ঢাকা ০১:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নায়ক শরীফুল রাজকে আইনি নোটিশ, ঘটনা কী পুরোনো বাস দিয়ে ছয় রুটে নতুন ব্যবস্থা চালু রোববার খোলাবাজারে ডলারের দাম বেড়ে ১২৮ টাকা ৫০ পয়সা, বেড়েছে ব্যাংকেও পল্টনে সাবেক অতিরিক্ত আইজিপির গাড়ির ধাক্কায় রিকশাচালক আহত, চালকের আসনে ছিলেন ছেলে মাস্টহেড পিআরের চিফ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড গ্রোথ অফিসার আশিক ইকবাল কেশবপুরে ধানখেতে পাওয়া গেল দুই নারী–পুরুষের অর্ধগলিত লাশ উত্তীর্ণ সব শিক্ষার্থীই উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবেন: শিক্ষামন্ত্রী রান্নার চুলা নিয়ে মেসে মারধর, কিশোরের মৃত্যু ফখরের সেঞ্চুরির পর মিনহাজের ঝোড়ো ব্যাটিং, ত্রিদেশীয় সিরিজ জিতল পাকিস্তান এইচএসসিতে ক্যাডেটে পাসের হার শতভাগ, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৯৪ শতাংশের বেশি

ঈদে দেশে ফেরার কথা ছিল, ফিরলেন কফিনবন্দী হয়ে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩০:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে রেখে গত বছরের শেষ দিকে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন শামীম হোসেন। এরপর একমাত্র কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। জন্মের পর প্রতিদিনই ভিডিও কলে মেয়েকে দেখতেন শামীম। মেয়ে কথা বলতে না পারলেও তার সঙ্গে গল্প করতেন, আদর দিতেন। ইচ্ছা ছিল, আগামী রোজার ঈদে দেশে ফিরে মেয়েকে কোলে নেবেন। কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি শামীমের।

মেয়ের জন্মের ৩৪ দিনের মাথায় গত ১০ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে নিজ কর্মস্থলে অগ্নিকাণ্ডে শামীম হোসেনসহ ১৬ জন নিহত হন। অগ্নিকাণ্ডে মরদেহ শনাক্ত করতে জটিলতা দেখা দেওয়ায় তখন মরদেহ দেশে আসেনি। ৮২ দিন পর আজ শনিবার কফিনবন্দী হয়ে একমাত্র সন্তানের মুখোমুখি হয়েছেন শামীম।

.

গত ১০ আগস্ট সৌদির রিয়াদে অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে কারখানায় ঘুমিয়ে ছিলেন শামীম। হঠাৎ কারখানায় আগুন লাগে। কিন্তু কারখানার মূল ফটক তালাবদ্ধ থাকায় কেউ বের হতে পারেননি। অগ্নিকাণ্ডে নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহীর ১৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়।

.

শামীমের বাড়ি নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের দীঘিরপাড় গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের জাকির হোসেনের একমাত্র ছেলে। পাঁচ লাখ টাকা ধারদেনা করে ২০১৬ সালে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন শামীম। পাঁচ বছর পর বাড়িতে ফিরে বিয়ে করেন। পাঁচ বছর বাড়িতে অবস্থানের পর ২০২৫ সালের শেষ দিকে আবার সৌদি যান। তখন তাঁর স্ত্রী মিতু খাতুন সন্তানসম্ভবা ছিলেন।

.

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রিয়াদে সোফা তৈরির একটি কারখানায় কাজ করতেন শামীম। গত ১০ আগস্ট সকালে অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে তিনি কারখানায় ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ কারখানায় আগুন লাগে। কিন্তু কারখানার মূল ফটক তালাবদ্ধ থাকায় কেউ বের হতে পারেননি। অগ্নিকাণ্ডে নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহীর ১৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। সাতজনের মরদেহ আগস্ট মাসেই দেশে এসেছিল। কিন্তু শনাক্ত করতে না পারায় শামীমসহ নয়জনের মরদেহ ডিএনএ পরীক্ষার পর আজ শনিবার দেশে আসে।

.সৌদিতে কারখানায় আগুনে নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা বেড়ে ১৬.

