ব্রহ্মপুত্রের তীরে ভাঙন আতঙ্ক, স্কুল বাঁচাতে শিশুদের কান্না
- আপডেট সময় : ১০:৪৩:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ৫২ বার পড়া হয়েছে

কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ও বুড়াবুড়ী ইউনিয়নের মিলনস্থলে ব্রহ্মপুত্র নদের তীব্র ভাঙন এখন পুরো এলাকার মানুষের জন্য চরম আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীর ধার ঘেঁষে বসবাসকারী শত শত পরিবার প্রতিদিনই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। নদী ক্রমেই বসতভিটা, ফসলি জমি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে ধেয়ে আসায় এলাকাজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) দুপুরে জলঙ্গার কুটি ও বাবুর চর এলাকার প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে শত শত নারী-পুরুষ মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। মানববন্ধনে অংশ নেয় স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শতাধিক শিক্ষার্থীও। শিশুদের অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি। তাদের মুখে ছিল ভয়, অনিশ্চয়তা এবং প্রিয় বিদ্যালয় হারানোর আশঙ্কা।
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধা আছিয়া বেগম কাঁপা কণ্ঠে বলেন, “এই ভিটাটুকুই আমাদের সবকিছু। নদী যদি এটুকুও নিয়ে যায়, তাহলে আমরা কোথায় যাব? কোথায় আশ্রয় নেব?” একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানান আকলিমা বেগম, কবিজন নেছা ও বৃদ্ধ শাহাবুর রহমান। তারা বলেন, বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙনে মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু স্থায়ী কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা নওশের আলী বলেন, “প্রতি বছরই ভাঙন দেখি। কিন্তু এবার নদীর স্রোত ও ভাঙনের গতি দেখে মনে হচ্ছে পুরো গ্রামটাই হয়তো নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।”
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শিশু শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ছিল গভীর উদ্বেগ। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিমা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, “আমাদের স্কুলটা যদি নদীতে ভেঙে যায়, তাহলে আমরা কোথায় পড়ব? আমরা কি সবাই আলাদা হয়ে যাব?” তার পাশে দাঁড়ানো সহপাঠী রাব্বি বলে, “আমরা শুধু চাই আমাদের স্কুলটা বাঁচুক।”
এদিকে স্থানীয়দের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে কুড়িগ্রাম জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের উদ্যোগে সেখানে মানববন্ধন ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে বক্তব্য দেন সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু, সহসভাপতি অধ্যক্ষ খাজা শরীফ রিন্টু, হাতিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু, নারী ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক নাজমুন নাহার বিউটি, সহ সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির এবং সাংবাদিক ফজলুল করিম ফারাজি।
সমাবেশে অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সরকার ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে। কিন্তু আমাদের দেশে নদীভাঙনের শিকার মানুষ বারবার গৃহহীন হয়ে নতুন ঠিকানার সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। তিনি দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও কার্যকর ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।
এদিকে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, জেলার ১৬টি নদ-নদীর মধ্যে তিস্তা নদ, ধরলা নদ, দুধকুমার নদ এবং ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত এক লাখ বালুভর্তি বিশেষ ব্যাগ ব্যবহারের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে এবং জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক কাজ শুরু করা হবে।
তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন, এসব উদ্যোগ কত দ্রুত বাস্তবায়ন হবে। কারণ প্রতিদিন একটু একটু করে নদী এগিয়ে আসছে জনপদের দিকে। আর সেই সঙ্গে বাড়ছে মানুষের আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা এবং টিকে থাকার কঠিন লড়াই।

























