ঢাকা ০৪:০৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সীতাকুণ্ড উপকূলে আজও হাহাকার

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ১২:৫৯:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৪ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সেই ভয়াল ২৯ এপ্রিল। ১৯৯১ সালের এই দিনে মধ্যরাতে লোনা জলের মরণ থাবায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী জনপদ। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় এলাকায় আছড়ে পড়েছিল প্রায় ২২৫ কিলোমিটার বেগের ঘূর্ণিঝড় ও ৩০ থেকে ৩৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস। মুহূর্তের মধ্যেই বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছিল সলিমপুর থেকে সৈয়দপুর পর্যন্ত ৯টি ইউনিয়ন।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সেই রাতে সীতাকুণ্ড উপজেলায় প্রাণ হারান প্রায় সাত হাজার মানুষ। নিখোঁজ হন আরও প্রায় তিন হাজার। অসংখ্য ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, ফসল ও সম্পদ ভেসে যায় জলোচ্ছ্বাসের পানিতে। উপকূলজুড়ে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি।

ঘটনার ৩৫ বছর পার হলেও উপকূলবাসীর নিরাপত্তা আজও নিশ্চিত হয়নি। একদিকে জলোচ্ছ্বাসের আতঙ্ক, অন্যদিকে বেড়িবাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ—সব মিলিয়ে এখনও চরম ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন অন্তত ৫০ হাজার মানুষ।

সীতাকুণ্ডের কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া, সোনাইছড়ি ও ভাটিয়ারী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পেরিয়ে গেলেও উপকূলীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনো দুর্বল ও অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৩৫ বছরে বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের নামে কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হলেও বাস্তবে অধিকাংশ অর্থ লোপাট হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বাঁশবাড়িয়া এলাকার বোয়ালিয়াকূল বেড়িবাঁধটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সংস্কার করা হলেও এক বছরের মধ্যেই আবার ভাঙতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের দাবি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং তদারকির অভাবের কারণে এসব বাঁধ টেকসই হচ্ছে না।

স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই আজ এলাকার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ ঝুঁকির মধ্যে জীবনযাপন করছে। সামান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়।

সীতাকুণ্ড পৌরসভাসহ উপকূলীয় এলাকায় শতাধিক ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের প্রয়োজন থাকলেও বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র ৬১টি। জনসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

উপজেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আব্দুর রহিম বলেন, চাহিদার তুলনায় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা অনেক কম। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক আশ্রয়কেন্দ্র ভবনই বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের সময় যে বনভূমি প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে উপকূলকে রক্ষা করেছিল, বর্তমানে জাহাজ ভাঙা শিল্প গড়ে ওঠার প্রতিযোগিতায় সেই বনাঞ্চলের বড় একটি অংশ উজাড় হয়ে গেছে।

পরিবেশবিদদের মতে, এই প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে ১৯৯১ সালের মতো কোনো দুর্যোগ আঘাত হানলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, উপকূলীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী না করা হলে এবং বেড়িবাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি বন্ধ না হলে ২৯ এপ্রিলের সেই ভয়াবহ দিনের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। তাই দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন উপকূলবাসী।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
   

সীতাকুণ্ড উপকূলে আজও হাহাকার

আপডেট সময় : ১২:৫৯:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

সেই ভয়াল ২৯ এপ্রিল। ১৯৯১ সালের এই দিনে মধ্যরাতে লোনা জলের মরণ থাবায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী জনপদ। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় এলাকায় আছড়ে পড়েছিল প্রায় ২২৫ কিলোমিটার বেগের ঘূর্ণিঝড় ও ৩০ থেকে ৩৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস। মুহূর্তের মধ্যেই বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছিল সলিমপুর থেকে সৈয়দপুর পর্যন্ত ৯টি ইউনিয়ন।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সেই রাতে সীতাকুণ্ড উপজেলায় প্রাণ হারান প্রায় সাত হাজার মানুষ। নিখোঁজ হন আরও প্রায় তিন হাজার। অসংখ্য ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, ফসল ও সম্পদ ভেসে যায় জলোচ্ছ্বাসের পানিতে। উপকূলজুড়ে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি।

ঘটনার ৩৫ বছর পার হলেও উপকূলবাসীর নিরাপত্তা আজও নিশ্চিত হয়নি। একদিকে জলোচ্ছ্বাসের আতঙ্ক, অন্যদিকে বেড়িবাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ—সব মিলিয়ে এখনও চরম ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন অন্তত ৫০ হাজার মানুষ।

সীতাকুণ্ডের কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া, সোনাইছড়ি ও ভাটিয়ারী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পেরিয়ে গেলেও উপকূলীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনো দুর্বল ও অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৩৫ বছরে বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের নামে কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হলেও বাস্তবে অধিকাংশ অর্থ লোপাট হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বাঁশবাড়িয়া এলাকার বোয়ালিয়াকূল বেড়িবাঁধটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সংস্কার করা হলেও এক বছরের মধ্যেই আবার ভাঙতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের দাবি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং তদারকির অভাবের কারণে এসব বাঁধ টেকসই হচ্ছে না।

স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই আজ এলাকার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ ঝুঁকির মধ্যে জীবনযাপন করছে। সামান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়।

সীতাকুণ্ড পৌরসভাসহ উপকূলীয় এলাকায় শতাধিক ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের প্রয়োজন থাকলেও বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র ৬১টি। জনসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

উপজেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আব্দুর রহিম বলেন, চাহিদার তুলনায় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা অনেক কম। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক আশ্রয়কেন্দ্র ভবনই বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের সময় যে বনভূমি প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে উপকূলকে রক্ষা করেছিল, বর্তমানে জাহাজ ভাঙা শিল্প গড়ে ওঠার প্রতিযোগিতায় সেই বনাঞ্চলের বড় একটি অংশ উজাড় হয়ে গেছে।

পরিবেশবিদদের মতে, এই প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে ১৯৯১ সালের মতো কোনো দুর্যোগ আঘাত হানলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, উপকূলীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী না করা হলে এবং বেড়িবাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি বন্ধ না হলে ২৯ এপ্রিলের সেই ভয়াবহ দিনের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। তাই দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন উপকূলবাসী।