ঢাকা ০৩:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিদেশি ঋণের খোঁজে ডলার নাকি পান্ডা বন্ড, কোন পথে সরকার দলীয় নেতার সমর্থন হারানোর দিনই আল–সাইয়েদের তহবিলে রেকর্ড অর্থ চুম্বন, প্রেম থেকে ঝগড়া, ‘বিগ বস’–এ আলোচিত কে এই নন্দিনী জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী নেই, টিআইবির এ তথ্য অসত্য: মিয়া গোলাম পরওয়ার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়: নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে প্রাক্তন ছাত্রকে মারধর করে পুলিশে দিল ছাত্রদল বিক্ষোভ-ভাঙচুর, ৩য় দিনে ৪ শতাধিক কারখানায় ছুটি মধ্যবর্তী নির্বাচন : হেরে গেলে বাকি দুবছর কীভাবে সামাল দেবেন ট্রাম্প সরকারের ব্যর্থতায় অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়েছে: এবি পার্টি ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডি–এডহক কমিটি বাতিলের সিদ্ধান্ত স্থগিত আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশনের পানির পাম্পে ককটেল বিস্ফোরণ

বিদেশি ঋণের খোঁজে ডলার নাকি পান্ডা বন্ড, কোন পথে সরকার

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৩২:১১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সরকার এখন বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ পেতে অন্যান্য বিকল্প পথও খুঁজছে। এ জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রথমবারের মতো সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন ডলার ও ইউরোয় যেমন বন্ড ছাড়ার কথা ভাবা হচ্ছে, তেমনি জাপানি ইয়েনে সামুরাই বন্ড ও চীনা মুদ্রা ইউয়ানে পান্ডা বন্ড ছাড়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যে ইউরো বন্ডটি হবে ডলারভিত্তিক। বিদেশি ঋণের উৎস বৃদ্ধি ও অর্থায়নের বিকল্প তৈরি করতে বন্ড ছেড়ে সব মিলিয়ে ১০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ সংগ্রহের এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ লক্ষ্য পূরণে লন্ডন, নিউইয়র্ক ও হংকংয়ের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা বা রোড শো আয়োজনের ইচ্ছা রয়েছে সরকারের। তবে কোন বন্ডে ঋণ নিলে খরচ কম হবে, তা নির্ভর করবে সুদের হার, মেয়াদ, বিনিময় হার এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতার ওপর।

.

জাপানের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিদেশি সরকার বা প্রতিষ্ঠান জাপানি ইয়েনে যে বন্ড ছাড়ে, সেটি সামুরাই বন্ড নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে জাপানের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা যায়। অন্যদিকে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিদেশি সরকার বা প্রতিষ্ঠান চীনা মুদ্রা ইউয়ানে যে বন্ড ছাড়ে তাকে বলা হয় পান্ডা বন্ড।

আর আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারে বন্ড ছেড়ে অর্থ সংগ্রহের প্রচলিত মাধ্যম হলো ডলারভিত্তিক ইউরো বন্ড। এখানে ইউরো বন্ড বলতে ইউরোপীয় মুদ্রা ইউরোতে বন্ড বোঝায় না।

বন্ড ছাড়ার ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান এবং হংকংভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্রিজওয়ার্কস ইন্টারন্যাশনালকে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ডের কাঠামো নির্ধারণ, আইনি পরামর্শক ও ট্রাস্টি নির্বাচন, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মতো কাজ করবে এ প্রতিষ্ঠানগুলো।

.

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ডলারে ঋণ নিলে ডলারে, ইয়েনে নিলে ইয়েনে এবং ইউয়ানে নিলে ইউয়ানে ঋণ ও সুদ পরিশোধ করতে হয়। তবে বিনিময় হার অনুকূলে না থাকলে ঋণের প্রকৃত খরচ বেড়ে যেতে পারে।

বন্ড ছাড়ার প্রক্রিয়াটিকে আকর্ষণীয় করতে ১৫-১৬ নভেম্বর কক্সবাজারে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে যৌথভাবে আন্তর্জাতিক ঋণবিষয়ক সম্মেলনের আয়োজন করছে সরকার। ‘পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক এ সম্মেলনে অংশ নিতে ৩০টি দেশের ১০০ প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি থাকবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ ছাড়া বক্তব্য দেবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর ছিংফেং ঝাং এবং বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যঁ পেম।

.

