের ১৭ আগস্ট কবির মৃত্যুদিনে। এত দিন ছাপা কাগজে থাকা সাক্ষাৎকারটি আজ অন্য আলো অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
.
নাসির আলী মামুন: রাহমান ভাই, সম্প্রতি লেখা একটা কবিতা পড়েন।
শামসুর রাহমান: ‘বন্ধু, খানিক দাঁড়াও এই/ ঝোপের ধারে। পরে নাহয় পা চালিয়ে/ যাওয়া যাবে অন্য পথে,/ যেখান থেকে আখেরে ঠিক পৌঁছে যাব/ অভীষ্ট সেই সাগরতুল্য সভাস্থলে।
‘এখানে এক মুক্তিযোদ্ধা চিরনিদ্রা/ নিয়েছিলেন আলিঙ্গনে যুদ্ধ করে বিদেশি সব শত্রুসেনা/ এবং নিজের দেশের কিছু ঘৃণ্য লোকের ঘোর বিরুদ্ধে।/ বন্ধু, এমন স্থানে খানিক নত মাথায়/ না দাঁড়ালে ভুলের বোঝা বইতে হবে।
‘ঝোপের পাশে অবহেলায় শুয়ে থাকা/ মুক্তিযোদ্ধা এখনো কি এই এলাকার কিছু লোকের/ স্মৃতিতে খুব ঝলসিত? নাকি সবাই/ অবহেলার আস্তাকুঁড়ে কবর দিয়ে আছে সুখে?
‘বন্ধু এবং আমি নানা ভাবনা বয়ে নিয়ে/ যাচ্ছি হেঁটে অভীষ্ট সেই সাগরতুল্য সভাস্থলে।/ যাচ্ছি হেঁটে, সূর্য ডোবার আগেই হেঁটে/ যেতে হবে সবার মাঝে মুক্ত মনে, যেতেই হবে।
‘দেরি করা চলবে না আর, কোথাও আর থামলে এখন চলবে না ভাই,/ সূর্য ডোবার আগেই আশা জাগিয়ে রেখে/ চলতে হবে, চলো বন্ধু, এগোই চলো ভবিষ্যতের খোলা পথে।’
[‘সাগরতুল্য সভার দিকে’, ‘গন্তব্য নাইবা থাকুক’ (২০০৪) শামসুর রাহমান]
মামুন: কবিতাটিতে আপনার নিজের জীবনের কথা আছে বলে মনে হয়েছে।
রাহমান: কী জানি, আমি জানি না, হতে পারে, তোমার যখন মনে হয়েছে।
মামুন: ১৯৮৫ সালে আপনি প্রথম বলেছিলেন, একজন সৃজনশীল মানুষ বা কবির কমপক্ষে ৫০০ বছর বাঁচা উচিত। আপনার মাত্র ৭৪ চলছে, তার মানে এখনো আপনি শিশু।
রাহমান: হা হা হা…
.
মামুন: সৃজনশীল মানুষের ৫০০ বছর বাঁচা উচিত—কথাটি আপনি এখনো বলেন। বিশেষত আপনার জন্মদিনের আগে। মানুষ তো ৫০০ বছর বাঁচে না, এ জন্য কি আপনার কোনো ক্ষোভ আছে?