দুপুরে শামীমের লাশবাহী গাড়ি গ্রামে ঢুকতেই স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রতিবেশীসহ এলাকার লোকজন শামীমের বাড়িতে ভিড় করেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে শামীমের স্ত্রী মিতু খাতুন বলেন, ‘স্বামীর সঙ্গে আমার মাত্র কয়েক মাসের সংসার। ছাপা (একমাত্র মেয়ে) পেটে আসার কয়েক মাস পর সে চলে যায়। ছাপার জন্মের পর সে (শামীম) প্রতিদিন অন্তত দুবার ভিডিও কলে কথা বলত। বেশির ভাগ সময় মেয়ের সঙ্গে কথা বলত, মেয়ে কথা বলতে না পারলেও গল্প করত, আদর দিত।’

মিতু প্রথম আলোকে বলেন, শামীমের পাঠানো টাকায় আকিকা দিয়ে মেয়ের নাম রেখেছিলেন। জানিয়ে ছিলেন, আগামী রোজার ঈদে দেশে আসবেন। মেয়েকে কোলে নেবেন, সোনার চুড়ি বানিয়ে দেবেন। তাঁর সেই শখ আর পূরণ হলো না। বাস্তবে বাবা–মেয়ের আর দেখা হলো না, কথা হলো না।

.

বিকেলে দীঘিরপাড় গ্রামের মসজিদ চত্বরে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে শামীমের দাফন সম্পন্ন হয়। জানাজায় অন্যান্যের মধ্যে নলডাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামীম হোসেন অংশ নেন। শামীমের বাবা জাকির হোসেন বলেন, ‘আমার ছ্যালিডা খুব বেশি পুড়ি গিছে। ওকে চেনার উপায় নাই। তবু ওর দাফন–কাফন করতে পেরে শান্তি পাইছি।’

.

একই অগ্নিকাণ্ডে খাজুরা ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের গোলাম রাব্বানীর ছেলে সাব্বির আহমেদও মারা যান। তাঁর মরদেহও আজ দুপুরে বাড়িতে আসে। মরদেহ পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় শোক নেমে এসেছে।

.

বাবা গোলাম রাব্বানী জানান, প্রায় সাড়ে চার বছর আগে তাঁর ছেলে সৌদি আরবে যান। আড়াই বছর আগে ভিডিও কলের মাধ্যমে ছেলের বিয়ে দেন। ইচ্ছা ছিল আগামী রোজার ঈদে ছেলে বাড়িতে ফিরলে আনন্দ–উৎসব করে পুত্রবধূকে বাড়িতে উঠিয়ে আনবেন। কিন্তু তার আগেই ছেলের নির্মম মৃত্যু হলো। পুত্রবধূকে আর বাড়িতে নিয়ে আসা হলো না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘বাঁচি থাকতে ওদের মধ্যে ভিডিও কলে কথা হতো। আজ ছ্যালি বাড়িত আসল। কিন্তু বাক্সবন্দী হয়া। ওদের দেকা হলো না, কতাও হলো না। এ যে কত বড় কষ্ট, আমি বুজাতে পারছিনি। আমাক খুব অপরাধী মনে হচ্ছে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

ঈদে দেশে ফেরার কথা ছিল, ফিরলেন কফিনবন্দী হয়ে

আপডেট সময় : ০৯:৩০:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে রেখে গত বছরের শেষ দিকে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন শামীম হোসেন। এরপর একমাত্র কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। জন্মের পর প্রতিদিনই ভিডিও কলে মেয়েকে দেখতেন শামীম। মেয়ে কথা বলতে না পারলেও তার সঙ্গে গল্প করতেন, আদর দিতেন। ইচ্ছা ছিল, আগামী রোজার ঈদে দেশে ফিরে মেয়েকে কোলে নেবেন। কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি শামীমের।

মেয়ের জন্মের ৩৪ দিনের মাথায় গত ১০ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে নিজ কর্মস্থলে অগ্নিকাণ্ডে শামীম হোসেনসহ ১৬ জন নিহত হন। অগ্নিকাণ্ডে মরদেহ শনাক্ত করতে জটিলতা দেখা দেওয়ায় তখন মরদেহ দেশে আসেনি। ৮২ দিন পর আজ শনিবার কফিনবন্দী হয়ে একমাত্র সন্তানের মুখোমুখি হয়েছেন শামীম।

.

গত ১০ আগস্ট সৌদির রিয়াদে অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে কারখানায় ঘুমিয়ে ছিলেন শামীম। হঠাৎ কারখানায় আগুন লাগে। কিন্তু কারখানার মূল ফটক তালাবদ্ধ থাকায় কেউ বের হতে পারেননি। অগ্নিকাণ্ডে নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহীর ১৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়।

.

শামীমের বাড়ি নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের দীঘিরপাড় গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের জাকির হোসেনের একমাত্র ছেলে। পাঁচ লাখ টাকা ধারদেনা করে ২০১৬ সালে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন শামীম। পাঁচ বছর পর বাড়িতে ফিরে বিয়ে করেন। পাঁচ বছর বাড়িতে অবস্থানের পর ২০২৫ সালের শেষ দিকে আবার সৌদি যান। তখন তাঁর স্ত্রী মিতু খাতুন সন্তানসম্ভবা ছিলেন।

.

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রিয়াদে সোফা তৈরির একটি কারখানায় কাজ করতেন শামীম। গত ১০ আগস্ট সকালে অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে তিনি কারখানায় ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ কারখানায় আগুন লাগে। কিন্তু কারখানার মূল ফটক তালাবদ্ধ থাকায় কেউ বের হতে পারেননি। অগ্নিকাণ্ডে নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহীর ১৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। সাতজনের মরদেহ আগস্ট মাসেই দেশে এসেছিল। কিন্তু শনাক্ত করতে না পারায় শামীমসহ নয়জনের মরদেহ ডিএনএ পরীক্ষার পর আজ শনিবার দেশে আসে।

.সৌদিতে কারখানায় আগুনে নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা বেড়ে ১৬.

দুপুরে শামীমের লাশবাহী গাড়ি গ্রামে ঢুকতেই স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রতিবেশীসহ এলাকার লোকজন শামীমের বাড়িতে ভিড় করেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে শামীমের স্ত্রী মিতু খাতুন বলেন, ‘স্বামীর সঙ্গে আমার মাত্র কয়েক মাসের সংসার। ছাপা (একমাত্র মেয়ে) পেটে আসার কয়েক মাস পর সে চলে যায়। ছাপার জন্মের পর সে (শামীম) প্রতিদিন অন্তত দুবার ভিডিও কলে কথা বলত। বেশির ভাগ সময় মেয়ের সঙ্গে কথা বলত, মেয়ে কথা বলতে না পারলেও গল্প করত, আদর দিত।’

মিতু প্রথম আলোকে বলেন, শামীমের পাঠানো টাকায় আকিকা দিয়ে মেয়ের নাম রেখেছিলেন। জানিয়ে ছিলেন, আগামী রোজার ঈদে দেশে আসবেন। মেয়েকে কোলে নেবেন, সোনার চুড়ি বানিয়ে দেবেন। তাঁর সেই শখ আর পূরণ হলো না। বাস্তবে বাবা–মেয়ের আর দেখা হলো না, কথা হলো না।

.

বিকেলে দীঘিরপাড় গ্রামের মসজিদ চত্বরে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে শামীমের দাফন সম্পন্ন হয়। জানাজায় অন্যান্যের মধ্যে নলডাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামীম হোসেন অংশ নেন। শামীমের বাবা জাকির হোসেন বলেন, ‘আমার ছ্যালিডা খুব বেশি পুড়ি গিছে। ওকে চেনার উপায় নাই। তবু ওর দাফন–কাফন করতে পেরে শান্তি পাইছি।’

.

একই অগ্নিকাণ্ডে খাজুরা ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের গোলাম রাব্বানীর ছেলে সাব্বির আহমেদও মারা যান। তাঁর মরদেহও আজ দুপুরে বাড়িতে আসে। মরদেহ পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় শোক নেমে এসেছে।

.

বাবা গোলাম রাব্বানী জানান, প্রায় সাড়ে চার বছর আগে তাঁর ছেলে সৌদি আরবে যান। আড়াই বছর আগে ভিডিও কলের মাধ্যমে ছেলের বিয়ে দেন। ইচ্ছা ছিল আগামী রোজার ঈদে ছেলে বাড়িতে ফিরলে আনন্দ–উৎসব করে পুত্রবধূকে বাড়িতে উঠিয়ে আনবেন। কিন্তু তার আগেই ছেলের নির্মম মৃত্যু হলো। পুত্রবধূকে আর বাড়িতে নিয়ে আসা হলো না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘বাঁচি থাকতে ওদের মধ্যে ভিডিও কলে কথা হতো। আজ ছ্যালি বাড়িত আসল। কিন্তু বাক্সবন্দী হয়া। ওদের দেকা হলো না, কতাও হলো না। এ যে কত বড় কষ্ট, আমি বুজাতে পারছিনি। আমাক খুব অপরাধী মনে হচ্ছে।’