অর্থায়নের বিকল্প উৎসের সন্ধানে সরকার চেষ্টা করতেই পারে। তবে দেখতে হবে যে বন্ড ছেড়ে সংগ্রহ করা অর্থ দিয়ে আমরা কী করছি। বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়, এমন প্রকল্পে অর্থ খরচ করলে কিন্তু ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাহিদ হোসেন, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়

.

অর্থ বিভাগ গত জুলাইয়ে আট সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে। এই কমিটি বন্ডের পরিমাণ, মুদ্রা, মেয়াদ, সুদের হার, বাজার নির্বাচন ও ঝুঁকি পর্যালোচনা করে সুপারিশ জমা দেবে।

এ বন্ড ইস্যুতে মার্কিন ডলার প্রাধান্য পেলেও জাপানি ইয়েন, চীনা ইউয়ানসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রায়ও ঋণ সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় চীনা মুদ্রা ইউয়ানে পান্ডা বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য হয়। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

বর্তমানে মার্কিন ডলারের তুলনায় জাপানি ইয়েন বা চীনা ইউয়ানে ঋণের সুদের হার কম। কিন্তু ঋণ পরিশোধের সময় ইয়েন বা ইউয়ানের বিপরীতে ডলারের মূল্য বেড়ে গেলে বাংলাদেশের জন্য ঋণের খরচ বাড়তে পারে। আবার তখন যদি ডলারের মূল্য কমে যায়, তাহলে খরচ কমতে পারে। তাই বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি কমাতে আগাম মুদ্রা বিনিময়ের চুক্তি করার সম্ভাবনা রয়েছে।

.

ডলারভিত্তিক বন্ডের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সঙ্গে ঋণ পরিশোধের মুদ্রার মিল রয়েছে। রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের বড় অংশ ডলারে আসে। ফলে ডলারে ঋণ নিলে মুদ্রা পরিবর্তনের প্রয়োজন তুলনামূলক কম হতে পারে। তবে ডলারের সুদের হার বেশি হলে বা ঋণের মেয়াদে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হলে চাপ বাড়বে।

অন্যদিকে সামুরাই বন্ডের মাধ্যমে জাপানের বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছানো এবং পান্ডা বন্ডের মাধ্যমে চীনের বড় পুঁজিবাজার ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু এসব বাজারে বিনিয়োগকারীরা কী সুদে ঋণ দিতে আগ্রহী, কী শর্ত আরোপ করবেন এবং বন্ড ছাড়তে কত খরচ হবে—সেগুলো আগে যাচাই করবে সরকার।

.

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সদস্য ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮০ কোটি টাকার ‘বাংলা বন্ড’ ছাড়ে, যা ৯ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের সমান। প্রাণ গ্রুপের উৎপাদন কার্যক্রম ও পণ্য বিতরণব্যবস্থা সম্প্রসারণে অর্থায়নের জন্য বন্ডটি ছাড়া হয়েছিল। তিন বছর মেয়াদি বন্ডটি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়। উদীয়মান বাজারে বিনিয়োগে বিশেষায়িত সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো এই বন্ড কেনে।

লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক পরিচালক নিখিল রাঠি তখন বলেছিলেন, আইএফসির এই ঐতিহাসিক বন্ড বৈশ্বিক বাংলা বন্ডবাজার চালুর পথ তৈরি করেছে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশি টাকার পরিচিতি বাড়িয়েছে।

প্রাণ-গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও আহসান খান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘তখন সবারই চাওয়া ছিল বন্ডবাজার উন্মুক্ত হোক ও সম্প্রসারণ হোক। আমরাও চেয়েছিলাম আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা। যত দূর মনে পড়ে, টাকা-বন্ডটি খুব ভালো ছিল। আমরা উপকার পেয়েছি। প্রয়োজনে আবার সে বাজারে যাব।’

.

আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বাণিজ্যিক শর্তে ঋণ নেওয়ার সুবিধা হচ্ছে অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি করা। এতে বহুপক্ষীয় ঋণদাতা সংস্থা বা দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাংকব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ হয়। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণের নতুন উৎস তৈরি হয়।

এদিকে বন্ডের মাধ্যমে নেওয়া ঋণের অর্থ কী কাজে ব্যয় করা হবে—এ নিয়ে প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়েছে অর্থনীতিবিদদের। তাঁদের মতে, উৎপাদনশীল প্রকল্পে বিনিয়োগ করে আয় বাড়ানো গেলে ঋণ পরিশোধ সহজ হতে পারে। কিন্তু অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হলে সুদ ও আসল পরিশোধের দায় বাড়বে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশের জন্য তাই ডলার, ইয়েন ও ইউয়ানের মধ্যে শুধু কম সুদের বন্ড বেছে নেওয়াই যথেষ্ট নয়। কোন মুদ্রায় ভবিষ্যৎ পরিশোধের ঝুঁকি কম, কোন বাজারে তুলনামূলক ভালো শর্ত পাওয়া যাবে এবং ঋণের অর্থ দিয়ে কতটা অর্থনৈতিক সুফল তৈরি করা সম্ভব—এসব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

.

বাংলাদেশ ২০১১ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক বাজারে ৫০ কোটি ডলারের সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ নেয়। এ নিয়ে ২০১২ সালে ৭ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করে। কিন্তু উদ্যোগটি তেমন এগোয়নি। ২০১৩ সালেও ৫০ কোটি ডলার সংগ্রহ করতে লন্ডনে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা হয়েছিল। এ উদ্যোগেও অগ্রগতি হয়নি।

পরবর্তীকালে ২০১৪ সালে ২০০ কোটি ডলারের, ২০১৬ সালে ১০০-২০০ কোটি ডলারের, ২০২১ সালে এবং এর পরেও আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে ঋণের ঝুঁকি, বাজার পরিস্থিতি ও অর্থায়ন–সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে কোনো উদ্যোগই এগোয়নি।

.

এ নিয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন, ‘অর্থায়নের বিকল্প উৎসের সন্ধানে সরকার চেষ্টা করতেই পারে। তবে দেখতে হবে যে বন্ড ছেড়ে সংগ্রহ করা অর্থ দিয়ে আমরা কী করছি। বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়, এমন প্রকল্পে অর্থ খরচ করলে কিন্তু ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, দুই বছর বা তিন বছরের জন্য ৮ থেকে ৯ শতাংশ সুদে বন্ড ছেড়ে ১০ বছর মেয়াদি প্রকল্পে বিনিয়োগ করলে কী দাঁড়াবে, এ অঙ্ক খুব জটিল নয়। সহজেই বোঝা যায়।’

আইএমএফ থেকে নতুন ঋণ পাওয়া না–পাওয়ার সঙ্গে সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার উদ্যোগকে সম্পর্কযুক্ত মনে হয় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমার মনে হয়, সরকার সমান্তরালভাবে এগোচ্ছে। তা হয়ে থাকলেও বিষয়টি নেতিবাচক নয়। বিদ্যমান বাস্তবতায় দেশে বহুমুখী অর্থায়ন উৎসের দরকার আছে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

বিদেশি ঋণের খোঁজে ডলার নাকি পান্ডা বন্ড, কোন পথে সরকার

আপডেট সময় : ০২:৩২:১১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সরকার এখন বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ পেতে অন্যান্য বিকল্প পথও খুঁজছে। এ জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রথমবারের মতো সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন ডলার ও ইউরোয় যেমন বন্ড ছাড়ার কথা ভাবা হচ্ছে, তেমনি জাপানি ইয়েনে সামুরাই বন্ড ও চীনা মুদ্রা ইউয়ানে পান্ডা বন্ড ছাড়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যে ইউরো বন্ডটি হবে ডলারভিত্তিক। বিদেশি ঋণের উৎস বৃদ্ধি ও অর্থায়নের বিকল্প তৈরি করতে বন্ড ছেড়ে সব মিলিয়ে ১০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ সংগ্রহের এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ লক্ষ্য পূরণে লন্ডন, নিউইয়র্ক ও হংকংয়ের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা বা রোড শো আয়োজনের ইচ্ছা রয়েছে সরকারের। তবে কোন বন্ডে ঋণ নিলে খরচ কম হবে, তা নির্ভর করবে সুদের হার, মেয়াদ, বিনিময় হার এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতার ওপর।

.

