আর্থিক চাপ স্বাধীনতার বাধা
- আপডেট সময় : ০৯:২১:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬ ৫১ বার পড়া হয়েছে

বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় বাস্তবতায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে আর্থিক নির্ভরতা—এমন অভিমত উঠে এসেছে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন আলোচনা সভায়। বক্তারা বলেছেন, টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি ছাড়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
তাদের মতে, সরকার বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আর্থিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। ফলে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক সাংবাদিকতার স্বার্থে বিকল্প ও স্বনির্ভর অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
রোববার (৩ মে) রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে দিবসটি উপলক্ষে পৃথক কর্মসূচি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সম্পাদক পরিষদ ও নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) যৌথভাবে সিরডাপ মিলনায়তনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গঠন : মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রসার’।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, গণমাধ্যম খাতে জবাবদিহি, নীতিনির্ধারণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য কমিশন অপরিহার্য। তিনি আশ্বাস দেন, বিনা অপরাধে কোনো সাংবাদিককে কারাগারে থাকতে হবে না এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মন্ত্রী আরও জানান, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার এবং প্রচলিত গণমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে কীভাবে দায়বদ্ধতার আওতায় আনা যায়, তা নিয়েও কাজ চলছে।
গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সমস্যার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, টিআরপি বা প্রচারসংখ্যার মতো সীমিত সূচকের ওপর ভিত্তি করে মান নির্ধারণ বাস্তবসম্মত নয়। গণমাধ্যমকে শুধু ব্যবসা হিসেবে না দেখে সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে নীতিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও সরকার ভাবছে।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর। এতে আরও অংশ নেন নোয়াব সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী, দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, সাংবাদিক ও বিশ্লেষক কামাল আহমেদ, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় সম্পাদক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা।
এদিকে তথ্য ভবন মিলনায়তনে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে পৃথক এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী পুনরায় বলেন, সরকার এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায় না; বরং অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা হবে। তিনি মানহানি মামলা ও অন্যান্য আইনি জটিলতা প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান।
অন্যদিকে ইউনেস্কো ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) যৌথভাবে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আরেকটি আলোচনা সভার আয়োজন করে। সেখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, ভুয়া তথ্য এবং সুশাসনের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটের পেছনে অর্থনৈতিক চাপ ও মালিকানার প্রভাব বড় ভূমিকা রাখছে। অনেক ক্ষেত্রে সম্পাদকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না, যা গণমাধ্যমের সামগ্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তারা সতর্ক করে বলেন, আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা টেকসই হবে না। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সার্বিকভাবে বক্তারা মনে করেন, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে একটি শক্তিশালী, দায়িত্বশীল ও বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

























