ঢাকা ০৬:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহায়তা পেলেন নিহত পোশাকশ্রমিক তৌফিকের পরিবার সুন্দরগঞ্জে যুবলীগ নেতাসহ গ্রেপ্তার ৩ পরীক্ষার আগে কেন্দ্র বদল, ৪০ কিলোমিটার যাতায়াতের শঙ্কায় শিক্ষার্থীরা অক্টোবরে হামলা-হয়রানির শিকার ২৮ সংবাদকর্মী, প্রাণ গেছে একজনের: বিএজির প্রতিবেদন মোগল জাহাজে ডাকাতিতে জড়িত ব্যক্তির নামে নিউইয়র্কের সৈকত দি পল-সেলসোরা নেই, মেসির বিদায়ের পর আর্জেন্টিনার প্রথম দলে কারা আছেন জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন বিষয়ে সরকার আন্তরিক আবেদন ছিল দুই কোটি টাকার, বড়দিনে তিন কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কমার্স ব্যাংকের দুই পরিচালকের পদত্যাগ, প্রিমিয়ারে নতুন তিন পরিচালক ‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান আইডি’ চালুর উদ্যোগ নেবে আইসিটি বিভাগ

বাংলার প্রথম ডাকটিকিট

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১১:০০:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলার প্রথম ডাকটিকিট

১৮৫৪ সালের ১ অক্টোবর তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রথমবারের মতো ডাকটিকিট ব্যবহার করা হয়। ডাকটিকিটের প্রচলন অবশ্য আরও আগে, ১৮৪০ সালে যুক্তরাজ্যে। তিন বছর পর, ১৮৪৩ সালের ১ মার্চ সুইজারল্যান্ডের জুরিখ ক্যান্টন তাদের নিজস্ব ব্যবহারের জন্য ডাকটিকিট প্রকাশ করে। এর পাঁচ মাস পর ব্রাজিল সমগ্র দেশের জন্য ডাকটিকিট চালু করে। পরবর্তী সময়ে জেনেভা (১৮৪৩), যুক্তরাষ্ট্র (১৮৪৭), মরিশাস (১৮৪৭), ফ্রান্স (১৮৪৯), বেলজিয়াম (১৮৪৯), বাভারিয়া/জার্মানি (১৮৪৯) ও স্পেন (১৮৫০)—এই দেশ বা রাজ্যগুলোর মাধ্যমে প্রথম ১০ বছরে মোট ১০টি অঞ্চলে ডাকটিকিটের ব্যবহার শুরু হয়।

১৮৫০ সালের আগে ভারতের ডাকব্যবস্থা ছিল বেশ বিশৃঙ্খল। অঞ্চলভেদে লোকাল ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর বা সামরিক কর্মকর্তারা নিজস্ব নিয়মে পোস্ট অফিস পরিচালনা করতেন। চিঠির ওজন ও দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে ডাকমাশুল হিসাব করা হতো, যা ছিল অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। সাধারণ মানুষ ডাকমাশুলের হিসাব বুঝত না বললেই চলে। ডাকব্যবস্থার আধুনিকায়নে ১৮৫০ সালে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসি ‘পোস্ট অফিস কমিশন’ গঠন করেন। কমিশন প্রধানত চারটি সুপারিশ করে:

১. অভিন্ন ডাকমাশুল: দূরত্বের হিসাব বাদ দিয়ে কেবল ওজনের ভিত্তিতে পুরো ভারতে কম খরচে একই ডাকমাশুল নির্ধারণ।

২. আঠালো ডাকটিকিট প্রবর্তন: নগদ টাকায় মাশুল পরিশোধের বদলে পূর্ব-প্রদত্ত (Pre-paid) আঠালো ডাকটিকিট বাধ্যতামূলক করা। এবং যুক্তরাজ্য থেকে এই ডাকটিকিটের নকশা ও মুদ্রণের ব্যবস্থা করা।

৩. একক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ: সব পোস্ট অফিসকে একটি কেন্দ্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে আনা।