রাহমান: আমার মনে হয় প্রত্যেক মানুষই; সাধারণ হোক, অসাধারণ হোক, অস্বাভাবিক মুহূর্তে মানুষ আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যার মুহূর্তটাকে তুমি স্বাভাবিক মুহূর্ত বলতে পারো না। এটা আমার ধারণা, অন্য কারও সঙ্গে না–ও মিলতে পারে। স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষ মরতে চায় না। সে বেঁচে থাকতে চায় তার পরিবারের মধ্যে, সমাজের মধ্যে এবং সে যেসব কাজ করে তার মধ্যে। কাজের ক্ষেত্রে যারা তার সহকর্মী তাদের মধ্যে, বন্ধুদের মধ্যে সে বেঁচে থাকতে চায়। কিন্তু একটা অস্বাভাবিক মুহূর্তে তার কাছে মনে হয়, নিজেকে ধ্বংস করে ফেলি। এ জন্য আমি বলেছি, ৫০০ বছর বাঁচতে চাই, চট করে মরে যেতে চাই না। যারা বলে আহা মরে যাই—আমি তাদের দলে নাই। সুন্দর পৃথিবী। মানুষের অভাব-অনটন থাকে, আমার জীবনেও আছে কিছু অভাব। এসব সত্ত্বেও আমি বাঁচতে চাই। আমি বলব না, মরার জন্য আমি খুব ব্যাকুল; বরং বলব, আমি যাদের ভালোবাসি, যারা আমাকে ভালোবাসে তারাও বেঁচে থাক। আমি বেঁচে থাকতে চাই, যত দিন যত বছর বেঁচে থাকা যায়। একদিন সংবাদপত্রে দেখলাম, আমাদের দেশেরই একজন মানুষ শতবর্ষ পেরিয়েও সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে আছে। আমার দুর্ভাগ্য যে আমার স্বাস্থ্য ভালো নেই। চাইছি অনেক বাঁচতে, হয়তো বাঁচব না। জানি না, আবার বেঁচেও যেতে পারি। এটা একটা চান্সের বিষয়। আর আমি শারীরিক নয়, মানসিক কাজ করি। তবে শরীরেরও কিছু প্রয়োজন হয়। যে কাজ করি তা করতে আমি ভালোবাসি। আমি বাধ্য হয়ে করি তা নয় কিন্তু। তবে এক হিসাবে বাধ্যই। আমার মন, ধারণা, চিন্তা আমাকে বাধ্য করে কবিতা বা যেকোনো একটা কিছু লিখতে। সুতরাং যদি আমার মগজ সুস্থ থাকে, চিন্তা করার শক্তি থাকে, তাহলে অনেক অনেক বছর লিখতে চাই।
সে জন্যই আমার বাঁচার ইচ্ছা। আমার প্রিয়জনদের কাছে পাওয়া, তাদের সঙ্গে থাকার ইচ্ছা। আমার মা-বাবা চলে গেছেন। তাঁরা চলে যান, আমি চাইনি। তাঁদের জন্য আমি কেঁদেছি, দুজনের মৃত্যুতেই আমার কান্না পেয়েছে।
মামুন: আপনার ছেলে মতিন…
রাহমান: আমার ছেলে মতিন আমাদের গ্রামের বাড়ির পুকুরে ডুবে মারা গেল।
মামুন: সেটা কোন বছর?
রাহমান: বছরটা আমি ভুলে গেছি।
.
আমার মনে হয় প্রত্যেক মানুষই; সাধারণ হোক, অসাধারণ হোক, অস্বাভাবিক মুহূর্তে মানুষ আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যার মুহূর্তটাকে তুমি স্বাভাবিক মুহূর্ত বলতে পারো না। এটা আমার ধারণা, অন্য কারও সঙ্গে না–ও মিলতে পারে। স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষ মরতে চায় না। সে বেঁচে থাকতে চায় তার পরিবারের মধ্যে, সমাজের মধ্যে এবং সে যেসব কাজ করে তার মধ্যে। কাজের ক্ষেত্রে যারা তার সহকর্মী তাদের মধ্যে, বন্ধুদের মধ্যে সে বেঁচে থাকতে চায়।
.
মামুন: আপনি তো তখন ঢাকায় ছিলেন?
রাহমান: আমি ঢাকায় ছিলাম, আমি যাইনি। ওর মৃত মুখ আমি দেখতে চাইনি। এতে কেউ কেউ আমাকে খুব নিষ্ঠুর মনে করেছে। কিন্তু আমি পারতাম না, সে ওইভাবে শুয়ে আছে, ওটা আমি দেখতে পারতাম না। ওকে আমি গ্রামে পাঠিয়েছিলাম বাধ্য হয়ে। কেননা সে ভীষণ ভায়োলেন্ট হয়ে গিয়েছিল। ওর তো একটা অসুখ হয়েছিল, মানসিক। অল্প বয়সে। সে ভায়োলেন্ট হয়ে আক্রমণ করত। আমাকে খুব কমই করেছে। ভাই-বোন-মাকে, অন্য সবাইকে আক্রমণ করেছে। যারা কাজ করত তাদেরও করেছে। কোনোভাবে যদি আমার মেয়ের চেহারার ক্ষতি হয়, বিয়ের সমস্যা হবে—এটা চিন্তা করে ওকে পাঠিয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম, অন্তত প্রথম মেয়ের বিয়ে হওয়া পর্যন্ত সে ওখানে থাক।
মামুন: ভায়োলেন্ট হওয়ার পেছনে ওর তো কোনো দোষ ছিল না, আপনারা বিরক্ত হতেন কেন?
