ঢাকা ১১:২৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

বেলে মাছ কেন বালির নিচে থাকে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:০৮:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ভোরবেলা নদীর ঘাটে গেলে জেলেদের জালে নানা রকম মাছ দেখা যায়। কোনোটা রুপালি, কোনোটা লম্বাটে, কোনোটা কাঁটায় ভরা। এর মধ্যে একটা মাছ আছে, যার দিকে হঠাৎ তাকালে চোখই পড়ে না। গায়ের রং বালির মতো ধূসর-বাদামি, তার ওপর গাঢ় ছোপ। মাছটার নাম বেলে।

প্রশ্ন হলো, মাছটা বালির কাছে কিংবা নিচে থাকে কেন? উত্তরটা বুঝতে হলে আগে মাছটাকে একটু চিনে নিতে হবে।

বেলে মাছের বৈজ্ঞানিক নাম Glossogobius giuris। এরা গোবি পরিবারের মাছ। আমাদের নদী, খাল, বিল আর পুকুরে একসময় এদের প্রচুর দেখা যেত। মোহনার লোনাপানিতেও টিকে থাকতে পারে। লম্বায় সাধারণত ১৫-২০ সেন্টিমিটার হয়, কোনো কোনোটা আরও বড়। মাথা চ্যাপটা, মুখ বড়। চোখ দুটো মাথার ওপরের দিকে বসানো। পিঠে দুটো আলাদা পাখনা আছে। অন্য অনেক মাছের মতো এরা সারাক্ষণ ভেসে বেড়ায় না। বেশির ভাগ সময় কাটে তলায়।

বেলের সবচেয়ে বড় কৌশল লুকিয়ে থাকা। বালু আর কাদার রঙের সঙ্গে গায়ের রং এমন মিলে যায় যে ওপর থেকে বোঝাই যায় না। একে বলে ‘ছদ্মবেশ’। এতে দুটো উপকার হয়। বক, মাছরাঙা বা বড় মাছ সহজে তাকে খুঁজে পায় না। আবার বেলে নিজেও শিকারি। চুপচাপ পড়ে থেকে সে অপেক্ষা করে। ছোট মাছ, চিংড়ি বা পোকার লার্ভা কাছে এলে হঠাৎ ঝাঁপ দেয়। এক ঝটকায় কাজ শেষ।

নড়াচড়া করলেই শিকারির চোখে পড়ার ভয়। তাই বেলে চলে ছোট ছোট লাফে। কয়েক হাত গিয়ে আবার থেমে যায়। এই থামা আর চলার ছন্দে মাছটা বালির সঙ্গে মিশে থাকে।

.চিংড়ি মাছ, কাঁকড়া নয় কেন.

শরীরও তার তলায় থাকার উপযোগী। গোবি পরিবারের মাছের নিচের দিকের পাখনা জোড়া লেগে চোষকের মতো একটা অংশ তৈরি করে। এর সাহায্যে মাছ শক্ত কিছুর গায়ে আটকে থাকতে পারে। স্রোত জোরালো হলেও সহজে ভেসে যায় না। অনেক মাছের শরীরে বায়ুথলি থাকে। সেটা ফুলিয়ে-চুপসে তারা পানির ওপরে-নিচে ওঠানামা করে। গোবি জাতীয় বেশির ভাগ মাছের এই থলি থাকে না, থাকলেও খুব ছোট। তাই ভেসে থাকার চেয়ে তলায় থাকাই এদের জন্য স্বচ্ছন্দ।

নদীর তলা বেলের কাছে শুধু লুকোনোর জায়গা নয়, ঘরও। ডিম পাড়ার সময় এরা নিরাপদ, আড়ালের জায়গা বেছে নেয়। গোবি পরিবারের অনেক মাছ পাথর বা গর্তের গায়ে ডিম আটকে রাখে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে তারাও তলার কাছাকাছি বড় হয়। খাবারও মেলে সেখানেই। বেলে ছোট প্রাণী খায়, আবার নিজেও বড় মাছ আর পাখির খাবার হয়। অর্থাৎ খাদ্যশৃঙ্খলের ঠিক মাঝখানে তার জায়গা। এই কড়া খুলে গেলে ওপরে-নিচে দুই দিকেই প্রভাব পড়ে।

এখানেই আসে আমাদের নদীর কথা। বালু সরে গেলে, কাদা অন্য রকম হয়ে গেলে মাছের আশ্রয়ও থাকে না। নদীর তলায় শুধু বেলে থাকে না। সেখানে শামুক আছে, ছোট চিংড়ি আছে, নানা পোকার লার্ভা আছে। বেলের খাবার আসে এদের থেকেই। তলদেশ নষ্ট হলে সবাই একসঙ্গে বিপদে পড়ে।

.কোন মাছ ডাঙায় বেঁচে থাকে.