৪. বিনা মূল্যে ডাক সুবিধা বাতিল: সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য প্রযোজ্য বিশেষ ও বিনা মূল্যে চিঠি পাঠানোর সুবিধা (Franking) বন্ধ করা।

এই সুপারিশসমূহের আলোকে ডাকটিকিট প্রকাশের চিন্তাভাবনা চলতে থাকে। তবে লর্ড ডালহৌসি যুক্তরাজ্য থেকে ডাকটিকিট নকশা ও মুদ্রণ করানোর বিপক্ষে ছিলেন, কারণ এতে প্রচুর সময়ের প্রয়োজন ছিল, যা ডাকটিকিট সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সে সময় ভারতবর্ষের রাজধানী ছিল কলকাতা। কলকাতার টাঁকশালে ডাকটিকিটের মতোই সংবেদনশীল স্ট্যাম্প পেপার ছাপা হতো। তাই লর্ড ডালহৌসি টাঁকশালের সুপারিনটেনডেন্ট কর্নেল ফোর্বসকে ডাকটিকিট তৈরির দায়িত্ব দেন।

এরই মধ্যে ১৮৫২ সালের ১ জুলাই সিন্ধু প্রদেশের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসক স্যার বার্টেল ফ্রেরের উদ্যোগে ‘সিন্ধু ডাক’ নামে আধা আনা মূল্যের একটি ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। এটি এশিয়ার প্রথম ডাকটিকিট হলেও এর ব্যবহার কেবল সিন্ধু প্রদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল।

সিন্ধু ডাক প্রকাশের পর সমগ্র ভারতের জন্য একক ডাকটিকিট চালুর তাগিদ বাড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কর্নেল ফোর্বস একটি নকশা প্রস্তুত করেন, যেখানে ব্রিটিশরাজের প্রতিনিধিত্ব করা একটা সিংহের ছবি ছিল ও পেছনে একটা পামগাছ ছিল। তাই এই নকশা ‘লায়ন অ্যান্ড পাম ট্রি’ নামে পরিচিত।

লর্ড ডালহৌসি কিন্তু এই নকশা পছন্দ করলেন না। কারণ, তখন যুক্তরাজ্য বা তার যেসব কলোনিতে ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়েছে, তার সবই রানি ভিক্টোরিয়ার ছবি দিয়েই প্রকাশ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের মতো ভারতেও রানি ভিক্টোরিয়ার প্রতিকৃতিসংবলিত ডাকটিকিট প্রকাশের পক্ষে মত দিয়ে লর্ড ডালহৌসি এই নকশা বাতিল করেন।

কর্নেল ফোর্বস চাননি একই মেশিনে স্ট্যাম্প পেপার ও ডাকটিকিট ছাপা হোক। কারণ, তাতে তার স্ট্যাম্প পেপার ছাপানোয় বিঘ্ন ঘটবে। তিনি যুক্তরাজ্য থেকে নতুন মেশিন ও প্রিন্টিং প্লেট আনার পক্ষে ছিলেন। তবে এতে দেরি হবে দেখে লর্ড ডালহৌসি দ্রুত কাজ শেষ করতে কলকাতার সার্ভেয়ার জেনারেলের অফিসকে দায়িত্ব দেন। সার্ভে অফিসে লিথোগ্রাফি প্রিন্টিংয়ের মানচিত্র ছাপানোর মেশিনে ডাকটিকিট ছাপানোর ব্যবস্থা করা হয়।

ডেপুটি সার্ভেয়ার জেনারেল ও রেভিনিউ সার্ভের সুপারিনটেনডেন্ট ক্যাপ্টেন হেনরি এডওয়ার্ড থুইলিয়ার ছিলেন প্রিন্টিংয়ের দায়িত্বে। তাকে চারটি পৃথক মূল্যমানের চারটি ডাকটিকিট ছাপানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়:

আধা আনা: ১/৪ তোলা পর্যন্ত ওজনের চিঠির জন্য।

এক আনা: ১/৪ তোলার বেশি কিন্তু ১ তোলার কম ওজনের জন্য।

দুই আনা: ১ তোলার বেশি কিন্তু ২ তোলার কম ওজনের জন্য।

চার আনা: ২ তোলার বেশি কিন্তু ৪ তোলার কম ওজনের জন্য।

থুইলিয়ার রানির প্রতিকৃতি দিয়ে খসড়া নকশা তৈরি করলে ১৮৫৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তা অনুমোদিত হয়। সার্ভে অফিসে সংরক্ষিত জলছাপযুক্ত ‘উভ পেপারে’ সিঁদুর লাল রঙে আধা আনা মূল্যের প্রথম ডাকটিকিট ছাপা হয়। প্রতিটি শিটে ১২টি সারিতে ১০টি করে মোট ১২০টি ডাকটিকিট ছিল।

দূরবর্তী ডাকঘরগুলোতে আগে ডাকটিকিট পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে ৯০০টি শিট ছাপিয়ে ১৮৫৪ সালের এপ্রিল মাসে বোম্বে জিপিওতে পাঠানো হয়। কিন্তু এর মধ্যেই নতুন নির্দেশনা আসে:

সিঁদুর লাল রংটি যুক্তরাজ্য থেকে আমদানি করা এবং ব্যয়বহুল। উপরন্তু এই রঙে কাজ করলে লিথোগ্রাফির পাথরের প্লেট দ্রুত ক্ষয় হয়ে যায়। তাই স্থানীয় নীল রং ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়।

রানির প্রতিকৃতির দুই পাশের খিলান নকশা অস্পষ্ট থাকায় খিলানের সংখ্যা ৯.৫ থেকে ৮-এ নামিয়ে আনতে বলা হয়। (অপ্রকাশিত সেই প্রথম ডাকটিকিটটি আজও ‘সাড়ে নয় খিলানের ডাকটিকিট’ নামে পরিচিত)।

তড়িঘড়ি করে বোম্বে জিপিওতে খবর পাঠানো হয় যে ইতিমধ্যে পাঠানো সব ডাকটিকিট ধ্বংস করে ফেলতে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রায় সব ডাকটিকিট ধ্বংস করে ফেলা হয়, তবে অল্প কিছু ডাকটিকিট যেকোনোভাবে হোক থেকে গিয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে সংগ্রাহকদের হাতে চলে আসে। এর মধ্যে ১০টি ডাকটিকিটের একটা কর্নার ব্লক ২০২২ সালে প্রায় ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

নকশা পরিবর্তনের পর অনুমোদিত নতুন প্লেটে স্থানীয় নীল রঙে ‘আধা আনা’ এবং লাল রঙে ‘এক আনা’ মূল্যের ডাকটিকিট ছাপানো শুরু হয়। এবার প্রতিটি শিটে ৮টি করে ১২ সারিতে মোট ৯৬টি ডাকটিকিট রাখা হয়। এতে এক লাইনের দাম ৪ আনা, ৪ লাইনের দাম ১ রুপি এবং এক শিটের দাম ৩ রুপি হিসাব করা সহজ হয়ে যায়।

১৮৫৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত থুইলিয়ার দুই কোটির বেশি ডাকটিকিট ছাপিয়ে বিভিন্ন স্থানে পাঠান। ১৮৫৪ সালের ১ অক্টোবর থেকে কলকাতা, ঢাকা, বোম্বে, মাদ্রাজসহ সব ডাকঘর থেকে এই দুটি ডাকটিকিট আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি শুরু হয়।

অন্যদিকে টাঁকশাল থেকে ডাকটিকিট ছাপানোর দায়িত্ব সার্ভে অফিসে আসার আগেই কর্নেল ফোর্বস রানির প্রতিকৃতি দিয়ে একটা ধাতব প্লেট বানিয়েছিলেন। সেই প্লেট ব্যবহার করে দুই আনা মূল্যের সবুজ ডাকটিকিটটি কলকাতা টাঁকশাল থেকে ‘টাইপোগ্রাফি’ পদ্ধতিতে প্রিন্ট করা হয়। তাই এটি দেখতে কিছুটা আলাদা এবং এর নকশাও ছিল বেশ সূক্ষ্ম। আলাদা ব্যবস্থাপনার কারণে এটি ১ অক্টোবরে ইস্যু করা সম্ভব হয়নি; প্রথম দুটি ডাকটিকিট প্রকাশের তিন দিন পর, অর্থাৎ ৪ অক্টোবর এটি বাজারে আসে।

