ঢাকা ০৪:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ অবস্থানে আফগানিস্তান, পেছনে পড়ল শ্রীলঙ্কাও মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা প্রবল, তবে জরিপ নিয়ে আশঙ্কাও কি নেই এক জোড়া ছোট্ট মাছের দাম ১৫ হাজার টাকা, মেলায় ছিল আরও কত চমক সাপ-পোকামাকড়ের ভয় মানেই প্রকৃতির প্রতি অনাগ্রহ নয় পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভে কিছু শিল্পমালিক জড়িত: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথা রেখেছে চীন, দেখায়নি রিয়াল মাদ্রিদের খেলা দুদকের মামলায় ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের দিলীপ কুমারকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ শাহরুখ খানের যে আইকনিক স্টাইলগুলো তরুণদের ব্যাপকভাবে ইনফ্লুয়েন্স করেছিল পোশাকশ্রমিকদের ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ ট্রাক্টর নিয়ে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে শেকৃবি শিক্ষার্থীরা, অস্থায়ী স্থাপনা ভাঙচুর

কাগজে ১ হাজার ২৬৪ শ্রমিক, বাস্তবে ১২ ভেকু মেশিনে চলছে খাল খনন

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ১২:৩৬:১৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬ ৪২ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় সরকারি খাল খনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কাগজে-কলমে হাজারেরও বেশি দরিদ্র শ্রমিক দিয়ে কাজ পরিচালনার কথা দেখানো হলেও বাস্তবে মাঠে চলছে অবৈধ এস্কেভেটর (ভেকু) মেশিন। একদিকে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ভেস্তে যাচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের আশায় বুক বেঁধে থাকা গরিব মানুষগুলো বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁদের ন্যায্য হক থেকে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের নজরের সামনেই দিনের পর দিন চলছে এই অনিয়ম। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে দেশব্যাপী জনগুরুত্বপূর্ণ খালসমূহ খনন, পুনঃখনন এবং খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় এ উপজেলায় দুটি খাল খনন ও পুনঃখনন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদনসহ বরাদ্দ পায়।

দপ্তর সূত্র আরও জানায়, অনুমোদিত প্রকল্প এলাকায় অধিক পানি ও কৃষিজমি থাকায় বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রকল্প দুটি সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দেয়। সে অনুযায়ী সংশোধিত খাল খনন ও পুনঃখননের অনুমতির জন্য প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়।

সংশোধিত প্রকল্প অনুযায়ী রামজীবন ইউনিয়নের ভবানীপুর ত্রাণের ব্রিজ থেকে কে কৈ কাশদহ তালেরডিটা (কালিতলা) ল্যাংগা খাল পর্যন্ত ৭ হাজার ৫৫০ মিটার খাল খননের অনুমোদন পায়। এতে ব্যয় ধরা আছে ২ কোটি ৬৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এছাড়া শ্রীপুর ইউনিয়নের ডেলারায় মহাশ্মশান থেকে দক্ষিণ শ্রীপুর সুইস গেট পর্যন্ত ৬ হাজার ৯০০ মিটার খাল খননের জন্য ২ কোটি ৪১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দুটি প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৫ হাজার টাকা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুই প্রকল্প মিলিয়ে ১২টি এস্কেভেটর (ভেকু) মেশিন খননকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। রামজীবন ইউনিয়নে ৮টি এবং শ্রীপুরে ৪টি। দুই প্রকল্পে পুরুষ-মহিলা মিলিয়ে ১ হাজার ২৬৪ জন শ্রমিক কাজ করার কথা। এরমধ্যে রামজীবন ইউনিয়নের প্রকল্পে ৬৬০ এবং শ্রীপুর ইউনিয়নের প্রকল্পে ৬০৪ জন। কিন্তু প্রকল্প দুটি ঘুরে কোথাও একজন শ্রমিকেরও দেখা মেলেনি। তাঁদের নাম কেবল তালিকার পাতায় বেঁচে আছে, মাঠে তাঁরা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

স্থানীয়রা বলছেন, শ্রমিক দিয়ে কাজ করার কথা শুনেছিলাম, তালিকাও করা হয়েছিল। কিন্তু এখন দেখছি ভেকু দিয়ে খনন চলছে। কাজও যে মানসম্পন্ন হচ্ছে তা বোঝার উপায় নেই। এসব খাল খননে জনগণের কোনো উপকারে আসবে না, শুধু কর্মকর্তাদের পকেট ভারি হবে বলে ধারণা তাদের। পাশাপাশি জামায়াত-বিএনপির মধ্যে শ্রমিক ভাগাভাগির বিষয়টি নিয়েও তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন অনেকে।

রামজীবন ইউনিয়নের দক্ষিণ কে কৈ কাশদহ গ্রামের বাওনি খালের পাশের বাসিন্দা মহির উদ্দিনের স্ত্রী মোছাঃ জামিরন বেগম (৬০) বলেন, ‘আটটা ভেকু মেশিন দিয়া মাটি কাটার কাম চলছে। কোনো কামলাক কাম করতে দেখি নাই হামরা। হামরা গরীব মানুষ। হামাকগুলাক দিয়া কাম কইললে ভালোই হইলো হয়। কিন্তু গরিবের হক ওমরা এখন মারি খাইবে।’

বাওনি খালে বাপ-দাদার আমল থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন মৃত কেরপা চন্দ্র দাশের ছেলে সুনীল চন্দ্র দাশ (৯০)। তিনি বলেন, ‘এই খালই আমাদের জীবন-জীবিকার অবলম্বন ছিল। বাপ-দাদার আমল থেকে এ খালে মাছ ধরে সংসার চালিয়েছি। একসময় খালটিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খাল ভরাট হয়ে গেছে, মাছও কমে গেছে। খালটি সঠিকভাবে খনন ও সংরক্ষণের জন্য সরকার উদ্যোগ নিয়েছে, এটা ভালো কথা। কিন্তু শ্রমিক দিয়ে খাল খননের কথা থাকলেও ভেকু দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় শ্রমিকরা কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকার যে উদ্দেশ্যে কর্মসংস্থানের কথা চিন্তা করে প্রকল্প নিয়েছে, সেটিও পূরণ হচ্ছে না।’

এ বিষয়ে কথা হয় শ্রমিকের তালিকায় নাম থাকা মো. আনিছুর রহমান ও মো. আবু বক্কর সিদ্দিকসহ আরও কয়েকজনের সাথে। তারা জানান, শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে মাসখানেক আগে ভোটার আইডি ও মোবাইল নম্বর নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর আর কেউ ফিরে তাকাননি। কাজ পাবেন কি না, কবে পাবেন, এই সামান্য প্রশ্নের উত্তরটুকুও তাদের জানা নেই।

স্থানীয়দের প্রশ্ন একটাই, ভেকু দিয়ে যদি বেশিরভাগ কাজ শেষ হয়ে যায়, তাহলে শ্রমিকদের জন্য আর কতটুকু অবশিষ্ট থাকবে? পাঁচ কোটি টাকারও বেশি সরকারি বরাদ্দের এই প্রকল্পে দরিদ্র মানুষের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত ও কঠোর জবাবদিহিতার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

এ বিষয়ে শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আজাহারুল ইসলাম বলেন, ‘ভেকু দিয়ে মাটি খননের কাজ চলছে। পরে শ্রমিক দিয়ে করা হবে। এখানে চারটি ভেকু কাজ করছে। ইউএনও স্যারসহ আমিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি।’

রামজীবন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. শামছুল হুদা সরকার বলেন, ‘আমাকে একদিন এমপি মহোদয় এবং পিআইও ডেকেছিলেন এ বিষয়ে। বলেছিলেন শ্রমিক লাগবে মোট ৬৬০ জন। এরমধ্যে বিএনপি দিবে ১২৫, জামায়াত দিবে ১২৫, এমপি মহোদয় দিবেন ৭৫ জন শ্রমিক। বাকি ৩৩৫ জন শ্রমিক আমার কাছে চেয়েছিলেন। তালিকাও করেছি। কিন্তু তারা আর তালিকা নেননি। এখন দেখছি তারা খাল খননের কাজ ভেকু দিয়েই করছেন।’

উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. বাবুল আহমেদ বলেন, ‘খাল খননের বিষয়ে ইউএনও বা পিআইও বিস্তারিত কিছুই বলেননি আমাদের। রামজীবন এবং শ্রীপুর ইউনিয়ন থেকে ১২৫ করে ২৫০ জন শ্রমিকের নাম চেয়েছেন মাত্র।’

এ প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মশিউর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তাঁর দপ্তরে কয়েকবার গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামকেও বারবার ফোন করা হলে তিনিও সাড়া দেননি।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘এস্কেভেটর মেশিন এবং শ্রমিক দুটো দিয়েই কাজ করার অনুমতি নেওয়া আছে। এখন ভেকু দিয়ে করা হচ্ছে। পরবর্তীতে শ্রমিক দিয়ে বাকি কাজগুলো করা হবে।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘খনন হওয়া খালের দুই ধারের হতদরিদ্ররাই শ্রমিক হিসেবে কাজ করবেন। অন্য এলাকার নয়।’

গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও গাইবান্ধা জেলা জামায়াতে ইসলামমীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মো. মাজেদুর রহমান শ্রমিক বিভাজনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘বিষয়টি ক্লিয়ার হওয়ার জন্য আমিও ইউএনও এবং পিআইওর সাথে কথা বলেছি। তারা বলেছেন ভেকু দিয়ে নাকি কাজ করা যাবে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
   

কাগজে ১ হাজার ২৬৪ শ্রমিক, বাস্তবে ১২ ভেকু মেশিনে চলছে খাল খনন

আপডেট সময় : ১২:৩৬:১৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় সরকারি খাল খনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কাগজে-কলমে হাজারেরও বেশি দরিদ্র শ্রমিক দিয়ে কাজ পরিচালনার কথা দেখানো হলেও বাস্তবে মাঠে চলছে অবৈধ এস্কেভেটর (ভেকু) মেশিন। একদিকে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ভেস্তে যাচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের আশায় বুক বেঁধে থাকা গরিব মানুষগুলো বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁদের ন্যায্য হক থেকে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের নজরের সামনেই দিনের পর দিন চলছে এই অনিয়ম। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে দেশব্যাপী জনগুরুত্বপূর্ণ খালসমূহ খনন, পুনঃখনন এবং খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় এ উপজেলায় দুটি খাল খনন ও পুনঃখনন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদনসহ বরাদ্দ পায়।

দপ্তর সূত্র আরও জানায়, অনুমোদিত প্রকল্প এলাকায় অধিক পানি ও কৃষিজমি থাকায় বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রকল্প দুটি সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দেয়। সে অনুযায়ী সংশোধিত খাল খনন ও পুনঃখননের অনুমতির জন্য প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়।

সংশোধিত প্রকল্প অনুযায়ী রামজীবন ইউনিয়নের ভবানীপুর ত্রাণের ব্রিজ থেকে কে কৈ কাশদহ তালেরডিটা (কালিতলা) ল্যাংগা খাল পর্যন্ত ৭ হাজার ৫৫০ মিটার খাল খননের অনুমোদন পায়। এতে ব্যয় ধরা আছে ২ কোটি ৬৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এছাড়া শ্রীপুর ইউনিয়নের ডেলারায় মহাশ্মশান থেকে দক্ষিণ শ্রীপুর সুইস গেট পর্যন্ত ৬ হাজার ৯০০ মিটার খাল খননের জন্য ২ কোটি ৪১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দুটি প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৫ হাজার টাকা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুই প্রকল্প মিলিয়ে ১২টি এস্কেভেটর (ভেকু) মেশিন খননকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। রামজীবন ইউনিয়নে ৮টি এবং শ্রীপুরে ৪টি। দুই প্রকল্পে পুরুষ-মহিলা মিলিয়ে ১ হাজার ২৬৪ জন শ্রমিক কাজ করার কথা। এরমধ্যে রামজীবন ইউনিয়নের প্রকল্পে ৬৬০ এবং শ্রীপুর ইউনিয়নের প্রকল্পে ৬০৪ জন। কিন্তু প্রকল্প দুটি ঘুরে কোথাও একজন শ্রমিকেরও দেখা মেলেনি। তাঁদের নাম কেবল তালিকার পাতায় বেঁচে আছে, মাঠে তাঁরা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

স্থানীয়রা বলছেন, শ্রমিক দিয়ে কাজ করার কথা শুনেছিলাম, তালিকাও করা হয়েছিল। কিন্তু এখন দেখছি ভেকু দিয়ে খনন চলছে। কাজও যে মানসম্পন্ন হচ্ছে তা বোঝার উপায় নেই। এসব খাল খননে জনগণের কোনো উপকারে আসবে না, শুধু কর্মকর্তাদের পকেট ভারি হবে বলে ধারণা তাদের। পাশাপাশি জামায়াত-বিএনপির মধ্যে শ্রমিক ভাগাভাগির বিষয়টি নিয়েও তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন অনেকে।

রামজীবন ইউনিয়নের দক্ষিণ কে কৈ কাশদহ গ্রামের বাওনি খালের পাশের বাসিন্দা মহির উদ্দিনের স্ত্রী মোছাঃ জামিরন বেগম (৬০) বলেন, ‘আটটা ভেকু মেশিন দিয়া মাটি কাটার কাম চলছে। কোনো কামলাক কাম করতে দেখি নাই হামরা। হামরা গরীব মানুষ। হামাকগুলাক দিয়া কাম কইললে ভালোই হইলো হয়। কিন্তু গরিবের হক ওমরা এখন মারি খাইবে।’

বাওনি খালে বাপ-দাদার আমল থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন মৃত কেরপা চন্দ্র দাশের ছেলে সুনীল চন্দ্র দাশ (৯০)। তিনি বলেন, ‘এই খালই আমাদের জীবন-জীবিকার অবলম্বন ছিল। বাপ-দাদার আমল থেকে এ খালে মাছ ধরে সংসার চালিয়েছি। একসময় খালটিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খাল ভরাট হয়ে গেছে, মাছও কমে গেছে। খালটি সঠিকভাবে খনন ও সংরক্ষণের জন্য সরকার উদ্যোগ নিয়েছে, এটা ভালো কথা। কিন্তু শ্রমিক দিয়ে খাল খননের কথা থাকলেও ভেকু দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় শ্রমিকরা কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকার যে উদ্দেশ্যে কর্মসংস্থানের কথা চিন্তা করে প্রকল্প নিয়েছে, সেটিও পূরণ হচ্ছে না।’

এ বিষয়ে কথা হয় শ্রমিকের তালিকায় নাম থাকা মো. আনিছুর রহমান ও মো. আবু বক্কর সিদ্দিকসহ আরও কয়েকজনের সাথে। তারা জানান, শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে মাসখানেক আগে ভোটার আইডি ও মোবাইল নম্বর নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর আর কেউ ফিরে তাকাননি। কাজ পাবেন কি না, কবে পাবেন, এই সামান্য প্রশ্নের উত্তরটুকুও তাদের জানা নেই।

স্থানীয়দের প্রশ্ন একটাই, ভেকু দিয়ে যদি বেশিরভাগ কাজ শেষ হয়ে যায়, তাহলে শ্রমিকদের জন্য আর কতটুকু অবশিষ্ট থাকবে? পাঁচ কোটি টাকারও বেশি সরকারি বরাদ্দের এই প্রকল্পে দরিদ্র মানুষের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত ও কঠোর জবাবদিহিতার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

এ বিষয়ে শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আজাহারুল ইসলাম বলেন, ‘ভেকু দিয়ে মাটি খননের কাজ চলছে। পরে শ্রমিক দিয়ে করা হবে। এখানে চারটি ভেকু কাজ করছে। ইউএনও স্যারসহ আমিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি।’

রামজীবন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. শামছুল হুদা সরকার বলেন, ‘আমাকে একদিন এমপি মহোদয় এবং পিআইও ডেকেছিলেন এ বিষয়ে। বলেছিলেন শ্রমিক লাগবে মোট ৬৬০ জন। এরমধ্যে বিএনপি দিবে ১২৫, জামায়াত দিবে ১২৫, এমপি মহোদয় দিবেন ৭৫ জন শ্রমিক। বাকি ৩৩৫ জন শ্রমিক আমার কাছে চেয়েছিলেন। তালিকাও করেছি। কিন্তু তারা আর তালিকা নেননি। এখন দেখছি তারা খাল খননের কাজ ভেকু দিয়েই করছেন।’

উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. বাবুল আহমেদ বলেন, ‘খাল খননের বিষয়ে ইউএনও বা পিআইও বিস্তারিত কিছুই বলেননি আমাদের। রামজীবন এবং শ্রীপুর ইউনিয়ন থেকে ১২৫ করে ২৫০ জন শ্রমিকের নাম চেয়েছেন মাত্র।’

এ প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মশিউর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তাঁর দপ্তরে কয়েকবার গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামকেও বারবার ফোন করা হলে তিনিও সাড়া দেননি।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘এস্কেভেটর মেশিন এবং শ্রমিক দুটো দিয়েই কাজ করার অনুমতি নেওয়া আছে। এখন ভেকু দিয়ে করা হচ্ছে। পরবর্তীতে শ্রমিক দিয়ে বাকি কাজগুলো করা হবে।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘খনন হওয়া খালের দুই ধারের হতদরিদ্ররাই শ্রমিক হিসেবে কাজ করবেন। অন্য এলাকার নয়।’

গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও গাইবান্ধা জেলা জামায়াতে ইসলামমীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মো. মাজেদুর রহমান শ্রমিক বিভাজনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘বিষয়টি ক্লিয়ার হওয়ার জন্য আমিও ইউএনও এবং পিআইওর সাথে কথা বলেছি। তারা বলেছেন ভেকু দিয়ে নাকি কাজ করা যাবে।’