ব্যাংক উদ্ধার প্রকল্প ও জবাবিদিহি নিয়ে কিছু প্রশ্ন
- আপডেট সময় : ০১:২২:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, ব্যাংকিং খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছরে জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। তিনি অবলীলায় স্বীকার করেন যে তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখা গেছে, ব্যাংকের তিন ভাগের এক ভাগ টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে কিছু লোক। তিনি এটাকে ঠিক চুরি বলতে চান না, এটাকে লুট বলাই সংগত বলে মনে করেন বরং। এভাবে ব্যাংকের টাকা লুট থেকেই আর্থিক খাতের সমস্যার শুরু, আর এটিকেই আমাদের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম প্রধান সমস্যা বলে যথার্থভাবে চিহ্নিত করেছেন তিনি।
আমাদের ব্যাংকগুলোর বিশ্ব রেকর্ড করা খেলাপি ঋণের আড়ালে একটা বিশাল অঙ্ক যে লুটপাটের কারণে ঘটেছে, এই সত্যটি প্রকাশ করে প্রকৃত অভিভাবকের পরিচয় দিয়েছেন মাননীয় গভর্নর। কারণ, ব্যাংক থেকে লুণ্ঠিত অর্থকে খেলাপি ঋণের ছদ্মাবরণে লুকিয়ে রাখার কোনো সুযোগ নেই। এই লুণ্ঠন ঘটেছে ব্যাংকিং নিয়মাচারের ব্যাপক লঙ্ঘন এবং বেনামি কিংবা অস্তিত্বহীন গ্রাহকের নামে ঋণ বিতরণের মাধ্যমে। আবার ব্যাংকের অসতর্কতা ও দুর্বল ঋণ নীতিমালার কারণে সিঁধ কাটার মতো চুরিও আছে খেলাপি ঋণের মধ্যে।
.ব্যাংক খাত ঠিক হবে তো?.
দ্বিতীয় একটি প্রশ্ন থেকে যায়, প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা কী শর্তে দেওয়া হবে কিংবা সে অর্থ আদায়ের কী ব্যবস্থা থাকবে। আমেরিকার সমস্যাকবলিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্ধার করার জন্য ফেডারেল রিজার্ভ যে সহায়তা দিয়েছিল, তার মধ্য থেকে কিছু আঞ্চলিক ব্যাংক ছাড়া জেপি মর্গান চেজ, ওয়েলস ফারগো, ব্যাংক অব আমেরিকা, সিটিকর্প-এর মতো ব্যাংকগুলো সুদ ও লভ্যাংশসহ পুরো অর্থ ফেরত দিয়েছিল।
.
ফলে ঋণের নামে লুটপাট ও চুরি, বেনামি ঋণ এবং সর্বোপরি ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও অনিচ্ছাকৃত খেলাপি মিলিয়ে আমাদের ব্যাংকিং খাতের ঘোষিত খেলাপি ঋণের হার এখন প্রায় ৩৩ শতাংশ, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ হার। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছে যথাক্রমে আফ্রিকার চাদ ও নিরক্ষীয় গিনি। অবশ্য বাংলাদেশের এই হার প্রকৃত অবস্থার সঠিক চিত্র কি না, সে সন্দেহ থেকেই যায়, কারণ, সব ব্যাংকই যে ঋণ শ্রেণীকরণের সবগুলো মাপকাঠি ঠিকভাবে ব্যবহার করে, এ কথা জোর দিয়ে বলা যায় না।
.ব্যাংক খাতের সংস্কারেও কেন খেলাপি ঋণ কমবে না.
ঋণের নামে লুটপাটের বিষয়টি কেবল স্বীকার করেই দায়িত্ব শেষ করেননি গভর্নর, ব্যাংকিং খাতের এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য পরবর্তী পাঁচ থেকে আট বছরে জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে, এমন একটা খসড়া প্রস্তাব সরকারের কাছে দিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে একটা অপ্রিয় সত্য কথাও বলেছেন তিনি, যে টাকা লুট হয়েছে, সেটা জনগণের টাকা। আবার এই জনগণকেই এখন সেই টাকা দিতে হচ্ছে। লুট করে নিয়ে গেছে একজন, আর জরিমানা দিচ্ছে জনগণ। এই সত্য কথাটি উচ্চারণের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ।
সরকারের কাছে পেশ করা খসড়া হিসাব অনুযায়ী ব্যাংকিং খাত মেরামতের জন্য বাজেট থেকে যদি আগামী পাঁচ বছর দিয়ে যেতে হয়, তাহলে মোট পরিমাণ দাঁড়াবে ৩ লাখ কোটি টাকা, আর আট বছর ধরে দিয়ে যেতে হলে মোট দাঁড়াবে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এখানে আমাদের কয়েকটা তথ্য মাথায় রাখতে হবে, ২০২৫-২৬ বছরে আমাদের বার্ষিক রাজস্ব আয় ছিল ৪ লাখ কোটি টাকার মতো। সর্বশেষ ঘোষিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং অনুমিত ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
. ব্যাংক খাতে ‘লাইসেন্স টু লুট’, বাংলাদেশ সংস্করণ.