রাহমান: না, বিরক্ত না। একটা বিশেষ কারণে ওকে ওখানে পাঠিয়েছিলাম। সে যে ওখানে মারা যাবে তা তো আমি জানতাম না। ওকে দেখাশোনা করার জন্য আমার চাচাতো ভাইয়ের কাছে মাসে ৭০০ টাকা করে পাঠাতাম। আমার মনে হয়, সে ভালো করে দেখাশোনা করেনি, কষ্ট দিয়েছে ওকে। ওর জন্য কষ্টও পাই। কিন্তু কষ্ট করে তো লাভ নেই। ওর কথা মাঝেমধ্যে মনে পড়ে। সব সময় মনে পড়ে না, এটাও বলি। এটাই কিন্তু বাস্তব।
মামুন: মতিনকে নিয়ে তো কবিতাও লিখেছেন।
রাহমান: হ্যাঁ, লিখেছি।
মামুন: কয়টা?
রাহমান: দু-তিনটা হবে।
মামুন: লাইন মনে আছে?
রাহমান: মনে নেই। স্মৃতি নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কিছুই মনে পড়ে না। অনেক বিখ্যাত কবিদের নামও মনে পড়ে না।
মামুন: প্রিয় মানুষদের নাম?
রাহমান: অনেক প্রিয় মানুষের নামও মনে করতে পারি না। কিছুদিন পর হয়তো মনে পড়ে। এ রকমভাবে চলছে। এটাই বোধ হয় জীবন।
.
মামুন: মা-বাবা, ছেলে-সন্তানের বিয়োগ-বিচ্ছেদ তো মানুষের জীবনে ঘটে। এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
রাহমান: বিচ্ছেদের কারণে মানসিক সমস্যা হয়, তবে এখনো আমি সে স্টেজে আসিনি যে হাত কাঁপছে। মাথা ঘুরে যাচ্ছে। মাথা ঘোরে কখনো কখনো। সেটা আমার বোধ হয় শরীর ভালো না সে জন্য।
মামুন: আপনার ৭৪ বছরের জীবনকে আনন্দ-বেদনায় কীভাবে ভাগ করবেন?
রাহমান: আমার মনে হয়, সুখের ভাগটা বেশি। এটা আমি অস্বীকার করব না। ভাগ্যের কাছে আমি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব না। কিন্তু কিছু দুঃখ-কষ্ট, সেগুলো এত তীব্র যে আনন্দ তখন ম্লান হয়ে যায়। এই যে দুঃখ-কষ্ট, প্রিয়জনদের মৃত্যু, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-বন্ধুদের মৃত্যু—এগুলো আমাকে খুবই আলোড়িত করে। আবার ভুলেও তো যাই। নিজের কাজেও তো আবার মন দিই। একেবারে উন্মাদ তো আমি হয়ে যাই না। এটাই বোধ হয় জীবনের রীতি।
.
আমার মনে হয়, সুখের ভাগটা বেশি। এটা আমি অস্বীকার করব না। ভাগ্যের কাছে আমি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব না। কিন্তু কিছু দুঃখ-কষ্ট, সেগুলো এত তীব্র যে আনন্দ তখন ম্লান হয়ে যায়। এই যে দুঃখ-কষ্ট, প্রিয়জনদের মৃত্যু, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-বন্ধুদের মৃত্যু—এগুলো আমাকে খুবই আলোড়িত করে। আবার ভুলেও তো যাই। নিজের কাজেও তো আবার মন দিই। একেবারে উন্মাদ তো আমি হয়ে যাই না। এটাই বোধ হয় জীবনের রীতি।
.