জাপানের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিদেশি সরকার বা প্রতিষ্ঠান জাপানি ইয়েনে যে বন্ড ছাড়ে, সেটি সামুরাই বন্ড নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে জাপানের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা যায়। অন্যদিকে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিদেশি সরকার বা প্রতিষ্ঠান চীনা মুদ্রা ইউয়ানে যে বন্ড ছাড়ে তাকে বলা হয় পান্ডা বন্ড।

আর আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারে বন্ড ছেড়ে অর্থ সংগ্রহের প্রচলিত মাধ্যম হলো ডলারভিত্তিক ইউরো বন্ড। এখানে ইউরো বন্ড বলতে ইউরোপীয় মুদ্রা ইউরোতে বন্ড বোঝায় না।

বন্ড ছাড়ার ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান এবং হংকংভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্রিজওয়ার্কস ইন্টারন্যাশনালকে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ডের কাঠামো নির্ধারণ, আইনি পরামর্শক ও ট্রাস্টি নির্বাচন, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মতো কাজ করবে এ প্রতিষ্ঠানগুলো।

.

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ডলারে ঋণ নিলে ডলারে, ইয়েনে নিলে ইয়েনে এবং ইউয়ানে নিলে ইউয়ানে ঋণ ও সুদ পরিশোধ করতে হয়। তবে বিনিময় হার অনুকূলে না থাকলে ঋণের প্রকৃত খরচ বেড়ে যেতে পারে।

বন্ড ছাড়ার প্রক্রিয়াটিকে আকর্ষণীয় করতে ১৫-১৬ নভেম্বর কক্সবাজারে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে যৌথভাবে আন্তর্জাতিক ঋণবিষয়ক সম্মেলনের আয়োজন করছে সরকার। ‘পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক এ সম্মেলনে অংশ নিতে ৩০টি দেশের ১০০ প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি থাকবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ ছাড়া বক্তব্য দেবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর ছিংফেং ঝাং এবং বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যঁ পেম।

.

অর্থায়নের বিকল্প উৎসের সন্ধানে সরকার চেষ্টা করতেই পারে। তবে দেখতে হবে যে বন্ড ছেড়ে সংগ্রহ করা অর্থ দিয়ে আমরা কী করছি। বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়, এমন প্রকল্পে অর্থ খরচ করলে কিন্তু ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাহিদ হোসেন, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়

.

অর্থ বিভাগ গত জুলাইয়ে আট সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে। এই কমিটি বন্ডের পরিমাণ, মুদ্রা, মেয়াদ, সুদের হার, বাজার নির্বাচন ও ঝুঁকি পর্যালোচনা করে সুপারিশ জমা দেবে।

এ বন্ড ইস্যুতে মার্কিন ডলার প্রাধান্য পেলেও জাপানি ইয়েন, চীনা ইউয়ানসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রায়ও ঋণ সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় চীনা মুদ্রা ইউয়ানে পান্ডা বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য হয়। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

বর্তমানে মার্কিন ডলারের তুলনায় জাপানি ইয়েন বা চীনা ইউয়ানে ঋণের সুদের হার কম। কিন্তু ঋণ পরিশোধের সময় ইয়েন বা ইউয়ানের বিপরীতে ডলারের মূল্য বেড়ে গেলে বাংলাদেশের জন্য ঋণের খরচ বাড়তে পারে। আবার তখন যদি ডলারের মূল্য কমে যায়, তাহলে খরচ কমতে পারে। তাই বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি কমাতে আগাম মুদ্রা বিনিময়ের চুক্তি করার সম্ভাবনা রয়েছে।

.

ডলারভিত্তিক বন্ডের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সঙ্গে ঋণ পরিশোধের মুদ্রার মিল রয়েছে। রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের বড় অংশ ডলারে আসে। ফলে ডলারে ঋণ নিলে মুদ্রা পরিবর্তনের প্রয়োজন তুলনামূলক কম হতে পারে। তবে ডলারের সুদের হার বেশি হলে বা ঋণের মেয়াদে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হলে চাপ বাড়বে।

অন্যদিকে সামুরাই বন্ডের মাধ্যমে জাপানের বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছানো এবং পান্ডা বন্ডের মাধ্যমে চীনের বড় পুঁজিবাজার ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু এসব বাজারে বিনিয়োগকারীরা কী সুদে ঋণ দিতে আগ্রহী, কী শর্ত আরোপ করবেন এবং বন্ড ছাড়তে কত খরচ হবে—সেগুলো আগে যাচাই করবে সরকার।

.