এই সিরিজের সবচেয়ে মূল্যবান ছিল চার আনা মূল্যের ডাকটিকিটটি। লাল রঙের ফ্রেমের মাঝে নীল রঙের রানির প্রতিকৃতি দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। দুটি রং আলাদাভাবে প্রিন্ট করতে হতো বলে এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ ছিল। ফলে এটি বাজারে আসতে আরও দুই সপ্তাহ দেরি হয় এবং ১৮৫৪ সালের ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত হয়।

দ্বিমুখী প্রিন্টিংয়ের কারণে ভুলবশত অন্তত ৬টি শিটে লাল ফ্রেম ছাপানোর পর কাগজ উল্টো করে ঘুরিয়ে নীল প্রতিকৃতি প্রিন্ট করা হয়। ফলে রানির মাথা নিচের দিকে নেমে যায়, যা সংগ্রাহকদের কাছে ‘Inverted Queen’ (ইনভার্টেড কুইন) নামে পরিচিত। প্রতি শিটে ১২টি করে ধরে অন্তত ৭২টি টিকিটে এই ভুল হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ২৮টি পাওয়া গেছে। বর্তমান বাজারে একটি ভালো মানের ইনভার্টেড কুইন ডাকটিকিটের দাম প্রায় দুই কোটি টাকা।

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ভারত বিভাজনের পর দুই দেশের মধ্যে সম্পদ বণ্টনের অংশ হিসেবে ডাক বিভাগের মালামালও ভাগ করা হয়। সে সময় বোম্বের কাছে নাসিক শহরের ‘সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস’-এ ব্রিটিশ ভারতের ডাকসামগ্রীতে ‘PAKISTAN’ শব্দটি ওভারপ্রিন্ট (Overprint) করে পাকিস্তানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। তবে সেই ডাকসামগ্রীবাহী একটি ট্রেনে দিল্লির কাছে নৈরাজ্যকারীরা আগুন দিলে প্রথম চালানের মালামাল বিনষ্ট হয়। পরবর্তী সময়ে পুনর্মুদ্রিত সেই ওভারপ্রিন্ট করা ব্রিটিশ-ভারতীয় ডাকটিকিট ও সামগ্রী ১৯৪৭ সালের ১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানে ইস্যু করা হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

বাংলার প্রথম ডাকটিকিট

আপডেট সময় : ১১:০০:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

বাংলার প্রথম ডাকটিকিট

১৮৫৪ সালের ১ অক্টোবর তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রথমবারের মতো ডাকটিকিট ব্যবহার করা হয়। ডাকটিকিটের প্রচলন অবশ্য আরও আগে, ১৮৪০ সালে যুক্তরাজ্যে। তিন বছর পর, ১৮৪৩ সালের ১ মার্চ সুইজারল্যান্ডের জুরিখ ক্যান্টন তাদের নিজস্ব ব্যবহারের জন্য ডাকটিকিট প্রকাশ করে। এর পাঁচ মাস পর ব্রাজিল সমগ্র দেশের জন্য ডাকটিকিট চালু করে। পরবর্তী সময়ে জেনেভা (১৮৪৩), যুক্তরাষ্ট্র (১৮৪৭), মরিশাস (১৮৪৭), ফ্রান্স (১৮৪৯), বেলজিয়াম (১৮৪৯), বাভারিয়া/জার্মানি (১৮৪৯) ও স্পেন (১৮৫০)—এই দেশ বা রাজ্যগুলোর মাধ্যমে প্রথম ১০ বছরে মোট ১০টি অঞ্চলে ডাকটিকিটের ব্যবহার শুরু হয়।

