বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বড় বিপদ ব্ল্যাক কার্বন
- আপডেট সময় : ০৭:০৪:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ভয়াবহ বায়ুদূষণের শিকার। বিশ্বের ২০টি সবচেয়ে দূষিত শহরের ১৭টিই দক্ষিণ এশিয়ায়। কার্বনের পাশাপাশি ব্ল্যাক কার্বন দূষণের বড় নিয়ামক হয়ে উঠছে। এতে লাখো মানুষের স্বাস্থ্যগত সমস্যা হচ্ছে। পরিবেশদূষণ রোধ করা গেলে শুধু পরিবেশই বাঁচবে না, এতে স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নও নিশ্চিত হবে।
ব্ল্যাক কার্বন এবং অন্যান্য পরিবেশদূষণকারী উপাদান নিয়ে এক আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-নীতিবিষয়ক সেমিনারে বক্তারা এ কথা বলেন। আজ রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে এ আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টকহোম ইউনিভার্সিটি। ক্লিন এয়ার ফান্ডের সহযোগিতায় ছিল এ আয়োজন।
.
সেমিনারে প্রধান অতিথি পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, পরিবেশের বিপর্যয় রাতারাতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তবে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের চেষ্টা চলছে। কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তাঁরা বেহাল পরিবেশ পেয়েছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বর্তমান সরকারে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, তিন মাসের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। এর মধ্যে ঢাকায় ২৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসবে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ওই সরকারের সময়ে মেগা প্রকল্পের সঙ্গে মেগা দুর্নীতি এবং মেগা পরিবেশ বিপর্যয় ঘটেছে। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময়ে দুই স্ট্রোক ইঞ্জিনের পরিবর্তে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালু ও পলিথিনের বিরুদ্ধে অভিযানের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, বিএনপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে, তখনই পরিবেশবান্ধব কাজ করেছে।
.
সেমিনারে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহ-উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সালাম। তিনি ইন্টারন্যাশনাল গ্লোবাল অ্যাটমসফেরিক কেমিস্ট্রি (আইজিএসি) এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউটের (এইচইআই) গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভস ওভারসাইট কমিটির সহসভাপতি। আবদুস সালাম বলেন, বায়ুদূষণ, বিশেষ করে ব্ল্যাক কার্বনের উৎস, পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর এর প্রভাব এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের করণীয় নিয়ে তিনি তাঁর গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
আবদুস সালাম বলেন, ব্ল্যাক কার্বনকে এলিমেন্টাল কার্বন বা সুট পার্টিকলও বলা হয়। জীবাশ্ম জ্বালানি, জৈব জ্বালানি ও জৈব পদার্থের অসম্পূর্ণ দহনের ফলে এটি তৈরি হয়। ডিজেলচালিত ইঞ্জিন, শিল্পকারখানা, ইটভাটা এবং খোলা জায়গায় বর্জ্য ও অন্যান্য উপাদান পোড়ানো ব্ল্যাক কার্বনের উল্লেখযোগ্য উৎস।
.
ব্ল্যাক কার্বনের প্রভাব তুলে ধরে অধ্যাপক সালাম বলেন, সমপরিমাণ ভরের হিসাবে কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় ব্ল্যাক কার্বনের উষ্ণায়ন ক্ষমতা ১০০ থেকে ১ হাজার গুণ বেশি। ফলে এর নিঃসরণ কমানো গেলে স্বল্প সময়ের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমানোর ক্ষেত্রে দ্রুত সুফল পাওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, বাতাসের সঙ্গে ব্ল্যাক কার্বনের কণা হিমালয়ের বরফ, হিমবাহ ও তুষারস্তরে জমা হয়। এতে বরফের উপরিভাগ কালচে হয়ে সূর্যের আলো বেশি শোষণ করে। ফলে বরফ দ্রুত গলে যায়। এর প্রভাব পড়ে লাখো মানুষের মিঠাপানির সরবরাহের ওপর। বায়ুমণ্ডলে ব্ল্যাক কার্বনের কারণে সৃষ্ট তাপ আঞ্চলিক জলচক্র, মেঘ সৃষ্টি ও মৌসুমি বায়ুর ধরনেও পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে অধ্যাপক সালাম বলেন, ব্ল্যাক কার্বন পিএম ২.৫-এর অন্যতম উপাদান। এর সূক্ষ্ম কণা শ্বাসতন্ত্রের গভীরে এবং রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এর উচ্চ ঘনত্ব শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হৃদ্রোগ ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়।
.
ঢাকার বায়ুদূষণের উৎস হিসেবে অধ্যাপক সালাম যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজ, সড়কের ধুলা, ঘরের রান্নার ধোঁয়া, ইটভাটা, বর্জ্য পোড়ানো, শিল্পকারখানা এবং আন্তসীমান্ত দূষণের কথা উল্লেখ করেন।
শীতকালে আন্তসীমান্ত দূষণের বিষয়টি তুলে ধরে অধ্যাপক সালাম বলেন, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চল থেকে দূষিত বায়ু বাংলাদেশ অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরের দিকে যায়। এ সময় কোনো কোনো ক্ষেত্রে পিএম ২.৫-এর ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৫০০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছায়। অর্থাৎ বাংলাদেশের বায়ুদূষণের পেছনে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎসের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা দূষণেরও বড় ভূমিকা রয়েছে।
.
তবে দূষণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের একটি সাফল্যের উদাহরণও তুলে ধরেন অধ্যাপক সালাম। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকায় দুই স্ট্রোক ইঞ্জিন নিষিদ্ধ করার পর ব্ল্যাক কার্বনের ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৪০ মাইক্রোগ্রাম থেকে কমে বর্তমানে ৬ থেকে ১২ মাইক্রোগ্রামে নেমে এসেছে। দূষণ কমাতে তিনি যানবাহন ও শিল্পকারখানার নিঃসরণ মানদণ্ড কার্যকর করা, পুরোনো ও অনুপযোগী যানবাহন পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও গণপরিবহন বাড়ানো, নির্মাণকাজের ধুলা নিয়ন্ত্রণ এবং খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো বন্ধের সুপারিশ করেন। পাশাপাশি ইটভাটায় পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার, নিয়মিত বায়ুমান পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
.
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওয়ার গুসপাফসন বলেন, ব্ল্যাক কার্বন বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। বিশ্বের ২০টি সবচেয়ে দূষিত শহরের ১৭টিই এ অঞ্চলে।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এসডিজিবিষয়ক প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যাপক এস এম আবদুল আউয়াল, ঢাকায় সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাম উইকস, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মোতালিব, মালদ্বীপের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি আহমেদ মুসলিম, ভারতের ইনস্টিটিউট ফর গভর্ন্যান্স অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের প্রোগ্রাম ম্যানেজার আলী রেজা এবং ভারতের ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের বিজ্ঞানী কৃষ্ণকান্ত বুদ্ধভান্ত।





















