সরকারি কর্মকর্তা সেজে প্রতারণা, মেলেনি চাকরি-ঘর-ভাতা কিছুই
- আপডেট সময় : ০৯:২৪:৪৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬ ৫১ বার পড়া হয়েছে

সরকারি চাকরি, বয়স্ক-বিধবা ও শিশু ভাতা, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরসহ নানা সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে শেখ জাহিদ হাসান জিল্লুর (৩৫) নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। শুধু টাকা আদায় নয়, চাকরির প্রলোভনে টাকা নেওয়ার পর কয়েকজনের হাতে ভুয়া নিয়োগপত্র ধরিয়ে দেওয়ারও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নিজেকে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এসব কাজ করে আসছেন জিল্লুর। সরকারি চাকরি ও বিভিন্ন সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে টাকা নেওয়ার পর কাজ না হলে টাকা ফেরত চাইতে গেলে কয়েকজনকে মামলার ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
শেখ জাহিদ হাসান জিল্লুর উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের দক্ষিণ ধোপাডাঙ্গা গ্রামের মৃত ফরজান আলী মাস্টারের ছেলে। একসময় বিজিবিতে চাকরি করতেন তিনি। ২০১৯ সালের দিকে সেই চাকরি হারানোর পর থেকে এলাকায় অবস্থান করছেন, আর এই সময় থেকেই তার বিরুদ্ধে একের পর এক প্রতারণার অভিযোগ উঠছে।
কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাকরি, ভাতা কিংবা ঘর পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া হয়। চাকরির ক্ষেত্রে পরে একটি নিয়োগপত্রও ধরিয়ে দেওয়া হয়, আর শেষে তা ভুয়া বলে প্রমাণিত হয় কিংবা প্রতিশ্রুত সুবিধাটিই আর মেলে না। প্রায় প্রতিটি ঘটনাতেই এই একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। এতে বোঝা যায়, বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং প্রতারণার একটি নিয়মিত কৌশল।
দক্ষিণ ধোপাডাঙ্গা ভেঁকিরমোড় গ্রামের মো. আবদুল মান্নান মিয়া ওরফে মাজহারুলের অভিযোগ, নৌবাহিনীতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে নেওয়া হয় ১৭ লাখ টাকা। পরে একটি নিয়োগপত্র দেওয়া হলেও বিভিন্ন মাধ্যমে যাচাই করে সেটি ভুয়া বলে জানতে পারেন তিনি। মাজহারুল বলেন, ‘চাকরির আশায় ১৭ লাখ টাকা দিয়েছিলাম। পরে নিয়োগপত্র হাতে পাই। বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, নিয়োগপত্রটি ভুয়া।’
দক্ষিণ বেকাটারী গ্রামের মো. মফিজল হক বলেন, ছেলেকে সেনাবাহিনীতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে নেওয়া হয় ৬ লাখ টাকা। পরে দেওয়া নিয়োগপত্রটিও ভুয়া বলে জানতে পারেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘টাকা ফেরত চাইলে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সময় নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি। চাইতে গেলে নানা টালবাহানা ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।’
চাকরির বাইরেও সরকারি ভাতা ও ঘর দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে জিল্লুরের বিরুদ্ধে। দক্ষিণ ধোপাডাঙ্গা বেডারভিটা গ্রামের মোছা. আজিরন বেওয়া জানান, নাতির নামে শিশু ভাতার কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে নেওয়া হয় ৫ হাজার টাকা। কার্ড না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইলে তাকে মামলার ভয় দেখানো হচ্ছে।
একই গ্রামের ছকু মিয়ার অভিযোগ, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ও জমি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে নেওয়া হয় ২০ হাজার টাকা। পরে ঘর না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইলে তাকেও পড়তে হচ্ছে নানা ভয়ভীতির মুখে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জিল্লুরের বিরুদ্ধে চাকরি ও সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। এসব অভিযোগ নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ-বৈঠক হলেও তাতে স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি, প্রতিবারই বৈঠক শেষ হয়েছে শুধু আশ্বাসে।
এর আগেও প্রতারণার অভিযোগে আইনগত জটিলতায় পড়েছিলেন জিল্লুর। গাইবান্ধা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীর স্বাক্ষর জাল করে প্রতারণার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল এবং সেই ঘটনায় কারাভোগও করতে হয়েছিল তাকে।
তবে এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন শেখ জাহিদ হাসান জিল্লুর। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি এলাকায় একটি বলাৎকারের ঘটনার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ করায় একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলছে। চাকরি বা সরকারি সুবিধা দেওয়ার নামে টাকা নেওয়া এবং ভুয়া নিয়োগপত্র দেওয়ার অভিযোগও মিথ্যা।’
ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা হোক। একই সঙ্গে টাকা উদ্ধারের ব্যবস্থা এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জিল্লুর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ বলেন, ‘বিষয়টি শুনেছি। তবে এখন পর্যন্ত লিখিত কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’





