১৮৫০ সালের আগে ভারতের ডাকব্যবস্থা ছিল বেশ বিশৃঙ্খল। অঞ্চলভেদে লোকাল ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর বা সামরিক কর্মকর্তারা নিজস্ব নিয়মে পোস্ট অফিস পরিচালনা করতেন। চিঠির ওজন ও দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে ডাকমাশুল হিসাব করা হতো, যা ছিল অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। সাধারণ মানুষ ডাকমাশুলের হিসাব বুঝত না বললেই চলে। ডাকব্যবস্থার আধুনিকায়নে ১৮৫০ সালে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসি ‘পোস্ট অফিস কমিশন’ গঠন করেন। কমিশন প্রধানত চারটি সুপারিশ করে:

১. অভিন্ন ডাকমাশুল: দূরত্বের হিসাব বাদ দিয়ে কেবল ওজনের ভিত্তিতে পুরো ভারতে কম খরচে একই ডাকমাশুল নির্ধারণ।

২. আঠালো ডাকটিকিট প্রবর্তন: নগদ টাকায় মাশুল পরিশোধের বদলে পূর্ব-প্রদত্ত (Pre-paid) আঠালো ডাকটিকিট বাধ্যতামূলক করা। এবং যুক্তরাজ্য থেকে এই ডাকটিকিটের নকশা ও মুদ্রণের ব্যবস্থা করা।

৩. একক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ: সব পোস্ট অফিসকে একটি কেন্দ্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে আনা।

৪. বিনা মূল্যে ডাক সুবিধা বাতিল: সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য প্রযোজ্য বিশেষ ও বিনা মূল্যে চিঠি পাঠানোর সুবিধা (Franking) বন্ধ করা।

এই সুপারিশসমূহের আলোকে ডাকটিকিট প্রকাশের চিন্তাভাবনা চলতে থাকে। তবে লর্ড ডালহৌসি যুক্তরাজ্য থেকে ডাকটিকিট নকশা ও মুদ্রণ করানোর বিপক্ষে ছিলেন, কারণ এতে প্রচুর সময়ের প্রয়োজন ছিল, যা ডাকটিকিট সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সে সময় ভারতবর্ষের রাজধানী ছিল কলকাতা। কলকাতার টাঁকশালে ডাকটিকিটের মতোই সংবেদনশীল স্ট্যাম্প পেপার ছাপা হতো। তাই লর্ড ডালহৌসি টাঁকশালের সুপারিনটেনডেন্ট কর্নেল ফোর্বসকে ডাকটিকিট তৈরির দায়িত্ব দেন।

এরই মধ্যে ১৮৫২ সালের ১ জুলাই সিন্ধু প্রদেশের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসক স্যার বার্টেল ফ্রেরের উদ্যোগে ‘সিন্ধু ডাক’ নামে আধা আনা মূল্যের একটি ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। এটি এশিয়ার প্রথম ডাকটিকিট হলেও এর ব্যবহার কেবল সিন্ধু প্রদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল।

সিন্ধু ডাক প্রকাশের পর সমগ্র ভারতের জন্য একক ডাকটিকিট চালুর তাগিদ বাড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কর্নেল ফোর্বস একটি নকশা প্রস্তুত করেন, যেখানে ব্রিটিশরাজের প্রতিনিধিত্ব করা একটা সিংহের ছবি ছিল ও পেছনে একটা পামগাছ ছিল। তাই এই নকশা ‘লায়ন অ্যান্ড পাম ট্রি’ নামে পরিচিত।

লর্ড ডালহৌসি কিন্তু এই নকশা পছন্দ করলেন না। কারণ, তখন যুক্তরাজ্য বা তার যেসব কলোনিতে ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়েছে, তার সবই রানি ভিক্টোরিয়ার ছবি দিয়েই প্রকাশ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের মতো ভারতেও রানি ভিক্টোরিয়ার প্রতিকৃতিসংবলিত ডাকটিকিট প্রকাশের পক্ষে মত দিয়ে লর্ড ডালহৌসি এই নকশা বাতিল করেন।

