ঢাকা ০৫:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহায়তা পেলেন নিহত পোশাকশ্রমিক তৌফিকের পরিবার সুন্দরগঞ্জে যুবলীগ নেতাসহ গ্রেপ্তার ৩ পরীক্ষার আগে কেন্দ্র বদল, ৪০ কিলোমিটার যাতায়াতের শঙ্কায় শিক্ষার্থীরা অক্টোবরে হামলা-হয়রানির শিকার ২৮ সংবাদকর্মী, প্রাণ গেছে একজনের: বিএজির প্রতিবেদন মোগল জাহাজে ডাকাতিতে জড়িত ব্যক্তির নামে নিউইয়র্কের সৈকত দি পল-সেলসোরা নেই, মেসির বিদায়ের পর আর্জেন্টিনার প্রথম দলে কারা আছেন জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন বিষয়ে সরকার আন্তরিক আবেদন ছিল দুই কোটি টাকার, বড়দিনে তিন কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কমার্স ব্যাংকের দুই পরিচালকের পদত্যাগ, প্রিমিয়ারে নতুন তিন পরিচালক ‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান আইডি’ চালুর উদ্যোগ নেবে আইসিটি বিভাগ

ধৈর্যের প্রতিদান: নবীজির জীবনের ৩ ঘটনা থেকে শিক্ষা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:১৬:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নবীজির জীবনপ্রবাহ শুধু ইতিহাসের কোনো দূরবর্তী অধ্যায় নয়; বরং তা মানবজাতির নৈতিকতার বাতিঘর, হেদায়েত ও অনুপ্রেরণার এক শাশ্বত উৎস।

জীবনযুদ্ধের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে দিশাহারা মানুষের জন্য তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ এক চিরন্তন রূপরেখা। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন থেকে বিশেষ ৩টি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা ও প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর আত্মিক অনুভূতির গল্প নিয়ে এই আলেখ্য।

তাওহিদের বার্তা নিয়ে মহানবী (সা.) যখন তায়েফ নগরে গিয়েছিলেন, তখন সেখানকার সর্দাররা সত্যের আলো গ্রহণ করা তো দূরের কথা, শহরের বখাটে ও দুষ্কৃতকারীদের খেপিয়ে দিয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে।

তাঁকে লক্ষ্য করে অকথ্য গালিগালাজ আর পাথর ছুড়তে থাকে। পাথরের আঘাতে তাঁর পবিত্র দেহ রক্তাক্ত হয়ে যায়, পাদুকা ভরে যায় রক্তে।

শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় তিনি যখন তায়েফের উপকণ্ঠে একটি আঙুরবাগানে আশ্রয় নিলেন, তখন আল্লাহ–তাআলা ফেরেশতা জিবরাইলকে পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতাসহ পাঠালেন।

জিবরাইল (আ.) বললেন, ‘আপনি অনুমতি দিলে দুই পাশের পাহাড় একত্র করে তায়েফবাসীদের পিষে ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’

প্রচণ্ড নিপীড়নের পর এমন সুযোগ পেয়েও তিনি কোনো প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। বরং উত্তর দিলেন, ‘না, বরং আমি আশা করি, আল্লাহ এদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন এক প্রজন্ম সৃষ্টি করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৩১)

শিক্ষা: নিজের ওপর নেমে আসা চরম লাঞ্ছনা ও নিপীড়ন সত্ত্বেও প্রতিপক্ষের প্রতি কল্যাণকামিতা এবং ক্ষমাশীল দূরদর্শিতাই হলো নববি চরিত্রের আসল পরিচয়।

কোরাইশদের হত্যা চক্রান্ত ব্যর্থ করে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর পরম বিশ্বস্ত সঙ্গী হজরত আবু বকর (রা.) বৈরী শত্রুর চোখ ফাঁকি দিতে বিপরীত দিকের সাওর গুহায় আশ্রয় নেন।

গুহায় প্রবেশের আগে আবু বকর (রা.) নিজে ভেতরে ঢুকে বিষাক্ত কীট-পতঙ্গের ঝুঁকি থেকে স্থানটি নিরাপদ করেন। এই কঠিন সফরে আবু বকরের কন্যা আসমা (রা.) রাতের আঁধারে জীবন বাজি রেখে মরুপথ পেরিয়ে তাঁদের খাবার পৌঁছে দিতেন।

কোরাইশদের এক অত্যাচারী সর্দার তাঁর মুখে চড় মেরে তথ্য আদায়ের চেষ্টা করলেও তিনি মুখ খোলেননি। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/৪৮৬, মোস্তফা আল-বাবি, মিসর, ১৯৫৫)

একপর্যায়ে পুরস্কারের লোভে খুঁজতে থাকা কাফেরদের একটি দল সাওর গুহার একেবারে মুখে এসে দাঁড়ায়। ওপর থেকে তাদের পায়ের পাতা দেখতে পেয়ে আবু বকর (রা.) নিজের জীবন নয়, বরং নবীজির নিরাপত্তার চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, তারা যদি কেবল পায়ের দিকে তাকায়, তবেই আমাদের দেখে ফেলবে।’