মামুন: মৃত্যু ছাড়া বেদনার আর কী কী আছে আপনার? যেমন আপনি লিখছিলেন যে আপনার অনেক জীবিত ঘনিষ্ঠ বন্ধুই আপনার কাছে মৃত হয়ে গেছে।
রাহমান: আমার কাছে বেদনার লাগে যখন কেউ কেউ বন্ধুত্বের ভাব করে; কিন্তু আসলে বন্ধু নয়।
মামুন: এটা আপনি বুঝতে পারেন?
রাহমান: পারি। আবার আমি, সংখ্যায় বেশি না হলেও, প্রকৃত বন্ধুও পেয়েছি। তাদের কাছে আমি ঋণী। এই ঋণ টাকাপয়সার দিক থেকে নয়। তবে একবার টাকা ধার নিয়েছি রশীদ করীমের কাছ থেকে। রশীদ করীম একজন খাঁটি মানুষ। তাঁর লেখাও খুব ভালো। আমার স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করার সময় টাকা ছিল না। এদিকে কেবিনভাড়া দিতে হবে। খুব সিরিয়াস অসুখ হয়েছিল তার। তখন রশীদ করীমের কাছ থেকে ৪০০ টাকা ধার নিয়েছিলাম। পরে আমার হাতে যখন টাকা এল তত্ক্ষণাৎ আমি ফিরিয়ে দিলাম। তিনি কিন্তু ভুলেই গিয়েছিলেন যে আমাকে টাকা ধার দিয়েছিলেন। এই একমাত্র বন্ধু, যাঁর কাছে আমি ধার নিয়েছিলাম। আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ, আমার বিপদের সময় তিনি আমাকে সাহায্য করেছিলেন।
.
মামুন: বেদনার আর কোনো ব্যাপার…
রাহমান: অনেক বেদনা আছে, যা আসলে বলা যাবে না। অনেক আগে যখন আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ি; সে সময় আমি একজনের প্রেমে…, মানে আমার মধ্যে প্রেম জেগে উঠেছিল।
মামুন: তিনি কি ইংরেজি বিভাগের ছিলেন?
রাহমান: ইংরেজি বিভাগের নয়, অন্য একটি বিভাগের। আমি তো এমএ পড়েছি, পরীক্ষা দিইনি—অর্ধেক দিয়েছি, অর্ধেক দিইনি। তিনি পরীক্ষা দিয়ে পাস করে অধ্যাপনা করেছেন। তাঁর প্রেমে পড়েছিলাম। তিনি আসতেন। তখন ভার্সিটিতে ছুটি হওয়ার পর কখনো কখনো সাহিত্য সভা হতো। যাঁরা লেখক, তাঁরা কবিতা-গল্প-প্রবন্ধ পড়তেন। প্রায় প্রতিটি সভায় কয়েকজন মহিলা আসতেন। তাঁরা আলাদাভাবে বসতেন। ওখানে একজনকে আমার চোখে পড়ে। তিনিও আমার দিকে চেয়ে থাকতেন, শুনতেন ভালো করে। খুব সুন্দরী ছিলেন। বিশেষ করে তাঁর চোখ দুটো ছিল নীল। তাঁর সঙ্গে বেশ প্রেম জমে উঠেছিল। দুজনেই স্থির করেছিলাম আমরা বিয়ে করব। কিন্তু একদিন তিনি আমাকে চিঠি লিখলেন, লাস্ট চিঠি তাঁর। লিখলেন যে আমাকে এমএ পরীক্ষা দিতেই হবে; পরীক্ষা দিয়ে সিএসপি হতে হবে। চিঠিটি আমার বাবার হাতে পড়ে। মা-ও ছিলেন আমার পাশে। বাবা তখন মাকে বললেন, ‘তোমার ছেলের জন্য সব মেয়ে ফুলের মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিয়ে করার জন্য।’ কেননা শর্তটর্ত নিয়ে চিঠিটা তো আমার পক্ষে যায়নি। আমি তখনো কিছু জানি না। ভাবলাম, কী ব্যাপার! দেখলাম বাবার হাতে চিঠি।
মামুন: আপনি চিঠিটা কখন পড়লেন?
রাহমান: পরে পড়েছি। আম্মাকে বললাম, দিয়ে দাও চিঠি। আম্মা চিঠিটা দিলেন, আমি পড়লাম।
মামুন: কোন বছরের ঘটনা এটা, মনে আছে?
রাহমান: পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে।
.
