ঢাকা ০৮:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

রাকিবুলের জিপিএ-৫ পাওয়ার খবরে শোক বাড়ল পরিবারে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:৩২:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিলেন রাকিবুল ইসলাম। সব সময় ক্লাসে প্রথম হয়েছেন। এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকার ফার্মগেট এলাকার একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিলেন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর কোচিংয়ের শিট দেওয়ার কথা বলে এক লোক তাঁকে বাসা থেকে ডেকে নেন। এরপর আর ফেরেননি রাকিব। গত ৬ অক্টোবর নীলফামারীর ডিমলা থেকে রাকিবুলের লাশ উদ্ধার করা হয়।

গত শনিবার প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, রাকিবুল জিপিএ–৫ পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর এই ভালো ফলের আনন্দ নেই পরিবারে। ছেলে হারানোর ব্যথায় পাগলপ্রায় মা। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি এলাকার মানুষও মেনে নিতে পারছেন না মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন পরিণতি।

.

রাকিবুল ইসলামের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের দাদিরআটা গ্রামে। তিনি এ গ্রামের কৃষক খাদেমুল ইসলাম ও জোহুরা বেগমের ছেলে। এবার ঘাটাইল ক্যান্টনম্যান্ট কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়া। সেই স্বপ্ন পূরণের প্রস্তুতি নিতে ঢাকায় গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করতে।

রাকিবুলের ভাই জহিরুল ইসলাম জানান, রাকিব পূর্ব শেওড়াপাড়ায় বন্ধুদের সঙ্গে মেসে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করতেন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টার দিকে অজ্ঞাতপরিচয় একজন তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করেন। এরপর রাকিবুল তাঁর বন্ধু ইসমাইল ও বুলবুলকে বাইরে যাওয়ার কথা বলেন।

.

ওই দিন রাত ১২টা ২৩ মিনিটের দিকে রাকিবুলের নম্বরে ফোন করেন তাঁর বড় ভাই। একজন ফোন ধরে বলেন, রাকিবুলকে ফিরে পেতে ১৫ লাখ টাকা দিতে হবে। এরপর তাঁর দুটি ফোন নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে রাকিবুলের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে পরিবার চার লাখ টাকা দেয়। কিন্তু টাকা পাওয়ার পর রাকিবুলকে ফেরত না দিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন ওই ব্যক্তি।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর নিখোঁজের পর রাকিবুলকে না পেয়ে অপহরণ ও অর্থ আদায়ের অভিযোগে গত ৫ অক্টোবর ঢাকার কাফরুল থানায় মামলা করেন তাঁর বড় ভাই জহিরুল ইসলাম। ওই দিন সন্ধ্যায় রাজধানীর শুক্রাবাদ এলাকা থেকে আবদুল্লা আল মামুন ওরফে মামুন সরকার নামের এক ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁকে নিয়ে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া গ্রামে পুলিশ অভিযান চালায়। মামুনের দেখিয়ে দেওয়া জায়গা থেকে গত ৬ অক্টোবর মাটি চাপা দেওয়া অবস্থায় কার্টনে ভরা রাকিবুলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

.

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কাফরুল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শ্যামল কুমার হালদার জানান, জিজ্ঞাসাবাদে মামুন জানিয়েছেন, ১৬ সেপ্টেম্বর রাকিবুলকে ধানমন্ডির বাসায় নিয়ে হত্যা করেন মামুন। এরপর তাঁর মরদেহ একটি কার্টনে ভরে টেপ দিয়ে মুড়িয়ে রাখেন। ওই দিন রাত ১০টার দিকে অটোরিকশায় করে কার্টনটি গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যান। সেখান থেকে বাসে রংপুরে যান। পরে আরেকটি বাসে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা বাস্ট্যান্ডে পৌঁছান। পরদিন সকাল ১০টার দিকে কার্টনটি নিয়ে বাড়িতে যান। সারা দিন বাড়ির পাশের সুপারিবাগানে সেটি রেখে সন্ধ্যার পর মাটি চাপা দেন। মামুনের জবানবন্দি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট লিপিবদ্ধ করেন বলে তদন্ত কর্মকর্তা জানান। পরে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

.

এদিকে এইচএসসি পরীক্ষার ফল বের হওয়ার পর দেখা যায়, রাকিবুল ইসলাম জিপিএ–৫ পেয়েছেন। এতে পরিবারের সদস্যদের শোক আরও বেড়ে গেছে।

রাকিবুলের ভাই জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ভাই এত ভালো রেজাল্ট করেছে, তারপরও আমাদের কাঁদতে হচ্ছে। শুধু আমরা নই, শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ ওর সহপাঠীরাও শোকাহত। ভাই ভালো রেজাল্ট করেছে, আমাদের সবার মাঝে মিষ্টি বিতরণ করার কথা। কিন্তু তা করতে পারছি না। আমাদের কান্নাকাটি করতে হচ্ছে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