রাসুল (সা.) পরম শান্ত ও অবিচল কণ্ঠে উত্তর দিলেন, ‘আবু বকর, সেই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার কী ধারণা, যাদের তৃতীয় জন স্বয়ং আল্লাহ?’ (সুরা তওবা, আয়াত: ৪০; সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৫৩)

আল্লাহর অলৌকিক কুদরতে গুহার মুখে মাকড়সা জাল বোনে এবং পায়রা ডিম পাড়ে। তা দেখে কাফেররা নিশ্চিত হয় যে ভেতরে কেউ থাকতে পারে না।

শিক্ষা: চারপাশে চরম সংকট আর নিরাশা ঘিরে ধরলেও যার অন্তরে আল্লাহর প্রতি অটল ভরসা থাকে, পৃথিবীর কোনো শক্তি তার ক্ষতি করতে পারে না।

মদিনা ঘেরাওকারী যৌথ কাফের বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতে মদিনার চতুর্পাশে পরিখা (খন্দক) খনন করছিলেন সাহাবিরা। প্রচণ্ড শীত, অনাহার আর ক্লান্তির মধ্যে খন্দক খোঁড়ার সময় মাটির নিচে বিশাল এক শক্ত পাথর সামনে আসে, যা কোনো কোদাল দিয়েই ভাঙা যাচ্ছিল না।

সাহাবিরা অসহায় হয়ে রাসুলের শরণাপন্ন হলেন। তিনি নিজ হাতে কোদাল তুলে নিয়ে পাথরে প্রথম আঘাত করলেন। অমনি একখণ্ড নূরের স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে বের হলো। তিনি বললেন, ‘আল্লাহু আকবার, আমাকে শামের (সিরিয়া) চাবি দান করা হয়েছে।

শপথ খোদার, আমি এই মুহূর্তে সেখানকার রাজপ্রাসাদগুলো দেখতে পাচ্ছি।’ দ্বিতীয় আঘাতে পুনরায় আলোর স্ফুলিঙ্গ বিচ্ছুরিত হলো এবং তিনি বললেন, ‘আল্লাহু আকবার, আমাকে পারস্যের বিজয় দান করা হয়েছে। শপথ খোদার, আমি মাদায়েনের শ্বেতপ্রাসাদ দেখতে পাচ্ছি।’

তৃতীয় আঘাতে পাথরটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল এবং তিনি বললেন, ‘আল্লাহু আকবার, আমাকে ইয়ামেনের চাবি দেওয়া হয়েছে। আমি এই স্থান থেকেই সানআর ফটকগুলো দেখতে পাচ্ছি।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩১৭৫)

শিক্ষা: চারপাশের বাস্তবতা যখন তীব্র অনিশ্চয়তা ও ক্ষুধায় পিষ্ট, তখনও রাসুল (সা.) সাহাবিদের অন্তরে ইমানের আলো ও সুদূরপ্রসারী বিজয়ের আশা জাগিয়েছিলেন। সংকট যত বড়ই হোক, মুমিনের আশা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কখনো নিভে যায় না।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

ধৈর্যের প্রতিদান: নবীজির জীবনের ৩ ঘটনা থেকে শিক্ষা

আপডেট সময় : ০৫:১৬:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

নবীজির জীবনপ্রবাহ শুধু ইতিহাসের কোনো দূরবর্তী অধ্যায় নয়; বরং তা মানবজাতির নৈতিকতার বাতিঘর, হেদায়েত ও অনুপ্রেরণার এক শাশ্বত উৎস।

জীবনযুদ্ধের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে দিশাহারা মানুষের জন্য তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ এক চিরন্তন রূপরেখা। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন থেকে বিশেষ ৩টি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা ও প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর আত্মিক অনুভূতির গল্প নিয়ে এই আলেখ্য।

তাওহিদের বার্তা নিয়ে মহানবী (সা.) যখন তায়েফ নগরে গিয়েছিলেন, তখন সেখানকার সর্দাররা সত্যের আলো গ্রহণ করা তো দূরের কথা, শহরের বখাটে ও দুষ্কৃতকারীদের খেপিয়ে দিয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে।

তাঁকে লক্ষ্য করে অকথ্য গালিগালাজ আর পাথর ছুড়তে থাকে। পাথরের আঘাতে তাঁর পবিত্র দেহ রক্তাক্ত হয়ে যায়, পাদুকা ভরে যায় রক্তে।

শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় তিনি যখন তায়েফের উপকণ্ঠে একটি আঙুরবাগানে আশ্রয় নিলেন, তখন আল্লাহ–তাআলা ফেরেশতা জিবরাইলকে পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতাসহ পাঠালেন।

জিবরাইল (আ.) বললেন, ‘আপনি অনুমতি দিলে দুই পাশের পাহাড় একত্র করে তায়েফবাসীদের পিষে ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’

প্রচণ্ড নিপীড়নের পর এমন সুযোগ পেয়েও তিনি কোনো প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। বরং উত্তর দিলেন, ‘না, বরং আমি আশা করি, আল্লাহ এদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন এক প্রজন্ম সৃষ্টি করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৩১)

