দূষণযুক্ত যান নিষিদ্ধ করার ফলে দিল্লিতে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা
- আপডেট সময় : ০৩:৩৬:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

দিল্লির দূষণ ঠেকাতে একগুচ্ছ বিধিনিষেধের ফলে কাজের কাজ কতটা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এর ফলে মূল্যবৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী। যানবাহনের ভাড়া যেমন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়বে, তেমনই বেড়ে যাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী; বিশেষ করে মাছ-মাংস-ডিম থেকে শুরু করে আলু-পেঁয়াজ-শাকসবজির দাম।
পাশাপাশি এ-ও ঠিক, দিল্লিতে দূষণযুক্ত যান প্রবেশের বিষয়ে কঠোর হুকুম দেওয়া হলেও এ সময়ে দীপাবলিসহ বিভিন্ন উৎসব ও বিয়েশাদিতে যে বিপুল পরিমাণ আতশবাজি পোড়ানো হয়, তা দূষণের মাত্রা মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এটি বন্ধে কোনো নির্দেশ দেওয়া তো দূরের কথা, কোনো উদ্যোগই কোনো মহলে নেই। এমনকি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত হতাশ হয়ে প্রশ্ন করেছেন, যে নির্দেশ কার্যকর করা যায় না, তা বলবৎ করার অর্থ কী?
.শীতের আগেই বায়ুদূষণ মোকাবিলায় দিল্লির বড় ঘোষণা, চালু হচ্ছে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’.
এর ফলে সরকারি উদ্যোগ ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। সেই সঙ্গে দেখা দিচ্ছে সংশয়ও, দূষণযুক্ত যান বন্ধের নির্দেশ ঘিরে। রাজনৈতিক মহলে এমন চর্চাও হচ্ছে, ১ নভেম্বর থেকে তিন মাসের জন্য এভাবে দূষণযুক্ত যানবাহনের দিল্লি প্রবেশ বন্ধ করে দিল্লির বিজেপি সরকার কি ১ নভেম্বর (রোববার) রামলীলা ময়দানের বিরোধী সমাবেশের ভিড় কমাতে পারবে?
.
রাজনৈতিক মহলে এমন চর্চাও হচ্ছে, ১ নভেম্বর থেকে তিন মাসের জন্য এভাবে দূষণযুক্ত যানবাহনের দিল্লি প্রবেশ বন্ধ করে দিল্লির বিজেপি সরকার কি ১ নভেম্বর (রোববার) রামলীলা ময়দানের বিরোধী সমাবেশের ভিড় কমাতে পারবে?
.
দিল্লি সরকার জানিয়েছে, দিল্লির বাইরে নিবন্ধিত ‘বিএস ৬’ মানদণ্ডের কম যেকোনো পেট্রল ও ডিজেলচালিত বাহন ১ নভেম্বর থেকে আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দিল্লিতে ঢুকতে পারবে না। এ নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়ছে বাস, ট্রাক, ট্রাক্টর, ট্রাক্টর-বাহিত ট্রেলার, মোটরগাড়ি বা তিন ও দুই চাকার অটো বা বাইক সবকিছু। দিল্লিতে প্রবেশের অনুমতি থাকছে শুধু ‘বিএস ৬’ মানদণ্ডের গাড়ি এবং সেসব যান যেগুলো বিদ্যুৎ, সিএনজি অথবা ব্যাটারিতে চলে।
.
এ পদক্ষেপের ফলে কী হতে চলেছে—পরিবহন মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানই তা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে। ‘বিএস ১’ থেকে ‘বিএস ৪’ মানদণ্ডের ৪৮ লাখ বাস, ট্রাক, ট্রাক্টর ও অন্যান্য গাড়ি দিল্লির লাগোয়া ন্যাশনাল ক্যাপিটাল রিজিয়নে (এনসিআর) নথিভুক্ত। এলাকাগুলো দিল্লির লাগোয়া উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা ও রাজস্থানে। প্রায় প্রতিদিনই এসব গাড়ি রাজধানী দিল্লিতে আসা-যাওয়া করে। আগামী তিন মাস এনসিআর থেকে এগুলো দিল্লি ঢুকতে পারবে না। এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধান সমস্যা।
.
যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও নিষিদ্ধের আওতায় রয়েছে নির্মাণকাজ। এ তিন মাস রাজধানী দিল্লির নির্মাণকাজ বন্ধ থাকবে। তবে নির্দিষ্ট কিছু জরুরি সরকারি নির্মাণকাজ, যেমন সেন্ট্রাল ভিস্তা, চলবে। সেই সব এলাকার রাস্তা, গাছপালায় পানি স্প্রে করতে হবে, যাতে ধূলিকণা বাতাসে উড়ে ‘পিএম ২’ বৃদ্ধি করতে না পারে।
.
দিল্লির নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের প্রায় পুরোটাই আসে এনসিআর হয়ে। মাছ-মাংস-ডিম থেকে শুরু করে আলু-পেঁয়াজ-আনাজপাতির প্রধান পাইকারি বাজারগুলোর (মান্ডি) অবস্থান উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদ বা হরিয়ানার ফরিদাবাদে; যা এনসিআরের মধ্যে পড়ছে। ব্যাপারীদের আশঙ্কা, মান্ডিতে মালপত্র আসা ব্যাহত হলে এবং তা দিল্লি ঢুকতে না পারলে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়তে বাধ্য। তেমনই বাড়বে যাত্রী পরিবহনের ভাড়াও।
.
