রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়ন জরুরি
- আপডেট সময় : ০৯:৪৪:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে সরকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচলে যে নতুন নীতিমালা করেছে, সেটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে পূর্ব অভিজ্ঞতা বলছে, যত ভালো নীতিমালা করা হোক না কেন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকলে সেটা শেষ পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখে না।
দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ স্থবিরতার যে ফাঁদে আটকা পড়েছে, তাতে করে কাঙ্ক্ষিত হারে নতুন জীবিকা সৃষ্টি হচ্ছে না। অন্যদিকে টানা চার বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেশির ভাগ মানুষের প্রকৃত আয় ক্রমাগত কমেছে। এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই যে এ রকম অর্থনৈতিক বাস্তবতা দেশে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে একই সঙ্গে বিগত সরকারগুলোর রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তও এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।
.
দেশে অটোরিকশা চালু দেড় দশকের বেশি সময় আগে হলেও নীতিমালা না থাকায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কালোটাকার মালিকেরা অসংখ্য অটোরিকশার মালিক হয়েছেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বিশৃঙ্খল পরিবহন খাতকে আরও বেশি নৈরাজ্যিক করে তুলেছে অটোরিকশা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোটরসাইকেলের পর অটোরিকশা সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের মূল কারণ হয়ে উঠেছে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির প্রায় ২০ শতাংশ ঘটে বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান–সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায়। ঢাকার সড়কে বর্তমানে অটোরিকশার সংখ্যা কত তা নিয়ে বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন কিংবা অন্য কোনো সংস্থার কাছে কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান সম্প্রতি প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, প্রায় ২৫ লাখ অটোরিকশা চলছে। প্রতিদিন আরও এক থেকে দেড় হাজার অটোরিকশা যুক্ত হচ্ছে। ফলে অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত জন্মকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জিং।
.
নীতিমালায় দেখা যাচ্ছে, অটোরিকশার উৎপাদন থেকে শুরু করে এর চলাচলের ক্ষেত্র, সংখ্যা, নিবন্ধনপ্রক্রিয়া ও চার্জিং অবকাঠামো—এ রকম জরুরি বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়েছে। রিকশার নিবন্ধনকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্ধারণ করা হয়েছে চলাচলের সড়ক ও এলাকা, সর্বোচ্চ গতি, চালকের বয়স, যাত্রীসংখ্যা, নিবন্ধন ফি ও কারিগরি মান। আমরা আশা করি, এগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সহায়ক হবে।
তবে অটোরিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে মান নিয়ন্ত্রণও দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঠেকাতে জরুরি। বর্তমানে সড়কে নানা সংস্করণের অটোরিকশা চলছে, যার বেশির ভাগই বিজ্ঞানসম্মত নয়। আমরা মনে করি, বুয়েটসহ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটগুলো অটোরিকশার মান পরীক্ষার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে পাঁচটি অটোরিকশার নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক, সেটাও ভেবে দেখা দরকার। আমরা মনে করি, বিধিমালায় একজনের সর্বোচ্চ একটি বা দুটি অটোরিকশা নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী তার সুফল পাবে।
.
অটোরিকশা খাতে নিয়ন্ত্রণ আনতে গেলে দেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে দেশে যেখানে ৭০ লাখের বেশি অটোরিকশা চলাচল করছে, সেখানে এটিকে নীতিমালার মধ্যে আনতেই হবে। নিবন্ধনের ক্ষেত্রে যদি দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব থাকে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটিই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফেরাতে গিয়ে বিশৃঙ্খলা ডেকে আনা হবে।
বাংলাদেশের সড়কের যে বিশৃঙ্খলা, তা থেকে মুক্তির পথ হলো বাসকেন্দ্রিক একটি সুশৃঙ্খল গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা। মূল সড়কে গণপরিবহনই চলতে হবে, অটোরিকশাকে হতে হবে শাখা সড়কের সহযোগী বাহন।






