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সদস্য ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮০ কোটি টাকার ‘বাংলা বন্ড’ ছাড়ে, যা ৯ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের সমান। প্রাণ গ্রুপের উৎপাদন কার্যক্রম ও পণ্য বিতরণব্যবস্থা সম্প্রসারণে অর্থায়নের জন্য বন্ডটি ছাড়া হয়েছিল। তিন বছর মেয়াদি বন্ডটি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়। উদীয়মান বাজারে বিনিয়োগে বিশেষায়িত সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো এই বন্ড কেনে।

লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক পরিচালক নিখিল রাঠি তখন বলেছিলেন, আইএফসির এই ঐতিহাসিক বন্ড বৈশ্বিক বাংলা বন্ডবাজার চালুর পথ তৈরি করেছে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশি টাকার পরিচিতি বাড়িয়েছে।

প্রাণ-গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও আহসান খান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘তখন সবারই চাওয়া ছিল বন্ডবাজার উন্মুক্ত হোক ও সম্প্রসারণ হোক। আমরাও চেয়েছিলাম আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা। যত দূর মনে পড়ে, টাকা-বন্ডটি খুব ভালো ছিল। আমরা উপকার পেয়েছি। প্রয়োজনে আবার সে বাজারে যাব।’

.

আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বাণিজ্যিক শর্তে ঋণ নেওয়ার সুবিধা হচ্ছে অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি করা। এতে বহুপক্ষীয় ঋণদাতা সংস্থা বা দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাংকব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ হয়। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণের নতুন উৎস তৈরি হয়।

এদিকে বন্ডের মাধ্যমে নেওয়া ঋণের অর্থ কী কাজে ব্যয় করা হবে—এ নিয়ে প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়েছে অর্থনীতিবিদদের। তাঁদের মতে, উৎপাদনশীল প্রকল্পে বিনিয়োগ করে আয় বাড়ানো গেলে ঋণ পরিশোধ সহজ হতে পারে। কিন্তু অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হলে সুদ ও আসল পরিশোধের দায় বাড়বে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশের জন্য তাই ডলার, ইয়েন ও ইউয়ানের মধ্যে শুধু কম সুদের বন্ড বেছে নেওয়াই যথেষ্ট নয়। কোন মুদ্রায় ভবিষ্যৎ পরিশোধের ঝুঁকি কম, কোন বাজারে তুলনামূলক ভালো শর্ত পাওয়া যাবে এবং ঋণের অর্থ দিয়ে কতটা অর্থনৈতিক সুফল তৈরি করা সম্ভব—এসব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

.

বাংলাদেশ ২০১১ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক বাজারে ৫০ কোটি ডলারের সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ নেয়। এ নিয়ে ২০১২ সালে ৭ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করে। কিন্তু উদ্যোগটি তেমন এগোয়নি। ২০১৩ সালেও ৫০ কোটি ডলার সংগ্রহ করতে লন্ডনে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা হয়েছিল। এ উদ্যোগেও অগ্রগতি হয়নি।

পরবর্তীকালে ২০১৪ সালে ২০০ কোটি ডলারের, ২০১৬ সালে ১০০-২০০ কোটি ডলারের, ২০২১ সালে এবং এর পরেও আন্তর্জাতিক বাজারে সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে ঋণের ঝুঁকি, বাজার পরিস্থিতি ও অর্থায়ন–সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে কোনো উদ্যোগই এগোয়নি।

.

এ নিয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন, ‘অর্থায়নের বিকল্প উৎসের সন্ধানে সরকার চেষ্টা করতেই পারে। তবে দেখতে হবে যে বন্ড ছেড়ে সংগ্রহ করা অর্থ দিয়ে আমরা কী করছি। বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়, এমন প্রকল্পে অর্থ খরচ করলে কিন্তু ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, দুই বছর বা তিন বছরের জন্য ৮ থেকে ৯ শতাংশ সুদে বন্ড ছেড়ে ১০ বছর মেয়াদি প্রকল্পে বিনিয়োগ করলে কী দাঁড়াবে, এ অঙ্ক খুব জটিল নয়। সহজেই বোঝা যায়।’

আইএমএফ থেকে নতুন ঋণ পাওয়া না–পাওয়ার সঙ্গে সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার উদ্যোগকে সম্পর্কযুক্ত মনে হয় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমার মনে হয়, সরকার সমান্তরালভাবে এগোচ্ছে। তা হয়ে থাকলেও বিষয়টি নেতিবাচক নয়। বিদ্যমান বাস্তবতায় দেশে বহুমুখী অর্থায়ন উৎসের দরকার আছে।’