যন্ত্র দিয়ে বালু তোলা এখন অনেক জায়গায় চোখে পড়ে। এতে নদীর তলদেশ ওলটপালট হয়ে যায়, পানি ঘোলা হয়। ঘোলা পানিতে শিকার দেখা কঠিন। ছোট প্রাণী মরে যায় বা সরে পড়ে। নদী ভরাট হলে গভীরতা কমে, শুকনা মৌসুমে অনেক জায়গায় পানিই থাকে না। কচুরিপানা, দূষণ আর কারখানার বর্জ্য পরিস্থিতি আরও খারাপ করে। বেলে খেতে সুস্বাদু বলে চাহিদাও বেশি। ফলে একদিকে আবাস নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ধরার চাপ বাড়ছে।

বিশ্বব্যাপী তালিকায় প্রজাতিটি এখনো ঝুঁকিতে ধরা হয়নি। কিন্তু এলাকাভেদে সংখ্যা কমার কথা জেলেরা বলেন। প্রবীণদের মুখে প্রায়ই শোনা যায়, আগের মতো সহজে বেলে মেলে না। দেশে বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণের আইন আছে। অনেক জায়গায় তা ঠিকমতো মানা হয় না বলে অভিযোগ ওঠে। নদী বাঁচাতে হলে আইন মানা আর নজরদারি, দুটোই জরুরি।

বেলে আসলে নদীর স্বাস্থ্যের একটা ইঙ্গিত। যে নদীর তলদেশ ঠিক আছে, পানি পরিষ্কার, সেখানেই এমন মাছ টিকে থাকে। মাছ কমে গেলে বুঝতে হয়, নদীর কোথাও গোলমাল হয়েছে। নদী একটা বড় ঘর, আর তার মেঝেটাই বালু আর কাদা। মেঝে ভেঙে গেলে বাসিন্দারা থাকবে কোথায়? বেলে মাছ সেই প্রশ্নটাই আমাদের সামনে রেখে যায়।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

.কোন মাছ ডাঙায় বেঁচে থাকে

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

বেলে মাছ কেন বালির নিচে থাকে

আপডেট সময় : ০৮:০৮:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

ভোরবেলা নদীর ঘাটে গেলে জেলেদের জালে নানা রকম মাছ দেখা যায়। কোনোটা রুপালি, কোনোটা লম্বাটে, কোনোটা কাঁটায় ভরা। এর মধ্যে একটা মাছ আছে, যার দিকে হঠাৎ তাকালে চোখই পড়ে না। গায়ের রং বালির মতো ধূসর-বাদামি, তার ওপর গাঢ় ছোপ। মাছটার নাম বেলে।

প্রশ্ন হলো, মাছটা বালির কাছে কিংবা নিচে থাকে কেন? উত্তরটা বুঝতে হলে আগে মাছটাকে একটু চিনে নিতে হবে।

বেলে মাছের বৈজ্ঞানিক নাম Glossogobius giuris। এরা গোবি পরিবারের মাছ। আমাদের নদী, খাল, বিল আর পুকুরে একসময় এদের প্রচুর দেখা যেত। মোহনার লোনাপানিতেও টিকে থাকতে পারে। লম্বায় সাধারণত ১৫-২০ সেন্টিমিটার হয়, কোনো কোনোটা আরও বড়। মাথা চ্যাপটা, মুখ বড়। চোখ দুটো মাথার ওপরের দিকে বসানো। পিঠে দুটো আলাদা পাখনা আছে। অন্য অনেক মাছের মতো এরা সারাক্ষণ ভেসে বেড়ায় না। বেশির ভাগ সময় কাটে তলায়।

বেলের সবচেয়ে বড় কৌশল লুকিয়ে থাকা। বালু আর কাদার রঙের সঙ্গে গায়ের রং এমন মিলে যায় যে ওপর থেকে বোঝাই যায় না। একে বলে ‘ছদ্মবেশ’। এতে দুটো উপকার হয়। বক, মাছরাঙা বা বড় মাছ সহজে তাকে খুঁজে পায় না। আবার বেলে নিজেও শিকারি। চুপচাপ পড়ে থেকে সে অপেক্ষা করে। ছোট মাছ, চিংড়ি বা পোকার লার্ভা কাছে এলে হঠাৎ ঝাঁপ দেয়। এক ঝটকায় কাজ শেষ।

নড়াচড়া করলেই শিকারির চোখে পড়ার ভয়। তাই বেলে চলে ছোট ছোট লাফে। কয়েক হাত গিয়ে আবার থেমে যায়। এই থামা আর চলার ছন্দে মাছটা বালির সঙ্গে মিশে থাকে।

.চিংড়ি মাছ, কাঁকড়া নয় কেন.