রাকিবুলের জিপিএ-৫ পাওয়ার খবরে শোক বাড়ল পরিবারে

আপডেট সময় : ০৬:৩২:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিলেন রাকিবুল ইসলাম। সব সময় ক্লাসে প্রথম হয়েছেন। এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকার ফার্মগেট এলাকার একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিলেন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর কোচিংয়ের শিট দেওয়ার কথা বলে এক লোক তাঁকে বাসা থেকে ডেকে নেন। এরপর আর ফেরেননি রাকিব। গত ৬ অক্টোবর নীলফামারীর ডিমলা থেকে রাকিবুলের লাশ উদ্ধার করা হয়।

গত শনিবার প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, রাকিবুল জিপিএ–৫ পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর এই ভালো ফলের আনন্দ নেই পরিবারে। ছেলে হারানোর ব্যথায় পাগলপ্রায় মা। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি এলাকার মানুষও মেনে নিতে পারছেন না মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন পরিণতি।

.

রাকিবুল ইসলামের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের দাদিরআটা গ্রামে। তিনি এ গ্রামের কৃষক খাদেমুল ইসলাম ও জোহুরা বেগমের ছেলে। এবার ঘাটাইল ক্যান্টনম্যান্ট কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়া। সেই স্বপ্ন পূরণের প্রস্তুতি নিতে ঢাকায় গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করতে।

রাকিবুলের ভাই জহিরুল ইসলাম জানান, রাকিব পূর্ব শেওড়াপাড়ায় বন্ধুদের সঙ্গে মেসে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করতেন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টার দিকে অজ্ঞাতপরিচয় একজন তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করেন। এরপর রাকিবুল তাঁর বন্ধু ইসমাইল ও বুলবুলকে বাইরে যাওয়ার কথা বলেন।

.

ওই দিন রাত ১২টা ২৩ মিনিটের দিকে রাকিবুলের নম্বরে ফোন করেন তাঁর বড় ভাই। একজন ফোন ধরে বলেন, রাকিবুলকে ফিরে পেতে ১৫ লাখ টাকা দিতে হবে। এরপর তাঁর দুটি ফোন নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে রাকিবুলের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে পরিবার চার লাখ টাকা দেয়। কিন্তু টাকা পাওয়ার পর রাকিবুলকে ফেরত না দিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন ওই ব্যক্তি।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর নিখোঁজের পর রাকিবুলকে না পেয়ে অপহরণ ও অর্থ আদায়ের অভিযোগে গত ৫ অক্টোবর ঢাকার কাফরুল থানায় মামলা করেন তাঁর বড় ভাই জহিরুল ইসলাম। ওই দিন সন্ধ্যায় রাজধানীর শুক্রাবাদ এলাকা থেকে আবদুল্লা আল মামুন ওরফে মামুন সরকার নামের এক ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁকে নিয়ে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া গ্রামে পুলিশ অভিযান চালায়। মামুনের দেখিয়ে দেওয়া জায়গা থেকে গত ৬ অক্টোবর মাটি চাপা দেওয়া অবস্থায় কার্টনে ভরা রাকিবুলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

.

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কাফরুল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শ্যামল কুমার হালদার জানান, জিজ্ঞাসাবাদে মামুন জানিয়েছেন, ১৬ সেপ্টেম্বর রাকিবুলকে ধানমন্ডির বাসায় নিয়ে হত্যা করেন মামুন। এরপর তাঁর মরদেহ একটি কার্টনে ভরে টেপ দিয়ে মুড়িয়ে রাখেন। ওই দিন রাত ১০টার দিকে অটোরিকশায় করে কার্টনটি গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যান। সেখান থেকে বাসে রংপুরে যান। পরে আরেকটি বাসে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা বাস্ট্যান্ডে পৌঁছান। পরদিন সকাল ১০টার দিকে কার্টনটি নিয়ে বাড়িতে যান। সারা দিন বাড়ির পাশের সুপারিবাগানে সেটি রেখে সন্ধ্যার পর মাটি চাপা দেন। মামুনের জবানবন্দি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট লিপিবদ্ধ করেন বলে তদন্ত কর্মকর্তা জানান। পরে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

.

এদিকে এইচএসসি পরীক্ষার ফল বের হওয়ার পর দেখা যায়, রাকিবুল ইসলাম জিপিএ–৫ পেয়েছেন। এতে পরিবারের সদস্যদের শোক আরও বেড়ে গেছে।

রাকিবুলের ভাই জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ভাই এত ভালো রেজাল্ট করেছে, তারপরও আমাদের কাঁদতে হচ্ছে। শুধু আমরা নই, শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ ওর সহপাঠীরাও শোকাহত। ভাই ভালো রেজাল্ট করেছে, আমাদের সবার মাঝে মিষ্টি বিতরণ করার কথা। কিন্তু তা করতে পারছি না। আমাদের কান্নাকাটি করতে হচ্ছে।’