ঢাকা ০২:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সত্যিই কি সব মৌলিক সংখ্যা 6k ± 1 আকারের? প্রমাণ কী?

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৫৬:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ভাগশেষের একটি সহজ খেলায় প্রমাণ হয়ে যায় মৌলিক সংখ্যার এক সুন্দর নিয়ম,

আর বেরিয়ে আসে দুটি চমক

π মুয়ায ইবনে মাসুদ

গণিতের জগতের সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্রগুলোর একটি হলো মৌলিক সংখ্যা। ২, ৩, ৫, ৭, ১১, ১৩, ১৭… অনন্তকাল ধরে চলা এই সংখ্যাগুলোর কোনো সহজ ধারা চোখে পড়ে না। তবু গণিতবিদেরা এদের ভেতরে কিছু চমৎকার নিয়ম খুঁজে পেয়েছেন। তেমন একটি হলো:

২ আর ৩ বাদে যেকোনো মৌলিক সংখ্যাকে 6k + 1 অথবা 6k–1 আকারে লেখা যায়, যেখানে k একটি ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যা।

প্রথম শুনলে অবিশ্বাস্য লাগে। কিন্তু ভাগশেষের একটি সহজ যুক্তিতেই এটা প্রমাণ করা যায়।

.

∎ ৬ দিয়ে ভাগ করলে

যেকোনো পূর্ণসংখ্যাকে ৬ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ হয় ০, ১, ২, ৩, ৪ বা ৫। তাই সব পূর্ণসংখ্যা ঠিক এই ছয় রকমের কোনো একটি:

6k, 6k + 1, 6k + 2, 6k + 3, 6k + 4, 6k + 5

এবার দেখি, কোনগুলো মৌলিক হতে পারে:

∎ 6k: ৬-এর গুণিতক (৬ = ২ × ৩), তাই মৌলিক নয়।

∎ 6k + 2 = 2(3k + 1): সব সময় জোড়, তাই ২ ছাড়া মৌলিক নয়।

∎ 6k + 3 = 3(2k + 1): সব সময় ৩ দিয়ে বিভাজ্য, তাই ৩ ছাড়া

   মৌলিক নয়।

∎ 6k + 4 = 2(3k + 2): সব সময় জোড়, তাই মৌলিক নয়।

বাকি থাকে শুধু 6k + 1 আর 6k + 5। আর 6k + 5 = 6(k + 1) -1, অর্থাৎ এটিকে 6k–1 আকারেও লেখা যায় (k-এর জায়গায় k + 1 নিয়ে)। সুতরাং ৩–এর চেয়ে বড় প্রতিটি মৌলিক সংখ্যা 6k + 1 অথবা 6k–1 আকারের। অন্য কোনো রূপ সম্ভবই নয়। কারণ, সব পূর্ণসংখ্যাই ওই ছয় ভাগের কোনো একটিতে পড়ে। প্রমাণ শেষ!

.

∎ মিলিয়ে দেখি

৫ = ৬(১) – ১, ৭ = ৬(১) + ১, ১১ = ৬(২) – ১, ১৩ = ৬(২) + ১

১৭ = ৬(৩) – ১, ১৯ = ৬(৩) + ১, ২৩ = ৬(৪) – ১, ২৯ = ৬(৫) – ১,   ৩১ = ৬(৫) + ১

প্রতিটি মৌলিক সংখ্যা নিয়ম মেনে চলছে।

∎ মনে রাখবে

সব মৌলিক সংখ্যা (২ আর ৩ বাদে) 6k ± 1 আকারের, কিন্তু 6k ± 1 আকারের সব সংখ্যা মৌলিক নয়! যেমন: k = 4 হলে 6(4) + 1 = 25 = 5 × 5। তাই এই নিয়ম মৌলিক খোঁজার জায়গা ছোট করে দেয়, মৌলিক বানায় না।

.

∎ প্রথম চমক: যমজ মৌলিকের গুণফল

যে দুটি মৌলিক সংখ্যার ব্যবধান মাত্র ২, তাদের বলে যমজ মৌলিক:

(৫, ৭), (১১, ১৩), (১৭, ১৯), (২৯, ৩১)… ৩-এর পরের যমজ মৌলিকেরা সব সময় 6k – 1 আর 6k + 1। কারণ, 6k ± 1 ছাড়া অন্যরূপে যমজ সম্ভব নয়। এবার এদের গুণ করে ১ যোগ করো:

(6k – 1)(6k + 1) + 1 = 36k2 – 1 + 1 = 36k2

অর্থাৎ ফল সব সময় একটি পূর্ণবর্গ, আর ৩৬ দিয়ে বিভাজ্য! মিলিয়ে দেখো: ৫ × ৭ + ১ = ৩৬, ১১ × ১৩ + ১ = ১৪৪, ১৭ × ১৯ + ১ = ৩২৪ = ১৮২।

∎ দ্বিতীয় চমক: p2 – 1 আর ২৪

৩-এর চেয়ে বড় যেকোনো মৌলিক p নাও। p2 – 1 সব সময় ২৪ দিয়ে বিভাজ্য!

