ঢাকা ০২:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ভারতের মধ্যে প্রথম কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হবে ম্যাজিক ইনস্টিটিউট উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির আগে সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে কি না, সংসদীয় কমিটিতে প্রশ্ন ‘ট্রাইব্যুনালে শুধু পলাতক আসামিদের বিচার হয়’—জামায়াত নেতার এমন বক্তব্য অসত্য: প্রসিকিউটর কক্সবাজারে নলকূপ খননে গ্যাস নির্গত হয়ে আগুন, যা জানাল পেট্রোবাংলা বেসরকারি খাতের ৫৫% কর্মী এআই ব্যবহার করেন, মেটলাইফের জরিপ প্রথমবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ১৩ জন, সবাই অকৃতকার্য ঘর হারিয়েও গল্প বলা থামেনি তাঁদের গঙ্গার পানি না এলে ভারতের পণ্যও বাংলাদেশে আসবে না: নাহিদ ইসলাম দেশে আলু চাষ কমছে, পেঁয়াজের বাড়ছে; কারণ কী অন্য আসামিদের সঙ্গে জিয়াউলকে আনলে সবাই আক্রান্ত হতে পারেন—এই বুদ্ধি কোথায় পেলেন: প্রসিকিউশনকে প্রশ্ন ট্রাইব্যুনালের

পকেট ভরা টাকায়ও মেলে না পেট ভরার সবজি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ১২:০৭:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬ ৬০ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অভিঘাত বিশ্বজুড়ে পড়লেও তার প্রভাব এসে ঠেকেছে বাঙালির ভাতের থালায়ও। প্রথমে জ্বালানির দাম বাড়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় চাপ। এরপর সেই প্রভাব পড়ে পরিবহন ভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। ফলে কাঁচাবাজারে রীতিমতো আগুন লেগেছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া এই অস্থিরতার প্রভাব এখন মূল্যস্ফীতিতেও স্পষ্ট। মার্চের তুলনায় এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, যার ফলে কম আয়ের মানুষের সংসার খরচে আরও চাপ তৈরি হয়েছে। এমন অবস্থায় বাজারে গিয়ে দাম শুনে অনেকের কাছে প্রতিটি সবজিই যেন একেকটি গোলার মতো মনে হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছে, দেশে এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে; যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—উভয় খাতই মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে বেশি ভূমিকা রেখেছে খাদ্যবহির্ভূত খাত। নিত্যপণ্যের দামের চাপ অব্যাহত থাকায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি এপ্রিলে বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ।

অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে এপ্রিলে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে; যা মার্চে ছিল ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ।

এই ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি জ্বালানি, পরিবহন ও বিভিন্ন সেবার ব্যয় বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা গেছে, প্রায় সব ধরনের সবজির দামই ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ডিম ও ভোজ্য তেলের দাম। চালের বাজারেও রয়েছে ঊর্ধ্বগতি।

কয়েক দিন আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৮০ টাকা নির্ধারণ করে। তবে বাজারে সে দামে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ১৯৪ থেকে ১৯৫ টাকায় এবং পাম অয়েল প্রায় ১৮০ টাকা দরে।

রাজধানীর হাতিরপুল ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে। ঢেঁড়স ও মিষ্টিকুমড়া ছাড়া প্রায় সব সবজির দামই এই সীমার মধ্যে। বরবটি, কাঁকরোল ও বেগুনের কেজি ১২০ টাকা। করলা, পটোল, টমেটো, গাজর, লাউ, উচ্ছে, চিচিঙ্গা, মুলা ও লতির দাম ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি। ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের একটি ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায় এবং পেঁপের কেজি ৮০ টাকা।

শসার কেজি ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, মিষ্টিকুমড়া ৪০ থেকে ৫০ টাকা, আলু ২০ থেকে ২৫ টাকা এবং ঢেঁড়সের কেজি ৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বড় আকারের এক হালি লেবু কিনতে গুনতে হচ্ছে প্রায় ৪০ টাকা।

ব্যবসায়ীদের দাবি, সাম্প্রতিক বৃষ্টির কারণে বাজারে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। হাতিরপুল বাজারের দোকানি ওমর ফারুক বলেন, বৃষ্টির কারণে সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটেছে। আবার তেলের দাম বাড়ায় গাড়ি ভাড়াও বেড়েছে। ফলে জিনিসপত্রের দাম দ্রুত বাড়ছে।

অন্যদিকে ক্রেতারা এ পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। রায়হান আবির নামে এক ক্রেতা বলেন, যেভাবে প্রতিদিন জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনই কঠিন হয়ে পড়বে।