নিন্দা করলে আমি সেটা এভাবে নিই যে একটা জিনিস যখন তৈরি হয়, তখন প্রশংসা হতে পারে, না-ও হতে পারে। নিন্দা হতে পারে, না-ও হতে পারে। দুটো দিকই আছে। সুতরাং আমি সাধারণত একটু নির্বিকার থাকি। আমি দেশের প্রধান কবি কি না, আদৌ কবি কি না—এ নিয়ে মাথা ঘামাই না। আমার লিখতে ভালো লেগেছে, লিখেছি। আমাকে তো কেউ বলেনি যে তুমি লেখো।
.
মামুন: ’৫৬-’৫৭—এ রকম সময়?
রাহমান: তার কিছুটা আগে বোধ হয়।
মামুন: সেই ভদ্রমহিলা কি আপনার কবিতা পড়তেন?
রাহমান: পড়তেন। তিনি এখনো জীবিত।
মামুন: দুজনে মিলেই কি বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? নাকি শুধু আপনারই সিদ্ধান্ত ছিল?
রাহমান: আমিই সিদ্ধান্ত নিলাম। তিনিও আর রাজি হলেন না। এটা আমার খুব খারাপ লেগেছিল। পরে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে।
মামুন: বিয়ের পর?
রাহমান: অনেক পর। দেখা হয়েছে এবং আমরা ওটা ভুলেই গেছি আরকি। এখন আর দ্বেষ কিংবা ঘৃণা নেই।
মামুন: আর দু-একটা বেদনার ঘটনা বলেন।
রাহমান: বেদনার আর তেমন কিছু নেই।
.
মামুন: আনন্দই বেশি আপনার জীবনে।
রাহমান: হ্যাঁ, আনন্দই বেশি।
মামুন: অনেক বড় কবির পরিবারই কবিকে বুঝতে পারে না বা বুঝতে চায় না। এটা কি বেদনা জাগায়?
রাহমান: না, আমার এটা মনে হয় না। আমার স্ত্রী তো একেবারে শিক্ষিত নয়, কিন্তু সে আমার কদর বোঝে।
মামুন: বুঝতে পারে?
রাহমান: বুঝতে পারে যে আমার একটা নাম বা সুনাম আছে। আমি খুব ফেলনা লোক নই। আমার ছেলেও হয়তো বোঝে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বোঝে আমার ছেলের বউ টিয়া, পশ্চিমবঙ্গের মেয়ে। সে যখন ছোট, ওর ফুফুর বিয়ে হয় ঢাকায়। ফুফুর সঙ্গে সে ঢাকায় আসে এবং থেকে যায়।
মামুন: আপনি যেসব নারীকে পছন্দ করেছেন, তাঁদের কেউ কেউ এখন আর নেই। তাঁদের মৃত্যুতে আপনার কষ্ট হয়নি?
রাহমান: সময় এমন একটা জিনিস, সব আস্তে আস্তে ধূসর করে দেয়। কারও মৃত্যুর খবর পেলে প্রথমে খুব কষ্ট হয়। তীব্র সেটা। কিন্তু এখন, ‘হ্যাঁ, তাঁর মৃত্যু হয়েছে’—এই তো বললাম। সময় মানুষকে অনেক বদলে দেয়।
.
মামুন: আপনিও অনেক বদলেছেন?
রাহমান: হ্যাঁ, বদলেছি আমি, অস্বীকার করব না। কিন্তু আমি যখন ভালোবেসেছি, খুব তীব্রভাবেই বেসেছি। এর মধ্যে কোনো ফাঁকি রাখিনি।
মামুন: আপনি যাঁদের ভালোবেসেছেন, তাঁরাও কি আপনাকে সে রকম ভালোবেসেছেন?
রাহমান: হ্যাঁ, মোটামুটি।
মামুন: তাঁরা তো আপনার প্রেরণা ছিল।
রাহমান: হ্যাঁ, প্রেরণা ছিল।
মামুন: আপনি অনেক কবিতা লিখেছেন, মনে হয় বেশির ভাগই প্রেমের কবিতা। আপনার কী মনে হয়?