আমাদের আয় ও ব্যয়ের এই টানাটানির বাজেট থেকে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা কীভাবে দেওয়া হবে, দিলে আমাদের ব্যয়ের কোন কোন খাতে টান পড়বে, সে আলোচনায় না গিয়ে প্রথমেই বলা যায়, এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতকে খাদের তলা থেকে তুলে আনার কোনো বিকল্পও নেই। আমেরিকার সাবপ্রাইম সংকটের জেরে বেহালে পড়া সে দেশের আর্থিক খাত পুনরুদ্ধারে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ৪৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার সহায়তা দিয়েছিল। তবে আমেরিকার তখনকার পরিস্থিতি ও পটভূমি এবং বাংলাদেশের উদ্ভূত পরিস্থিতির উৎসের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য।
আমেরিকার ব্যাংকগুলো বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল অতি লোভের কারণে, সেখানে এমন ঢালাও লুটপাট হয়নি। ২০০৭ সালের শেষার্ধে আবাসনশিল্পকে চাঙা করা এবং আসন্ন মন্দাবস্থা মোকাবিলার জন্য ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমাতে শুরু করলে মানুষের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়, বিশেষ করে বাড়ি কেনার জন্য সহজ শর্তে পাওয়া ঋণ। ব্যাংকগুলো এমন অনেক গ্রাহককে বাড়ি কেনার জন্য ঋণ দিয়েছিল, যাদের ঋণ পাওয়ার কোনো যোগ্যতাই ছিল না। এই ঝুঁকিপূর্ণ ঋণই ‘সাবপ্রাইম মর্টগেজ’ নামে পরিচিতি পায়।
.ব্যাংক খাতে খেলাপি তোষণ যে পরিণাম ডেকে এনেছে.
ঋণঝুঁকি কমানোর জন্য ব্যাংকগুলো আবার এসব ঋণকে একত্র করে নতুন প্রোডাক্ট হিসেবে বিনিয়োগকারী ও ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল। এসব ঋণ পোর্টফোলিওকে আবার ছোট ছোট টুকরায় ভাগ করে মনভোলানো বাহারি নামে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ারবাজারে বিক্রি করা হতে থাকে। এগুলো ছিল অনেকটা মিউচুয়াল ফান্ডের মতো। কিন্তু কম সুদের সুদিন আর বেশি দিন থাকেনি। সুদের হার বেড়ে গেলে হোম লোনের মাসিক কিস্তির অঙ্ক বেড়ে যায়। ফলে ঋণ খেলাপ বাড়তে থাকে।
খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকগুলো তাদের কাছে বন্ধকি বাড়ি বিক্রি করে দেওয়া শুরু করলে বাড়ির বাজারে ধস নামে, বাড়ি বিক্রি করেও ঋণের পুরো টাকা আদায় হচ্ছিল না। একপর্যায়ে বাড়ির বাজার ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ এবং শেয়ারবাজার ধসের কারণে বিশ্বের বড় বড় বিনিয়োগ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যায়। কেবল ২০০৮ সালেই ২৫টির বেশি মার্কিন ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় চরম তারল্যসংকট ও অবিশ্বাসের সৃষ্টি করে।
.পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা সম্ভব? .
কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে এ রকম পরিস্থিতি ঘটেনি। এখানে চলেছে কিছু ব্যাংক পরিচালক ও বড় ঋণগ্রহীতার যোগসাজশে ঋণের নামে লুণ্ঠন ও বেনামি ঋণের মহোৎসব। তাই আমেরিকার ব্যাংকগুলোর অবস্থা এবং সেগুলোকে উদ্ধারের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির কোনো মিল নেই। তারপরও বলা যায় আমাদের ব্যাংকগুলোকে উদ্ধারের জন্য আমেরিকার মতো ‘বেইল আউট’ পরিকল্পনার বিকল্প ছিল না।
কিন্তু একই সঙ্গে একটা গুরুতর বিষয়ের সুরাহা হওয়া উচিত। প্রথমত, আমরা যদি কোনো ঋণকে লুটপাটের সঙ্গে তুলনা করি, সেটাকে ঋণের আড়ালে লুকিয়ে রাখার সুযোগ নেই। দ্বিতীয়ত, লুটপাট একটা ফৌজদারি অপরাধ।
তাই ঋণের নামে লোপাটকৃত কিংবা সরাসরি লুণ্ঠিত অর্থ এবং বেনামি বলে প্রমাণিত ঋণ হিসাবকে প্রকৃত খেলাপি হিসাব থেকে আলাদা করে ফেলতে হবে। প্রথমোক্ত দুই শ্রেণির ঋণকে তছরুপ বিবেচনা করে ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে প্রটেস্টেড বিল হিসেবে সরিয়ে নেওয়া যায়, যা সাধারণত ব্যাংকের যেকোনো তছরুপ বা জালিয়াতির ক্ষেত্রে করা হয়। তারপর এসব লুণ্ঠন ও বেনামি ঋণের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
.খেলাপি ঋণ: সামনের দরজা বন্ধ, পেছনের দরজা খোলা.
এই পন্থায় যতটুকু সম্ভব উদ্ধার করতে হবে লুণ্ঠিত অর্থ। বাকি অংশ ধীরে ধীরে অবলোপন করতে হবে। ঋণের নামে লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে জনগণের টাকায় ব্যাংককে উদ্ধার করার ব্যবস্থা হবে সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এই ব্যবস্থায় প্রকৃত খেলাপি ঋণ থেকে লুণ্ঠিত ও বেনামি ঋণকে আলাদা করলে কোনো কারচুপি ছাড়াই খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার দুটোই কমবে।
অন্যদিকে প্রকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা খর্ব করতে হবে। তাঁদের পরিচয় প্রকাশ্য করার উদ্যোগ নিলেও উল্লেখযোগ্য সুফল আসার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নেতৃত্ব খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন।
এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সুদ মওকুফের মাধ্যমে এককালীন পরিশোধের সুযোগ। বড় খেলাপিদের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থায় বিশেষ সফলতা আসবে না। কারণ, তারকা খেলাপিরা তাঁদের ঋণের টাকা হয় বিদেশে সরিয়ে নিয়েছেন কিংবা এমন জায়গায় বিনিয়োগ করে রেখেছেন, সেগুলো বিক্রি করে অর্থ উদ্ধার প্রায় অসম্ভব। এসব খেলাপি গ্রহীতার অনেকেই সম্পদ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধে আগ্রহীও নন। তাঁদের আগ্রহ যেকোনো উপায়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত প্রণোদনার সুবিধা নেওয়ার প্রতি।
.
দ্বিতীয় একটি প্রশ্ন থেকে যায়, প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা কী শর্তে দেওয়া হবে কিংবা সে অর্থ আদায়ের কী ব্যবস্থা থাকবে। আমেরিকার সমস্যাকবলিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্ধার করার জন্য ফেডারেল রিজার্ভ যে সহায়তা দিয়েছিল, তার মধ্য থেকে কিছু আঞ্চলিক ব্যাংক ছাড়া জেপি মর্গান চেজ, ওয়েলস ফারগো, ব্যাংক অব আমেরিকা, সিটিকর্প-এর মতো ব্যাংকগুলো সুদ ও লভ্যাংশসহ পুরো অর্থ ফেরত দিয়েছিল।
দেশের করদাতা জনগণ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত ‘বেইল আউট’ পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন দিলেও জানতে চাইতে পারে, যাদের কারণে আজ এই পরিস্থিতি, তারা কি সব সময়ের মতোই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে? তাই নিরুপায় করদাতাদের আশা, উদ্যোগটি একতরফা হবে না, উদ্ধার করা ব্যাংকগুলোর দুরবস্থার হোতাদের জবাবদিহি ও বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
-
ফারুক মঈনউদ্দীন লেখক ও ব্যাংকার
fmainuddin@hotmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব

