এমন পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান চালানোর দাবি জানিয়েছেন ভোক্তারা। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বাজারের এই অস্থিতিশীলতা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণা সংস্থা সানেম–এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন, উৎপাদন, সেচ, সংরক্ষণ ও বিতরণ খরচ বেড়ে যায়, যা সরাসরি পণ্যের দামে প্রভাব ফেলে। তবে তিনি মনে করেন, এপ্রিলের মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি শুধু জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে নয়; সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বিনিময় হারের চাপ, আমদানি ব্যয়, বাজারের আচরণ এবং মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশাও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
   

পকেট ভরা টাকায়ও মেলে না পেট ভরার সবজি

আপডেট সময় : ১২:০৭:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অভিঘাত বিশ্বজুড়ে পড়লেও তার প্রভাব এসে ঠেকেছে বাঙালির ভাতের থালায়ও। প্রথমে জ্বালানির দাম বাড়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় চাপ। এরপর সেই প্রভাব পড়ে পরিবহন ভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। ফলে কাঁচাবাজারে রীতিমতো আগুন লেগেছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া এই অস্থিরতার প্রভাব এখন মূল্যস্ফীতিতেও স্পষ্ট। মার্চের তুলনায় এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, যার ফলে কম আয়ের মানুষের সংসার খরচে আরও চাপ তৈরি হয়েছে। এমন অবস্থায় বাজারে গিয়ে দাম শুনে অনেকের কাছে প্রতিটি সবজিই যেন একেকটি গোলার মতো মনে হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছে, দেশে এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে; যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—উভয় খাতই মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে বেশি ভূমিকা রেখেছে খাদ্যবহির্ভূত খাত। নিত্যপণ্যের দামের চাপ অব্যাহত থাকায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি এপ্রিলে বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ।

অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে এপ্রিলে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে; যা মার্চে ছিল ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ।

এই ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি জ্বালানি, পরিবহন ও বিভিন্ন সেবার ব্যয় বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা গেছে, প্রায় সব ধরনের সবজির দামই ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ডিম ও ভোজ্য তেলের দাম। চালের বাজারেও রয়েছে ঊর্ধ্বগতি।

কয়েক দিন আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৮০ টাকা নির্ধারণ করে। তবে বাজারে সে দামে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ১৯৪ থেকে ১৯৫ টাকায় এবং পাম অয়েল প্রায় ১৮০ টাকা দরে।

রাজধানীর হাতিরপুল ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে। ঢেঁড়স ও মিষ্টিকুমড়া ছাড়া প্রায় সব সবজির দামই এই সীমার মধ্যে। বরবটি, কাঁকরোল ও বেগুনের কেজি ১২০ টাকা। করলা, পটোল, টমেটো, গাজর, লাউ, উচ্ছে, চিচিঙ্গা, মুলা ও লতির দাম ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি। ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের একটি ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায় এবং পেঁপের কেজি ৮০ টাকা।

শসার কেজি ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, মিষ্টিকুমড়া ৪০ থেকে ৫০ টাকা, আলু ২০ থেকে ২৫ টাকা এবং ঢেঁড়সের কেজি ৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বড় আকারের এক হালি লেবু কিনতে গুনতে হচ্ছে প্রায় ৪০ টাকা।

ব্যবসায়ীদের দাবি, সাম্প্রতিক বৃষ্টির কারণে বাজারে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। হাতিরপুল বাজারের দোকানি ওমর ফারুক বলেন, বৃষ্টির কারণে সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটেছে। আবার তেলের দাম বাড়ায় গাড়ি ভাড়াও বেড়েছে। ফলে জিনিসপত্রের দাম দ্রুত বাড়ছে।

অন্যদিকে ক্রেতারা এ পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। রায়হান আবির নামে এক ক্রেতা বলেন, যেভাবে প্রতিদিন জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনই কঠিন হয়ে পড়বে।

এমন পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান চালানোর দাবি জানিয়েছেন ভোক্তারা। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বাজারের এই অস্থিতিশীলতা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণা সংস্থা সানেম–এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন, উৎপাদন, সেচ, সংরক্ষণ ও বিতরণ খরচ বেড়ে যায়, যা সরাসরি পণ্যের দামে প্রভাব ফেলে। তবে তিনি মনে করেন, এপ্রিলের মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি শুধু জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে নয়; সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বিনিময় হারের চাপ, আমদানি ব্যয়, বাজারের আচরণ এবং মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশাও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।