রাহমান: কিছু না কিছু, কোনো না কোনো জিনিসের প্রতি প্রেম তো বটেই। হয়তো প্রেমের যে অর্থ আমরা জানি, ঠিক সে অর্থে হয়তো নয়। মানুষের জন্য তো ভালোবাসা আছেই।
মামুন: মানুষের জন্য প্রেম, দেশের জন্য প্রেম।
রাহমান: হ্যাঁ, দেশের প্রতি। এটা তো আছেই। এটা আমার কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে। কেউ কেউ নিন্দা করেছেন—কী লেখে এগুলো! আবার অনেকে প্রশংসা করেছেন।
.
মামুন: নিন্দা শুনলে কেমন লাগে?
রাহমান: নিন্দা করলে আমি সেটা এভাবে নিই যে একটা জিনিস যখন তৈরি হয়, তখন প্রশংসা হতে পারে, না-ও হতে পারে। নিন্দা হতে পারে, না-ও হতে পারে। দুটো দিকই আছে। সুতরাং আমি সাধারণত একটু নির্বিকার থাকি। আমি দেশের প্রধান কবি কি না, আদৌ কবি কি না—এ নিয়ে মাথা ঘামাই না। আমার লিখতে ভালো লেগেছে, লিখেছি। আমাকে তো কেউ বলেনি যে তুমি লেখো। হ্যাঁ, বলেছে, সে হলো আমার মন, আমার মাথা। আমার তো লেখার কথা ছিল না। কারও লেখার কথা থাকে না। হঠাৎ তাঁর মনে জেগে ওঠে তাঁর লেখা। তিনি যত বড় বা যত ছোট কবিই হোন। তিনি যদি লেখক বা কবি হন, তাঁর মনে জাগে, না হলে তো লেখা যায় না।
মামুন: আপনার রচনায় আপনি কোন সুরটা বাজাতে চেয়েছেন?
রাহমান: মূল সুরটা ভালোবাসারই। সেটি কোনো ব্যক্তির প্রতি হতে পারে; আমার পরিবারের লোকজন, আমার মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান হতে পারে। আমার পরবর্তী জেনারেশন হতে পারে বা আমার বন্ধু হতে পারে। বন্ধুদের নিয়েও কবিতা লিখেছি আমি। তারপর দেশের জন্য লিখেছি। সুরটা প্রেমেরই মনে করি। ঘৃণা দিয়ে তো আমি লিখিনি। মানুষের প্রতি ঘৃণাটা আমার আসে না। হয়তো খুব বেশি হলে ব্যঙ্গর মতো হয়ে যায়। এটা আমার দোষ কি না জানি না। হয়ে যায় আরকি।
মামুন: ঘৃণা কিন্তু ঠিকই প্রকাশ পায়। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে একটা প্রদর্শনী দেখে এক কবিতায় আপনি লিখেছিলেন—ধিক, ধিক, রাজাকারদের। এ রকম আরও অনেক কবিতা আছে আপনার, বোঝা যায়।
রাহমান: বোঝা যায়?
.
মামুন: আমরা পাঠক হিসেবে বুঝতে পারি। আচ্ছা, আজ আমার সামনে একটি কবিতা লিখেছেন। কবিতাটা কি আগেই মাথায় এসেছিল?
রাহমান: না। আমি সাধারণত পত্রিকা পড়ি সকালবেলা। তারপর লেখালেখি করি। আজ এই কবিতা কিন্তু পত্রিকা পড়ার আগেই লিখেছি। না হলে হয়তো লেখাই হতো না। হঠাৎ আমার মনে স্ট্রাইক করেছে। আজ এ রকম একটা কবিতা লিখব আমি জানতাম না। অনেস্টলি বলছি। ভণ্ডামি করছি না, বাহাদুরিও না। যে রকমই হোক, আমি এটা লিখে ফেলেছি। হ্যাঁ, একটা জিনিস মাথায় থাকে, হয়তো কোথাও লেখা দিতে হবে…
.
মামুন: ফরমায়েশি লেখা?
রাহমান: ফরমায়েশি বলতে ঠিক ফরমায়েশি না, মানে লেখা চায় কেউ কেউ। চায় যে এটা আমার সৌভাগ্য বলতে পারো। অনেকের কাছে লেখা চায় না, তারা দেয় কিন্তু। আমার কাছে চাইছে লেখা, এটা কিন্তু সহজ কথা না।
মামুন: তাহলে কি আপনি জনপ্রিয় এবং খ্যাতিমান—দুটোই?
