ফ্লোরিডায় বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের সহপাইলটের বয়স ছিল ২০ বছর
- আপডেট সময় : ০৩:২২:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের অস্টিন থেকে বাহামা যাওয়ার পথে গত রোববার দক্ষিণ ফ্লোরিডায় একটি ছোট লিয়ারজেট উড়োজাহাজ মাটিতে আছড়ে পড়ে বিস্ফোরিত হয়। এই উড়োজাহাজের কো–পাইলট (সহপাইলট) ছিলেন নাতালিয়া গাদেলহা ফিলগেইরাস। সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঠিক আগে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের (এটিসি) অডিওতে ২০ বছর বয়সী এই কো-পাইলটকে আকুতি জানিয়ে ‘মে ডে’, ‘মে ডে’ (উড়োজাহাজে সাহায্য চেয়ে জরুরি বিপদ সংকেত) বলে চিৎকার করে সাহায্য চাইতে শোনা যায়।
ভয়াবহ দুর্ঘটনার কিছু মুহূর্ত আগে লাইভএটিসি ডট নেট–এ রেকর্ড হওয়া এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের রেডিও কলে ফিলগেইরাস জানান, বাইরের তাপমাত্রা মাইনাস ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়ায় উড়োজাহাজে বরফ জমছিল। তিনি উড়োজাহাজে মাঝারি ধরনের ঝাঁকুনির কথাও জানান, যার ফলে এটি প্রায় ৭০০ ফুট পর্যন্ত ওঠানামা করছিল।
.
কয়েক মুহূর্ত পর ফিলগেইরাস চিৎকার করে বলে ওঠেন, ‘মে ডে’, ‘মে ডে’। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতি মিনিটে ১০ হাজার ফুট নিচে নেমে যাচ্ছি।’
ফিলগেইরাস চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আমরা অতিরিক্ত গতির অবস্থায় চলে গেছি (ওভারস্পিড কন্ডিশন), প্রতি মিনিটে ২০ হাজার ফুট নিচে নেমে যাচ্ছি…আমরা মাটিতে আছড়ে পড়তে যাচ্ছি।’
২০ বছর বয়সী নাতালিয়া গাদেলহা ফিলগেইরাস (২০) ছিলেন ব্যক্তিগত লিয়ারজেট৬০ উড়োজাহাজটির সহপাইলট। ফ্লোরিডার পাম বিচ কাউন্টির এক আবাসিক এলাকায় রোববার উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়। দুর্ঘটনায় আরোহীদের নয়জনই নিহত হন। ফিলগেইরাস ১৭ বছর বয়সে প্রাইভেট পাইলট ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরবর্তী সময়ে এডিএস–বি এক্সচেঞ্জের ফ্লাইট ডেটাতে দেখা যায়, লিয়ারজেট৬০ উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হওয়ার মাত্র এক মিনিট আগে ২৭ হাজার ফুট নিচে নেমে গিয়েছিল।
.
২০ বছর বয়সী ফিলগেইরাস কে
তৎকালীন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, ফিলগেইরাস ২০২৩ সালে ১৭ বছর বয়সে ওয়েস্ট বোকা র্যাটন কমিউনিটি হাইস্কুলের জ্যেষ্ঠ ছাত্রী থাকাকালে পাইলট লাইসেন্স পান। এই তরুণ বৈমানিক (ব্রাজিলীয় পরিবারে জন্ম হলেও ফ্লোরিডায় থাকতেন) ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার আগেই প্রাইভেট পাইলট লাইসেন্স পাওয়ায় এর আগেও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিলেন তিনি।
ফিলগেইরাসের মায়ের ভাষ্যমতে, ফিলগেইরাস নয় মাস ধরে কমার্শিয়াল পাইলট হিসেবে কাজ করছিলেন।
ফিলগেইরাসের মা ক্যামিলা গাদেলহা কোর্টেলেটি সিএনএন ব্রাসিলকে, ‘সে খুব ভালো একটা মেয়ে ছিল, দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী। সে ছিল সহপাইলট এবং তাঁর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার ছিল না।’
ফিলগেইরাসের পাইলট লাইসেন্সে দেখা গেছে, বিমানটি ওড়ানোর অনুমতি তাঁর ছিল, তবে পুরো ফ্লাইট পরিচালনা বা মূল দায়িত্বে (কমান্ডে) থাকার অনুমতি ছিল না।
ফিলগেইরাসের সৎবাবা থিয়াগো কোর্টেলেটি (৪৪) নিউইয়র্ক পোস্টকে বলেন, ফিলগেইরাসের ১ হাজার ৩০০ ঘণ্টা উড়ানোর অভিজ্ঞতা ছিল। তাঁর মতে, উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হওয়ার মাত্র ১০ মিনিট আগে এই ২০ বছর বয়সী তরুণী তাঁর বয়ফ্রেন্ড জাস্টিনকে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন।
কোর্টেলেটি বলেন, ‘সে শুধু বলেছিল, প্রচণ্ড ঝাঁকুনি হচ্ছে, বরফ জমছে।’
.