৫২ – ১ = ২৪,   ৭২ – ১ = ৪৮,   ১১২ – ১ = ১২০,   ১৩২ – ১ = ১৬৮

কেন? p2 – 1 = (p – 1)(p + 1)। p বিজোড়, তাই p – 1 আর p + 1 দুটিই জোড়, আর পরপর দুটি জোড় সংখ্যার একটি ৪ দিয়ে বিভাজ্য। তাই গুণফলে ২ × ৪ = ৮ আছে। আবার p – 1, p, p + 1 পরপর তিনটি সংখ্যার একটি ৩ দিয়ে বিভাজ্য, আর সেটি p নয় (p মৌলিক)। তাই গুণফলে ৩-ও আছে। ৮ আর ৩ সহমৌলিক, তাই ৮ × ৩ = ২৪!

.

∎ একটু সাবধান

এখানে গাণিতিক আরোহ (Mathematical Induction) খাটে না। আরোহে দেখাতে হয়, n–এ সত্য হলে n + 1-এ সত্য। কিন্তু একটি মৌলিক থেকে পরের মৌলিক কত দূরে, তা কেউ জানে না, তাই ‘পরের ধাপ’ ধরা যায় না। এই প্রমাণের আসল শক্তি ভাগশেষের যুক্তি: সব সংখ্যাকে কয়েকটি দলে ভাগ করে দেখানো, কোন দলে মৌলিক থাকতে পারে না।

গণিত শুধু সূত্রের সমাহার নয়, এটি সংখ্যার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুন্দর সব প্যাটার্ন খুঁজে বের করার বিজ্ঞান।

এই প্রমাণ আমি ভালোভাবে শিখেছি আহমেদ জাওয়াদ চৌধুরী ও তামজীদ মোর্শেদ রুবাবের গণিতের স্বপ্নযাত্রা-১: আর্ট অব প্রবলেম সলভিং আর গণিতের স্বপ্নযাত্রা-২: গণিত অলিম্পিয়াডের প্রথম ধাপ বই থেকে।

তোমার জন্য প্রশ্ন: ৩–এর চেয়ে বড় কোনো মৌলিক সংখ্যার বর্গকে ১২ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ কত হয়? (উত্তর: সব সময় ১। কারণ, p2 – 1 ২৪ দিয়ে, তাই ১২ দিয়েও বিভাজ্য)

সহযোগিতায়: বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

সত্যিই কি সব মৌলিক সংখ্যা 6k ± 1 আকারের? প্রমাণ কী?

আপডেট সময় : ১২:৫৬:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

ভাগশেষের একটি সহজ খেলায় প্রমাণ হয়ে যায় মৌলিক সংখ্যার এক সুন্দর নিয়ম,

আর বেরিয়ে আসে দুটি চমক

π মুয়ায ইবনে মাসুদ

গণিতের জগতের সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্রগুলোর একটি হলো মৌলিক সংখ্যা। ২, ৩, ৫, ৭, ১১, ১৩, ১৭… অনন্তকাল ধরে চলা এই সংখ্যাগুলোর কোনো সহজ ধারা চোখে পড়ে না। তবু গণিতবিদেরা এদের ভেতরে কিছু চমৎকার নিয়ম খুঁজে পেয়েছেন। তেমন একটি হলো:

২ আর ৩ বাদে যেকোনো মৌলিক সংখ্যাকে 6k + 1 অথবা 6k–1 আকারে লেখা যায়, যেখানে k একটি ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যা।

প্রথম শুনলে অবিশ্বাস্য লাগে। কিন্তু ভাগশেষের একটি সহজ যুক্তিতেই এটা প্রমাণ করা যায়।

.

∎ ৬ দিয়ে ভাগ করলে

যেকোনো পূর্ণসংখ্যাকে ৬ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ হয় ০, ১, ২, ৩, ৪ বা ৫। তাই সব পূর্ণসংখ্যা ঠিক এই ছয় রকমের কোনো একটি:

6k, 6k + 1, 6k + 2, 6k + 3, 6k + 4, 6k + 5

এবার দেখি, কোনগুলো মৌলিক হতে পারে:

∎ 6k: ৬-এর গুণিতক (৬ = ২ × ৩), তাই মৌলিক নয়।

∎ 6k + 2 = 2(3k + 1): সব সময় জোড়, তাই ২ ছাড়া মৌলিক নয়।

∎ 6k + 3 = 3(2k + 1): সব সময় ৩ দিয়ে বিভাজ্য, তাই ৩ ছাড়া

   মৌলিক নয়।

∎ 6k + 4 = 2(3k + 2): সব সময় জোড়, তাই মৌলিক নয়।

বাকি থাকে শুধু 6k + 1 আর 6k + 5। আর 6k + 5 = 6(k + 1) -1, অর্থাৎ এটিকে 6k–1 আকারেও লেখা যায় (k-এর জায়গায় k + 1 নিয়ে)। সুতরাং ৩–এর চেয়ে বড় প্রতিটি মৌলিক সংখ্যা 6k + 1 অথবা 6k–1 আকারের। অন্য কোনো রূপ সম্ভবই নয়। কারণ, সব পূর্ণসংখ্যাই ওই ছয় ভাগের কোনো একটিতে পড়ে। প্রমাণ শেষ!

