সংবিধান সংশোধনে তাড়াহুড়া নয়, ঐক্য ও অন্তর্ভুক্তির তাগিদ
- আপডেট সময় : ১১:০০:১২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

সংবিধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় আইনজীবী ও সংবিধানবিশেষজ্ঞরা এ কথা বলেন।
.
সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া না করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধানের মূলনীতি রক্ষা এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন আইনজীবী ও সংবিধানবিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন, রাজনৈতিক বিভাজন দূর করে সব মতের মানুষকে নিয়ে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে হবে।
আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে সংবিধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় আইনজীবী ও সংবিধানবিশেষজ্ঞরা এ কথা বলেন। ‘মানবাধিকার, গণতন্ত্র, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং ৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতি’ শীর্ষক এ সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি।
.
আলোচনা সভার প্রধান অতিথি ছিলেন গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও অন্যতম সংবিধানপ্রণেতা ড. কামাল হোসেন। তাঁর পক্ষে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির প্রচার সম্পাদক সানজিদ রহমান।
এতে বলা হয়, মানুষের অধিকার রক্ষার কাজ এখনো শেষ হয়নি। স্বাধীন বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ম, গোষ্ঠী, লিঙ্গ, বর্ণ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো বৈষম্য হতে দেওয়া যাবে না। সবাই মিলে একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
.
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত জুলাই সনদ কোনো গণপরিষদে অনুমোদিত হয়নি। তাই এই সনদ মানতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই।
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, সভায় সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য
.
আলোচনা সভায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, সংবিধান সংশোধন হতে পারে। তবে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য সংশোধন করা হলে সে সংশোধনী অতীতেও থাকেনি, ভবিষ্যতেও থাকবে না। শুধু ধর্মীয় চিন্তাভাবনা থেকেও সংবিধান সংশোধন করা উচিত হবে না।
.
বিএনপি জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে, সেগুলো বাদ দিয়ে বাকি বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা হবে উল্লেখ করে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ শিথিল করার বিষয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। সংশোধন যাতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, সে চিন্তাও আছে সরকারের। তিনি সুপ্রিম কোর্টে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো ও এটিকে শক্তিশালী করার দাবি জানান।
সভায় সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যাপক আবু সাইয়িদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত জুলাই সনদ কোনো গণপরিষদে অনুমোদিত হয়নি। তাই এই সনদ মানতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। সংবিধান সংশোধনের আগে গণপরিষদ গঠনের দাবি জানান তিনি। গণভোটের আয়োজনকে ‘জগাখিচুড়ি’ ও ‘গোঁজামিল’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে জাতিকে বিভক্ত ও বিভ্রান্ত করা হয়েছে।
.
সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে, তবে তা তড়িঘড়ি করে করা উচিত নয় বলে মত দেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেন, গত ৫০ বছরে সমাজ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিবর্তন এসেছে। এসব পরিবর্তনের প্রতিফলন সংবিধানে থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংবিধানের মূলনীতিগুলোও রক্ষা করতে হবে। আগে সংবিধান প্রণয়নে যাঁদের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে, তাঁদের কথা শোনার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
.
জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান সারা হোসেন। তিনি বলেন, সংবিধানে জীবনের অধিকার রক্ষা ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
.
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, সংবিধানের মূল আদর্শ ও নীতি থেকে দেশ অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। সে কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ বাংলাদেশকে টিকিয়ে রাখতে হলে বারবার বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যেতে হবে। এ দেশে মৌলবাদী গোষ্ঠী যদি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। যেকোনো মূল্যে তাদের নির্মূল করতে হবে।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাসান তারিক চৌধুরী। আইনজীবী রেজাউল ইসলাম ও মুরাদ আল হাসানের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মো. ইয়াহিয়া, বর্তমান সহসভাপতি জগলুল হায়দার আফ্রিক, আলী আজম ও আনোয়ারুল হক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হুমাউন কবির প্রমুখ।

