কর্নেল ফোর্বস চাননি একই মেশিনে স্ট্যাম্প পেপার ও ডাকটিকিট ছাপা হোক। কারণ, তাতে তার স্ট্যাম্প পেপার ছাপানোয় বিঘ্ন ঘটবে। তিনি যুক্তরাজ্য থেকে নতুন মেশিন ও প্রিন্টিং প্লেট আনার পক্ষে ছিলেন। তবে এতে দেরি হবে দেখে লর্ড ডালহৌসি দ্রুত কাজ শেষ করতে কলকাতার সার্ভেয়ার জেনারেলের অফিসকে দায়িত্ব দেন। সার্ভে অফিসে লিথোগ্রাফি প্রিন্টিংয়ের মানচিত্র ছাপানোর মেশিনে ডাকটিকিট ছাপানোর ব্যবস্থা করা হয়।

ডেপুটি সার্ভেয়ার জেনারেল ও রেভিনিউ সার্ভের সুপারিনটেনডেন্ট ক্যাপ্টেন হেনরি এডওয়ার্ড থুইলিয়ার ছিলেন প্রিন্টিংয়ের দায়িত্বে। তাকে চারটি পৃথক মূল্যমানের চারটি ডাকটিকিট ছাপানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়:

আধা আনা: ১/৪ তোলা পর্যন্ত ওজনের চিঠির জন্য।

এক আনা: ১/৪ তোলার বেশি কিন্তু ১ তোলার কম ওজনের জন্য।

দুই আনা: ১ তোলার বেশি কিন্তু ২ তোলার কম ওজনের জন্য।

চার আনা: ২ তোলার বেশি কিন্তু ৪ তোলার কম ওজনের জন্য।

থুইলিয়ার রানির প্রতিকৃতি দিয়ে খসড়া নকশা তৈরি করলে ১৮৫৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তা অনুমোদিত হয়। সার্ভে অফিসে সংরক্ষিত জলছাপযুক্ত ‘উভ পেপারে’ সিঁদুর লাল রঙে আধা আনা মূল্যের প্রথম ডাকটিকিট ছাপা হয়। প্রতিটি শিটে ১২টি সারিতে ১০টি করে মোট ১২০টি ডাকটিকিট ছিল।

দূরবর্তী ডাকঘরগুলোতে আগে ডাকটিকিট পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে ৯০০টি শিট ছাপিয়ে ১৮৫৪ সালের এপ্রিল মাসে বোম্বে জিপিওতে পাঠানো হয়। কিন্তু এর মধ্যেই নতুন নির্দেশনা আসে:

সিঁদুর লাল রংটি যুক্তরাজ্য থেকে আমদানি করা এবং ব্যয়বহুল। উপরন্তু এই রঙে কাজ করলে লিথোগ্রাফির পাথরের প্লেট দ্রুত ক্ষয় হয়ে যায়। তাই স্থানীয় নীল রং ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়।

রানির প্রতিকৃতির দুই পাশের খিলান নকশা অস্পষ্ট থাকায় খিলানের সংখ্যা ৯.৫ থেকে ৮-এ নামিয়ে আনতে বলা হয়। (অপ্রকাশিত সেই প্রথম ডাকটিকিটটি আজও ‘সাড়ে নয় খিলানের ডাকটিকিট’ নামে পরিচিত)।

তড়িঘড়ি করে বোম্বে জিপিওতে খবর পাঠানো হয় যে ইতিমধ্যে পাঠানো সব ডাকটিকিট ধ্বংস করে ফেলতে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রায় সব ডাকটিকিট ধ্বংস করে ফেলা হয়, তবে অল্প কিছু ডাকটিকিট যেকোনোভাবে হোক থেকে গিয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে সংগ্রাহকদের হাতে চলে আসে। এর মধ্যে ১০টি ডাকটিকিটের একটা কর্নার ব্লক ২০২২ সালে প্রায় ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