.

∎ মিলিয়ে দেখি

৫ = ৬(১) – ১, ৭ = ৬(১) + ১, ১১ = ৬(২) – ১, ১৩ = ৬(২) + ১

১৭ = ৬(৩) – ১, ১৯ = ৬(৩) + ১, ২৩ = ৬(৪) – ১, ২৯ = ৬(৫) – ১,   ৩১ = ৬(৫) + ১

প্রতিটি মৌলিক সংখ্যা নিয়ম মেনে চলছে।

∎ মনে রাখবে

সব মৌলিক সংখ্যা (২ আর ৩ বাদে) 6k ± 1 আকারের, কিন্তু 6k ± 1 আকারের সব সংখ্যা মৌলিক নয়! যেমন: k = 4 হলে 6(4) + 1 = 25 = 5 × 5। তাই এই নিয়ম মৌলিক খোঁজার জায়গা ছোট করে দেয়, মৌলিক বানায় না।

.

∎ প্রথম চমক: যমজ মৌলিকের গুণফল

যে দুটি মৌলিক সংখ্যার ব্যবধান মাত্র ২, তাদের বলে যমজ মৌলিক:

(৫, ৭), (১১, ১৩), (১৭, ১৯), (২৯, ৩১)… ৩-এর পরের যমজ মৌলিকেরা সব সময় 6k – 1 আর 6k + 1। কারণ, 6k ± 1 ছাড়া অন্যরূপে যমজ সম্ভব নয়। এবার এদের গুণ করে ১ যোগ করো:

(6k – 1)(6k + 1) + 1 = 36k2 – 1 + 1 = 36k2

অর্থাৎ ফল সব সময় একটি পূর্ণবর্গ, আর ৩৬ দিয়ে বিভাজ্য! মিলিয়ে দেখো: ৫ × ৭ + ১ = ৩৬, ১১ × ১৩ + ১ = ১৪৪, ১৭ × ১৯ + ১ = ৩২৪ = ১৮২।

∎ দ্বিতীয় চমক: p2 – 1 আর ২৪

৩-এর চেয়ে বড় যেকোনো মৌলিক p নাও। p2 – 1 সব সময় ২৪ দিয়ে বিভাজ্য!

৫২ – ১ = ২৪,   ৭২ – ১ = ৪৮,   ১১২ – ১ = ১২০,   ১৩২ – ১ = ১৬৮

কেন? p2 – 1 = (p – 1)(p + 1)। p বিজোড়, তাই p – 1 আর p + 1 দুটিই জোড়, আর পরপর দুটি জোড় সংখ্যার একটি ৪ দিয়ে বিভাজ্য। তাই গুণফলে ২ × ৪ = ৮ আছে। আবার p – 1, p, p + 1 পরপর তিনটি সংখ্যার একটি ৩ দিয়ে বিভাজ্য, আর সেটি p নয় (p মৌলিক)। তাই গুণফলে ৩-ও আছে। ৮ আর ৩ সহমৌলিক, তাই ৮ × ৩ = ২৪!

.

∎ একটু সাবধান

এখানে গাণিতিক আরোহ (Mathematical Induction) খাটে না। আরোহে দেখাতে হয়, n–এ সত্য হলে n + 1-এ সত্য। কিন্তু একটি মৌলিক থেকে পরের মৌলিক কত দূরে, তা কেউ জানে না, তাই ‘পরের ধাপ’ ধরা যায় না। এই প্রমাণের আসল শক্তি ভাগশেষের যুক্তি: সব সংখ্যাকে কয়েকটি দলে ভাগ করে দেখানো, কোন দলে মৌলিক থাকতে পারে না।

গণিত শুধু সূত্রের সমাহার নয়, এটি সংখ্যার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুন্দর সব প্যাটার্ন খুঁজে বের করার বিজ্ঞান।

এই প্রমাণ আমি ভালোভাবে শিখেছি আহমেদ জাওয়াদ চৌধুরী ও তামজীদ মোর্শেদ রুবাবের গণিতের স্বপ্নযাত্রা-১: আর্ট অব প্রবলেম সলভিং আর গণিতের স্বপ্নযাত্রা-২: গণিত অলিম্পিয়াডের প্রথম ধাপ বই থেকে।

তোমার জন্য প্রশ্ন: ৩–এর চেয়ে বড় কোনো মৌলিক সংখ্যার বর্গকে ১২ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ কত হয়? (উত্তর: সব সময় ১। কারণ, p2 – 1 ২৪ দিয়ে, তাই ১২ দিয়েও বিভাজ্য)

সহযোগিতায়: বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি