ইউরোপে বিক্ষোভ: তরুণরা নিজেদের ‘বলির পাঁঠা’ ভাবছে
- আপডেট সময় : ১১:১০:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

জীবনযাত্রার ব্যয় লাগামহীনভাবে বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাস্তায় নেমেছেন তরুণেরা। প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও তাঁদের আস্থা কম।
স্থানীয় বিভিন্ন অসন্তোষ এসব বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। তবে গত সপ্তাহান্তে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, স্পেন, ইতালি ও জার্মানিতে লাখ লাখ মানুষকে রাজপথে নামানোর পেছনে রয়েছে কিছু অভিন্ন সমস্যা। এর মধ্যে রয়েছে আকাশচুম্বী আবাসন ব্যয়, কম মজুরি ও জলবায়ু সংকট।
.শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পর জার্মানির একাধিক শহরে সহিংসতা.
এসব বিক্ষোভে সামনের সারিতে রয়েছেন স্কুল-কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ফ্রান্সের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামেন। তাঁরা আরও ভালো ও বেশি সুযোগ-সুবিধা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অস্বচ্ছ পদ্ধতি বন্ধের দাবি জানান। সেখান থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত।
সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসবিদ সিলভাঁ বুলুক বলেন, ‘এটি একটি ইউরোপীয় আন্দোলন। তবে ফ্রান্সই এর অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।’
কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সমাবেশের পর গত ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সে অন্তত ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শুরুতে বিক্ষোভ অনেকটাই শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে দ্রুতই সেখানে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে আড়াল করে ফেলে।
এর চার দিন পর গ্রিসের কয়েকটি শহরে ১০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভ করেন। তাঁদের কারও কারও হাতে ছিল গ্রিক ও ফরাসি ভাষায় লেখা স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড।
গ্রিসের অ্যারিস্টটল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ফিলিপ্পোস আর্মেন বলেন, ‘ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সমস্যাগুলো একই রকম।’
.জেন-জি বিক্ষোভে আবার উত্তাল ইউরোপ: ৩ দেশে সংঘর্ষ, ধরপাকড় ও লুটপাট.
ইউরোপজুড়ে অনেক মানুষ এখন এমন একটি ব্যবস্থার মুখোমুখি, যার কার্যকারিতা ফুরিয়ে এসেছে। এমনটাই মনে করেন বেলজিয়ামের সমাজবিজ্ঞানী জিওফ্রে প্লেয়ার্স।
ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব লুভাঁর সামাজিক আন্দোলনবিষয়ক এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘তরুণদের সামনে বড়জোর একটি চাকরির সুযোগ রাখা হচ্ছে। আর অনেকের ক্ষেত্রে সেই চাকরিও অনিশ্চিত।’
একই সঙ্গে উচ্চ আবাসন ব্যয় ও জলবায়ু সংকটের ঝুঁকির কারণে তরুণদের পড়াশোনা আর তাঁদের মা-বাবার প্রজন্মের মতো জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।
.ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ–সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ৫ শতাধিক.
স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসের মতো দেশগুলোর অনেক বিক্ষোভে আবাসন একটি ‘কেন্দ্রীয় বিষয়’ হয়ে উঠেছে। কারণ, এর সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সম্পদের ক্রমবর্ধমান অসম বণ্টনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। গবেষক প্লেয়ার্স এ কথা বলেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মারিয়াম মার্তিনেস-বাসকুনান মনে করেন, ‘দারিদ্র্যের চেয়ে অনিশ্চয়তাই মানুষের অসন্তোষের বড় কারণ।’
স্পেনের টেলিভিশন চ্যানেল আরটিভিইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাদ্রিদের অটোনমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, ফ্রান্সের বিক্ষোভের চিত্র অন্য দেশের তরুণদেরও উৎসাহিত করেছে। একইভাবে পর্তুগালে আবাসনের অধিকারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের তাঁবু খাটিয়ে অবস্থানের দৃশ্যও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে ভূমিকা রেখেছে।
.আগামীকাল জার্মানির ৩০টির বেশি শহরে জেন-জি বিক্ষোভ.
বুলুকের মতে, আগের প্রজন্মের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা ও পরিবেশগত সমস্যার চাপ সম্পর্কে তরুণেরা গভীরভাবে সচেতন। এ কারণে তরুণদের মধ্যে নিজেদের ‘বলির পাঁঠা’ মনে করার অনুভূতি তৈরি হয়েছে।
বুলুক নিজেও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। তিনি বলেন, ফ্রান্সের শ্রেণিকক্ষে মুঠোফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার একটি অপ্রত্যাশিত প্রভাব দেখা গেছে। শিক্ষার্থীরা আবার একে অপরের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেছে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ে তাঁদের পড়াশোনার পরিবেশ কতটা খারাপ হয়েছে, তা–ও বুঝতে পারছে।
জার্মানিতে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে আবার বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালুর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়টিও অনেক তরুণকে বিক্ষোভে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছে।
.ফ্রান্সের ইয়েলো ভেস্ট কারা, কীভাবে তাঁদের আন্দোলন শুরু হলো.
আগামী এক বছরে স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও গ্রিসে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর মধ্যে তরুণদের বিক্ষোভ সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন। ২০১৮-১৯ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে এই আন্দোলন বড় ধরনের বিক্ষোভের আয়োজন করেছিল। অন্যদিকে ইতালিতে শুক্রবারের বিক্ষোভে তরুণদের সঙ্গে যোগ দেন জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের প্রতিবাদ জানানো চালক ও কৃষকেরা।
প্লেয়ার্স বলেন, আরেকটি অভিন্ন অসন্তোষ হলো, সাধারণ মানুষের কথা কেউ শুনছে না—এমন ব্যাপক ধারণা। এর ফলে সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রের মধ্যে দূরত্ব ও বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমাজে বৈষম্য ও অবিচার বেড়ে যাওয়ার অনুভূতি।
প্লেয়ার্স আরও বলেন, ‘যেসব তরুণের মা-বাবা সচ্ছল, তাঁদের জীবন তুলনামূলক স্বচ্ছন্দ। বিপরীতে, যাঁরা আর্থিকভাবে অনিশ্চিত অবস্থার পরিবার থেকে এসেছেন, তাঁদের জীবন এখন অনেক বেশি কঠিন।’
.‘এভাবে হাল ছেড়ে দেওয়া যায় না, রাজপথে ফিরতেই হতো’


























