যেভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ তৈরি হয়
- আপডেট সময় : ১২:৫৬:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে

পরমাণুর নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্র থেকে নির্গত শক্তিকেই পারমাণবিক শক্তি বলা হয়, যা প্রোটন ও নিউট্রন দ্বারা গঠিত। এই শক্তি প্রধানত দুটি উপায়ে উৎপাদিত হতে পারে—ফিশন এবং ফিউশন। ফিশন হলো এমন প্রক্রিয়া যেখানে একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াস বিভক্ত হয়ে শক্তি উৎপন্ন করে। আর ফিউশন হলো একাধিক নিউক্লিয়াস একত্রিত হয়ে শক্তি সৃষ্টি করা। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে মূলত নিউক্লিয়ার ফিশন প্রযুক্তিই ব্যবহার করা হয়। ফিউশন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি এখনো গবেষণা ও উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পারমাণবিক শক্তিকে একটি সম্ভাবনাময় সমাধান হিসেবে তুলে ধরছে।
নিউক্লিয়ার ফিশন এমন একটি বিক্রিয়া যেখানে একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াস দুই বা ততোধিক ছোট নিউক্লিয়াসে বিভক্ত হয় এবং এর সাথে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়। উদাহরণ হিসেবে, একটি নিউট্রন যখন ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আঘাত করে, তখন তা বেরিয়াম ও ক্রিপ্টনের মতো ছোট নিউক্লিয়াসে বিভক্ত হয় এবং অতিরিক্ত দুই বা তিনটি নিউট্রন বের হয়। এই নিউট্রনগুলো আবার অন্যান্য ইউরেনিয়াম পরমাণুকে বিভক্ত করে একটি চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করে। প্রতিবার এই বিক্রিয়া ঘটার সময় তাপ ও তেজস্ক্রিয়তার আকারে শক্তি উৎপন্ন হয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কীভাবে কাজ করে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রিঅ্যাক্টরের ভেতরে নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন করা হয়। সাধারণত ইউরেনিয়াম-২৩৫ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উৎপন্ন তাপ রিঅ্যাক্টরের শীতলীকরণ তরল—সাধারণত পানি—উত্তপ্ত করে বাষ্প তৈরি করে। এই বাষ্প টারবাইন ঘোরায় এবং টারবাইন জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এভাবে কার্বন-মুক্ত বিদ্যুৎ তৈরি হয়।
ইউরেনিয়াম আহরণ, সমৃদ্ধকরণ ও ব্যবহার ইউরেনিয়াম একটি ধাতু যা পৃথিবীর বিভিন্ন শিলা ও পাথরের মধ্যে পাওয়া যায়। ইউরেনিয়ামের প্রধান দুটি আইসোটোপ হলো ইউরেনিয়াম-২৩৮ এবং ইউরেনিয়াম-২৩৫। বিশ্বের অধিকাংশ ইউরেনিয়াম ইউরেনিয়াম-২৩৮ হলেও এটি ফিশন চেইন রিঅ্যাকশন ঘটাতে পারে না। অন্যদিকে ইউরেনিয়াম-২৩৫ শক্তি উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে এর পরিমাণ এক শতাংশেরও কম।
এই কারণে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর পরিমাণ বাড়ানো হয়। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। পরে এটি তেজস্ক্রিয় অবস্থায় থাকে এবং কঠোর নিরাপত্তা বিধি মেনে নিষ্পত্তি করতে হয়।
নিউক্লিয়ার ফুয়েল সাইকেল পারমাণবিক জ্বালানি চক্র বা নিউক্লিয়ার ফুয়েল সাইকেল হলো একটি শিল্প প্রক্রিয়া, যা ইউরেনিয়াম খনি থেকে উত্তোলনের মাধ্যমে শুরু হয়ে ব্যবহৃত জ্বালানির নিষ্পত্তির মাধ্যমে শেষ হয়। ব্যবহৃত জ্বালানি বা ‘স্পেন্ট ফুয়েল’ বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে পুনর্ব্যবহার করেও নতুন জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব।
পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার ফলে বিভিন্ন মাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হয়। এসব বর্জ্যের পরিমাণ মোট বর্জ্যের তুলনায় খুবই কম হলেও নিরাপত্তার কারণে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এগুলো ব্যবস্থাপনা করা হয়। ভবিষ্যতের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
আগামী প্রজন্মের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ‘উন্নত রিঅ্যাক্টর’ বলা হয়। এসব রিঅ্যাক্টর বর্তমান প্রযুক্তির তুলনায় কম বর্জ্য উৎপাদন করবে এবং আরও নিরাপদ হবে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এসব উন্নত রিঅ্যাক্টরের নির্মাণ শুরু হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পারমাণবিক শক্তি
পারমাণবিক শক্তি একটি স্বল্প-কার্বন নির্গমনকারী জ্বালানি উৎস। কয়লা, তেল বা গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো এখানে কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয় না। বর্তমানে বিশ্বের মোট স্বল্প-কার্বন বিদ্যুতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর থেকে উৎপাদিত হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

