শরীরও তার তলায় থাকার উপযোগী। গোবি পরিবারের মাছের নিচের দিকের পাখনা জোড়া লেগে চোষকের মতো একটা অংশ তৈরি করে। এর সাহায্যে মাছ শক্ত কিছুর গায়ে আটকে থাকতে পারে। স্রোত জোরালো হলেও সহজে ভেসে যায় না। অনেক মাছের শরীরে বায়ুথলি থাকে। সেটা ফুলিয়ে-চুপসে তারা পানির ওপরে-নিচে ওঠানামা করে। গোবি জাতীয় বেশির ভাগ মাছের এই থলি থাকে না, থাকলেও খুব ছোট। তাই ভেসে থাকার চেয়ে তলায় থাকাই এদের জন্য স্বচ্ছন্দ।

নদীর তলা বেলের কাছে শুধু লুকোনোর জায়গা নয়, ঘরও। ডিম পাড়ার সময় এরা নিরাপদ, আড়ালের জায়গা বেছে নেয়। গোবি পরিবারের অনেক মাছ পাথর বা গর্তের গায়ে ডিম আটকে রাখে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে তারাও তলার কাছাকাছি বড় হয়। খাবারও মেলে সেখানেই। বেলে ছোট প্রাণী খায়, আবার নিজেও বড় মাছ আর পাখির খাবার হয়। অর্থাৎ খাদ্যশৃঙ্খলের ঠিক মাঝখানে তার জায়গা। এই কড়া খুলে গেলে ওপরে-নিচে দুই দিকেই প্রভাব পড়ে।

এখানেই আসে আমাদের নদীর কথা। বালু সরে গেলে, কাদা অন্য রকম হয়ে গেলে মাছের আশ্রয়ও থাকে না। নদীর তলায় শুধু বেলে থাকে না। সেখানে শামুক আছে, ছোট চিংড়ি আছে, নানা পোকার লার্ভা আছে। বেলের খাবার আসে এদের থেকেই। তলদেশ নষ্ট হলে সবাই একসঙ্গে বিপদে পড়ে।

.কোন মাছ ডাঙায় বেঁচে থাকে.

যন্ত্র দিয়ে বালু তোলা এখন অনেক জায়গায় চোখে পড়ে। এতে নদীর তলদেশ ওলটপালট হয়ে যায়, পানি ঘোলা হয়। ঘোলা পানিতে শিকার দেখা কঠিন। ছোট প্রাণী মরে যায় বা সরে পড়ে। নদী ভরাট হলে গভীরতা কমে, শুকনা মৌসুমে অনেক জায়গায় পানিই থাকে না। কচুরিপানা, দূষণ আর কারখানার বর্জ্য পরিস্থিতি আরও খারাপ করে। বেলে খেতে সুস্বাদু বলে চাহিদাও বেশি। ফলে একদিকে আবাস নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ধরার চাপ বাড়ছে।

বিশ্বব্যাপী তালিকায় প্রজাতিটি এখনো ঝুঁকিতে ধরা হয়নি। কিন্তু এলাকাভেদে সংখ্যা কমার কথা জেলেরা বলেন। প্রবীণদের মুখে প্রায়ই শোনা যায়, আগের মতো সহজে বেলে মেলে না। দেশে বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণের আইন আছে। অনেক জায়গায় তা ঠিকমতো মানা হয় না বলে অভিযোগ ওঠে। নদী বাঁচাতে হলে আইন মানা আর নজরদারি, দুটোই জরুরি।

বেলে আসলে নদীর স্বাস্থ্যের একটা ইঙ্গিত। যে নদীর তলদেশ ঠিক আছে, পানি পরিষ্কার, সেখানেই এমন মাছ টিকে থাকে। মাছ কমে গেলে বুঝতে হয়, নদীর কোথাও গোলমাল হয়েছে। নদী একটা বড় ঘর, আর তার মেঝেটাই বালু আর কাদা। মেঝে ভেঙে গেলে বাসিন্দারা থাকবে কোথায়? বেলে মাছ সেই প্রশ্নটাই আমাদের সামনে রেখে যায়।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

.কোন মাছ ডাঙায় বেঁচে থাকে