সর্বভারতীয় মোটর ট্রান্সপোর্ট কংগ্রেসের হিসাব অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে চলেছে আড়াই লাখ পণ্য পরিবহনকারী যান। এসব যানবাহনেই জম্মু কাশ্মীর ও হিমাচল প্রদেশ থেকে দিল্লিতে আপেল আসে। উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব ও হরিয়ানা থেকে আসে আলু। মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থান থেকে আসে পেঁয়াজ। হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ ও রাজস্থান থেকে আসে দুধ। পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তর প্রদেশ থেকে আসে ডিম এবং হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ ও গুজরাট থেকে আসে মাছ।
.
মাংসের সরবরাহ প্রধানত আসে উত্তর প্রদেশ থেকে। এ ছাড়া এনসিআর সরবরাহ করে কাঁচা শাকসবজি। শীতকালে দিল্লির দূষণ কমাতে যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা নতুন ব্যাপার নয়। কিন্তু এবার তা কঠোরভাবে পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দিল্লি ঢোকার আগে চেকপোস্টগুলোয় বসানো হয়েছে ‘অটোমেটিক নম্বর প্লেট রিকগনিশন’ ক্যামেরা। এসব ক্যামেরা ‘এআই’–চালিত। এ ক্যামেরা গাড়ির দূষণের মানদণ্ড চিহ্নিত করবে। চেকপোস্টগুলোয় মোট ৩০০ কর্মী নিয়োগ করা হচ্ছে, যাঁরা নির্দেশ মানা হচ্ছে কি না, তদারক করবেন। তা ছাড়া প্রত্যেক জায়গাতেই ব্যারিকেড রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি দিল্লির পেট্রলপাম্পগুলোকে বলা হয়েছে, দূষণরোধ সার্টিফিকেট ছাড়া কাউকে যেন জ্বালানি দেওয়া না হয়।
.
যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও নিষিদ্ধের আওতায় রয়েছে নির্মাণকাজ। এই তিন মাস রাজধানীর নির্মাণকাজ বন্ধ থাকবে। তবে নির্দিষ্ট কিছু জরুরি সরকারি নির্মাণকাজ, যেমন সেন্ট্রাল ভিস্তা, চলবে। সেই সব এলাকার রাস্তা, গাছপালায় পানি স্প্রে করতে হবে, যাতে ধূলিকণা বাতাসে উড়ে ‘পিএম ২’ বৃদ্ধি করতে না পারে। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি অফিস-কাছারিতে ৫০ শতাংশ কর্মীকে বাড়ি থেকে কাজ (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) করাতে হবে।
যান চলাচল ও নির্মাণকাজ ছাড়াও দিল্লির দূষণের একটা বড় কারণ, হরিয়ানা ও পাঞ্জাবে ফসল কাটার পর খেত জ্বালিয়ে দেওয়ার প্রথা। পশ্চিমি হাওয়ায় ভর দিয়ে সেই ধোঁয়া দিল্লি ছেয়ে ফেলে। সেই প্রথা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কারণ, জমি থেকে কাটা ফসলের গোড়া তোলা খরচ ও সময়সাপেক্ষ।
তবে সবচেয়ে বড় বিষয়, আতশবাজি বন্ধ করতে না পারা। উগ্র হিন্দত্ববাদীরা দীপাবলিতে আতশবাজি বন্ধের বিরুদ্ধে। তাঁদের দাবি, বাজি পোড়ানো দীপাবলির ধর্মীয় অঙ্গ। সুপ্রিম কোর্ট চেষ্টা যে করেননি, তা নয়। কিন্তু দিল্লি পুলিশ তাঁদের রায় বলবৎ করতে ব্যর্থ। জনরোষের ভয়ে পুলিশ আগ্রহীও নয়। আম আদমি পার্টির আমলে পুলিশ যা পারেনি, বিজেপি আমলেও তা পালনে তারা ব্যর্থ। ‘দূষণ সচেতন শিক্ষিত জনতাও’ বাজি পোড়ানো বন্ধে সেভাবে উদ্যোগী নয়।
.
ফলে গত ২৯ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এম এম সুন্দরেশ ও বিচারপতি পি বি ভারালের ডিভিশন বেঞ্চ হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, প্রতিবছর দীপাবলির আগে বাজি পোড়ানো বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হলেও তা একরকম ‘তাত্ত্বিক চর্চা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্দেশ মানার চেয়ে লঙ্ঘনই বেশি হচ্ছে। বিচারপতিরা বলেছেন, স্রেফ নিষেধাজ্ঞা জারি করে লাভ নেই। নতুন কিছু ভাবা প্রয়োজন। তাঁরা বলেছেন, বিরাট কোহলিদের মতো জনপ্রিয় ক্রিকেটার বা বিনোদন জগতের লোকজনকে দিয়ে প্রচার চালানো যেতে পারে, যদি তাতে কাজের কাজ কিছু হয়।
এটাই আসল কথা। কাজের কাজ হওয়া। হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও শীতকালে দিল্লির দূষণ (একিউআই) মাত্রা অক্টোবরের শেষ ও নভেম্বরের গোড়ায় ২০০ থেকে ৩৫০-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করে। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে ৩৫০ থেকে ৪০০। কখনো কখনো একিউআই মাত্রা ৫০০-ও স্পর্শ করে।

