কৈশোরেই বিমান উড়ানো শেখা
সিবিএস১২-কে দেওয়া একটি পুরোনো সাক্ষাৎকারে, বোকা র্যাটন হাইস্কুলের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ ছাত্রী ফিলগেইরাস ব্যাখ্যা করেছিলেন, তিনি ২০২০ সালে পাইলটের প্রশিক্ষণ শুরু করেন। তাঁর বাবাও তাঁকে শেখাতেন, যিনি ২০১৮ সালে শখের বশে উড়োজাহাজ চালানো শিখেছিলেন।
ফিলগেইরাস বলেছিলেন, ‘অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রমী হতে আমার ভালো লাগে। তাই আমার কাছে মনে হতো এটা খুব চমৎকার একটি বিষয়, যা সাধারণ সুযোগের মতো নয়।’
ফিলগেইরাস আরও যোগ করেছিলেন, ‘আমি সাধারণ কিছু না করে এটাই করেছি এবং শেষ পর্যন্ত বিষয়টি এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে আমার কাছে এটা দারুণ লাগে। অনেকে ভাবেন, আমি উড়োজাহাজ ওড়াতে পারি অথচ গাড়ি চালাতে পারি না, এটা অদ্ভুত। আমার নিজেরও হাসি পায়। এখন আমি গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য সত্যিই ব্যাকুল হয়ে আছি।’
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, পাম বিচ কাউন্টি স্কুল ডিস্ট্রিক্ট তাঁদের হাইস্কুলের বিশেষায়িত এভিয়েশন একাডেমির অংশ হিসেবে তাঁর লাইসেন্সের খরচ বহন করেছিল। সেখানে শিক্ষার্থীরা সিমুলেটর এবং ড্রোন দিয়ে ওড়ানোর অনুশীলন করত।
.
আর কারা নিহত হলেন
সাতজন যাত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনায় অ্যাডাম রবিনসন, তাঁর স্ত্রী হেলেন শার্প এবং তাঁদের দুই সন্তান চার বছর বয়সী এমা ও দুই বছরের চার্লি মারা গেছে। এ ছাড়া শিশুদের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা অনিতা মারিয়া সেটিনাও মারা গেছেন।
আরও দুজন নিহত ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন—র্যাচেল রিড ও চার্মি ফেহর। তবে অন্য পাইলটের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
নিহত সাত যাত্রীর পরিবার এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমাদের হৃদয় পাইলটদের পরিবারের জন্যও সমব্যথী, যাঁরা আমাদের মতোই গভীর শোকে নিমজ্জিত।’
রবিনসন সম্প্রতি প্রফিটলেড পডকাস্টে বলেছিলেন, তিনি ও তাঁর পরিবার কলোরাডোর অ্যাসপেনে বাস করতেন। তিনি ছিলেন ‘রব্লি’ নামক ই–মেইল মার্কেটিং প্ল্যাটফর্মের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং ‘রিটেনশন ডটকম’–এর প্রতিষ্ঠাতা। এই সাইট ই-কমার্স ওয়েবসাইটের ভিজিটরদের ই–মেইল ঠিকানার সঙ্গে যুক্ত করার প্রযুক্তি সরবরাহ করে থাকে।
.
৪৫ বছর বয়সী রবিনসন বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, আমি আমার স্বপ্নের জীবন যাপন করছি।’
এই উদ্যোক্তা বলেছিলেন, ‘আমার সবচেয়ে দারুণ লাগে, আমি সকাল–সন্ধ্যা আমার সন্তানদের দেখতে পাই। কাজের জন্য আমাকে খুব একটা ঘুরে বেড়াতে হয় না। আর আমি এমন এক জায়গায় থাকার সুযোগ পেয়েছি, যা সব সময় আমার স্বপ্নের জায়গা ছিল। আমার স্ত্রীও ভীষণ আনন্দিত। কারণ, তিনি পুরোদস্তুর একজন শিল্পী হতে পারছেন।’
টেক্সাসের অস্টিনে রবিনসন বেশ পরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। কারণ, রিটেনশন ডটকম-এর মূল কার্যালয় সেখানেই ছিল। এ বছর অস্টিন দ্বিতীয়বারের মতো উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় কোনো প্রযুক্তি উদ্যোক্তাকে হারাল। এর আগে জুনে জোশুয়া বেয়ার মারা যান, যিনি একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মের নেতৃত্বে ছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপগুলোকে সহায়তা করত।
অস্টিন টেকনোলজি কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা থম সিঙ্গার বলেন, ‘রবিনসন ছিলেন অস্টিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোক্তা।’
