রাহমান: হা হা হা, কী জানি, আমি জানি না।
মামুন: জনপ্রিয়তা কিন্তু সহজে আসে না। দেখা যায় অনেকে খুব খ্যাতিমান, কিন্তু জনপ্রিয় নন।
রাহমান: যেমন ধরো, এক ভদ্রলোক আর্মিতে কাজ করতেন, তিনি খুব উত্সাহী হয়ে আমার জন্মদিন পালন করবেন। তাঁর নাম, কী যেন নাম…
মামুন: মেজর এম এইচ খান (অব.)।
রাহমান: হ্যাঁ, চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার।
মামুন: চলুন, পেছনে ফিরে যাই। আপনার জন্ম তো ৪৬ মাহুতটুলীতে, পুরান ঢাকায়। ওই বাড়ির একটা বর্ণনা দেন। আপনার বাবা কী করতেন, আপনার ভাইবোন—তাঁদের কথা বলুন।
রাহমান: আমি জন্মেছি আমার নানার বাড়িতে। নানার বাড়ি আর আমাদের মাহুতটুলীর ওই বাড়ি বলা যায় একটাই বাড়ি, মাঝখানে শুধু দেয়াল ছিল একটা। যে ঘরে আমি জন্মেছি, সেটি ছিল মাটির ঘর।
মামুন: বাকিটা তো দালান ছিল?
রাহমান: হ্যাঁ।
.
মামুন: আপনার নানা ভাড়ায় থাকতেন, না নিজেই মালিক ছিলেন বাড়িটার?
রাহমান: নিজেই মালিক ছিলেন।
মামুন: নানার নামটা একটু বলেন।
রাহমান: মুন্সি আফতাব উদ্দিন আহম্মদ। আমার নানা ও নানিকে আমি একটা বই উত্সর্গ করেছি, কবিতার বই। জন্মানোর পর আমাকে নানার বাড়ি থেকে আমাদের বাড়িতে আনা হয়। এই বাড়িটা আমার আব্বা ও চাচা মিলে বানিয়েছিলেন। আমি তো আমার মা-বাবার প্রথম সন্তান। কিন্তু আমার মা বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী ছিলেন আমার মায়েরই বড় বোন। আবার তিনি ছিলেন নানার আরেক স্ত্রীর মেয়ে। তিনি মারা যান। ওনার ঘরে ছিল চার সন্তান, তাঁদের মধ্যে একজনকে আমি দেখতে পারিনি। আগেই মারা যান তিনি। তিনজনকে আমি দেখেছি। এই তিনজনও আর বেঁচে নেই।
মামুন: আপনার নানার আদি নিবাস কোথায়?
রাহমান: নরসিংদী জেলার পাড়াতলী গ্রাম। আমার দাদা আর নানা তো আপন ভাই। নানা ছিলেন ছোট। দাদা একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তখন স্কুলটার দরিদ্র অবস্থা ছিল। শুরুতে ঘর ছিল বেড়ার। আব্বা ওটাকে হাইস্কুল করেছেন।
মামুন: মাহুতটুলীর বাড়িতে আর যান না কত দিন হলো?
রাহমান: তিন বছর।
মামুন: বাড়িটা কি বিক্রি করে দিয়েছেন?
রাহমান: হ্যাঁ।
মামুন: শেষবার যখন গেলেন, তখন কেউ আপনাকে চিনতে পেরেছিল?
রাহমান: কেউ চিনতে পারেনি। সে রকম পুরোনো লোক নেই এখন। আমার বয়সই তো এখন ৭৪ হয়ে যাচ্ছে। স্মৃতিও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু মনে পড়ে। যেমন ছোটবেলায় নানির সঙ্গে ঘুমাতাম এবং মাঝেমধ্যে বিছানায় প্রস্রাব করে দিতাম। নানা-নানি খুব স্নেহ করতেন। নানি নানাকে বলতেন, তোমার নাতির জ্বালায় আমি নামাজ পড়তে পারব না। হা হা হা।

