শিক্ষা: নিজের ওপর নেমে আসা চরম লাঞ্ছনা ও নিপীড়ন সত্ত্বেও প্রতিপক্ষের প্রতি কল্যাণকামিতা এবং ক্ষমাশীল দূরদর্শিতাই হলো নববি চরিত্রের আসল পরিচয়।

কোরাইশদের হত্যা চক্রান্ত ব্যর্থ করে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর পরম বিশ্বস্ত সঙ্গী হজরত আবু বকর (রা.) বৈরী শত্রুর চোখ ফাঁকি দিতে বিপরীত দিকের সাওর গুহায় আশ্রয় নেন।

গুহায় প্রবেশের আগে আবু বকর (রা.) নিজে ভেতরে ঢুকে বিষাক্ত কীট-পতঙ্গের ঝুঁকি থেকে স্থানটি নিরাপদ করেন। এই কঠিন সফরে আবু বকরের কন্যা আসমা (রা.) রাতের আঁধারে জীবন বাজি রেখে মরুপথ পেরিয়ে তাঁদের খাবার পৌঁছে দিতেন।

কোরাইশদের এক অত্যাচারী সর্দার তাঁর মুখে চড় মেরে তথ্য আদায়ের চেষ্টা করলেও তিনি মুখ খোলেননি। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/৪৮৬, মোস্তফা আল-বাবি, মিসর, ১৯৫৫)

একপর্যায়ে পুরস্কারের লোভে খুঁজতে থাকা কাফেরদের একটি দল সাওর গুহার একেবারে মুখে এসে দাঁড়ায়। ওপর থেকে তাদের পায়ের পাতা দেখতে পেয়ে আবু বকর (রা.) নিজের জীবন নয়, বরং নবীজির নিরাপত্তার চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, তারা যদি কেবল পায়ের দিকে তাকায়, তবেই আমাদের দেখে ফেলবে।’

রাসুল (সা.) পরম শান্ত ও অবিচল কণ্ঠে উত্তর দিলেন, ‘আবু বকর, সেই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার কী ধারণা, যাদের তৃতীয় জন স্বয়ং আল্লাহ?’ (সুরা তওবা, আয়াত: ৪০; সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৫৩)

আল্লাহর অলৌকিক কুদরতে গুহার মুখে মাকড়সা জাল বোনে এবং পায়রা ডিম পাড়ে। তা দেখে কাফেররা নিশ্চিত হয় যে ভেতরে কেউ থাকতে পারে না।

শিক্ষা: চারপাশে চরম সংকট আর নিরাশা ঘিরে ধরলেও যার অন্তরে আল্লাহর প্রতি অটল ভরসা থাকে, পৃথিবীর কোনো শক্তি তার ক্ষতি করতে পারে না।

মদিনা ঘেরাওকারী যৌথ কাফের বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতে মদিনার চতুর্পাশে পরিখা (খন্দক) খনন করছিলেন সাহাবিরা। প্রচণ্ড শীত, অনাহার আর ক্লান্তির মধ্যে খন্দক খোঁড়ার সময় মাটির নিচে বিশাল এক শক্ত পাথর সামনে আসে, যা কোনো কোদাল দিয়েই ভাঙা যাচ্ছিল না।

সাহাবিরা অসহায় হয়ে রাসুলের শরণাপন্ন হলেন। তিনি নিজ হাতে কোদাল তুলে নিয়ে পাথরে প্রথম আঘাত করলেন। অমনি একখণ্ড নূরের স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে বের হলো। তিনি বললেন, ‘আল্লাহু আকবার, আমাকে শামের (সিরিয়া) চাবি দান করা হয়েছে।

শপথ খোদার, আমি এই মুহূর্তে সেখানকার রাজপ্রাসাদগুলো দেখতে পাচ্ছি।’ দ্বিতীয় আঘাতে পুনরায় আলোর স্ফুলিঙ্গ বিচ্ছুরিত হলো এবং তিনি বললেন, ‘আল্লাহু আকবার, আমাকে পারস্যের বিজয় দান করা হয়েছে। শপথ খোদার, আমি মাদায়েনের শ্বেতপ্রাসাদ দেখতে পাচ্ছি।’

তৃতীয় আঘাতে পাথরটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল এবং তিনি বললেন, ‘আল্লাহু আকবার, আমাকে ইয়ামেনের চাবি দেওয়া হয়েছে। আমি এই স্থান থেকেই সানআর ফটকগুলো দেখতে পাচ্ছি।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩১৭৫)

শিক্ষা: চারপাশের বাস্তবতা যখন তীব্র অনিশ্চয়তা ও ক্ষুধায় পিষ্ট, তখনও রাসুল (সা.) সাহাবিদের অন্তরে ইমানের আলো ও সুদূরপ্রসারী বিজয়ের আশা জাগিয়েছিলেন। সংকট যত বড়ই হোক, মুমিনের আশা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কখনো নিভে যায় না।