নকশা পরিবর্তনের পর অনুমোদিত নতুন প্লেটে স্থানীয় নীল রঙে ‘আধা আনা’ এবং লাল রঙে ‘এক আনা’ মূল্যের ডাকটিকিট ছাপানো শুরু হয়। এবার প্রতিটি শিটে ৮টি করে ১২ সারিতে মোট ৯৬টি ডাকটিকিট রাখা হয়। এতে এক লাইনের দাম ৪ আনা, ৪ লাইনের দাম ১ রুপি এবং এক শিটের দাম ৩ রুপি হিসাব করা সহজ হয়ে যায়।

১৮৫৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত থুইলিয়ার দুই কোটির বেশি ডাকটিকিট ছাপিয়ে বিভিন্ন স্থানে পাঠান। ১৮৫৪ সালের ১ অক্টোবর থেকে কলকাতা, ঢাকা, বোম্বে, মাদ্রাজসহ সব ডাকঘর থেকে এই দুটি ডাকটিকিট আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি শুরু হয়।

অন্যদিকে টাঁকশাল থেকে ডাকটিকিট ছাপানোর দায়িত্ব সার্ভে অফিসে আসার আগেই কর্নেল ফোর্বস রানির প্রতিকৃতি দিয়ে একটা ধাতব প্লেট বানিয়েছিলেন। সেই প্লেট ব্যবহার করে দুই আনা মূল্যের সবুজ ডাকটিকিটটি কলকাতা টাঁকশাল থেকে ‘টাইপোগ্রাফি’ পদ্ধতিতে প্রিন্ট করা হয়। তাই এটি দেখতে কিছুটা আলাদা এবং এর নকশাও ছিল বেশ সূক্ষ্ম। আলাদা ব্যবস্থাপনার কারণে এটি ১ অক্টোবরে ইস্যু করা সম্ভব হয়নি; প্রথম দুটি ডাকটিকিট প্রকাশের তিন দিন পর, অর্থাৎ ৪ অক্টোবর এটি বাজারে আসে।

এই সিরিজের সবচেয়ে মূল্যবান ছিল চার আনা মূল্যের ডাকটিকিটটি। লাল রঙের ফ্রেমের মাঝে নীল রঙের রানির প্রতিকৃতি দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। দুটি রং আলাদাভাবে প্রিন্ট করতে হতো বলে এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ ছিল। ফলে এটি বাজারে আসতে আরও দুই সপ্তাহ দেরি হয় এবং ১৮৫৪ সালের ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত হয়।

দ্বিমুখী প্রিন্টিংয়ের কারণে ভুলবশত অন্তত ৬টি শিটে লাল ফ্রেম ছাপানোর পর কাগজ উল্টো করে ঘুরিয়ে নীল প্রতিকৃতি প্রিন্ট করা হয়। ফলে রানির মাথা নিচের দিকে নেমে যায়, যা সংগ্রাহকদের কাছে ‘Inverted Queen’ (ইনভার্টেড কুইন) নামে পরিচিত। প্রতি শিটে ১২টি করে ধরে অন্তত ৭২টি টিকিটে এই ভুল হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ২৮টি পাওয়া গেছে। বর্তমান বাজারে একটি ভালো মানের ইনভার্টেড কুইন ডাকটিকিটের দাম প্রায় দুই কোটি টাকা।

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ভারত বিভাজনের পর দুই দেশের মধ্যে সম্পদ বণ্টনের অংশ হিসেবে ডাক বিভাগের মালামালও ভাগ করা হয়। সে সময় বোম্বের কাছে নাসিক শহরের ‘সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস’-এ ব্রিটিশ ভারতের ডাকসামগ্রীতে ‘PAKISTAN’ শব্দটি ওভারপ্রিন্ট (Overprint) করে পাকিস্তানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। তবে সেই ডাকসামগ্রীবাহী একটি ট্রেনে দিল্লির কাছে নৈরাজ্যকারীরা আগুন দিলে প্রথম চালানের মালামাল বিনষ্ট হয়। পরবর্তী সময়ে পুনর্মুদ্রিত সেই ওভারপ্রিন্ট করা ব্রিটিশ-ভারতীয় ডাকটিকিট ও সামগ্রী ১৯৪৭ সালের ১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানে ইস্যু করা হয়।